মিঃ জিন্নাহ্’র ঐতিহাসিক ১৪ দফাঃ

ফন্ট সাইজ:
         মহামান্য আগা খানের সভাপতিত্বে ১৯২৮ সনের ৩১শে ডিসেম্বর দিল্লীতে সর্বদলীয় মুসলিম দলগুলোর এক সম্মেলনে এই চৌদ্দটি দফা গৃহীত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯২৯ সনের মার্চে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ সম্মেলনেও এ দফাগুলো গৃহীত হয়। এগুলোই “মিঃ জিন্নাহর চৌদ্দ দফা” হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। এ দফাগুলোর প্রথম ও দ্বিতীয়, ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ দফা প্রত্যক্ষভাবে ফেডারেল পদ্ধতির সাথে সম্পর্কিত। 
১। ভারতের সরকার পদ্ধতি হবে ফেডারেল। 
২। Residuary powers প্রদেশ এবং দেশীয় রাজ্যগুলোর উপর ন্যস্ত থাকবে। 
৩। যদি কোন সম্প্রদায়ের তিন চতুর্থাংশ কোন বিলের বিরোধিতা করে, তাহলে সে বিল নিয়ে আলোচনা হবে না। 
৪। মুসলমানদের জন্য আলাদা নির্বাচনের অধিকার অক্ষন্ন থাকবে-যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁরা স্বেচ্ছায় সে অধিকার ছেড়ে না দেয়।
৫। কেন্দ্রীয় বিধান সভায় এক তৃতীয়াংশের মুসলিম সদস্যদের আসন সংরক্ষিত থাকতে হবে। 
৬। মুসলমানরা যে যে প্রদেশে সংখ্যালঘু, সেখানে তাদের প্রতিনিধিত্বের বর্তমান ব্যবস্থা অক্ষুন্ন থাকবে।
৭। কোন সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় কোন অবস্থানেই সংখ্যালঘুতে বা সম-অধিকার সম্পন্ন সম্প্রদায়ে পরিণত হবে না। 
৮। বেলুচিস্তান এবং উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে সংস্কার সাধন করতে হবে।
৯। সিন্ধুকে আলাদা করতে হবে।
১০। চাকুরী বাকুরীতে মুসলমানদের চাকুরীর সংখ্যা সংরক্ষণ করতে হবে। 
১১। মুুসলমানদের তাহজীব তমুুদ্দন, ধর্মীয় অনুভূতি ও শিক্ষা, পার্সোনাল ল’ এবং ওয়াকফের বিধান সংরক্ষণ করতে হবে। 
১২। সরকারের শিক্ষা বিভাগে মুসলমানদের যথার্থ প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে। 
১৩। প্রদেশগুলোর স্ব-প্রণোদিত অনুমতি ব্যতিরেখে ভারতের শাসনতন্ত্রের কোন পরিবর্তন সাধন করা যাবে না। 
১৪। ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলোর স্ব-প্রণোদিত অনুমতি ব্যতিরেখে ভারতের শাসনতন্ত্রের কোন পরিবর্তন সাধন করা যাবে না। 
 
লাহোর প্রস্তাব
১৯৪০ সালের ২২শে ও ২৩শে মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগ অধিবেশনের সমাপ্তি দিবসে অবিভক্ত ভারবর্ষের দশ কোটি মুসলমানের স্বকীয় জীবনধারা স্বাধীনভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে স্বতন্ত্র বাসভূমি কায়েমের দাবীতে অবিভক্ত বঙ্গের প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ, কে, ফজলুল হক নিম্নোক্ত প্রস্তাব পেশ করেন। স্বতন্ত্র বাসভূমি দাবীর এই  প্রস্তাবই ইতিহাসে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ নামে খ্যাত। মূল প্রস্তাবটি নিম্নরূপঃ
 
অর্থাৎ ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অত্র অধিবেশনের সুবিবেচিত অভিমত এই যে, এ দেশে কোন শাসনতান্ত্রিক পরিকল্পনাই কার্যকর কিংবা মুুসলমানদের নিকট গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না, যদি না অতঃপর বর্ণিত মূলনীতিসমূহের ভিত্তিতে তাহা পরিকল্পিত হয়। যথা, ভৌগলিক নৈকট্য সমন্বিত, ইউনিটগুলো প্রয়োজন অনুসারে স্থানিক রদবদলপূর্বক সীমানা চিহ্নিত করিয়া অঞ্চল গঠন করিতে হইবে এবং মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট অঞ্চল যেমন, ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চল সমন্বয়ে অবশ্যই স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ গঠন করিতে হইবে, যেখানে অন্তর্ভুক্ত ইউনিটগুলো স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম হইবে।’
“ইউনিট ও অঞ্চলগুলিতে সংখ্যালঘুদের সহিত পরামর্শক্রমে তাহাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং অন্যান্য অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণের নিমিত্ত সংবিধানে পর্যাপ্ত, কার্যকর ও ম্যান্ডেটরী নিরাপত্তার সুনিশ্চিত বিধান সংযোজন করিতে হইবে এবং ভারতের যে সকল অংশে মুসলমান ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রহিয়াছে তাহাদের সহিত পরামর্শক্রমে তাহাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং অন্যান্য অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যও সংবিধানে পর্যাপ্ত কার্যকরী ও বাধ্যতামূলক নিরাপত্তার সুনিশ্চিত বিধান সংযোজন করিতে হইবে”।
“অত্র অধিবেশন ওয়ার্কিং কমিটিকে অনুরূপ অঞ্চলগুলির যাবতীয় ক্ষমতা যেমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বৈদেশিক বিষয়, যোগাযোগ, শল্ক এবং প্রয়োজনমত অন্যান্য বিষয়ের উপর চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রদানের উদ্দেশ্যে উল্লেখিত মূলনীতিগুলির ভিত্তিতে একটি সাংবিধানিক পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য আরও ক্ষমতা দিতেছে।”
পরিতাপের বিষয়, “লাহোর প্রস্তাবের” প্রস্তাবক বঙ্গীয় প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ, কে, ফজলুল হক দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে মুসলিম লীগ হইতে বহিস্কৃত হইলে ১৯৪২ সালে হিন্দুমহাসভা নেতা ডঃ শ্যামা প্রসাদ মুখার্জীর যোগসাজসে শ্যামা-হক মন্ত্রীসভা গঠন করেন। মাত্র ৪০ জন এম, এল, এ মুসলিম লীগে থাকিয়া গেলেন। বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদ (Bengal Legislative Asembly)- এর ২৫০ জন সদস্যের ২১০ জন শ্যামা-হক মন্ত্রীসভাকে সমর্থন করেন; তন্মধ্যে ৮৮ জন্ই হিন্দু সদস্য। জনপ্রিয়তার অগ্নি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হইল কায়েদে আযমের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ ১৯৪২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নাটোর উপনির্বাচনে।  মাওলানা আক্রাম খাঁ সম্পাদিত ‘দৈনিক আজাদ’ই ছিল একমাত্র মুসলিম লীগ সমর্থক। বাকী কলিকাতার ১২টি দৈনিক ও মুসলিম মুখপাত্র ‘নবযুগ’ এক সুরে মুসলিম লীগ ও কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র মণ্ডুপাত করিতেছিল।
নাটোর উপ-নির্বাচনে মুসলিম লীগ বিপুল ভোটে জয়লাভই করে নাই বরং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর জামানতও বাজেয়াপ্ত হয়। নাটোরের ভোটারগণ , তথা নাটোরের একমাত্র মুসলিম জনতা প্রমাণ করিল ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড়। জাতির স্বার্থ নিয়া ছিনি -মিনি খেলিলে দেশবাসী যে বাংলার চাষী, বাংলার মুসলিম জনতার অর্থনৈতিক , সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা, চাকুরী-বাকুরী অঙ্গনে অগ্রযাত্রার একচ্ছত্র পথপ্রদর্শক ও মুসলিম স্বার্থ রক্ষক শেরে বাংলা এ,কে, ফজলুল হককেও ক্ষমা বা বরদাশত করে না; নাটোর উপ-নির্বাচন এই শিক্ষাই দিল। মুসলিম রাজনীতিতে আবার নূতন আশার সঞ্চার হইল। ইহাই ছিল ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম জনতার স্বতন্ত্র আবাসভূমি “পাকিস্তান” দাবীর প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনের পূর্বাভাষ। শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা পতন হইলে ১৯৪৩ সালের ২৪শে এপ্রিল খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে বঙ্গে মুসলিম লীগ মন্ত্রীসভা গঠিত হয়।
 
ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগের সহিত সম্পর্ক
অবভিক্ত বঙ্গদেশে নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ ছিল পাকিস্তান আন্দোলনে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সংগ্রামী ছাত্র সংগঠন। ১৯৪৪ সালে যথারীতি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই এবং কলেজে আগমনের পরই আমি ঢাকা কলেজ মুসলিম ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হই। 
ঢাকা কলেজ গভর্ণমেন্ট হোস্টেলের সহ-আবাসিক ও সহপাঠি জনাব আবদুল হই (বর্তমানে ডাক্তার) ১৫০ নং মোগলটুলী মুসলিম লীগ কর্মীশিবির কার্যালয়ে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক চিন্তানায়ক জনাব আবুল হাশিমের সহিত আমার পরিচয় করাইয়া দেন। উপস্থিত কর্মীবৃন্দের উদ্দেশ্যে জনাব আবুল হাশিমের রাত্রিভর পবিত্র কালেমার ব্যাখ্যা, প্রস্তাবিত রাষ্ট্র পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও ব্যক্তিজীবনে ইসলামী মূল্যবোধের সুস্পষ্ট রূপরেখা আমার কিশোর মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। তাঁহার জ্ঞানগর্ভ তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা উপলক্ষে অনুষ্ঠিত উক্ত কর্মী আসরেই সর্বজনাব শামসুল হক, শামসুদ্দিন আহমদ, কামরুদ্দিন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, তাজুদ্দিন আহমদ, নইমুদ্দিন আহমদ ও শওকত আলীর সহিত আমার পরিচয় হয়। তাঁহারাই উক্ত কার্যালয়ের প্রাণ ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে ঢাকার ১৫০ নং মোগলটুলীর দ্বিতল ও ত্রিতল ছিল পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগ কর্মীশিবিরের প্রাণকেন্দ্র এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ সার্বক্ষণিক ত্যাগী রাজনৈতিক কর্মীদের প্রধান কার্যালয়। বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রগতিশীল তরুণ নেতা জনাব শামসুল হক উপরোক্ত কার্যালয়ের কর্মাধ্যক্ষ ছিলেন। কালে ঘটনাবিবর্তনে আমি মুসলিম লীগের উক্ত প্রগতিশীল অংশের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত হইয়া পড়ি। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৪৬ সনের ১৬ই নভেম্বর কলিকাতার ৩নং ওয়েলসলি ফাস্ট লেইন হইতে কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিসের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ‘মিল্লাত’ প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকাটিই ছিল মুসলিম লীগের উক্ত প্রগতিশীল অংশের চিন্তাধারার মুখপত্র।