১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচন

ফন্ট সাইজ:

         ১৯৪৫ সালেই ৯ই মে জার্মানী ও ইটালীর আত্মসমর্পণের পর আফ্রো-ইউরোপীয় রণভূমিতে যুদ্ধ বন্ধ হয়। ইহার অব্যবহিত পরই গণতান্ত্রিক দেশ যক্তরাজ্যে (United Kingdom) ১৯৪৫ সালের ২৬শে জুলাই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং বিজয়ী শ্রমিক দল মিঃ ক্লিমেন্ট এটলীর নেতৃত্বে সরকার গঠন করে। অক্ষশক্তির অন্যতম অংশীদার জাপান ২রা সেপ্টেম্বর (১৯৪৫) আত্মসমর্পণ করিলে এশীয় রণভূমিতে যুদ্ধ বন্ধ হয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। মহাযুদ্ধোত্তরকালে পরিস্থিতির গুণগত পরিবর্তন অনুধাবন করিয়া ভারতীয় জনমত যাচাই করার উদ্দেশ্যে ইংরেজ সরকার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেন এবং ভারতে নিযুক্ত তদানীন্তন গভর্ণর জেনারেল লর্ড ওয়াভেল কর্তৃক ২৫শে জুন (১৯৪৫) আহূত সিমলা কনফারেন্স ব্যর্থ হইলে ২৯শে আগস্ট (১৯৪৫) তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন পরিষদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।

         নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতি কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতীয় উপমহাদেশে স্বতন্ত্র স্বাধীন সার্বভৌম আবাসভূমি ‘পাকিস্তানের’ দাবীতে দশ কোটি ভারতীয় মুসলিম অধিবাসীর নিকট শান্তিপূর্ণ রায়দানের সুযোগ গ্রহণের উদাত্ত আহ্বান জানান।
         বঙ্গদেশে নির্বাচন পরিচালনার উদ্দেশ্যে পার্লামেন্টারী বোর্ড গঠন করার জন্য ৩০শে সেপ্টেম্বর (১৯৪৫) কলিকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কাউন্সিল অধিবেশনে জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও জনাব আবুল হাশিমের যৌথ নেতৃত্বে পরিচালিত প্রগতিশীল অংশ খাজা নাজিমুদ্দিন ও বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ পরিচালিত রক্ষণশীল অংশকে পরাজিত করে। নির্বাচিতব্য পাঁচটি আসনেই জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, জনাব আবুল হাশিম, জনাব আহমদ হোসেন, মাওলানা রাগিব আহসান ও জনাব মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী (লাল মিঞা) নির্বাচিত হন। নয় সদস্যবিশিষ্ট পার্লামেন্টারী বোর্ডের অপর চারজন সদস্য প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ (বঙ্গীয় মুসলিম লীগ সভাপতি হিসাবে পদাধিকার বলে), বঙ্গীয় লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের মুসলিম লীগ দলীয় সদস্যবৃন্দ কর্তৃক নির্বাচিত জনাব নূরুল আমিন ও বঙ্গীয় লেজিসলেটিভ এসেম্বলীর মুসলিম লীগ সদস্যবৃন্দ কর্তৃক নির্বাচিত জনাব ফজলুর রহমান পূর্বাহ্নেই স্থিরীকৃত ছিলেন। বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদ নির্বাচনে মুসলিম লীগ ১১৯টি মুসলিম আসনের মধ্যে ১১৩টিতে বিপুল ভোটাধিক্যে জয়লাভ করে। ২রা এপ্রিল (১৯৪৬) জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারী দলের সর্বসম্মতনেতা নির্বাচিত হন এবং ২২শে এপ্রিল (১৯৪৬) বঙ্গীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
         জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পরামর্শে পার্লামেন্টারী বোর্ড জেলা, মহকুমা ও থানা পর্যায়ে সর্বক্ষণ কর্মী পরিচালিত নির্বাচনী বোর্ড স্থাপন করে। ছাত্রলীগের কার্যব্যাপদেশে কলিকাতা অবস্থানকালে তদানীন্তন নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের অন্যতম নেতা জনাব নূরুদ্দিন আহমদ ভারতীয় দশ কোটি মুসলমানের আবাসভূমি পাকিস্তান দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনে মুসলিম ছাত্রদের অংশগ্রহণের অপরিহার্যতা ও গুরুত্ব ব্যাখ্যা করিয়া চার সদস্যবিশিষ্ট ত্রিপুরা জেলা নির্বাচনী বোর্ডের অন্যতম সর্বক্ষন কর্মী হওয়ার আহ্বান জানাইলে আমি তাহাতে সানন্দচিত্তে সম্মত হই এবং ১৯৪৬ সালে আই.এস.সি পরীক্ষাদানে বিরত থাকি।
         কলিকাতা হইতে ঢাকা প্রত্যাবর্তন করিয়া আমার শ্রদ্ধেয় অগ্রজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এস.সি শেষবর্ষের ছাত্র জনাব আবদুল করিম (পরবর্তীকালে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ও ডীন) সাহেবকে আমার রাজনৈতিক অভিমত জ্ঞাপন করিয়া তাঁহার অনুমতি প্রার্থনা করি। আমার কাকুতি-মিনতি উপেক্ষা করিতে না পারিয়া স্নেহান্ধ ভাই অগত্যা আমার প্রার্থনা মঞ্জুর করেন এবং আব্বাজান ও বড় ভাইকে বুঝাইয়া বলিবার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালের অনুষ্ঠিতব্য আই.এ.সি পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফলাফলের আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির পরিপ্রেক্ষিতে তাঁহাদের সমর্থন লাভে সক্ষম হই। আমি মধ্যবিত্ত সরকারী চাকুরে পরিবারের সন্তান। হাজারো সমস্যাসঙ্কুল পরিবার আমাকে কেন্দ্র করিয়া ভবিষ্যত স্বচ্ছলতার স্বপ্ন রচনা করিয়াছিল। আমার রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও কার্যাবলীর ফলস্বরূপ আমাদের গরীব পরিবারকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারের নিকট হইতে অন্যায় এবং অবিচার সহ্য করিতে হইয়াছে। 
         ত্রিপুরা জেলা নির্বাচনী বোর্ডে আমি ব্যতীত বাকী অপর তিনজন সদস্য ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহম্মদ, জনাব এ,কে,এম, রফিকুল হোসেন ও জনাব সিরাজুল ইসলাম। খন্দাকার মোশতাক আহম্মদ জেলা নির্বাচনী বোর্ডের কর্মাধ্যক্ষ (Workers-in-Charge) ছিলেন। 
         ১৯৪৬ সালের ২০শে মার্চ নির্বাচনী প্রচারণা চালাইতে বরুড়া উপস্থিত হইলে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট ও কৃষক প্রজা দলীয় কর্মীদের অতর্কিত হামলায় সর্ব জনাব নূর মিঞা, আবদুর রব, শাহ আলম, আবদুল হামিদ, রেয়াজত আলী ও আমি গুরুতরভাবে আহত হই। 
         সর্বভারতীয় নির্বাচনী ফলাফল ছিল নিঃসন্দেহে পাকিস্তান দাবীর পক্ষে ভারতীয় দশ কোটি মুসলমানের দ্ব্যর্থহীন সমর্থনের সাক্ষ্য। এই ফলাফল ছিল নিম্নরূপঃ কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের ৩০টি মুসলিম আসনের ৩০টি আসন ও প্রাদেশিক আইন পরিষদ নির্বাচনে আসামে ৩৪টি মুসলিম আসনের মধ্যে ৩১ টি, বঙ্গদেশে ১১৯টির মধ্যে ১১৩টি, বিহারের ৪০টির মধ্যে ৩৪টি, উড়িষ্যার ৪টির মধ্যে ৪টি, যুক্তপ্রদেশে ৬৬টির মধ্যে ৫৫টি, পাঞ্জাবে ৮৬টির মধ্যে ৭৯টি, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে ৩৮টির মধ্যে ১৭টি, সিন্ধুতে ৩৫ টির মধ্যে ২৮টি, বোম্বেতে ৩০টির মধ্যে ৩০টি, মধ্য প্রদেশে ১৪টর মধ্যে ১৪টি, মাদ্রাজে ২৯টির মধ্যে ২৯টি অর্থাৎ সর্বমোট ৫২৫টি মুসলিম আসনের মধ্যে ৪৬৪ টি আসন লাভ। 
 
দিল্লী কনভেনশন
      সাধারণ নির্বাচনে বিপুল জয়ের পর মুসলিম লীগের একচ্ছত্র নেতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ৭, ৮ ও ৯ এপ্রিল (১৯৪৬) দিল্লীতে এ্যাংলো এরাবিক কলেজে মুসলিম লীগ লেজিসলেটারস্ কনভেনশন আহ্বান করেন। উক্ত কনভেনশনে দর্শক হিসাবে আমার যোগ দিবার ঐকান্তিক ইচ্ছা সত্ত্বেও নানা কারণে আমি দিল্লী যাইতে পারি নাই।
      দিল্লী এ্যাংলো এরাবিক কলেজে অনুষ্ঠিত লেজিসলেটারস কনভেনশনের ৯ই এপ্রিল অধিবেশনে বঙ্গীয় মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারী পার্টি নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পেশকৃত নিম্নোক্ত প্রস্তাব গৃহীত হয়ঃ 
 
অর্থাৎ প্রস্তাব গ্রহণ করা হইল যে,
(১) ভারতবর্ষের উত্তর-পূর্বে বঙ্গদেশ ও আসাম এবং উত্তর-পশ্চিমে পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান অঞ্চলগুলি যাহা ‘পাকিস্তান অঞ্চল’ নামে অভিহিত এবং যেখানে মুসলমানরা প্রধান সংখ্যাগুরু তাহাদের সমবায়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করা হউক এবং অবিলম্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা কার্যকর করার নিমিত্ত দ্ব্যর্থহীন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হউক। 
(২) স্ব স্ব সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে পাকিস্তান ও হিন্দুস্তানের জনগণ কর্তৃক দুইটি পৃথক সংবিধান রচনাকারী সংস্থা গঠন করা হউক।
(৩) ১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ নিখিল ভারত মুসলিম লীগ কর্তৃক লাহোরে গৃহীত প্রস্তাবানুসারে পাকিস্তান ও হিন্দুস্থানের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হউক।
(৪) মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবীর স্বীকৃতি ও অবিলম্বে ইহার বাস্তবায়ন্ কেন্দ্রে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার গঠনে মুসলিম লীগের সহযোগিতা ও অংশগ্রহণে অপরিহার্য শর্ত। 
       জনাব আবুল হাশিম উপরোক্ত দিল্লী প্রস্তাবকে লাহোর প্রস্তাবের সরাসরি বরখেলাপ বলিয়া তীব্র ভাষায় বিরোধিতা করেন এবং তিনি সঠিকভাবে যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, ১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের পূর্ণাঙ্গ জাতীয় সম্মেলন যে প্রস্তাব গ্রহণ করিয়াছে এবং ১৯৪১ সালের মাদ্রাজ অধিবেশনে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ যাহাকে মূলনীতি (Creed) হিসাবে গ্রহণ করিয়াছে ঐ প্রস্তাবকে বাতিল বা ইহার সংশোধনকরণ লেজিসলেটারস কনভেনশনের এক্তিয়ার বহির্ভূত। লাহোর প্রস্তাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে দুইটি সার্বভৌম রাষ্ট্র সৃষ্টির দ্ব্যর্থহীন অঙ্গীকার ছিল। গভীর পরিতাপের বিষয়, ১৯৪৬ সালের ৯ই এপ্রিল দিল্লী মহানগরীস্থ এ্যাংলো এরাবিক কলেজে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ লেজিসলেটারস কনভেনশনে বঙ্গদেশেরই ভাবী প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রস্তাবক্রমে লাহোর প্রস্তাবানুযায়ী একাধিক রাষ্ট্র গঠনের পরিবর্তে একটি রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। নেতা সোহরাওয়ার্দীর জাতীয় রায়কে বাতিল করার প্রয়াস আমাদের তরুণ মনকে অত্যন্ত আহত করে। যে কায়েদে আজমের সভাপতিত্বে ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হইয়াছিল, সেই কায়েদে আজমেরই সভাপতিত্বে ১৯৪৬ সালে দিল্লী প্রস্তাব গৃহীত হয়। নেতৃবৃন্দ বেমালম হজম করিয়া ফেলিয়াছিলেন যে, সর্বভারতে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সাধারণ নির্বাচনে মুসলমানগণ লাহোর প্রস্তাবের পক্ষেই দ্ব্যর্থহীন রায় দিয়াছিল। কি প্রখর নীতিজ্ঞান নেতৃকূলের!
 
ক্যাবিনেট মিশন
      ভারতবর্ষে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন পরিষদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের অব্যবহিত পরই বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী মিঃ ক্লিমেন্ট এটলী ১৫ই মার্চ (১৯৪৬) বৃটিশ হাউস অব কমন্স-এ ঘোষনা করিলেন যে, বৃটিশ সরকার ভারতকে স্বায়ত্তশাসন দানে সহায়তা করার মানসে ভারত সচিব লর্ড প্যাথিক লরেন্স, বাণিজ্য বোর্ড সভাপতি স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস, নৌ-বিভাগের প্রথম লর্ড  (First Lord of admiralty) এ, ভি, অ্যালেকজান্ডার সমবায়ে গঠিত ক্যাবিনেট মিশন ভারতে পাঠাইবার সিদ্ধান্ত নিয়াছে। তদানুযায়ী ‘ক্যাবিনেট মিশন’ ২০শে মার্চ, (১৯৪৬) করাচী অবতরণ করে। নিম্নোক্ত কারণগুলি বোধ হয় ইংরেজ সরকারকে উপরে বর্ণিত সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করেঃ 
      প্রথমতঃ ভারতব্যাপী সদ্য অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে হিন্দ মুসলিম নির্বিশেষে ভারতবাসী স্বাধীনতার পক্ষে রায় দিয়াছে। দ্বিতীয়তঃ ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন (Govt. of India Act, 1935) মোতাবেক ভারতবর্ষের এগারটি প্রদেশে ভারতীয় জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি কর্তৃক সরকার পরিচালনার সুযোগ ভারতবাসীকে আত্মসচেতন ও স্বাধিকার সচেতন করিয়া তুলিয়াছে। তৃতীয়তঃ প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর বিশ্বশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মহাচীন, সোভিয়েট রাশিয়া ভারতবাসীর হস্তে ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আন্তজার্তিক চাপ সৃষ্টি করিতেছিল। চতুর্থতঃ (ক) দীর্ঘকাল যাবৎ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে দীক্ষিত সর্বভারতীয় বিপ্লবী সংগঠনগুলির প্রচেষ্টা, (খ) দ্বিতীয় বিশ্বযুুদ্ধকালে সর্বভারতীয় বিপ্লবী অগ্নিপুরুষ নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সর্বাধিনায়কত্বে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর একটি অংশ কর্তৃক জাপান ও  জার্মানীর সহায়তায় আই, এন, এ (Indian National Army) গঠন ও স্বাধীনতা যুদ্ধ ঘোষণা, (গ) মহাযুদ্ধোত্তর ভারতের বোম্বাই বন্দরে ভারতীয় নৌবাহিনীর বিদ্রোহ ইত্যাদির মধ্যে দূরদৃষ্টি ও অন্তদৃষ্টি সম্পন্ন ইংরেজী রাজশক্তির একটি অংশ ভারতবাসীর মধ্যে সশস্ত্র পথে মাতৃভূমিকে মুক্ত করার অদম্য ও দুর্দমনীয় স্পৃহা লক্ষ্য করে। স্মর্তব্য, ভারতকে আজাদী দান প্রসঙ্গে ইতিপূর্বে ১৯৪২ সালের ১১ই মার্চ বৃটিশ সরকারের অন্যতম মন্ত্রী কূটনীতিক স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস, ১৯৪৫ সালের জুন মাসে গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়াভেল আহূত সিমলা কনফারেন্স ও বৃটিশ পার্লামেন্টারী মিশন ভারতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে বিরাজমান মতভেদ নিরসনের ব্যর্থ প্রচেষ্টা করেন। ভারতীয় নেতৃবৃন্দের মতভেদ ও মতামত যাচাই করিয়া ভারতকে স্বাধীনতা দান কল্পেই ক্যাবনেট মিশনের ভারতে আগমন ঘটে।
      বৃটিশ ক্যাবিনেট মিশন প্রায় দুই মাস ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সহিত আলাপ-আলোচনা এবং দেন-দরবারের পর ১৯৪৬ সালের ১৬ই মে ভারতীয় শাসনতান্ত্রিক জটিলতা অপনোদন মানসে নিম্নোক্ত সুপারিশগুলি সাধারণ্যে প্রকাশ করেঃ 
 
অর্থাৎ
(১) বৃটিশ ভারত ও দেশীয় রাজ্যসমূহ সমবায়ে ভারতীয় ইউনিয়ন সংগঠিত হওয়া উচিত, যাহার বিষয়াবলী থাকিবে পররাষ্ট্র, দেশরক্ষা ও যোগাযোগ। উপরোক্ত বিষয়াবলীর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ যোগানের আবশ্যকীয় ক্ষমতা থাকা উচিত।
(২) ইউনিয়ন অর্থাৎ কেন্দ্রীয় বিষয়গুলি ব্যতীয় সকল বিষয় এবং বাদ বাকী সর্বক্ষমতা প্রদেশগুলির উপর ন্যস্ত হওয়া উচিত। 
(৩) কেন্দ্রীয় বিষয়গুলি ব্যতীত সকল বিষয় ও ক্ষমতা দেশীয় রাজ্য সমূহের আয়ত্তাধীন থাকিবে। 
(৪) প্রশাসন ও আইন পরিষদসহ গ্র“প গঠন প্রদেশগুলির এক্তিয়ারাধীন। কোন কোন প্রাদেশিক বিষয় সাধারণভাবে গ্রহণ করা হইবে তাহা প্রত্যেক গ্র“পই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবে।
(৫) কেন্দ্রী ও গ্র“পগুলির সংবিধানে বিধান থাকা উচিত যে, প্রারম্ভিক দশ বৎসর এবং তৎপরবর্তী প্রত্যেক দশ বৎসর অন্তর অন্তর যে কোন প্রদেশ স্বীয় আইন পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সংবিধানের ধারাগুলি পুনঃ বিবেচনার দাবী করিতে পারিবে। 
ভারতবর্ষকে তিনভাগে বিভক্ত করা হউক।
সেকশন-এঃ মাদ্রাজ, বোম্বে, সংযুক্ত প্রদেশ, বিহার, মধ্য প্রদেশ ও উড়িষ্যা- ১৬৭টি সাধারণ আসন ও ২০টি মুসলিম আসন।
সেকশন-বিঃ পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও সিন্ধুপ্রদেশ ৯ট সাধারণ আসন ও ২২টি মুসলিম আসন ও ৪টি শিখ আসন।
সেকশন-সিঃ বঙ্গদেশ ও আসাম-৩৪টি সাধারণ আসন ও ৩৬টি মুুুসলিম আসন। 
 
নেহরুর ভুলঃ হিন্দু মুসলিম ঐক্য প্রচেষ্টা বানচাল
      ২৪শে মে (১৯৪৬) নিখিল ভারত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি “স্বাধীন, অখণ্ড ও গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষের” সংবিধান প্রণয়নকল্পে প্রস্তাবিত গণপরিষদে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। 
      ৬ই জন (১৯৪৬) নিখিল ভারত মুসলিম লীগ কাউন্সিলের গোপন বৈঠক ও ২৫শে জুন (১৯৪৬) নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটি ছয়টি সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশাবলী যথা বঙ্গদেশ, আসাম, পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান সমবায়ে একটি গ্রুপ গঠনের দাবী তুলিয়া ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান গ্রহণ করিয়া গণপরিষদে যোগ দিতে সম্মত হয়। কিন্তু ১০ই জুলাই (১৯৪৬) বোম্বে শহরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে নিখিল ভরত কংগ্রেসের সদ্য নির্বাচিত সভাপতি পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরুর অবিবেচনা প্রসূত ঘোষণা- “কংগ্রেস গণপরিষদ কেবলমাত্র অংশগ্রহণ করিতে সম্মত হইয়াছে এবং যাহা সর্বোৎকৃষ্ট মনে করে সেই মোতাবেক ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যানকে পরিবর্তন বা সংশোধন করার ব্যাপারে নিজেকে স্বাধীন মনে করে- We are entirely and absolutely free to determine অর্থাৎ আমরা নির্ধারণ করার বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে ও নিঃশর্তভাবে স্বাধীন মুসলিম লীগ মহলকে শঙ্কিত করে এবং অখণ্ড সর্বভারতীয় কাঠামো বজায় রাখার অধিকাংশ মহলের সর্বপ্রকার ঐকান্তিক প্রচেষ্টাকে বানচাল করে। অবশ্য নেহরুর মন্তব্যের প্রতিধ্বনি ১৯৪৭ সালের ২৫শে এপ্রিল ভারতীয় গণপরিষদের অধিবেশনে শোনা যায়। অতঃপর অখণ্ড ভারতের সংবিধান রচনার মানসে ভারতীয় গণপরিষদে যোগদান মর্মে কংগ্রেস-লীগ ঐক্যমত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হইয়া গেল। বিদেশী ইংরেজী শাসকচক্র অবিভাজ্য ও অখন্ড স্বাধীন ভারত রাষ্ট্র কায়েমের প্রচেষ্টায় যখন আপ্রাণ চেষ্টায় নিয়োজিত, নিখিল ভারত কংগ্রেসের অখণ্ড ভারত দাবীদার অপরিপক্ক নেতৃবৃন্দ স্বীয় কার্যক্রম দ্বারা ভারতকে দ্বি-খণ্ডিত করার হুতাসন যজ্ঞের সর্বপ্রকার আয়োজন করিয়া ফেলিলেন। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে তখনকার দিনে ভারতবাসীর মনে যে উচ্চাশা ও প্রত্যয় জন্মিয়াছিল, তাহা অচিরেই ধুলিসাৎ হইয়া গেল। ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক আবহাওয়া এক অশুভ ও অভিশপ্ত খাতে প্রবাহিত হইতে লাগিল। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার বিষবাষ্পে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক এত বিষাক্ত হইল যে, হিন্দু মুসলমানে র পাশাপাশি বাড়িতে সহঅবস্থান চিন্তার অতীত হইয়া পড়িল। পাঞ্জাব ও বঙ্গদেশে স্বীয় বাস্তুভিটা ত্যাগ করিয়া রিক্ত, পর্যদুস্ত ও সহায়সম্বলহীন হতভাগ্য লক্ষ লক্ষ লোক ভিনদেশযাত্রী হইল ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শিকারে পরিণত হইল। স্বার্থপর ক্ষমতালোভী ভারতীয় নেতৃত্ব ইতিহাসের পৃষ্ঠায় ঘৃণিত গোষ্ঠী হিসাবেই চিহ্নিত হইবে-ইহাই আমার তখনকার তরুণ বয়সের প্রতিক্রিয়া। 
 
মুসলিম লীগের সীদ্ধান্ত
      সাংবাদিক সম্মেলনে পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরুর মন্তব্যের পটভুমিকায় উদ্ভুত সমগ্র রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার নিমিত্ত কায়েদে আজম কর্তৃক আহূত ২৭, ২৮ ও ২৯শে জুুলাই (১৯৪৬) বোম্বে শহরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ কাউন্সিলের তিনদিন স্থায়ী বিশেষ অধিবেশন ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান গ্রহণ সম্পর্কিত পূর্ব সিদ্ধান্ত বাতিল করিয়া নিম্নোক্ত প্রস্তাব গ্রহণ করেঃ
অর্থাৎ “যেহেতু কংগ্রেসের অনমনীয়তা ও বৃটিশ সরকারের বিশ্বাস ভঙ্গের কারণে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ কাউন্সিল কেবিনেট ডেলিগেশন ও ভাইসরয় কর্তৃক ১৬ই মে (১৯৪৬) প্রদত্ত বিবৃতিতে সন্নিবেশিত প্রস্তাবাবলী প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নিয়াছ, যেহেতু সমঝোতা ও নিয়মতান্ত্রিক পথে ভারতীয় সমস্যার শান্তপূর্ণ সমাধানে মুসলিম ভারত সর্বপ্রচেষ্টা নিঃশেষ করিয়াছে; যেহেতু বৃটিশের পরোক্ষ সমর্থনে বলীয়ান হইয়া কংগ্রেস বর্ণ-হিন্দু রাজ প্রতিষ্ঠা করিতে বদ্ধ পরিকর; যেহেতু সাম্পতিক ঘটনাপঞ্জী প্রমাণ করিয়াছে যে, ভারতীয় ব্যাপারে ন্যায় বিচার ও নিরপেক্ষতা নয় বরং ক্ষমতার রাজনীতিই নির্ধারণী বিষয়বস্তু; যেহেতু ইহা সবিশেষ স্পষ্ট হইয়াছে যে, স্বাধীন ও পূর্ণ সার্বভৌম পাকিস্তান রাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক প্রতিষ্ঠা ব্যতীত ভারতীয় মুসলমান শান্ত থাকিবে না এবং মুসলিম লীগের অনুমোদন ও সম্মতি ব্যতীত কোন সংবিধান রচনাকারী সংস্থা অথবা দীর্ঘ মেয়াদী কিংবা স্বল্প মেয়াদী সংবিধান অথবা কেন্দ্রে অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠনের যে কোন প্রচেষ্টাকে বাধা দেবে; নিখিল ভারত মুসলিম লীগ কাউন্সিলের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিয়েছে যে, পাকিস্তান অর্জনের জন্য প্রত্যক্ষ সংগ্রামের আশ্রয় গ্রহণ করার, তাহাদের ন্যায্য অধিকার রক্ষা করার, তাহাদের সম্মান রক্ষা করার এবং বর্তমান বৃটিশ দাসত্ব ও ভবিষ্যৎ হিন্দু আধিপত্য ঝাড়িয়া ফেলিবার সময় মুসলিম জাতির জন্য আসিয়াছে। 
      “এই কাউন্সিল জাতিকে তাহাদের একমাত্র প্রতিনিধিত্বমূলক ও কর্তৃত্বব্যঞ্জক সংগঠন নিখিল ভারত মুসলিম লীগের পিছনে দাঁড়াইবার ও যে কোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুতি নিবার আহ্বান জানাইতেছে।”
      “উপরে ঘোষিত নীতিকে কার্যকর করিতে ও প্রয়োজনবোধে আশু সংগ্রামে প্রবৃত্ত হওয়ার জন্য মুসলমানদিগকে সংগঠিত করিতে অবিলম্বে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের কর্মসূচী প্রণয়নের জন্য ওয়াকির্ং কমিটিতে কাউন্সিল নির্দেশ দিতেছে।”
      “ইংরেজের মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও তাহাদের গভীর ক্ষোভের প্রতীক হিসাবে সরকার প্রদত্ত সর্বপ্রকার খেতাব বর্জনের জন্য মুসলমানদের প্রতি এই কাউন্সল আহ্বান জানাইতেছে”।
 
১৬ই আগস্ট, প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস, সাম্পদায়িক দাঙ্গার তাণ্ডবলীলা
      উপরোক্ত প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ১৬ই আগস্টকে “প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস” ঘোষণা করা হয় এবং খাজা নাজিমুদ্দিন, নওয়াব ইসমাইল ও চৌধুরী খালেকুজ্জামান সমবায়ে তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি অব এ্যাকশন বা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। একদিকে ইংরেজী সরকার বিরোধী প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাকে ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত, অন্যদিকে খেতাব বর্জনের নির্দেশে বিচলিত খেতাবধারী স্যার খাজা নাজিমুুদ্দিন কলিকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ব্যাখ্যা দিতে গিয়া মন্তব্য করেন যে, প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ইংরেজের বিরুদ্ধে নয়, হিন্দুন্দের বিরুদ্ধে। মুসলিম লীগের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা খাজা নাজিমুদ্দিনের অপব্যাখ্যা সাম্প্রদায়ক হিন্দুদিগকে কলিকাতার বিভিন্ন এলাকার সংগোপনে দাঙ্গা প্রস্তুতি নিতে ইন্ধন যোগাইয়া ছিল, সাধারণ শান্তিপ্রিয় হিন্দুকে বিভ্রান্ত করিয়াছিল। অথচ ২রা আগস্ট (১৯৪৬) মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির বোম্বে নগরীতে অনুষ্ঠিত সভা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস কর্মসূচী নিম্ন প্রস্তাবাকারে ঘোষণা করেঃ 
      অর্থাৎ “ভারতীয় মুসলমানদিগকে ১৬ই আগস্ট (১৯৪৬) সকল কাজ-কর্ম বন্ধ রাখিতে ও পূর্ণ হরতাল পালন করিতে আহ্বান জানাইতেছে।”
      ২২শে জুলাই  (১৯৪৬) কেন্দ্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব জানাইয়া ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস সভাপতি যথাক্রমে কায়েদে আজম ও পণ্ডিত নেহরুকে পত্রে সহযোগিতার আহ্বান জানান। কায়েদে আজমের পত্রে লর্ড ওয়াভেলকে ১৬ই জুন (১৯৪৬) ক্যাবিনেট মিশন ও ভাইসরয় প্রদত্ত যুক্ত ঘোষণা স্মরণ করাইয়া দেওয়া সত্ত্বেও লর্ড ওয়াভেল ১২ই আগস্ট (১৯৪৬) পণ্ডিত নেহরুকে অন্তবর্তীকালীন কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করেন। কেন্দ্রে একদলীয় কংগ্রেস সরকার গঠনের প্রস্তুতি দাঙ্গাবাজ সাম্প্রদায়িক হিন্দুদিগকে অত্যন্ত উৎসাহিত করিল।
      তদানিন্তন বঙ্গীয় প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও কায়েজে আজম যদি সেদিন “প্রত্যক্ষ সংগ্রাম” সম্বন্ধে অপব্যাখ্যার অপরাধে স্যার নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতেন তাহা হইলে ১৬ই আগস্ট কলিকাতার রক্ষক্ষয়ী দাঙ্গায় অনাহূত নিরীহ কলিকাতাবাসীকে প্রাণ দতে হইত না। ধনে-জনে-মানে মুসলিম সম্প্রদায়ই সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও সমগ্র ভারব্যাপী এমনকি বিদেশেও মুসলিম ও মুসলিম লীগ সরকার অর্থাৎ সোহওাওয়ার্দ সরকারকেও এই কলঙ্কময় অধ্যায়ের জন্য দায়ী হইতে হইয়াছে। ইহার প্রতিক্রিয়ায় বিহারে নির্দোষ নিরীহ মুসলমানদিগকে উন্মত্ত সাম্প্রদায়িক হিন্দুদের হাতে কচুকাটা হইতে হইয়াছে, অবলা নারীকে সতীত্ব হারাইতে হইয়াছে, ধন-সম্পদ লুন্ঠিত ও অগ্নিদাহ হইয়াছে। ইতিপূর্বে কলিকাতার সংগঠিত নারকীয় দাঙ্গার প্রতিক্রিয়ায় নোয়াখালী জেলার কতিপয় এলাকার উগ্র সাম্প্রদায়িক মুসলমানদের হাতে নিরপরাধ শান্তপ্রিয় সাধারণ হিন্দুকে ধনে-জনে-মানে মাশুল দিতে হইয়াছে।
      অথচ পাশাপাশি দৃষ্টান্ত ঢাকা শহরে ১৬ই আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস পালনকালে কোন প্রকার সাম্প্রদায়ক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে নাই, যদিও ঢাকাই ছিল হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আখড়া। ইহাই হইল ঢাকার অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতা শামসুল হক ও শামসুদ্দিন আহমেদের স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন নেতৃত্বের কৃতিত্ব। জনাব হক ও জনাব আহমদ যথাক্রমে পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগ কর্মী শিবিরের কর্মাধ্যক্ষ ও ঢাকা জেলা মুসলিম লীগের সম্পাদক ছিলেন।
      নোয়াখালীতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর মহাত্মা গান্ধীর স্বয়ং দাঙ্গা দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে নোয়াখালীর পথে কলিকাতা পৌছার পূর্বদিন বিহারে মুসলিম নিধনযজ্ঞ শুরু হয়। অপেক্ষাকৃত শান্ত নোয়াখালীর পথে যাত্রা স্থগিত রাখিয়া সদ্য দাঙ্গা কবলিত বিহারই ছিল গান্ধিজীর উপযুক্ত কর্মস্থল। তবে, ঝানু রাজনীতিবিদ গান্ধীজী তাহা করিতে যাইবেন কেন? নোংরা রাজনীতির তাগিদে ঋষিতুল্য গান্ধীজীকেও কত নীচস্তরে নামিতে হইয়াছিল। গান্ধীজীর তখনকার দৃষ্টিতে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ ছিল না, ছিল সবার উপরে রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার। এতদসত্ত্বেও বঙ্গীয় প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী স্বয়ং গান্ধীজীর নোয়াখালী যাত্রা ও অবস্থানের সর্বপ্রকার ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু সাম্প্রদায়িক হিন্দুরা স্বীয় ব্যক্তিগত জিঘাংসাবৃত্তি চরিতার্থ করার মানসে গান্ধীজীর নোয়াখালী অবস্থানের সুযোগ গ্রহণ করিয়া অনর্থক স্থানীয় মুসলিম নেতৃত্বকে নানাভাবে পুলিশী হয়রানির শিকারে পরিণত করিয়াছিল। তাই প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী ২রা ডিসেম্বর (১৯৪৬) মহাত্মা গান্ধীকে নিম্নোক্ত ব্যক্তিগত পত্র লিখিয়াছিলেনঃ 
 
অর্থাৎ “বাংলার হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আপনার ইচ্ছাকে আমি অতীব মূল্যবান জ্ঞান করি। তবে, মুসলমানরা মনে করে যে, আপনি যদি পারস্পরিক সুুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার নীতি বাস্তবিকই চালাইয়া যাইতে চান, তাহা হইলে বিহারই প্রকৃত ক্ষেত্র হওয়া উচিত। আপনার অবস্থান আপনার অনুগামীদের অনেককেই বানোয়াট প্রমাণাদি উদ্ভাবন করিতে এবং স্থানীয় মুসলমান ও স্থানীয় মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে আপনার সমীপে তাহা পেশ করিতে উৎসাহিত করিয়াছে, যাহা অদূর ভবিষ্যতে পারস্পারিক আস্থা স্থাপনে সম্ভবত সহায়ক হইবে না।”
      ২৪শে আগস্ট (১৯৪৬) কেন্দ্রে এক দলীয় কংগ্রেস সরকার প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে ভারতবাসীর উদ্দেশ্যে বেতার ভাষণ দান করিয়া গভর্ণর জেনারেল লর্ড ওয়াভেল রক্তক্ষয়ী দাঙ্গায় বিধ্বস্ত কলিকাতা নগরী সরেজমিনে পরিদর্শন কল্পে ২৫শে আগস্ট কলিকাতা আগমন করিলেন। কলিকাতায় সোহরাওয়ার্দী-ওয়াভেল আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী ৬ই সেপ্টেম্বর (১৯৪৬) কায়েদে আজমের সহিত তাঁহার বোম্বের মালাবার হিল বাসভবনে সাক্ষাত করেন। কায়েদে আজমের সহিত আলোচনার পর ৮ই সেপ্টেম্বর দিল্লীতে পুনরায় সোহরাওয়ার্দী-ওয়াভেল বৈঠক হয়। সোহরাওয়ার্দী-ওয়াভেল বৈঠকের পরিপ্রেক্ষিতে ৯ই সেপ্টেম্বর কায়েদে আজম দীর্ঘক্ষণ বৈঠকের পর ১০ই সেপ্টেম্বর (১৯৪৬) ভারতীয় সমস্যা নিরসনকল্পে সর্বদলীয় বৈঠকের আহ্বান জানান। গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়াভেলের আমন্ত্রণে ১৬ই এবং ১৮ই সেপ্টেম্বর কায়েদে আজম-ওয়াভেল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভূপালের নওয়াবের উদ্যোগে গান্ধী-জিন্নাহ-ভূপাল নওয়াব একদফা আলোচনা হয়। আলোচনার পর গান্ধী ও জিন্নাহ যুক্ত বিবৃতিতে সাম্প্রদায়িক শান্ত ও সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানান। স্মর্তব্য যে, ভারতীয় সমস্যা সমাধানকল্পে ১৯৪৫ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর কায়েদে আজমের বোম্বের মালাবার হিল বাসভবনে গান্ধী-জিন্নাহ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বটে; তবে ভারতের মেঘাচ্ছন্ন ভাগ্যাকাশে সূর্যোদয়ের কোন পূর্বাভাষ পাওয়া যায় নাই। বরং অনাগত ভবিষ্যত ভারতবাসীর জন্য বহয়া আনে দুর্বিষহ দুঃখ ও যাতনা। 
      ৪ঠা ও ৭ই অক্টোবর (১৯৪৬) দিল্লীস্থ ভূপাল হাউজে জিন্নাহ-নেহরু বৈঠক হয়। ১২ই ও ১৩ই অক্টোবর কায়েদে আজম-ওয়াভেল বৈঠকে ফলপ্রসু আলোচনা হয় এবং ১৩ই অক্টোবর নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটি অন্তর্বর্তীকালীন কেন্দ্রীয় সরকারে যোগদানের প্রস্তাব গ্রহণ করে। তদানুযায়ী ২০শে নভেম্বর (১৯৪৬) জনাব লিয়াকত আলী খান (অর্থ), জনাব আই,আই, চূন্দ্রীগড় (বাণিজ্য), সরদার আবদুর রব নিশতার (যোগাযোগ), রাজা গজনফর আলী খান (স্বাস্থ্য) ও বাবু যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল (আইন) অর্ন্তবর্তীকালীন কেন্দ্রীয় সরকারে যোগ দেন। বাবু যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল পরিচালিত সিডিউল কাস্ট ফেডারেশনের সর্বময় মুসলিম লীগ সংগঠনের প্রতি ভ্রাতৃসুলভ সহানুভূতি ছিল। তাই মুসলিম লীগ শ্রী মণ্ডলকে কেন্দ্রীয় সরকারের সদস্য হিসাবে মনোনীত করে। উক্ত সফল পরিণতির একক কৃতিত্ব তীক্ষè বুদ্ধিসম্পন্ন জনাব সোহরাওয়ার্দীর।
      আমাদের মত ক্ষুদ্র কর্মীদের তরুণ মন তখনকার নেতাদের আচরণে আশা-নিরাশায় দুলিতেছিল। দলমত নির্বিশেষে আমরা অতি আন্তরিকভাবেই ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যানের শুভ পরিণতি চাহিতেছিলাম। কিন্তু তাহাতো হইবার নহে। নেতাদের আত্মস্বার্থ তাহা হইতে দিবে কেন? তথাপি শেষরক্ষার কামনায় আল্লাহ আল্লাহ করিতে লাগিলাম। অনভিপ্রেতের সূত্রপাত হইল। ৯ই ডিসেম্বর (১৯৪৬) অনুষ্ঠিত ভারতীয় গণপরিষদের অধিবেশনে যোগদান করা হইতে মুসলিম লীগ বিরত রহিল। বৃটিশ গভর্নমেন্ট ২০শে ফেব্র“য়ারী (১৯৪৭) ঘোষণা করিলেন যে, ১৯৪৮ সালের জুনের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর করিতে বৃটিশ সরকার বদ্ধপরিকর। ২২শে মার্চ (১৯৪৭) লর্ড মাউন্টব্যাটেন গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়াভেলের স্থলাভিষিক্ত হইয়াই ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সহিত ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা শুরু করেন। তাঁহারই প্রচেষ্টায় পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরু ঘোষনা করিলেন যে, অনিচ্ছুক অংশ বাদ দিয়া পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় কংগ্রেসের কোন আপত্তি নাই। ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন কংগ্রেস লীগ নেতৃবৃন্দের সহিত সবিশেষ বিস্তারিত আলোচনার পর ৩রা জুন (১৯৪৭) ভারত বিভাগের পরিকল্পনা ঘোষণা করিলেন। ইহাই বিখ্যাত “৩রা জুন পরিকল্পনা” নামে অভিহিত।