• হোম
  • জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ৭৫
  • ভূমিকা

ভূমিকা

ফন্ট সাইজ:

চতুর্থ সংস্করণের ভূমিকা 

আমি রাজনীতিবিদ। ব্যস্ত মানুষ। নানাবিধ সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বইটিকে পূর্ণাঙ্গ করার অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছি। সেই লক্ষ্যে আমার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বর্তমান সংস্করণেও বেশ কিছু তথ্য সংযোজন করেছি। একবারে সম্ভব নয় বিধায় ধাপে ধাপে সংযোজনের মধ্য দিয়েই বইটির পুর্ণাঙ্গ রূপ দেয়ার প্রচেষ্টা আমার অব্যাহত থাকবে। একথা আজ সর্বজন স্বীকৃত যে, আমাদের জাতীয় জীবনে ইতিহাস বিকৃতির ডামাডোলে সত্র আজ বিস্তৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছে। মিথ্যা আর বিকৃত ইতিহাসই আজ জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। খলনায়ক নায়কে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে ইতিহাস একটি রূঢ় বাস্তবতা। তাকে সাময়িকভাবে হয়তো বা এদিক সেদিক করা যায়। কিন্তু কালের পরিক্রমায় ইতিহাস তার স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হবেই। এর ব্যাতিক্রম হয় না। যুগে যুগে তাই হয়ে আসছে। আর তাই অসত্যের ডামাডোলে যতই ধামা চাপা দেয়া হোক না কেন সত্য তার স্বমহিমায় আত্মপ্রকাশ করবেই। ইতিহাস তাই বলে। বইটির তৃতীয় সংস্করণের মতো বর্তমান সংস্করণেও আরো কিছু তথ্য ও ঘটনা সংযোজন করেছি। তৎমধ্যে বাংলাকে স্বাধীন ও অখন্ড রাখতে তৎকালীন বাংলার গভর্ণর স্যার ফেডারিক বরোজের প্রচেষ্টা, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ভারত সরকারের সাথে স্বাক্ষরিত ৭ দফা গোপন সমঝোতা চুক্তি এবং এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে দিল্লীতে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকারি পরবর্তীতে পররাষ্ট্র মন্ত্রী, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও জাতীয় সংসদের স্পীকার মরহুম জনাব হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর একটি সাক্ষাৎকার, শেখ মুজিব, বেগম মুজিব ও মেজর জিয়া প্রসঙ্গ সংযোজন করেছি। বিশেষ করে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে জাতীয় স্বার্থে শেখ মুজিব কর্তৃক গৃহীত কতিপয় ঐতিহাসিক কার্য্যক্রম, বেগম মুজিবের ত্যাগ-তিতিক্ষার কিছু বিবরণ এবং তৎকালীন মেজর জিয়া কর্তৃক ২৭ শে মার্চ চট্টগ্রাম বেতারের কালুরঘাট ট্রান্সমিশন কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের প্রেক্ষিত সম্পর্কে কিছু তথ্যের উল্লেখ করেছি। বইটির তৃতীয় সংস্করণে মুদ্রণ প্রমাদজনিত এবং তথ্যগত কিছু ত্রুটি ছিল-এ সংস্করণে তা সংশোধন করা হয়েছে এবং স্থানে স্থানে প্রয়োজনে সংযোজন করা হয়েছে। এটা সর্বজন বিদিত যে, শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আমার রাজনৈতিক আদর্শগত বিরোধ চরমে পৌঁছার কারণেই আমাকে আওয়ামী লীগ হতে বহিস্কৃত হতে হয় অথবা অন্য ভাবে বললে বলা যায় দু’জনের মত এবং পথের চরম ভিন্নতার কারণেই এক সাথে রাজনীতি করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭১ এর ২৫শে মার্চ পাক বাহিনীর নিকট তাঁর ‘আত্মসমর্পন’ এর কারনে স্বাধীনতা সংগ্রামে স্বশরীরে নেতৃত্ব দিতে না পারলেও বাংগালীর স্বাধীনতা সংগ্রামে শেখ মুজিবই একচ্ছত্র নেতা এটা মেনে নিতে কোন সংশয় বা দ্বিধা নাই। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধান হিসেবে তার রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যক্রমের সঙ্গে একমত ছিলাম না। জাতীয় স্বার্থ বিরোধী কার্যক্রমের তীব্র বিরোধীতা করেছি তাঁর বিরুদ্ধেকঠোর আন্দোলন সংগ্রাম করেছি, কারাবরণ করেছি। এসব কিছুই রাজনৈতিক। রাজনৈতিক বিরোধীতাকে আমি কখনো ব্যক্তিগত বিরোধিতায় পর্যবসিত করিনি। বিশেষ করে আমার বইয়ে যা উল্লেক করেছি এবং যেভাবে উল্লেখ করেছি তা শুধু সত্র ইতিহাসকে তুলে ধরার প্রয়াসে সে সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলোই তুলে ধরেছি এবং তা যে কারও বিরুদ্ধে কিংবা পক্ষে যেতে পারে। আমার কাছে রাজনীতিটাই বড়, দেশের স্বার্থটাই বড়। ব্যক্তি স্বার্থকে আমি কখনো বড় করে দেখিনি। 
 
স্বাধীনতার অভূদ্যয়ে জননন্দিত ও জনমানসে প্রতিষ্ঠত একচ্ছত্র নেতা শেখ মজিবুর রহমান এর সাথে সরকারী সামরিক কর্মচারী মেজর জিয়াউর রহমানকে পাশাপাশি দাঁড় করাবর যে কোন প্রয়াস বা চিন্তাই গর্হিত। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ জিয়াউর রহমানের ২৭শে মার্চের ঘোষণাকে প্রতিঘাত করতে ২৬শে মার্চ শেখ মুজিব কতৃক চট্টগ্রামে জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে প্রচারের জন্য প্রেরিত বলে একটি বানোয়াট স্বাধীনতার ঘোষণার গল্প তৈরী করলো-পরবর্তীতে শেখ মুজিবও এটিকে মেনে নিয়ে ইতিহাসে একটি চরম মিথ্যা সংযোজন করলেন। রাজনীতিকে আমি সব সময় সব কিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছি। আমার বইয়ে এরই প্রতিফলন ঘটিয়েছি। যা সত্য তাই তুলে ধরেছি। কার পক্ষে বা বিপক্ষে গেল তার ভ্রুক্ষেপ আমি করিনি। 
 
একারণেই দেখা যাবে যে, রাজনৈতিক ভাবে যাদের আমি প্রচন্ড বিরোধীতা করেছি অনেক জায়গায তাদের মন্দ কাজের সমালোচনার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থে ভালো কাজের প্রশংসা করতেও কুণ্ঠা বোধ করিনি। শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের ইতিহাসে এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। তার ব্যর্থতা যেমনি পর্বত প্রমাণ সফলতাও তেমনি আকাশ চুম্বি। পাকিস্তান আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তানেও ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবের সাথে একযোগে কাজ করেছি। একসাথে সংগঠন করেছি, আন্দোলন করেছি, কারাবরণ করেছি। অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে, আন্দোলন সংগঠনে মতবিরোধ হয়েছে, মতপার্থক্য হয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়েছি আবার একাত্ম হয়েছি।
 
বলা হয় ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারী পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবর রহমান- এটা সর্বৈধ মিথ্যা। ৪ঠা জানুয়ারী ১৯৪৮ সালে আমরা যখন ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করি তখন তিনি ঢাকায় ছিলেন না, ছিলেন নিজ বাড়ী ফরিদপুরের গোপালগঞ্জে। আমরা তার অনুমতি না নিয়ে আহ্বায়ক কমিটিতে তাকে সদস্যভূক্ত করি। বিশ্বাস ছিল যে তিনি এতে দ্বিমত করবেন না। তিনি তো আমাদের নেতাও  ছিলেন। পরে ঢাকায় এসে তিনি পূর্ণ উদ্যোমে নব প্রতিষ্ঠিত এই ছাত্র সংগঠনকে সংগঠিত করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। ‘৫২ সালের রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকার গাল-গল্প ডাহামিথ্যা। ‘৫২ এর সেই উত্তাল সময়ে তিনি কারাগারে অন্তরীন ছিলেন। ২১শে ফেব্রুয়ারী পর সরকার কর্তৃক ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে যখন দেশ উত্তপ্ত আমাদেরকে একে একে কারাগারে নিক্ষেপ করা হচ্ছে সে সময় তিনি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন এবং গোপালগঞ্জে নিজ বাড়ীতে অবস্থান করতে থাকেন। ঢাকা-নারায়নগঞ্জের রক্তঝরা উত্তাল আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে তিনি আসেন নাই। যদিও এটাই ছিল তার দায়িত্ব ও কর্তব্য। প্রতিটি মুহূর্তে আমি তার আগমনের প্রতীক্ষায় ছিলাম। 
 
১৯৬৭ সালে তিনি বাংগালীর মুক্তি সনদ নামে অভিহিত ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবী পেশ করেন এবং ৬ দফা অন্দোলন সারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেন। পরবর্তীতে ৬ দফা-১১ দফা, অগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ’৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে একছত্র বিজয়ের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে যান এদেশের একচ্ছত্র নেতা। ৬ দফার পক্ষে তিনি এতদঅঞ্চলের মানুষের ম্যান্ডেট লাভ করেন। তার ত্যাগ-তিতিক্ষা, অন্দোলন-সংগ্রামই তাকে এই  উপনীত করেছিল। ’৫২ এর ভাষা অন্দোলনের মাধ্যমে বাংগালী জাতীয়তাবাদেও চেতনার যে স্ফুরণ ঘটেছিল, বাংগালীর স্বাধীন সত্তার বিকাশের যে উদগ্রবাসনা জেগেছিল, ৬ দফা-১১ দফা অন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা আর সাধারণ নির্বাচনে নিরংকুশ বিজয়-তার সফলতা এনে দেয়। জাতীয়তাবাদের পুনর্জাগরণের সেই মহালগ্নের নেতা হিসাবে দেশবাসী শেখ মুজিবকেই বরণ করে নেয়।
 
পশ্চিমা উর্দুভাষী শাসক-শোষক গোষ্ঠী নিয়মতান্ত্রিক পথে নির্বাচনে বিজয়ী নেতার কাছে ক্ষমতা  হস্তান্তর না করে বাংগালীকে স্তব্ধ করে দিতে ট্যাংক কামান আর বন্দুক নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে বাংগালীরা পাক হায়েনা বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করতে বাধ্য হয়। পুরো মার্চ মাসই ছিল বাংগালী জাতির স্বাধীনতা অন্দোলনের মানসিক প্রস্তুতির মাস। ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কর্তৃক স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন, ২রা মার্চ পাকিস্তানের পতাকার স্থলে মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন, ৩রা মার্চ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ স্বাধীনতা অন্দোলনের সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিতে থাকে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দেও দ্যোদুল্যমানতার মধ্যেও স্বাধীনতা সংগ্রামের মতো এতবড় একটি কাজে একমাত্র পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের নেতৃত্ব ছিল সুসংহত, সুগঠিত ও লক্ষ্যে স্থির দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। কিন্তু ২৫ শে মার্চ ৭১ এর কাল রাত্রিতে বাংগালীর এই একচ্ছত্র নেতা, স্বাধীনতা অন্দোলনের মূর্ত প্রতীক শেখ মুজিব পাক বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পন করে আজাদী সংগ্রামীদের বিপদে ফেলে দিলেন। এই পরিস্থিতিতে দেশবাসী না তাকে ফেলতে পারে, না তাকে মূর্ত সেনাপতি হিসাবে গ্রহণ করতে পারে। 
 
কিন্তু তার ৬ দফা আন্দোলনের উত্তাল উন্মাদনায় জাতির মনে স্বাধীনতার স্বপ্ন অর আকাংখা তীব্রভাবে জেগে উঠে এবং মনোজগৎ হয়ে উঠে দুর্জয় শক্তিতে বলীয়ান। ২৫শে মার্চের কালো রাত্রিতে operation search light এ পাক হায়েনাদের কামান বন্দুকের বিরুদ্ধে দেশবাসী কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে স্বাধীনতার রক্তক্ষয়ী মরনপণ সংগ্রামে রক্ত নিতে রক্ত দিতে ঝাপিয়ে পড়ে। শুরু হলো মরণপণ মুক্তিযুদ্ধ। মুজিব মুক্তিযুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন কি ছিলেন না, আত্মসমর্পন করেছেন কি করেন নাই এ নিয়ে ’৭১ সালে কারো মনে কোন প্রশ্নই উঠে নাই। মুজিব জাতির মনে যে, ’স্বাধীনতার ’ স্বপ্ন ও আকাঙ্খা জাগিয়ে দিয়েছিলেন মানুষের মনের সে দুর্জয় সাহস ও শক্তিই দেশকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিয়েছে।  
 
পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি শুনতে পান বাংলাদেশ হিন্দুস্থানী ফৌজের দখলে- এতে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হন এবং অস্বস্তি বোধ করতে থাকেন। তাই করাচী হতে লন্ডন, লন্ডন থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকায় ফেরার পথে দিল্লীতে মুজিব ইন্দিরা গান্ধীর কাছে জানতে চান ‘বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য কবে প্রত্যাহার করবেন’? একই কথা তিনি কলকাতা সফরের সময় ইন্দিরা গান্ধীকে জিজ্ঞেস করার পর তাৎক্ষণিকভাবে ইন্দিরা গান্ধী তাঁর সেনা প্রধানকে ডেকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, আমি ঢাকা যাওয়ার পূর্বেই যেন ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশ হতে প্রত্যাহার করা হয়। এতেই প্রমান হয় মুজিব সত্যিই স্বাধীনতার রূপকার এবং প্রাণ পুরুষ ছিলেন।
 
শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণা প্রসঙ্গে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর ১৯৭১ সালের ৬ই নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বীয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত ভাষণের একটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। সে ভাষনে তিনি বলেন- “………. The cry for independence of Bangladesh arose after the arrest of shik Mujib, not before. He (Mujib) himself, so far as I know has not asked for Independence even now……….”  এই ভাষণই প্রমান করে শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। 
 
এতদসত্বেও ১৬ই ডিসেম্বর পূর্ণাঙ্গ বিজয় অর্জন পর্যন্ত সশস্ত্র সংগ্রামে বাংলাদেশের অভ্যুদয় পর্বটি তাকে ঘিরেই অবর্তিত ছিল। আর স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত দেশবাসীর তিনিই ছিলেন অনুপ্রেরণার মূর্ত প্রতীক। এর পাশাপাশি পরিস্থিতির পারিপার্শ্বিকতায় মেজর জিয়ার মতো মেজর আবু ওসমান চৌধুরী, মেজর শফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশাররফ, এমন কি অওয়ামী লীগ নেতা এম, এ হান্নান প্রমুখ ব্যক্তিগণও বিভিন্ন স্থান থেকে ইথারে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাই বলে বিশেষ কোন এক মেজরের ঘোষণাকেই একক ঘোষণা ধরে নিয়ে সেই মেজরকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জাতীয় বীর আখ্যায়িত করার প্রশ্ন উঠে না শেখ মুজিব-শেখ মুজিবই। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর হতেই শত ভুল ভ্রান্তি সত্ত্বেও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে শেখ মুজিবসহ আমরা অগণিত রাজনৈতিক কর্মীর কাফেলা সামরিক-বেসামরিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক দাবী দাওয়া আদায়ে অবিরত আন্দোলনে-সংগ্রামে জেল-জুলম নিপীড়ন আর নির্যাতন সহ্য করে আত্মত্যাগের নজীরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে পাকিস্তানে উচ্চ পদস্থ সামরিক বেসামরিক চাকুরীর ব্যবস্থা করি। এই নিরবিচ্ছন্ন আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশবাসীর মনে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা দেয়। মনে রাখতে হবে এদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসা, অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে মুক্তি আর পি.এস.পি, সি.এস.পি মেজর, কর্ণেল, মেজর জেনারেল আমাদের মতো ত্যাগী রাজনীতিকেরই সংগ্রামের ফল। তাদের অর্জন নয়।  
 
দুঃখের সাথে বলতে হয় অন্যের কৃতিত্ব নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া, অন্যের কৃতিত্বকে অস্বীকার করে একক কৃতিত্বের দাবীদার বনে যাওয়ার এই প্রবণতাও শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগের মাধ্যমেই। যেমন শেখ মুজিব ৪ঠা জানুয়ারী ১৯৪৮ সালে উপস্থিত না থাকলেও তাকেই পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের প্রতিষ্ঠাতা বলে চালিয়ে দেওয়া, ’৫২ এর ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে অংশ গ্রহণ না করলেও তাকেই ভাষা আন্দোলনের নেতা বানানোর ঘৃণ্য কারসাজি-‘৭১ এর ২৫ শে মার্চ কালো রাত্রিতে গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি স্বাধীনতার কোন ঘোষণা না দেয়া সত্বেও পরবর্তীতে ওয়ারলেসের মাধ্যমে চট্টগ্রামে জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে প্রচারের জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা প্রেরণের বানোয়াট কাহিনী প্রচার সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং শেখ মুজিব নিজেও সেই মিথ্যাটাকেই সত্য বলে চালিয়ে ছিলেন। এমনি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং শেখ মুজিব নিজেও সেই মিথ্যাটাকেই সত্য বলে চালিয়ে ছিলেন। এমনি অরো অনেক ঘটনায় অপরের কৃতিত্বকে অস্বীকার করে নিজের কৃতিত্ব বলে জাহির করেছে।  
 
স্বাধীনতা অর্জনে ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধে হিন্দুস্থানের অবদান অতুলনীয়। সামরিক বেসামরিক, ব্যবসায়ী, সংস্কৃতিসেবী সকল মহলের সহায়তা ও অবদান চির স্বরণীয় এবং এই অবদানের কৃতজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। বিদুষী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জগৎ জোরা অবিরাম প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বব্যাপী জনমত সৃষ্টি হয়। সেই সঙ্গে বিশ হাজার ভারতীয় সৈন্যের রক্ত মুক্তি বাহিনীর রক্তের সঙ্গে বাংলার মাটি ও পানিতে একাকার হয়ে মিশে যায়। অবশ্য চীন ও অমেরিকা বাংলার আজাদী সংগ্রামকে ধ্বংস করতে সব ধরণের প্রয়াস চালায়। কিন্তু ব্যর্থ হয়।  
 
অমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সনের নির্দেশে সপ্তম নৌবহর যুদ্ধংদেহী সংহারী মুর্ত্তিতে বঙ্গোপসাগরে অবস্থান নেয়ার পায়তারা করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন সপ্তম নৌ বহরকে বাধা দানের হুমকি দিলে যুক্তরাষ্ট্র অগ্রসর হওয়া থেকে বিরত হয়। ১৯৭১ সালে ভারত-সোভিয়েত ১৫ সালা সামরিক সহযোগিতা চুক্তি এটাও বিচক্ষণ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দেশ রক্ষা পলিসির ফল।  
 
অবিভক্ত ভারতের আসাম প্রদেশে প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সভাপতি ছিলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মাহমুদ আলী এবং আসাম রাজ্যেও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন স্যার সাদ উল্লাহ। দেশ বিভাগের সময় আসাম রাজ্যের অন্তর্গত সিলেট জেলায় গণভোট অনুষ্ঠানের সময় মওলানা মওদুদী, দেওবন্দী হোসেন আহমদ মাদানী, আবুল কালাম আজাদ গোষ্ঠীর অপপ্রচারের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানীর একক প্রচেষ্টা এবং প্রভাবে সিলেটের জনগণ পূর্ব পাকিস্তানে যোগ দেয়ার ম্যান্ডেট দান করে। এই সাফল্য, কৃতিত্ব এবং অবদান এককভাবে মওলানা ভাসানীর।  
 
এই বিশাল ব্যক্তিত্ব যখন দেশ বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে অগমন করেন তখন জনগণকে মাঠ পর্যায়ে নেতৃত্বদানের মত একটি বিরাট শুণ্যস্থান পূরণ হয়। মুসলিম লীগের স্বার্থপর, সুবিধাবাদী ও ঊর্দুভাষী শাসক শোষকদের তাবেদার দালাল শ্রেণীর নেতৃস্থানীয়দের বিরুদ্ধে প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদীরা তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৪৯ সালে সোহরাওয়ার্দী ভাসানীর যৌথ উদ্যোগে পাকিস্তানে প্রথম বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়। ১৯৫৪ সালে এই দলের সঙ্গে শেরে বাংলা ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টির সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটে। এর পরেই ভীত সন্ত্রস্ত্র  উর্দুভাষী শোষক-শাসক পশ্চিমা চক্র প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর ঐক্যে ফাটল ধরাবার প্রয়াস চালায়। ইতিমধ্যে গভর্ণর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ প্রথম গণ পরিষদ ভেঙ্গে দেয় ও ‘৫৬ সালে দ্বিতীয় গণপরিষদে পাকিস্তানের সংবিধান প্রণীত হয়।
 
এই বিশাল ব্যক্তিত্বই আবার ১৯৫৭ সালে সদরি ইস্পাহানীর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জার করাচী যাওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং করাচীর Beach Luxury-তে মিলিত হয়ে তারা আলাপ আলোচনা করেন। এর কিছুকালের মধ্যেই পাকিস্তানের উভয় অংশে তখনকার সর্বোচ্চ জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে প্রধানমন্ত্রী পদ হতে প্রেসিডেন্ট ইসকান্দার মীর্জা পদচ্যুত করেন।  
 
প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মীর্জা ১৯৫৮ সালের ৮ই অক্টোবর পাক পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দিয়ে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে- সমগ্র দেশে সামরিক শাসন জারী করে জেনারেল আয়ুব খানকে Martial Law Administrator পদে নিয়োগ দেন। এর কিছু দিনের মধ্যে ২৭শে অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইসকান্দর মীর্জা জেনারেল আয়ূব খানকে প্রধানমন্ত্রী ও জেনারেল মুসাকে প্রধান সেনাপতির পদে নিয়োগ দেন। জেনারেল আয়ুব খান এই ঘোষণা কে ষড়যন্ত্রের আলামত মনে করে প্রেসিডেন্ট ইসকান্দর মীর্জাকে লন্ডনে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেন এবং ১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে সারা পাকিস্তান ব্যাপী অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনও বাতিল করে দেন।  
 
জেনারেল আয়ুব শাসনকালে আয়ুবী শাসনের ক্রীড়নক হয়ে মওলানা ভাসানী আয়ুব খানের প্রতিনিধি হয়ে চীন ভ্রমণে গেলেন মাও সেতুং এর দর্শনার্থী হয়ে। ১৯৫৪ সালে গভর্ণর ইস্কান্দর মীর্জা ডান্ডা শাসনের আওয়াজ-উঠা সত্বেও কম্যুনিষ্টদের প্ররোচনায় কম্যুনিষ্ট আয়োজিত বার্লিন শান্তি সম্মেলনে যোগ দিতে চলে গেলেন। উত্তরকালে এতে করে তিনি কার্যতই জিহাদী জননেতা থেকে তথাকথিত প্রগতিশীল কর্মীদের নেতাতে পরিণত হলেন।  
‘৬৯ এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কারণে গণঅভ্যূত্থান এবং সত্তরের নির্বাচনে এক চেটিয়া গণরায় পেয়ে শেখ মুজিবের অভূতপূর্ব উত্থান ঘটে এবং মুজিবেরই রাজনৈতিক নেতা ও গুরু মওলানা ভাসানী হন জন-বিচ্ছিন্ন।  
‘৭৫ পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমানের ক্রীড়নক হয়ে ভাসানী তার অবস্থানের শেষ চিহ্ন মুছে ফেলেন। তার দলের নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষ জিয়ার দলের দখলে চলে যায়- এমন কি তার দলীয় কর্মীরা জিয়ার দলে যোগ দিয়ে ‘‘জনগণের নয়ন মনি, মওলানা ভাসানী‘‘ শোগান বদল করে জিয়াকে জনগণের নয়নমনি বানিয়ে ফেলেন। 
 
জিয়ার মার্শাল ল’ চলাকালে দেশব্যাপী অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচন বাতিল দাবী করে মওলানা ভাসানী কলঙ্কের ডালি মাথায় নেন-মার্শাল ল’ এডমিনিষ্ট্রেটার এর বরকান্দাজ পদে অভিষিক্ত হয়ে ধন্য বোধ করলেন। আটপৌঢ়ে জীবন যাপনকারী ঝুপড়িবাসী সর্ব্যতাগী সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রাসারণবাদের ত্রাস মওলানা হলেন বরকান্দাজ আর তার অনুগামীরা হলেন দালাল-অর্থে বিত্তে তালুকদার।  
 
বানান বিভ্রাট পাঠককে পীড়া দেয়। এ জন্যে চতুর্থ সংস্কারণে অনেক বানান বিভ্রাট ও মুদ্রণ প্রমাদ নিরসনে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়েছে। তা সত্ত্বেও একেবারে নির্ভূল বই পাঠকদের হাতে পৌঁছে দিতে পারিনি। এ ছাড়া বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষের স্মৃতি শক্তিও লোপ পায়। আমার বেলায়ও এর ব্যতিক্রম নয়। এই গ্রন্থে বর্ণিত কিছু ঘটনা স্মৃতিনির্ভরতার কারণে তথ্যগত ভুল-ত্রুটি থাকা অস্বাভাবিক নয়। দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায় এই গ্রন্থে (পৃঃ ১৫১) ভুলবশতঃ উলেখিত হয়েছে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছিল ২৩ ফেব্রুয়ারী । কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শহীদ মিনার নির্মাণের সঠিক তারিখ ২৬ ফেব্রুয়ারী। এ ধরণের তথ্যগত ত্রুটি আমাকে জানালে তা কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদের সাথে গৃৃহীত হবে প্রয়াস নেয়া হবে ইনশায়াল্লাহ।  
 
তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশকালে কঠোর পরিশ্রম করেছেন রাজনৈতিক সহকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা মুন্সী আবদুল মজিদ ও আমার দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সহকর্মী, বিশিষ্ট রাজনীতিক, মুক্তিযুদ্ধাকালে আমার পাশে ছায়ার মত ছিলেন যে জনাব এহসানুল হক সেলিম তারা উভয়ই ৪র্থ সংস্করণ প্রকাশে তদ্রুপ ভূমিকাই পালন করেছেন। তাদের প্রতি রইল আমার অশেষ অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা কিন্তু ভাষার তুবরীতে তাদের ছোট করবার অধিকার আমার নেই। 
 
‘‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ‘৭৫ বইটির দ্বিতীয় সংস্করণের মতো বর্তমানের এই চতুর্থ সংস্করেণও বিভিন্ন সময় নুতন তথ্য সংযোজন ও পরিবর্ধন হেতু ছাপার কাজে ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। কিন্তু প্রেস এতে বিরক্তি প্রকাশ না করে যে বিরল সহযোগিতা প্রদান করেছে এরই ফলশ্রুতিতে বইটি মুদ্রিত আকারে প্রকাশ হতে পেরেছে। এই ধরণের বিরল সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লিঃ এর সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারী ভাইদের প্রতি অমি কৃতজ্ঞ। 
 
বিশেষ করে, এর সভাপতি জনাব আ.জ.ম. শামসুল আলম সাহেব যার আন্তরিক উদ্যোগে বইটির প্রকাশিত হলো, তাকে জানাই আমার অন্তরের উষ্ণ ভালোবাসা আর অকৃত্তিম শ্রদ্ধা। 
 
 
অলি আহাদ 
ফেব্রুয়ারী ২০০৪ 
 

তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকা

আমি সহজাত লেখক নই। বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ নিঃশেষ হয়ে যাবার পর বিবেকের তাড়নায় ও সুধী পাঠকদের উৎসাহ আর তাগিদে বইটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশে আমাকে উদ্যোগী হতে হয়েছে। কিন্তু আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বইটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশের জন্য উপযুক্ত প্রকাশনা সংস্থা যখন খুঁজে পাচ্ছিলাম না। চরম হতাশা যখন আমাকে গ্রাস করছিল ঠিক তখনই মহান করুণাময় আল্লাহ পাকের অশেষ কৃপায় বন্ধুবর আখতার উল-আলম সাহেব আবির্ভূত হলেন। তার একাগ্রতায় আর মহতি উদ্যোগ খোশরোজ কিতাব মহলের স্বত্বাধিকারী জনাব মহীউদ্দীন আহমদ সাহেব এগিয়ে এলেন। তিনি দায়িত্ব নিলেন বইটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশের। দায়মুক্ত হলাম আমি। ফলশ্রুতিতে বইটি যথাসময়ে পাঠকের হাতে তুলে দেয়া সম্ভব হয়েছে। জনাব আখতার-উল-আলম আর জনাব মহীউদ্দীন আহমদ সাহেবের এই মহৎ অবদান আমাকে চির কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ করেছে। আমি তাদের কাছে ঋণী হয়ে রইলাম। তাদের ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। তাদের এই অবদান আমাদের সমসাময়িক কালের ইতিহাসে স্বর্ণ অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে। পরম করুণাময় আল্লাহ গাফুরুর রাহীম তাদের সহায় হোন। আমি রাজনীতিক। ব্যস্ত মানুষ। নানাবিধ সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বইটিকে পূর্ণাঙ্গ করার অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছি। সেই লক্ষ্যে আমার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বর্তমান সংস্করণে বেশ কিছু তথ্য সংযোজন করা হলো এবং ভবিষ্যৎ সংস্করণেও আরো তথ্য সংযোজন করা হবে। একবারে সম্ভব নয় বিধায় ধাপে ধাপে বিভিন্ন তথ্য সংযোজনের মধ্য দিয়ে বইটিকে পূর্ণাঙ্গ করার ইচ্ছা আমার কাছে। আমাদের জাতীয় জীবনে অসত্য আর বিকৃত ইতিহাসের ডামাডোলে সত্য ইতিহাস হারিয়ে যাবার যে প্রবণতা চলে আসছে, আমার এই বইখানির বর্ধিত ৩য় সংস্করণ অনুসন্ধিৎসু সত্যান্বেষী পাঠক সমাজকে অন্ততঃ কিছুটা হলেও তৃপ্তি দান করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। প্রসঙ্গত, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে সাম্প্রতিকালের সৃষ্ট বিতর্ক যেমনি অনাকাঙ্খিত তেমনি অনভিপ্রেতও বটে। মনে রাখতে হবে যে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি হঠাৎ করেই সৃষ্টি হয়নি। ১৯৪৭ সালে গান্ধী নেহেরু’র বঙ্গভঙ্গের সর্বনাশা পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বোস-সোহরায়ার্দীর স্বাধীন সার্বভৌম অখন্ড বঙ্গদেশ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। ‘৫২-এর ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জাতিসত্ত্বার ক্রমবিকাশের ধারায় বিভিন্ন গণতান্ত্রিক, সাংস্কৃতিক স্বাধীকারের আন্দোলনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তি, নৃতাত্ত্বিক আত্ম পরিচয়ের স্বকীয় সত্ত্বার সন্ধানে ব্যাপৃত বৃহত্তর বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর অব্যাহত শোষণ আর শাসনের বিরুদ্ধে ২৩ বছরের আন্দোলনের মধ্য দিয়েই জাতিয়তাবাদী চেতনার স্ফুরণ ঘটে এবং এর চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে এদেশের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকল মানুষের সম্মিলিত প্রয়াসে আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির কারণে। বাংলার স্বাধীনতাআন্দোলনের সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকায় যার নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে তিনি হচ্ছেন মজলুম জননেতা  মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। প্রাসঙ্গিকভাবে বলতেই হয় যে, ‘৬০-এর দশকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা অর্জনের চূড়ান্ত ধাপে পৌছানোর লক্ষ্যে সৃষ্ট নিউক্লিয়াসে আমার কার্যক্রম আগামী দিনের ইতিহাসে অবশ্যই লিপিবদ্ধ হবে। ‘৭১-এর জনতার স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্খাই নেতৃত্বকে পেছনে ফেলে অগ্রগামী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। জনতার সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে স্বাধীনতার মুলমন্ত্র থেকে অন্য খাতে প্রবাহিত করার ক্ষমতা তৎকালীন কোন রাজনৈতিক নেতৃত্বেও ছিল না। আর তাই সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম আপন পরিণতিতে ধাবিত হয়। ‘৭১ এর ২৫ মার্চ পর্যন্ত শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ইয়াহিয়ার সাথে আপোষ আলোচনা এক পাকিস্তানের ভিত্তিতেই ছিল। ৭ই মার্চের ভাষণের তাৎপর্য যতই স্বাধীকারের পটভূমিতে বিশ্লেষিত হোক না কেন তাও ‘জয় বাংলা‘ আর ‘জয় পাকিস্তানে’র উচ্চকিত শ্লোগানে ২৫ শে মার্চ পর্যন্ত আপোষ মিমাংসার ধুম্রজালে আবদ্ধ ছিল। ‘৭১-এর ২৫শে মার্চের আলোচনা শেষে যখন জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকবাহিনীকে নিরস্ত্র বাঙালি জনতার উপর সশস্ত্র আক্রমণের নির্দেশ দিয়ে ভুট্টোসহ তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে করাচির পথে ধাবমান তখন রাত ৮.৩০ মিনিটে, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের হাই কমান্ডের সাংবাদিকদের নিকট প্রদত্ত বক্তব্য ‘আলোচনা ফলপ্রসু হয়েছে আর মাত্র ঘোষণা বাকি‘-এই বক্তব্যের তাৎপর্য আর যা-ই হোক রাত ১২ টায় শেখ মুজিব কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণার কোন প্রেক্ষাপটের সাক্ষ্য বহন করে না। তবে যা বাস্তব তা হলো ২৬শে মার্চ প্রতুষ্যে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতা জনাব এম এ হান্নান কর্তৃক চট্টগ্রাম বেতার হতে কম শক্তিশালী মাইক্রোওয়েভে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান, পরবর্তীতে ২৭শে মার্চ তৎকালীন মেজর জিয়ার কণ্ঠে প্রথমে এককভাবে তার নামে, পরবর্তীতে সংশোধন করে শেখ মুজিবের নামে স্বাধীনতার ঘোষণা জনমনে সাহস, আস্থা ও স্বস্তি এনে দেয়। সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও সেই ঘোষণায় অনুপ্রাণিত হয় এবং নব উদ্যমে সংগঠিত হয়। এই প্রসঙ্গে বলা অসঙ্গত হবে না সেই সময় অবস্থা এমন ছিল যে, স্বাধীনতা সংগ্রামের মত এত বড় একটা সংগ্রমে নেতৃত্ব দান করার জন্যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের পরিকল্পিত ও সুসংহত দ্বিধা সংকোচহীন নেতৃত্ব ছাড়া কোন সুসংহত পরিকল্পনা কিংবা নেতৃত্বেও সমন্বয় ছিল না। সেই কারণেই বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন স্থান হতে যেমন, কুষ্টিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও জয়দেবপুর হতে যথাক্রমে তৎকালীন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী, খালেদ মোশাররফ ও শফিউল্লাহ কর্তৃকও স্বাধীনতার ঘোষণা আসে। পরিস্থিতির বাস্তবতায় তা-ই স্বাভাবিক ছিল। একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এসব ঘোষণা স্বাধীনতা আন্দোলনের কোন মাইল ফলক ছিল না। ছিল স্বতঃস্ফুর্ততার বহিঃপ্রকাশ। তবে একথা সত্য যে, সে সময়ে শেখ মুজিবর রহমানের ইমেজ বা জনপ্রিয়তা কিংবদন্তীতূল্য ছিল। আর জনগণ তার নামকে স্বাধীনতার সমার্থক অর্থে গ্রহণ করেছিল। সেই ক্ষেত্রে শেখ মুজিবের উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতি স্বাধীনতা মন্ত্রের প্রতি জনতার বিশ্বাসে কোন ফাটল ধরাতে পারেনি বরং তার ‘বিতর্কিত’ অনুপস্থিতি জনগণের মনে এক ধরনের সহানুভূতির জন্ম দিয়েছিল। কাজেই মুক্তিযুদ্ধের সকল মহান সংগঠক ও যোদ্ধা সকলেই এই মহান কৃতিত্বের অংশীদার।
 
 স্বাধীনতা সংগ্রামের মাইল ফলক ‘৫২-এর ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের ২১শে ফেব্রুয়ারীসহ সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে ডঃ আনিসুজ্জামানের লেখা একটি নিবন্ধ এই সংস্করণে সন্নিবেশিত করেছি। এমন আরো কিছু ঘটনা ও তথ্য এই সংস্করণে সংযোজিত করেছি। তন্মধ্যে হীরেন মুখার্জীর ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্টে পাক-ভারত স্বাধীনতার উপর একটি লেখা, প্রফেসর রেহমান সোবহানের পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুই অর্থনীতির প্রদত্ত ভাষণ এবং অতিসম্প্রতি প্রদত্ত ভারতীয় বি.এস.এফ এর উদ্দেশ্য যে ইতিহাস-সচেতন পাঠক সমাজকে অসত্য আর ইতিহাস বিকৃতির ভিড়ে কিছুটা হলেও সত্য ইতিহাসের স্বাদ আস্বাদন করানো। পাঠক সমাজ তৃপ্ত হলে আমার পরিশ্রম স্বার্থক হয়েছে বলে মনে করবো। দ্বিতীয় সংস্করণের মুদ্রণ প্রমাদের কারণে যে সকল ভূল ত্রুটি ছিল তা সংশোধন করতে প্রয়াস নিয়েছি। 
 
আমার সহকর্মী বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মুনসী আবদুর মজিদ গতবারের মতো এবারেও বইটির তৃতীয় সংস্কারণ প্রকাশে অামাকে অব্যাহত চাপের মধ্যে রাখে এবং তার এই নিরলস প্রাণান্তকর পরিশ্রমের ফলে বইটির তৃতীয় সংস্করণ পাঠকের হাতে সময়মতো তুলে দেয়া সম্ভব হয়েছে। তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করতে চাই না। বইটির ছাপানোর ব্যাপারে সার্বিক তত্ত্বাবধানে অক্লান্ত প্রাণান্তকর পরিশ্রম দিয়ে Final proof থেকে শুরু করে, অঙ্গসজ্জা ও বর্ধিত অংশের সম্পাদনা সুচারুরূপে সম্পন্ন করে বর্তমান এই সংস্করণটি সুন্দর ও পরিচ্ছন্নভাবে প্রকাশ করতে আমার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে আগাগোড়া আমার একান্ত সাথী মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বিশিষ্ট রাজনীতিক জনাব মোঃ এহসানুল হক সেলিম সহযোগিতা করে আমাকে কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করেছেন। গত দুই সংস্করণ প্রকাশে যে স্বজনদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও কর্মকান্ডে আমাকে দায়মুক্ত রেখেছিল তাদের উদাসীনতা ও অন্যমনস্কতা আমাকে যখন বিপর্যস্ত করছিল সেই মুহূর্তে তিনি আবির্ভূত হলেন তার সাহায্যে সহায়তার অকৃত্রিম সহমর্মিতা নিয়ে, আমি অভিভূত কৃতজ্ঞ। আল্লাহ গফুরুর রাহিম তাঁর কৃপা দৃষ্টিতে তাকালেন উৎরে গেলাম আমি। আমি অভিভূত, আমি কৃতজ্ঞ, তাকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমার নেই। ধন্যবাদ জানিয়ে তাকে ছোট করতে চাই না। শুধু হৃদয়ের উষ্ণ অনুভূতিতেই তা ধরে রাখতে চাই। সকলের প্রতি আমার আন্তরিক অভিনন্দন। 
 
 
অলি আহাদ  
জানুয়ারি, ১৯৯৭ 
 

প্রথম সংস্করণের ভূমিকা

মুজিব সরকার ৩০শে জুন, ১৯৪৭ ইং ‘বিশেষ ক্ষমতা আইনে’ আমাকে গ্রেফতার করে এবং বিনাবিচারে কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রাখে। ১৫ই আগষ্ট (১৯৭৫) ঐতিহাসিক বিপ্লবের পর আমি মুক্তি পাই। ১৯৪৭ সালে ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর হইতে পরবর্তী আড়াই যুগে তৎকালীন জননিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হইয়া বহুবার কারাগারে বিনাবিচারে আটক ছিলাম। সত্য বলিতে কি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করিবার দায়ে বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বহিস্কার, জেল-জুলুম, পুলিশী হয়রানি, গ্রামের বাড়ীতে অন্তরীণ ও আত্মগোপন জীবন এ সবই যেন আমার ভগ্যলিপি।
 
১৯৪৭ সালেও অন্যায়ের প্রতিবাদ করিতে গিয়াই কারাবরণ করিতে হইয়াছে। সে বৎসরের জুন মাসে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগরের ২৬ নং সেলে পদার্পণ করিতেই বিগত ২৬/২৭ বৎসরের বিভিন্ন রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের দৃশ্যাবলী আমার স্মৃতিপটে উদয় হইতেছিল। অতীতের যে অসংখ্য রাজনৈতিক ঘটনার সহিত আমি সরাসরি জড়িত ছিলাম, তাহাই এখানে লিপিবদ্ধ করিবার প্রয়াস পাইয়াছি। লেখনীশক্তি আমার নাই; ভাষার উপর দখলও নাই; তথাপি এক অদ্ভূত উৎসাহ ও প্রেরণা, অদম্য আকাঙ্খা ইচ্ছাশক্তি যেন আমাকে এইসব ঘটনাপঞ্জী লিপিবদ্ধ করিতে বাধ্য করিয়াছে। সর্বোপরি FAO (U.N.O)কর্মরত আমার স্নেহাদ স্নেহাষ্পদ অনুজ মোহাম্মদ আমিরুজ্জামানের (C.S.P) তাগাদার পর তাগাদা ও চাপ ছিল আমার সকল প্রেরণার উৎসমূল। সে বুঝিতে চায় না যে, আমার কলম অত্যন্ত দুর্বল, সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালা আমাকে তেমন কোন লেখনীশক্তি দেন নাই। কারাগারের নির্জন কক্ষে ছোট ভাইটির স্নেহাসিক্ত কোমল মুখখানি মানসপটে উদিত হইলেই লিখিবার ইচ্ছা আমার সকল অপারগতা, অক্ষমতা ও দূর্বলতাকে ছাপাইয়া উঠিত। ছোট ভাইটির চাহিদাই জয়ী হইত। এই বইখানি তাহারই ফলশ্রুতি। (১৯৫৮ সালে আমিরুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিল। ১৯৫৮ সালেই উচ্চ শিক্ষার্থে যুক্তরাষ্ট্র গমন করে এবং সিএসপি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় ও ১৯৫৯ সালে C.S.P. একাডেমিক ট্রেনিং গ্রহণের জন্য পাকিস্তান প্রত্যাবর্তন করে)।
 
আমি জানি, এই বইটিতে বর্ণিত সত্য ও প্রকৃত ঘটনাবিবরণী অনেকের বিরাগের কারণ হইবে। কিন্তু উপায় নাই। আমার সবিনয় নিবেদন, আমার প্রতি বিরূপ না হইয়া নিজ নিজ বিবেককে জিজ্ঞাসা করুন; দেশ ও জাতির অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার জন্য ক্ষমতায় আরোহনকারী কিংবা ক্ষমতার বাহিরে অবস্থানকারী আপনারা দায়ী কিনা? কত ওয়াদা করিয়াছেন, কত ওয়াদা ভাঙ্গিয়াছেন? আমাদের চরিত্র বিশ্লেষণ করিলে কি লর্ড ম্যাকলে বর্ণিত নিম্ন-গাঙ্গেয় এলাকার বাঙ্গালী চরিত্রের অবিকল চিত্ররূপ ধরা পড়ে না? বস্তুতঃ সিংহের যেমন থাবা, গুরুর যেমন শিং এবং মৌমাছির যেমন হুল, তেমনি আমাদের প্রধান অস্ত্র হইল প্রতারণা। বড় বড় অঙ্গীকার, সহজ কৈফিয়ৎ, সুবিধা বিশেষে ফুলানো-ফাপানো মিথ্যার ফুলঝুরি এই সবই হইতেছে আমাদের আক্রমণ ও আত্মরক্ষার অস্ত্র। আমার মতে সাধারণ লোককে নয়, সাধারণ লোকের নেতৃস্থানীয় শ্রেণীকেই ম্যাকলে সাহেব ইঙ্গিত করিয়াছেন, কারণ ম্যাকলে সাহেব নেতৃস্থানীয় লোকদেরই সাহচর্যে আসিয়াছিলেন।
১৯৭১ সালের ভয়াবহ ৯টি মাস মা-হারা সন্তানের ক্রন্দন, সন্তানহারা মায়ের হাহাকার, স্বামীহারা স্ত্রীর অসহায় অবস্থা, স্ত্রীহারা স্বামীর দীর্ঘশ্বাস আজও জাতির চেতনা, বিবেক ও অস্তিত্বকে বিদ্রুপ করিতেছে। পাকসেনা লক্ষ লক্ষ লোককে ভিটামাটি ছাড়া করিয়াছে, দেশান্তর করিয়াছে, প্রাণহানি ঘটাইয়াছে-সংক্ষেপে ধনে-জনে মানে বাঙ্গালী নিঃস্ব হইয়াছে। বিনিময়ে নেতৃত্ব স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পরিবর্তে দেশ ও জাতিকে দিয়াছে আভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ ও দিল্লীর সহিত বশ্যতামূলক মৈত্রী। নব্য শাসকগোষ্ঠী পূর্বসুরীদেরই পথ অনুসারী। সুতরাং অত্যাচার ও নির্যাতন তাহাদের অমোঘ অস্ত্র। পাক শাসকদের অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করিয়াছি। কিন্তু মাথা নত করি নাই। আজও মাথা নত করিব না।
 
ব্যক্তিগত সুবিধা অজর্ন আমার পক্ষে কখনও সম্ভব হয় নাই। রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন জটিল মুহূর্তে নীতির প্রশ্নে প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সহিত আমার মতবিরোধ ঘটিয়াছে। সবাই জানেন, নীতি ও আদর্শকে কেন্দ্র করিয়া রাজনৈতিক দল গড়িয়া উঠে এবং দলীয় নীতি ও আদর্শে মুগ্ধ হইয়াই কর্মীরা স্ব স্ব ইচ্ছানুসারে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনে যোগদান করেন। কিন্তু ক্ষমতার পূজারী নেতাদের নীতিহীনতা ও আদর্শের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতায় বহুক্ষেত্রেই কর্মীদের বিভ্রান্ত হইতে হয়। তখন তাহাদের পক্ষে নূতন কোন দল খুজিয়া নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। অথচ ক্ষমতালোভী, চরিত্রহীন ও চক্রান্তকারী নেতারাই এই ধরনের সত্যানুসন্ধিৎসু ও আদর্শবাদী কর্মীদের হেয় প্রতিপন্ন করিবার জন্য দল ত্যাগের অপবাদ দেন, যদিও এইসব কর্মীদের নীতিহীনরা আদর্শত্যাগী বলিয়া আখ্যায়িত করিবার সাহস ঐসব নেতার হয় না। 
বিভিন্ন আন্দোলনে অগণিত কর্মী ত্যাগের মহিমা ও কর্তব্যজ্ঞানে উদ্বুদ্ধ হইয়া বিনাদ্বিধায় কারা নির্যাতন ভোগ করিয়াছেন, দৈহিক নির্যাতন সহ্য করিয়াছেন, এমনকি প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিয়াছেন। কেহবা সহায়-সম্পত্তি হারাইয়া হইয়াছেন সর্বস্বান্ত। আবার কেহ আত্মসম্মান ত্যাগ করিয়া অন্যের দ্বারস্থ হইতে বাধ্য হইয়াছেন। তাহাদের সবাইকে আমি সশ্রদ্ধচিত্তে ও সসম্ভ্রমে স্মরণকরি।
 
অজস্র কর্মী বিভিন্ন আন্দোলনের বিভিন্ন স্তরে উল্লেখযোগ্য ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করিয়া আন্দোলনে ধাপে ধাপে সফলতার পর্যায়ে লইয়া গিয়াছেন। যদি এই বইতে কাহারো সেই অগ্রণী ভূমিকার উল্লেখ না হইয়া থাকে, তাহা আমার সরাসরি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অভাব অথবা অজ্ঞতাপ্রসূত। কাহারো অগ্রণী ভূমিকা অস্বীকার করিবার অর্থ স্বীয় বিবেক ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের প্রতারণা করা। উল্লেখিত ও অনুল্লেখিত কর্মীদেরা সমবেত ও যৌথ কর্মপ্রচেষ্টা সকল আন্দোলনের মূলভিত্তি এবং তাহাই আমার এই বইটির প্রতিপাদ্য। আশা করি, এই পটভূমিকায় সকলেই আমাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখিবেন।
বইটিতে ১৯৪৫ সাল হইতে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক ঘটনারাজী সময়ানুক্রমিকভাবে (in chronological order)লিপিবদ্ধ করিবার চেষ্টা করিয়াছি। তাই কোন কোন ক্ষেত্রে বিভিন্ন জায়গায় একই ঘটনার পুনরুল্লেখ থাকিতে পারে।
 
এই বই লিখিতে গিয়া ইতিহাসের নিকট আমি সত্যকে সম্পূর্ণভাবে তুলিয়া ধরিবার নৈতিক দায়িত্ব অনুভব করিয়াছি যদিও ইহার অধিকাংশই দুঃখজনক এবং তিক্ত। মানুষ মাত্রেই ভুল করে। রাজনীতিবিদগণও ইহার ব্যতিক্রম নহেন। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে যখন যাহার চরিত্র ও কার্যাবলী আমার দৃষ্টিতে যেইভাবে পরিস্ফুটিত হইয়াছে, অবিকল তাহাই তুলিয়া ধরিবার চেষ্টা করিয়াছি। সত্যের অপলাপ করিয়া রাজনৈতিক কোন কর্মী অথবা নেতার অহেতুক নিন্দা করি নাই। প্রত্যেকের সম্পর্কে আমার প্রতিক্রিয়া ছিল মুক্ত-বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন ও বিবেকপ্রসূত। প্রতিটি চরিত্রের ক্ষেত্রেই কথা ও কাজের যথার্থ মিল বা সঙ্গতি এবং গরমিল বা অসঙ্গতি যখন সেইভাবে পরিলক্ষিত হইয়াছে, যথাস্থানে তাহাই তুলিয়া ধরিয়াছি। সুতরাং, ইতিহাসের প্রতি আমার দায়িত্ব পালনকালে যদি কাহারও মনে সামান্যতম আঘাতও দিয়া থাকি, তবে অনিচ্ছাকৃত সেই ক্রটির জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। ভুল বা অজ্ঞতাবশতঃ কোন তথ্য বা ঘটনার উল্লেখ বাদ থাকিতে পারে। না থাকাটাই অস্বাভাবিক। আমার বিনীত অনুরোধ, গঠনমূলক মনোভাব লইয়া যে কেহ আগামী সংস্করণে বইটির তথ্যগত ও গুণগত মানোন্নয়নে সহায়তা করিলে আমি একান্ত বাধিত থাকিব।
 
আমার পরম স্নেহভাজন অধ্যাপক মোমিনুল হক পান্ডুলিপি রিভাইজ করিবার সময় প্রয়োজনীয় শিরোনাম বসাইয়া, স্থানে স্থানে ভাষার ক্রটি শুদ্ধ করিয়া বইটির উৎকর্ষ বিধানে সহায়তা করিয়াছেন। বইটি ছাপাকালে final proof দেখার কষ্টকর কাজটি সমাধা করিতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেন নাই। ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনে তাহাকে ছোট করিব না। অধ্যাপক মোমিনের পরপরই আমার সহধর্মিনী অধ্যাপিকা রাশিদা বেগম বইটি সম্পূর্ণ তার নিজ হাতে গ্রহণ করে। বেচারীর একদিকে সংসারধর্ম পালন অন্যদিকে চাকুরী। রাজনীতিবিদের সংসার! একা তাহাকে কত দিক যে সামাল দিতে হয়। ইহার মধ্যে সময় করিয়া ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত দেহমনকে বই দেখার কাজে নিয়োজিত করিতে হইয়াছে। অনুজ আমিরুজ্জামানের অনবরত তাগাদা ও দৈনিক ইত্তেফাকের বন্ধুবর আখতারউল-আলম সাহেবের অবিরাম তাগাদায় শেষ পর্যন্ত বইটি প্রকাশিত হইতে পারিল। অর্থাভাবে বইটি প্রকাশ করা যখন অসম্ভব কল্পনায় পরিণত হয়, আখতার-উল-আলম সাহেব বইটিকে প্রেসে পাঠাইতে বাধ্য করেন এবং এমন কি আমাকে ঋণগ্রস্ত করিয়া ছাড়েন। শুধু তাহাই নহে। বইটিকে পুনঃরিভাইজ করিবার মত দায়িত্বপূর্ণ কাজটি একপ্রকার জোরপূর্বক স্বহস্তে গ্রহণ করেন। গ্রীষ্মের প্রচন্ড গরমে সুদীর্ঘ একমাস অমানুষিক খাটুনি খাটিয়া আখতার-উল-আলম সাহেব বইটিকে পূণাঙ্গ রূপ দিতে সহায়তা করিয়াছেন। তাহার অকৃত্রিম সহৃদয়তা ও দরদ ভাষায় প্রকাশ অসম্ভব। আমার ছোট বোনদ্বয় শেলী ও এলী এবং ছোট ভাই জিল্লুর বই কপি করবার মত নিরানন্দময় কাজটি সমাধা করিয়াছে। সাপ্তাহিক ইত্তেহাদের জেনারেল ম্যানেজার সাঈদ হাসান বইটির জন্য কাগজ, ছাপাখানা অর্থাৎ ছাপাইবার পূর্ণ ঝুঁকি গ্রহণ করে। মাঝে মাঝে আনুষঙ্গিক প্রয়োজনের অর্থ জোগাইবার মত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাটির সমাধানও সে করিয়া দেয়। ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা জানাইয়া তাহাদের কাহাকেও ছোট করিব না। 
 
অলি আহাদ
মে, ১৯৮২