বঙ্গ বঙ্গের দাবী

ফন্ট সাইজ:
      ভারত বিভাগ সম্ভাবনা আঁচ করিতে পারিয়া ভারতীয় হিন্দু মহাসভা নেতা বঙ্গ সন্তান ডঃ শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী ২৩শে ফেব্রুয়ারী (১৯৪৭) এক বিবৃতিতে বঙ্গ বঙ্গের দাবি করেন এবং তদনুযায়ী ১৯৪৭ সালের ৫ই এপ্রিল তারকেশ্বরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসম্মেলনে হিন্দু সংখ্যা গরিষ্ঠ জেলাগুলোর সমবায়ে হিন্দুবঙ্গ প্রদেশ গঠন করার দাবি উত্থাপন করেন। উক্ত দাবীর ভিত্তিতেই নিখিল ভারত কংগ্রেস সভাপতি আচার্য কৃপালনী বঙ্গভঙ্গ দাবীর সমর্থনে মার্চ মাসে (১৯৪৭) প্রকাশ্য বিবৃতি দান করেন। 
 
স্বাধীন বঙ্গের দাবী
      উগ্র সাম্প্রদায়িক সর্বনাশা দাবীর বিরুদ্ধে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস সভাপতি শ্রী সুরেন্দ্র মোহন ঘোষ, বঙ্গীয় কংগ্রেস পার্লামেন্টারী পার্টি নেতা শ্রী কিরণ শঙ্কর রায়, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর অগ্রজ শ্রী শরৎ চন্দ্র বসু, জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, জনাব আবুল হাশিম এমন কি খাজা নাজিমুদ্দিন ও জনাব ফজলুর রহমান স্বাধীন বঙ্গের আওয়াজ তুলিয়াছিলেন। জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৪৭ সালের ২৭শে এপ্রিল নয়াদিল্লতে জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে স্বাধীন সার্বভৌম বঙ্গ প্রস্তাব দেশবাসীর সমীপে পেশ করেন। একই তারিখে খাজা নাজিমুদ্দিনও স্বাধীন সার্বভৌম বঙ্গদেশের দাবী উত্থাপন করিয়া বিবৃতি দান করেন। জনাব আবুল হাশিম ৩০শে এপ্রিল (১৯৪৭) এক বিবৃতিতে সার্বভৌম অখণ্ড বঙ্গদেশ প্রতিষ্ঠাবিরোধী শক্তির সকল যুক্তি খণ্ডন করিয়া বঙ্গবাসর প্রতি ঐক্যের আহ্বান জানান। ১১ই মে (১৯৪৭) জনাব আবুল হাশিম ও নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর অগ্রজ শরৎ চন্দ্র বসু সোদপুর আশ্রমে গান্ধীজীর সহিত সার্বভৌম অখণ্ড বঙ্গদেশ প্রস্তাব আলোচনার জন্য এক বৈঠকে মিলিত হন। ১২ই মে (১৯৪৭) জনাব সোহরাওয়ার্দী তদীয় মন্ত্রীসভার সদস্য জনাব ফজলুর রহমানসহ সোদপুর আশ্রমে মহাত্মা গান্ধীর সহিত পুনঃসাক্ষাত করেন। স্বাধীন অখণ্ড বঙ্গদেশ প্রচেষ্টার অগ্রগতি অবহিত করার জন্য কায়েদে আজমের সহিত জনাব সোহরাওয়ার্দী দিল্লিতে ১৫ই মে এক বৈঠকে মিলিত হন। ইতিপূর্বে ২৮শে এপ্রিল দিল্লি হইতে কলিকাতা প্রত্যাবর্তনের পর প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমুদ্দিন, আবুল হাশিম, বঙ্গীয় মন্ত্রীসভার সদস্য ফজলুর রহমান এবং ফরওয়ার্ড ব¬ক নেতা শরৎ চন্দ্র্র বসু ও ২৯শে এপ্রিল মুসলিম লীগ সাব কমিটির সদস্যবৃন্দ হোসেন শহীদ সোহারাওয়ার্দী, নূরুল আমিন, ফজলুর রহমান, হামিদুল হক চৌধুরী ও ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা শরৎ চন্দ্র বসু এবং ৩০শে এপ্রিল মুসলিম লীগ সাব কমিটির সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রী ও তদীয় মন্ত্রীসভার সদস্য ফজলুর রহমান, শরৎ চন্দ্র বসু ও কিরণ শঙ্কর রায় পৃথক পৃথকভাবে কয়েক দফা বৈঠকে নিম্নোক্ত প্রস্তাবাবলী আলোচনা করিয়াছিলেনঃ
১। বঙ্গদেশ একটি সার্বভৌম স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হইবে। সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রই ভারতের অন্যান্য অংশের সহিত সম্পর্ক নির্ধারণ করিবে। 
২। সংবিধান রচনা ও চালু করার পর বঙ্গীয় আইন পরিষদ প্রাপ্ত বয়স্ক ভোটাধিকারে যুক্ত নির্বাচন ভিত্তিতে নির্বাচিত হইবে। 
৩। উভয় পক্ষ কর্তৃক ১ম ও ২য় প্যারা গৃহীত হইলে ও বৃটিশ সরকার (এইচ,এম,জি) বঙ্গদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করিলে, বর্তমান মন্ত্রীসভা ভাঙ্গিয়া দেওয়া হইবে এবং প্রধানমন্ত্রী ব্যতীত সমসংখ্যক মুসলমান ও হিন্দু (তফসিলী হিন্দুসহ) সমবায়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হইবেও প্রধানমন্ত্রী মুসলমান হইবে। 
৪। অন্তর্বর্তী সরকার তফসিলী জাতিসহ হিন্দু ও মুসলমানকে চাকুরীতে সমহারে নিয়োগ করিবে। 
৫। ১৯৪৮ এর জুন বা তৎপূর্বে বৃটিশ সরকার বঙ্গীয় অন্তবর্তীকালীন সরকারের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করিবে।
৬। সংবিধান রচনা করিতে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস যথাক্রমে ১৬ জন মুসলমান ও ১৪ জন হিন্দু একুণে ৩০ জন সদস্য বিশিষ্ট অস্থায়ী সংবিধান রচনাকারী সংস্থা গঠন করিবে।
 
বাংলাকে স্বাধীন ও অখন্ড রাখতে গভর্নর বরোজের প্রচেষ্টাঃ 
 
বাংলাকে স্বাধীন ও অখন্ড রাখতে
গভর্ণর বরোজের প্রচেষ্টা পণ্ড
 
      বঙ্গের গভর্ণর স্যার ফ্রেডারিক বরোজ বঙ্গদেশকে অখন্ড এবং স্বাধীন রাখার প্রচন্ড চেষ্টা করেছিলেন, জিন্নাহ এবং মুসলিম লীগ এ প্রয়াসের প্রতি পূর্ণ সমর্থন দেন। তিনি লন্ডনের সমর্থনও পেয়েছিলেন কিন্তু তাঁর সমস্ত চেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যায়। এই মহান উদ্যোগকে ভন্ডুল করে দেয় প্যাটেল, নেহরু এবং গান্ধী।
      ১৯৪৭ সনের মে মাসে ভারত সংক্রান্ত সেক্রেটারী অব স্টেট লর্ড লিস্টওময়েল মাউন্ট বেটনের সর্বশেষ খসড়া পর্ণবিবেচনার জন্য একটি নীতি নির্ধারক স্মারক প্রেরণ করেন। এতে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে নিম্নোক্তগুলো উল্লেখযোগ্যঃ
ক) বঙ্গদেশ অখন্ড রাখার পক্ষে যুক্তিগুলো হচ্ছে-
১) সিলেট সহ কিংবা সিলেট ব্যতিরেখে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য ভূখন্ডের দিক দিয়ে বেশ বড়।
২) যদি বঙ্গদেশ হিন্দুস্থানের সাথে যুক্ত না থাকে, তাহলে কার্যতঃ এটা একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রই হবে যদিও উত্তর পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে এ রাষ্ট্রের সম্পর্ক থাকতে পারে। শুধুমাত্র এ সংযোগের আশংকায় স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবকে দেশকে খন্ড বিখন্ড করার প্রয়াস হিসেবে গণ্য করা যায় না। 
৩) বঙ্গবিভাগ এ অঞ্চলের অধিবাসদের মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনবে বিশেষতঃ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে কারণ কলিকাতার একটি বিশাল পশ্চাদভূমি আলাদা হয়ে যাবে। 
      বৃটিশ সরকারের উ্চ্চ মহলে বঙ্গদেশ সম্পর্কে  উদার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে। মাউন্টম্যান্টেনের স্বাধীন বঙ্গদেশ বিরোধী মনোভঙ্গির বিপরীতে। 
      বৃটিশ মন্ত্রীসভার সাথে সর্বশেষ আলোচনার জন্য যাওয়ার পূর্ব মূহূর্ত বঙ্গের গভর্ণর স্যার ফ্রেডারিক বরোজকে লর্ড মাউন্টব্যাটান এক চিঠিতে লেখেন-
      ‘শিমলায় নেহরুর সাথে আমার আলোচনার প্রেক্ষিতে বলতে পারি একটি স্বাধীন বঙ্গদেশ কংগ্রেস হাই কমান্ড যেমন মেনে নেবে না তেমনি তাদের অনুসারীদেরকেও এ ধরনের প্রস্তাব সমর্থন করতে দেবে না, তাদের ধারনা হচ্ছে হিন্দস্থান ছাড়া বঙ্গের কোন ভবিষ্যত নেই। কিন্তু আমি এটা বোঝাতে চাচ্ছি না সোহরাওয়ার্দী তাঁর অখন্ড বঙ্গদেশ গঠনের উদ্যোগ থেকে নিবৃত্ত হন।
      বৃটিশ সরকারের ভারত ও বার্মা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সভাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৭ সনের ১৯শে মে। মাউন্টব্যাটেন এ সভায় উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী এটলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় বঙ্গদেশ প্রশ্নটি আলোচিত হয়। মাউন্টব্যাটেন প্রধানমন্ত্রীকে জানান যে, বঙ্গের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবিভাগের ব্যাপারে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। সোহরাওয়ার্দীর ধারণা ছিল এটাকে যুক্ত নির্বাচন এবং কোয়ালিশন সরকারের মাধ্যমে অখন্ড রাখা যায়। জিন্নাহ ভেবেছিলেন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্পন্ন স্বাধীন বঙ্গদেশ এক ধরনের সাবসিডিয়ারী পাকিস্তানের মত হবে এবং সেজন্য সোহরাওয়ার্দীর পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন প্রদান করেন। কংগ্রেস হয়ত রাজী হত কিন্তু এ শর্তে যে বঙ্গদেশ যেন পাকিস্তানের অংশে পরিণত না হয় এবং হিন্দুস্থানের কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে যা নাকি কোন অবস্থাতেই মুসলমানদের নিকট গ্রহণযোগ্য হত না। 
     জিন্নাহ কলিকাতাকে ‘ফ্রি সিটি’ বা অবাধ নগরী হিসাবে চেয়েছিলেন যার বিরোধিতা করে কংগ্রেস কারণ তারা মনে করে কলিকাতা ছাড়া, পূর্ববঙ্গ দুই তিন বছরের মধ্যে প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলে পূূণর্বার যুক্ত হয়ে যেতে পাে র। মাউন্টব্যাটেন রাজনৈতিক দলগুলোকে জানান যে প্রদেশের ভবিষ্যত সম্পর্কে, যদি তারা ১৯৪৭ সনের ২রা জুনের আগে কোনরকম সমঝোতায় পৌছাতে পারে তাহলে তিনি তা তাঁর বিবৃতিতে সংযোজন করবেন।
      ১৯৪৭ সনের ১৯শে মে বঙ্গের গভর্ণর স্যার ফ্রেডারিক বরোজ মাউন্টব্যাটেনকে এক তার বার্তা প্রেরণ করেন।
      তাঁর বার্তায় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের স্বাধীন বঙ্গদেশ সম্পর্কে তাদের স্ব স্ব স্মারক সন্নিবেশিত ছিল। 
      বরোজ জানালেন যে লীগ ও কংগ্রেসের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছে তাহ সন্তোষজনক এবং এমন একটি চুক্তি হয়েছে যার ফলে শরৎ চন্দ্র বসুু তাঁর প্রস্তাবিত “সমাজতান্ত্রিক বঙ্গদেশ প্রজাতন্ত্র” নামের পরিবর্তে “স্বাধীন বঙ্গদেশ” নাম রাখতে সম্মত হয়েছেন। ২রা জুন বঙ্গভঙ্গ সংক্রান্ত ভারত সরকারের প্রস্তাব ভারতীয় নেতৃবৃন্দের কাছে বৃটিশ সরকারের প্রস্তাব পেশ করার কথা ছিল-এ বিষয়টিকে সামনে রেখেই যাতে বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব পেশ করা না হয় সেজন্য গভর্ণর বরোজ একটি আশু সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং এ প্রেক্ষিতেই তিনি সোহরাওয়ার্দী কিরণ শংকর রায়ের সাথে আলাদা আলাদা ভাবে এক নতুুন আলোকে আলোচনা করেন। তাঁর নতুন প্রস্তাবের মধ্যে ছিল ভারতের অন্য যে কোন অংশের সাথে সম্ভাব্য সম্পর্ক সম্পর্কে তাঁদের পূবর্তন অবস্থানের পরিবর্তন সাধন করে কালবিলম্ব না করে বঙ্গদেশের জন্য একটি কোয়ালিশন প্রস্তাব গ্রহণের আশু পদক্ষেপ নেয়া অত্যাবশ্যক। ভাইসরয়ের ২রা জুনের প্রস্তাবনা বিতর্কাতীত ভাবে গৃহীত হওয়ার আগেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। অন্যান্য বিষয় বঙ্গীয় কোয়ালিশন সরকারের আইন সভায় আলোচনা করে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা করা যাবে। বরোজের বিশ্বাস ছিল বঙ্গে এমন একটি কোয়ালিশনের প্রস্তাবের বিরোধিতা কংগ্রেস হাই কমান্ড করতে পারবে না এবং স্বাধীন বঙ্গরাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র প্রণয়নে অনেক সুবিধা রয়েছে যদি এতে শরৎ বসুর শর্তাবলী গুলো না থাকে। সোহরাওয়ার্দী এ প্রস্তাবে রাজী হয়ে যান তিনি বিশ্বাস করতেন যে এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তিনি জিন্নাহ ও তার দলকে রাজী করাতে পারবেন। কিরণ শংকর রায়ও বরোজের প্রস্তাবকে এবং এ ব্যাপারে প্রস্তাবিত পদক্ষেপের প্রতি তাঁর আন্তরিক সমর্থন স্থাপন করেন যে পদক্ষেপে বৃটিশ থাকাকালে অথবা তাদের চলে যাওয়ার পরে রক্তপাত পড়োনো যাবে। কিরণ শংকর রায়ের সেদিন সন্ধ্যায় তাঁর দলের প্রতিনিধিবৃন্দ এবং শরৎ বসুর সাথে সাক্ষাত করার কথা। সোহরাওয়ার্দী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন যে, প্রস্তাবটির সাফল্য সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে ২রা জুনের বিবৃতিতে বঙ্গ বিভাগ সম্পর্কিত কোন প্রস্তাব থাকবে না এ মর্মে তাঁর দলকে নিশ্চিত করার উপর।
      গভর্ণনেরর সাথে আলোচনার পর একটি কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা গঠনের সাফল্য সম্পর্কে সোহরাওয়ার্দী প্রচন্ডভাবে আশান্বিত ছিলেন। যদি এটা নিশ্চিত করা যেত তাহলে বৃটিশ সরকারের পক্ষে
১। ২রা জুনের বিবৃতিতে বঙ্গ বিভাগ সম্পর্কে কোন কিছু উল্লেখ না করা। এবং 
২) ভবিষ্যত বঙ্গদেশের শাসনতান্ত্রিক সম্পর্কজনিত কোন প্রকার উল্লেখ না করে কৌশলে ভবিষ্যে তর নির্বাচিতব্য কোয়ালিশন মন্ত্রী সভার উপর ন্যাস্ত করা।
     মাউন্টব্যাটেন ১৯৪৭ সনের ১৬ই মে বরোজকে যে চিঠি লেখেন তাতে মন্তব্য করেন “বর্তমান পরিকল্পনায় বঙ্গকে সন্নিবেশিত করা কঠিন ব্যাপার”।
     বরোজ মনে করেছিলেন যে উপরে বর্ণিত প্রস্তাব বঙ্গ সমস্যার সমাধানে সহায়ক হবে। কিন্তু প্রচন্ড নৈরাজ্য থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তিনি বর্ণিত সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে উত্থাপন করেন। ২রা জুনের বিবৃতিতে কি থাকবে সে সম্পর্কে বরোজের কোন ধারনা ছিল না। তিনি যে ফর্মুলা দিয়েছিলেন তাতে বলা হয়েছিল “বঙ্গে দুটো প্রধান দল রয়েছে- সম্প্রতি তারা একটি কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা গঠনে সম্মত হয়েছেন এবং ভবিষ্যত শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য একটি আলাদা বিধান সভা নির্বাচিত হবে। লীগ এবং কংগ্রেস নেতারা তাদের স্মারকে যে উল্লেখ করেছিলেন তা নিম্নরূপঃ
ক) বঙ্গদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে। এ স্বাধীন দেশ ভারতের অন্য অংশের সাথে সম্পর্ক নির্ধারণ করবে।
খ) এ ব্যাপারে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বঙ্গদেশের শাসনতন্ত্রে বঙ্গের আইন সভার নির্বাচন যুক্ত নির্বাচনের ভিত্তিতে হবে, এতে হিন্দু ও মুসলিম সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে আসন সংরক্ষিত থাকবে সিডিউল কাস্ট সম্প্রদায়ের এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আসন এমনভাবে সংরক্ষিত থাকবে যাতে সিডিউল কাষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য তাদের বর্তমান হারের আসন সংরক্ষিত থাকে। 
নির্বাচনী এলাকা একটি হবে না অর্থাৎ ভোট পূর্ণভোটের ভিত্তিতে (Cumulative) না হয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত জনগোষ্ঠী থেকে প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে গণনা হবে। একজন প্রার্থী যদি তার নিজস্ব সম্প্রদায়ের মেজরিটি ভোট এবং অন্য সম্প্রদায়ের ভোটারদের ২৫ শতাংশ ভোট পায় তাহলে তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। যদি কোন প্রার্থীর ক্ষেত্রে এ সব শর্তাবলী পূূর্ণ না হয় তাহলে স্বীয় সম্প্রদায়ের সর্বাধিক ভোট থেকে তাকে নির্বাচিত ঘোষনা করা হবে। ভোটাধিকার যত বেশী সম্ভব ব্যাপক করা হবে এবং চুড়ান্ত পর্যায়ে প্রাপ্ত বয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন হবে। বর্তমানে চালু পদ্ধতি অনুযায়ী সম্পদের ভিত্তিতে ভোটাধিকার থেকে মহিলাদের ভোট দেয়া থেকে বিরত রাখা হবে। 
গ) স্বাধীন বঙ্গদেশ প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে এবং বঙ্গ ভঙ্গ হবে না মর্মে ঘোষণা দেয়া হলে বর্তমানের বঙ্গীয় মন্ত্রীসভা ভেঙ্গে দেয়া হবে এবং একটি নতুুন মন্ত্রীসভা গঠন করা হবে। সে মন্ত্রীসভায় মুসলমান ও হিন্দু (তফসিলী জাতিসহ) সমান সংখ্যক মন্ত্রী থাকবে কিন্তু এটা প্রধানমন্ত্রীর বেলায় প্রযোজ্য নয়। প্রধানমন্ত্রী হবেন মুসলমান এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হবেন হিন্দু। 
(ঘ) নতুন শাসনতন্ত্রের অধীনে একটি আইন সভা ও মন্ত্রী পরিষদ গঠন হওয়া পর্যন্ত হিন্দু সম্প্রদায় (তফসিলী জাতিসহ) এবং মুসলিম সম্প্রদায় চাকুরী বাকুরীতে সম সংখ্যক হবেন। 
(ঙ) গণ-পরিষদ সদস্য সংখ্যা হবে ৩০, ১৬ জন মুসলমান, ১৪ জন হিন্দু। তারা মুসলমান ও হিন্দু অথবা মুুসলিম লীগ ও কংগ্রেস কর্তৃক নির্বাচিত হবেন। ১৯৪৮ সনের জুন মাসের আগে অথবা ঐ তারিখেই ক্ষমতা এ গণপরিষদে ন্যস্ত করতে হবে। বিকল্পভাবে, বঙ্গীয় আইন সভায় যারা ইতিমধ্যে বঙ্গীয় আইন সভা থেকে গণপরিষদে নির্বাচিত হয়েছেন তাদের সমন্বয়ে স্বাধীন বঙ্গ রাষ্ট্রের গণপরিষদ গঠিত হবে। 
 
বঙ্গ-ভঙ্গ বনাম স্বাধীন বঙ্গ
      বঙ্গীয় মুসলিম লীগ ও বঙ্গীয় কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীন অখণ্ড বঙ্গ-আন্দোলন প্রয়াসে লিপ্ত থাকাকালীন অবাঙ্গালী হিন্দু নেতা আচার্য কৃপালনী, পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরু, পুরুষোত্তম দাস ট্যান্ডন, সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল, চরম সাম্প্রদায়িক হিন্দু মহাসভা নেতা বঙ্গসন্তান শ্রী শ্যামা প্রসাদ মূখার্জী সৃষ্ট বঙ্গ-ভঙ্গ দাবীকে সর্বভারতীয় প্রবল হিন্দু দাবীতে পরিণত করিয়াছিলেন। পরিহাস ও পরিতাপের বিষয়, যে হিন্দু সম্প্রদায় ১৯০৫ সালে বঙ্গ-ভঙ্গ রদ করার উদ্দেশ্যে ভারতে ও ভারতের বাহিরে এক অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন করিয়া সম্রাট পঞ্চম জর্জকে ১৯১১ সালে বঙ্গ-ভঙ্গ রদ ঘোষণা করিতে বাধ্য করাইয়াছিল, সেই হিন্দু সন্তানরাই ১৯৪৭ সালে বঙ্গ-ভঙ্গ দাবীতে সমগ্র হিন্দু ভারতকেই প্রকম্পিত করিয়া তুলিল। তাহাদের অভীষ্ট সিদ্ধহইল, ইংরেজ রাজের কুটিল সহায়তায় বঙ্গ-ভঙ্গ হইয়া গেল। বঙ্গীয় হিন্দু-মুসলিম নেতারা বাঙ্গালী জাতিকে সুসংঘবদ্ধ করার নিমিত্ত হিন্দু-মুসলিম সমস্যাকে বাস্তব দৃষ্টিতে মোকাবিলা করিতে স্বতঃই প্রয়াস পাইতেছিলেন। দূরদর্শী বিচক্ষণ বাঙ্গালী রাজনীতিজ্ঞ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ২৩শে এপ্রিল (১৯২৪) বেঙ্গল প্যাকট করেন। কিন্তু অবস্থা বৈগুণ্যে বিভ্রান্ত হইয়া তদীয় অনুগামী সুভাষ চন্দ্র বসু নিজ সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কৃষ্ণনগর কনফারেন্সে (১৯২৯) বেঙ্গল প্যাকট বা বঙ্গ চুক্তি বাতিল ঘোষণা করেন। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে নেতাজী এই ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহা সফল হইল না- ত্রিপরী কংগ্রেস সম্মেলনে দ্বিতীয়বারের জন্য কায়েমী স্বার্থের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি নিখিল ভারত কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হইলেন বটে, তবে অবাঙ্গালী উর্ধ্বতন কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের কারসাজিতে অচিরেই পদত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন। স্পষ্ট হইয়া গেল যে, অবাঙ্গালীরা কখনই নেতৃত্বকে বরদাশত করিতে রাজী ছিল না। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু স্বীয় ভ্রম উপলব্দি করিলেন ও তাঁহার রাজনৈতিক গুরু দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া স্থানীয় সমঝোতার মাধ্যমে কলিকাতা মুসলিম লীগ নেতা আবদুর রহমান সিদ্দীকিকে কলিকাতা করপোরেশনের মেয়র মনোনীত ও নির্বাচিত করিলেন। এই বারও বাঙ্গালী জাতির সঙ্কট মুহূর্তে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ও নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসুর পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া বঙ্গীয় কংগ্রেস নেতা সুরেন্দ্র মোহন ষোষ, কিরণ শঙ্কর রায় ও শরৎ চন্দ্র বসু এবং মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীত সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম মিলিতভাবে হিন্দু মুসলমানের স্বাধীন ও সার্বভৌম বঙ্গদেশ প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে আত্মনিয়োগ করিলেন। তাঁহারা মহাত্মাগান্ধী ও কায়েদে আজমকে উপরে বর্ণিত খসরা চুক্তির মর্ম অবহিত রাখিয়া চলিলেন। কিন্তু সর্বভারতীয় শীর্ষ নেতৃদ্বয় স্ব স্ব অহমিকা ও কর্তৃত্বের বশবর্তী হইয়া বঙ্গ-ভঙ্গ অপরিহার্ড করিয়া তুলিলেন। আর সেই মুহূর্তেই বাঙ্গালী হিন্দু ও বাঙ্গালী মুসলমান উগ্র সাম্প্রদায়কতার সর্বনাশা বিষপানে আকন্ঠ নিমজ্জিত। বঙ্গীয় কংগ্রেস-লীগ খসড়া চুক্তির কপিসহ ২৩শে মে (১৯৪৭) শ্রী শরৎ চন্দ্র বসু কর্তৃক লিখিত পত্রোত্তরে গান্ধীজীর ৮ই জুনের লিখিত জবাবের কিয়দংশ নিম্নে উদ্ধৃত করিলামঃ
     অর্থাৎ আপনার খসড়া আমি সম্পূর্ণ পাঠ করিয়াছি। পণ্ডিত নেহরু ও সর্দার প্যাটেলের সহিত স্কীমটি মোটামুটি আলোচনা করিয়াছি। তাঁহারা উভয়েই প্রস্তাবটির ঘোর বিরোধী- অখন্ড বঙ্গদেশ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা আপনার ত্যাগ করা উচিত এবং বঙ্গ-ভঙ্গের পক্ষে সৃষ্ট পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে বিনষ্ট করা হইতে বিরত হউন।
     কত কৌশলই না জানেন নেতারা। পূর্বাহ্নে ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যানকে বানচাল করার জন্য বঙ্গ-আসাম গ্র“পিংয়ের বিরুদ্ধে আসাম প্রদেশের সাম্প্রদায়ক প্রধানমন্ত্রী গোপীনাথ বরদৌলীর নেতৃত্বে পরিচালিত প্রতিবাদের ঝড়কে কতই না উৎসাহ দিয়াছেন মহাত্মাজী ! শ্রদ্ধাভাজন নেতারা বারবার সংকীর্ণ স্বার্থপ্রণোদিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। আর দেশবাসী ও আমাদের মত তরুণ কর্মীরা হই তাহাদের হুতাশন-যজ্ঞের কাঠখড়ি। আফসোসের বিষয়, এতদসত্বেও বাঙ্গাল হিন্দুদের নকট সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদই গৃহীত হইল-বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ নহে। আমার ধারণা, বর্তমান রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও রাষ্ট্রীয় সীমারেখা যাহাই হউক না কেন, ঐতিহাসিক অগ্রগতির এক পর্যায়ে লাহোর প্রস্তাবের সার্থক বাস্তবায়ন হইবে ও বৃহত্তর বঙ্গদেশ রাষ্ট্র গঠিত হইবে। ইহারই ইংগিত রাখিয়া গিয়াছেন শরৎ চন্দ্র বসু ও আবুল হাশিম। এই নেতৃত্বের ফেব্র“য়ারী মাসে (১৯৪৭) এক গোপন দ্বি-পাক্ষিক আলোচনায় বাংলা ভাষাভাষী বৃহত্তর বঙ্গদেশ গঠনের খসড়া প্রণয়ন করেন। প্রণীত খসড়া অনুযায়ী বিহার প্রদেশের বাংলা ভাষাভাষী পুর্নিয়া জেলা ও বঙ্গদেশের বর্ধমান ডিভিশনভুক্ত জেলাগুলি সমবায়ে পশ্চিম বঙ্গ প্রদেশ, প্রেসিডেন্সী ডিভিশন, রাজশাহী ডিভিশন, ঢাকা ডিভশন, চট্টগ্রাম ডিভিশন ও শ্রীহট্ট জেলা সমবায় মধ্যপ্রদেশ এবং শ্রীহট্ট জেলা ব্যাতিরেকে আসাম প্রদেশের জেলা সমবায়ে পূর্ববঙ্গ প্রদেশ গঠিত হইবে। আর এই প্রদেশগুলির সমবায়ে গঠিত হইবে বৃহত্তর বঙ্গদেশ রাষ্ট্র।
মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী আবুল হাশিম নেতৃত্বাধীন অংশ ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগষ্ট direct action day পালন দিবসে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় অখন্ড বাংলার দাবীতে প্রধান মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তার ৪০নং থিয়েটার রোডস্থ বাসভবনে এক প্রতিনিধিত্ব মূলক সভা আহ্বান করেন। উক্ত সভায় জনাব আবল হাশিম, সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রী সভায় তফসিলী সম্প্রদায়ের মন্ত্রী শ্রী যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল, দৈনিক ইত্তেহাদের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিঞা, অল বেঙ্গল স্টুডেস্টস লীগের প্রাক্তন জেনারেল সেক্রেটারী নুরুদ্দিন আহমদ, শেখ মুজিবুর রহমান, পূর্ব বঙ্গ মুসলিম লীগের কর্মী শিবির নেতা পরবর্তীতে পূূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল সেক্রেটারী জনাব শামসুল হক, ঢাকা জেলা মুসলিম লীগ সম্পাদক সামসুুুদ্দিন আহমদ সহ অনেকেই যোগ দেন। 
আমরা ঢাকায় বঙ্গ-ভঙ্গ আন্দোলনের বিরুদ্ধে জনমত গড়িয়ে তুলিবার প্রচেষ্টায় সর্বশক্তি নিয়োজিত ছিলাম। ছাত্র মহলই ছিল আমাদের কর্মক্ষেত্র স্বাধীন ও সার্বভৌম অখণ্ড বঙ্গদেশ পরিকল্পনা সমর্থনে হিন্দু-মুসলিম ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা পরিচালনাকালে ছাত্রনেতা শ্রী সরোজ দাস ও শ্রী অজিত কুমার হাজরার সহিত আমার হৃদ্যতা সৃর্ষ্টি হয়। তখনকার উগ্র সাম্প্রদায়িক বিষাক্ত হওয়ায় দেশ জর্জরিত হওয়া স্বত্ত্বেও সংকল্প ও আদর্শের মিল আমাদিগকে ভ্রাতৃত্বের রাখী বন্ধনে আবদ্ধ করিয়াছিল। 
পূর্বসূরী শরৎ চন্দ্র বসু, হোসেন শহীদ সোহারাওয়ার্দী, আবুল হাশিমের স্বপ্ন বাস্তবায়নের ভার ্উত্তর সূূরী বংশধরদের উপর ন্যস্ত। 
 
রাজা গোপাল আচারীর প্রস্তাবঃ
      ১৯৪২ সালে বৃটিশ কুুটনীতিক ও মন্ত্রী-স্যার ষ্টাফোর্ড ক্রিপস ভারতে আসেন। তিনি মুসলিম লীগ নেতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং কংগ্রেস নেতাদের সাথে আলোচনা করেন। 
      কংগ্রেসের অখন্ড ভারতের দাবী থাকলেও কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতা রাজা গোপাল আচারী স্যার ষ্ট্যাফোর্ড ক্রিপস এর কাছে এই মর্মে প্রস্তাব রাখেন যে- যে সমস্ত জেলাসমূহ ও নিকটবর্তী জেলা সমূহ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট সেগুলি একত্রে মুসলিম জোন এবং যে সমস্ত জেলা সমূহ ও নিকটবর্তী জেলা সমূহ হিন্দু সংখ্যাগরষ্ট সেগুলি একত্রে হিন্দু জোন গঠিত হইবে। ফলশ্র“তিতে পাঞ্জাব ও বেঙ্গল বিভক্ত হয়। 
     অন্যদিকে বাংলার গভর্নর মিঃ বরোজ এর প্রস্তাব ছিল গনভোটের।
 
মুসলিম লীগ কর্তৃক ৩রা জুন পরিকল্পনা গ্রহণ
      নিখিল ভারত মুসলিম লীগ কাউন্সিল ৫ই জুন (১৯৪৭) অধিবেশনে ইংরেজী সরকার ঘোষিত ভারত বিভাগজনিত ৩রা জুন পরিকল্পনা ৪০০-৮ ভোটে গ্রহণ করে। উল্লেখ্য যে, নিখিল ভারত কংগ্রেসের অন্যতম শীর্ষ স্থানীয় নেতা রাজা গোপালাচারী ১৯৪৩ সালে ক্রিপস মিশন ভারতে অবস্থানকালে কায়েদে আজমের সহিত আলোচনার সময় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলির সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা গুলির সমবায়ে পাকিস্তান রাষ্ট গঠনের প্রস্তাব দিয়াছিলেন। “৩রা জুন পরিকল্পনা” রাজা গোপালাগারীর প্রস্তাবের প্রায় অভিন্নরূপ। লাভের মধ্যে হইল হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের চরম অবনতি, ব্যাপক হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, লুঠ, রাহাজানী, অগ্নিসংযোগ ও মেয়েদের সতীত্ব হরণ। নেতাদের রহস্য সত্যি বুঝা দায়!
১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম অধ্যুষিত সীমান্ত প্রদেশে খান আবদুল গফ্ফার খান ও ডাঃ খান সাহেব ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত কংগ্রেস প্রার্থীরা মুসলিম লীগ মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বিপুলভাবে জয়লাভ করে। তাই ৩রা জুন ঘোষণা মোতাবেক উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশবাসীদের মতামত যাচাইয়ের জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে সীমান্ত প্রদেশবাসী পাকিস্তান রাষ্ট্রে যোগদানের রায় দেয়। তদনুরূপ আসাম প্রদেশভক্ত শ্রীহট্ট জেলায় ৬ই ও ৭ই জুলাই (১৯৪৭) অনুষ্ঠিত গণভোটে শ্রীহট্ট জেলা পাকিস্তান রাষ্ট্রে যোগ দেয়। আমি কতিপয় বন্ধুসহ শ্রীহট্টে অনুষ্ঠিত গণভোটে অংশগ্রহণ করিয়াছিলাম।