মহান ভাষা আন্দোলনের গোড়া পত্তন

ফন্ট সাইজ:
      উপরে বর্ণিত কারণেই স্বাভাবিকভাবে বাঙ্গালী শিক্ষিত সম্প্রদায় প্রতিবাদমুখর হইয়া উঠিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পদার্থ বিজ্ঞান এবং রসায়ন বিজ্ঞানের অধ্যাপকদ্বয় আবুল কাসেম ও নূরুল হক ভূঁইয়া ধুমায়িত অসন্তোষকে সাংগঠনিক রূপদান প্রচেষ্টায় ১৯৪৭ সালের ১লা সেপ্টেম্বর পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস গঠন করে। নব গঠিত তমুদ্দন মজলিসই মহান ভাষা আন্দোলনের গোড়াপত্তন করে। অক্টোবর (১৯৪৭) পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে ও পূর্ববঙ্গ সরকারের মন্ত্রী, সাহিত্যিক হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরীর সভাপতিত্বে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মেলনে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষারূপে স্বীকৃতিদানের প্রথম প্রকাশ্য দাবী উত্থাপিত হয়। 
      ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ডঃ জিয়া উদ্দিন আহমদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করিবার সুপারিশ করেন। জ্ঞান তাপস ভাষাবিদ ডঃ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ইহার প্রতিবাদে বলেন, ‘যদি বিদেশী ভাষা বলিয়া ইংরেজী ভাষা পরিত্যক্ত হয়, তবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষারূপে গ্রহণ না করার কোন যুক্তি নাই। যদি বাংলা ভাষার অতিরিক্ত কোন দ্বিতীয় ভাষা গ্রহণ করিতে হয়, তবে উর্দু ভাষার দাবী বিবেচনা করা উচিত।” সচেতন শিক্ষিত সম্প্রদায়ের বিরোধিতা সুকৌশলে এড়াইবার মানসে করাচী শাসক-চক্র উর্দুকে Lingua franca বা ব্যবহৃত সাধারণ ভাষারূপে গ্রহণ করাইবার চেষ্টায় লিপ্ত হন।
      বস্তুতঃ করাচী হইতে ঢাকা পর্যন্ত উর্দু ভাষা-ভাষী ও বাংলা ভাষা-ভাষী মহলের উর্দুকেই রাষ্ট্র ভাষা অথবা লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা বা সাধারণ ভাষারূপে গ্রহণের বাদ-প্রতিবাদই পরবর্তীকালে শিক্ষাঙ্গন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন অতিক্রম করিয়া রাজনৈতিক অঙ্গনে জটিল রাজনৈতিক সমস্যায় রূপান্তরিত হয়।
      যাহা হউক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাঙ্গন এবং সাহিত্যসেবী বিদগ্ধজনের দ্রুত সমর্থনযুষ্ট দাবী “বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের অফিস-আদালত ও শিক্ষার মাধ্যম করিতে হইবে” অচিরেই পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের সার্বজনীন দাবীতে পরিণত হইল। ঢাকার বিভিন্ন সভা ও মিছিলের মূল আওয়াজ ছিল “পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই”। ক্রমশঃ আন্দোলন পরিচালনাকারীদের বোধোদয় হয় যে, পূর্ববঙ্গ পাকিস্তান রাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য বিধায় আমাদের দাবী প্রাদেশিক ভাষা করিবার দাবীতে পর্যবসিত হইয়া পড়িবার আশঙ্কা রহিয়াছে। অতএব প্রাথমিক ভুল দাবী সংশোধন করিয়া আমাদের দাবী উত্থিত হইল, “বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করিতে হইবে।” রাজধানী ঢাকার রাজপথে মিছিলে শুনা গেল “রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই”। উল্লেখ্য যে, নির্দয় সরকারী হামলা রুখিয়া দাঁড়াইবার ঐতিহাসিক প্রয়োজনে বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যসেবী, সংস্কৃতিসেবীদের গণ্ডি অতিক্রম করিয়া সেইদিন সর্বত্যাগী নির্ভয় তরুণ ছাত্র সমাজের উপরেই এই সক্রিয় আন্দোলনের মূল ও গুরু দায়িত্ব বর্তিয়াছিল। সেই দাবী পূরণের স্বার্থেই রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে ও পুরোভাগে ছাত্র সমাজের আবির্ভাব এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয় পূর্বকাল পর্যন্ত এই ধারাই অব্যাহত ছিল। বলাই বাহুল্য যে, ইহা ছিল দুুর্বল রাজনৈতিক নেতৃত্বেরই ফলশ্রুতি। তাই উত্তরকালে বাঙ্গালী জনতাকে দিতে হইয়াছে চরম মূল্য ও পোহাইতে হইয়াছে নজীরবিহীন দুর্ভোগ। 
      করাচীতে অনুষ্ঠিত সরকারী শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা অথবা লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা করিবার প্রস্তাবের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ৬ই ডিসেম্বর (১৯৪৭) পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিসের সেক্রেটারী অধ্যাপক আবুল কাসেমের সভাপতিত্বে ছাত্র সভায় বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করিবার প্রস্তাব গৃহীত হয়। সভাস্থলে হইতে এক বিরাট মিছিল পূর্ববঙ্গ সরকারের মন্ত্রী মোহাম্মদ আফজল এবং মন্ত্রী নূরুল আমিনের বাসভবনে গমন করেন। মন্ত্রীদ্বয়ের নিকট হইতে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা করিবার আশ্বাস পাইয়া এই মিছিলযোগে আমরা অর্থমন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরীর বাসভবনে উপস্থিত হই। মন্ত্রী মহোদয় আমাদের দাবী সমর্থন করিতে অস্বীকৃতি জানান। তথা হইতে আমরা মিছিলসহ মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের বাসভবনে বর্ধমান হাউজে উপস্থিত হই। কিন্তু অসুস্থ্যতার অজুহাতে খাজা সাহেব আমাদের সহিত সাক্ষাৎ করেন নাই।
      এমনি অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে বাস ট্রাক ভর্তি একদল উচ্ছৃঙ্খল মুসলিম লীগ সমর্থক ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রদের ও পলাশী ব্যারাক নিবাসী সরকারী কর্মচারীদের উপর অসৌজন্যমূলক হামলা চালায়। এই গুণ্ডামীর প্রতিবাদে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রাঙ্গণে সভা অনুষ্ঠানের পর মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় দৃঢ় প্রতজ্ঞ এক বিরাট বিক্ষোভ মিছিল অপরাহ্ন বেলা আনুমানিক সাড়ে তিন ঘটিকার সময় শিক্ষামন্ত্রী আবদুল হামিদের আবদুল গনি রোডস্থ বাসভবনে গমন করে। শিক্ষামন্ত্রী লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় উপর তলা হইতে নিচে মিছিলকারীদের নিকট আসেন। তিনি মিছিলকারীদের দাবীর সহিত একাত্মতা ঘোষনা করেন এবং একটি কাগজে তাহা লিখিয়াও দেন। এই বিরাজ বিক্ষোভ মিছিলটি অতঃপর মন্ত্রী মহোদয়সহ সেক্রেটারিয়েট্ ভবনমুখে অগ্রসর হয়। সেক্রেটারীয়েটের প্রধান ফটক বন্ধ থাকিবার দরুন মিছিলের অগ্রভাবে অবস্থানরত আমরা কয়েকজন দেওয়াল টপকাইয়া ভিতরে প্রবেশ করি এবং ফটক খুলিয়া দেই। মিছিলের গগনবিদারী আওয়াজে মন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ আফজল স্বীয় দফতর হইতে বাহির হইয়া মিছিলকারীদের মাঝখানে আগমন করেন। তিনিও আমাদের দাবী লিখিতভাবে স্বীকার করেন। মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ও অন্যান্য মন্ত্রী ১৫ই ও ১৬ই ডিসেম্বর করাচীতে অনুষ্ঠিতব্য মুসলিম লীগ কাউন্সিল সভায় যোগ দিতে ইতিমধ্যে ঢাকা ত্যাগ করিয়াছিলেন। অকপটে স্বীকার করিতে হইবে যে, মিছিলকারীদের কেহ কেহ মন্ত্রী মহোদয়ের প্রতি উগ্র আচরণ করিতে ছাড়ে নাই। তবুও এমনকি অশোভন দৈহিক হামলা পরিচালনা সত্ত্বেও মন্ত্রীদ্বয় নেতৃসুলভ ধৈর্যের পরিচয় দেন এবং মিছিলকারীদের সহিত অত্যন্ত ভদ্রোচিত ব্যবহার করেন। আমাদের কাহারো কাহারো অভদ্রজনিত ব্যবহারকে উপেক্ষা করিয়াই কৃষিমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ আফজল মিছিলকারীদের দাবী অনুযায়ী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হোস্টেলে গমন করেন। গুণ্ডামীর চিহ্ন স্বচক্ষে দেখিবার পর মিছিলসহ সরকারী কর্মচারীদের আবাসস্থল পলাশী ব্যারাকেও যান এবং তথায় মাগরিবের নামাজ আদায় করেন। তিনি এই স্থলে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত জেলা প্রশাসক এস, রহমতুল্লাহ ও পুলিশের ডি, আই, জি, সৈয়দ ওবায়েদুল্লাহকে প্রতিকার গ্রহণের নির্দেশ দেন। উল্লেখ্য যে, কেবলমাত্র গণতান্ত্রিক রাজনীতিতেই জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা উপরোক্ত আচরণ সম্ভব, কোন মিলিটারী ক্যু কিংবা কোন টোটেলিটারিয়ান ডিকটেটরদের দেশে ইহা অকল্পনীয়।
      কিন্তু অবস্থাগতিতে উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার ফলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটিল। একই দিন বিকাল বেলা কোর্টের উল্টাদিকে অবস্থিত ও, কে, রেষ্টুরেন্ট (বর্তমান মাইরেন্ডার) হইতে বাহির হইবার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগ কর্মী শিবিরের (১৫০ নং মোগলটুলী, ঢাকা) অন্যতম নেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নঈমুদ্দিন আহমদ (পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক ও উত্তরকালে ঢাকা হাইকোর্ট বার সেক্রেটারী) গুণ্ডা বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত ও প্রহৃত হন। মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুলের ছাত্রদের একটি মিছিলও রায় সাহেব বাজারে গণ্ডা কবলিত হয়। শিক্ষিত সম্প্রদায় উক্ত ঘটনাবলীকে খুব একটা সহজভাবে নিতে পারেন নাই। ইহার প্রতিবাদে ১৩ই ডিসেম্বর সেক্রেটারীয়েটের কর্মচারীরা ধর্মঘট পালন করেন। সরকার প্রত্যুত্তরে ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করিয়া ১৫ দিনের জন্য সভা, মিছিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।