পূৰ্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আত্মপ্রকাশ

ফন্ট সাইজ:
সরকার বিরোধী ছাত্র শক্তিকে সংগঠিত করিবার জন্য কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত ছাত্র ফেডারেশনই ছিল তখনকার দিনে একমাত্র সক্রিয় ছাত্র প্রতিষ্ঠান। মুসলমান ছাত্র সমাজের একটি অংশ উক্ত সংগঠনকে বিদেশী শক্তির তল্পীবাহক বলিয়া সন্দেহের চোখে দেখিত। এহেন সাংগঠনিক শূন্যতা নিরসনকল্পে আমি ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করি এবং সর্বজনাব অবদুর রহমান চৌধুরী, অবদুল মতিন খান চৌধুরী, অবদুল হামিদ চৌধুরী ও মোল্লা জালাল উদ্দিনের সহিত আলাপ আলোচনা চালাইতে থাকি। আমি তাহাদিগকে ঢাকায় নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ কাউ›িসলের তলবী সভা আহবান করিবার উদ্দেশ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করিবার জন্য অনুরোধ জানাই। আমার যুক্তি ছিল এই যে, এই পদ্ধতিতেই মুসলিম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সরকারের তল্পীবাহক শাহ অজিজুর রহমানকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অপসারিত করা যাইবে ও কাউ›িসলের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নুতন কমিটি নির্বাচন করিয়া ছাত্র আন্দোলনে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হইবে; কিন্তু তাঁহারা আমার প্রস্তাবে বিশেষ উৎসাহ প্রদর্শন করেন নাই। বোধহয় কাউন্সিলে সংখ্যা গরিষ্ঠের সমর্থন সম্বন্ধেতাঁহারা সন্দিহান ছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, শেখ মুজিবুর রহমান তখনও স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করিতেন না। তখন পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনের সহিত তিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন না। 
 
মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভা ঢাকার ছাত্র মহল হইতে যত বিচ্ছিন্ন হইতেছিল, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সমর্থকবৃন্দের মর্যাাদা ছাত্র মহলে ততই বৃদ্ধি পাইতেছিল। এই সময়ে আমি জাতীয় ছাত্র সমস্যা নিরসনের ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই নূতন ছাত্র সংগঠন গঠন করিবার তাগিত তীব্রভাবে বোধ করিতেছিলাম। তাই একমনা ছাত্র নেতৃবৃন্দের সহিত প্রাথমিক আলোচনা করিয়া ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি অপরাহ্নে ফজলুল হক হল মিলনায়তনে এক ছাত্র কর্মীসভা আহবান করি। সেই মুহূর্তে ঘটনাচক্রে ফেনী কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক নাজমুল করিম উপস্থিত ছিলেন। আমার তাঁহাকেই সভাপতি করিয়া সভার কাজ আরম্ভ করি। সভায় নূতন ছাত্র সংগঠন সাম্প্রদায়িক না অসাম্প্রদায়িক হইবে এই প্রশ্নে উপস্থিত অনেকের সহিত অমার মতানৈক্য দেখা দেয়। আমি সংগঠনের অসাম্প্রদায়িক নামের পক্ষে ছিলাম। যাহা হউক, অধিকাংশের মতের পক্ষে স্বীয় প্রস্তাব প্রত্যাহার করিয়া অবশেষে আমরা সর্বসম্মতিক্রমের ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ গঠন করি। জনাব নঈমুদ্দিন আহমদকে ও আমাকে আহবায়ক করিয়া যথাক্রমে পূর্ব পাকিস্তান ও ঢাকা শহর কমিটি গঠন করা হয় এবং নি¤œলিখিত ব্যক্তিদের সদস্য করিয়া পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়ঃ 
 
(১) নঈমুদ্দিন আহমদ (রাজশাহী) আহবায়ক, (২) আবদুর রহমান চৌধুরী (বরিশাল),  (৩) শেখ মুজিবুর রহমান (ফরিদপুর), (৪) অলি আহাদ (কুমিল্লা), আহবায়ক ঢাকা শহর কমিটি (৫) আজিজ অহমদ (নোয়াখালী), (৬) আবদুল মতিন (পাবনা), (৭) দবিরুল ইসলাম (দিনাজপুর), মফিজুর রহমান (রংপুর), (৯) শেখ আবদুল আজিজ (খুলনা), (১০) নওয়াব আলী (ঢাকা), (১১) নূরুল কবির (ঢাকা সিটি), (১২) আবদুল আজিজ (কুষ্টিয়া), (১৩) সৈয়দ নূরুল আলম (ময়মনসিংহ), (১৪) আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী (চট্টগ্রাম)। 
 
শেখ মুজিবুর রহমান তখন ঢাকা ছিলেন না এবং এই সংগঠন সম্পর্কে তিনি কিছুই অবহিত ছিলেন না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, সাংগঠনিক কমিটিতে তাঁহার অন্তর্ভূক্তি তিনি সানন্দেই গ্রহণ করিবেন। এবং তিনি সত্যই কোন দ্বিধাদ্বন্দ বা অনীহা প্রকাশ না করিয়া বরং সংগঠনকে দৃঢ় ও মজবুত করিবার প্রয়াসে সর্বশক্তি নিয়োগ করিয়াছিলেন। উল্লেখ্য যে, অধুনা অনেকেই শেখ মুজিবুর রহমানকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা বলিয়া প্রচার করিতেছেন। কিন্তু ইহা ইতিহাসের বিকৃতিমাত্র। 
 
জনাব মোহাম্মদ তোয়াহা ছাত্র ফেডারেশনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের আত্মপ্রকাশ খুব একটা উৎসাহের চোখে দেখেন নাই। কিন্তু আমাদের সহিত অতীত সাহচর্যের দুর্বলতার জন্যই তিনি সংগঠনের অগ্রগতিতে কোন বাধাও দেন নাই। 
 
ছাত্র মহল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তাই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে উদ্বুদ্ধ করে। প্রকৃতপক্ষে প্রদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন সন্ধিক্ষণে ছাত্রলীগ এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করিয়াছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের একক দাবীদার এই ছাত্র সংগঠন। ভাবীকালে এই সংগঠন পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর রূপায়ন ও পরিবর্তনে এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। 
 
১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রথম কাউ›িসল অধিবেশন বসে। এই অধিবেশনেই জনাব দবিরুল ইসলামকে সভাপতি ও জনাব খালেক নেওয়াজ খানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। জনাব দবিরুল ইসলামের পর জনাব শামসুল হক চৌধুরী ১৯৫৩ সালে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশন পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৩ সালের কাউ›িসল অধিবেশন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগকে অসাম্প্রদায়িক করিবার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্বান্ত গ্রহণ করে এবং পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নাম পরিবর্তন করিয়া পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ নাম রাখে। উল্লেখ্য যে, ১৯৪৮ সালের ডিসে¤¦রের দিকে সৈয়দ নজরুল ইসলামের (সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি) সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অর্গানাইজিং কমিটির সভায় আমি পুনরায় এই সংগঠনের অসাম্প্রদায়িক নামকরণের প্রস্তাব করিয়াছিলাম; কিন্তু প্রস্তাব গৃহীত না হওয়ার প্রতিবাদে আমি পদত্যাগ করি। যেহেতু পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা বিভিন্ন সময়ে পালন করিয়াছে, তাই বিভিন্নকালের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম নিম্নে লিপিবদ্ধ করিলামঃ 
 

১৯৪৮ 

  • নঈমুদ্দিন আহমদ -আহবায়ক 

১৯৪৯-৫৩ 

  • দবিরুল ইসলাম -সভাপতি
  • খালেক নেওয়াজ খান -সাধারণ সম্পাদক 

১৯৫৩-৫৪ 

  • কামরুজ্জামান -সভাপতি
  • এম, আবদুল ওয়াদুদ -সাধারণ সম্পাদক 

১৯৫৫-৫৬-৫৭ 

  • আবদুল মমিন তালুকদার -সভাপতি
  • আবদুল আউয়াল  -সাধারণ সম্পাদক 

১৯৫৭-৬০ 

  • রফিকুল্লাহ চৌধুরী -সভাপতি 

১৯৫৭-৫৮ 

  • কাজী অজহারুল ইসলঅম -সাধারণ সম্পাদক 

১৯৫৮-৫৯-৬০ 

  • শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন -সাধারণ সম্পাদক 

১৯৬০-৬৩ 

  • শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন -সভাপতি
  • শেখ ফজলূল হক মনি -সাধারণ সম্পাদক 

১৯৬৩-৬৫ 

  • কে, এম, ওবায়দুর রহমান -সভাপতি
  • সিরাজুল আলম খান -সাধারণ সম্পাদক 

১৯৬৫-৬৬-৬৭ 

  • মাজহারুল হক বাকী -সভাপতি
  • আবদুর রাজ্জাক -সাধারণ সম্পাদক 

১৯৬৭-৬৮ 

  • ফেরদৌস আহমদ কোরেশী -সভাপতি
  • আবদুর রাজ্জাক -সাধারণ সম্পাদক 

১৯৬৮-৬৯ 

  • আবদুর রউফ -সভাপতি
  • খালেক মোহাম্মদ আলী -সাধারণ সম্পাদক 

১৯৬৯-৭০ 

  • তোফায়েল আহমদ -সভাপতি
  • আ,স,ম, আবদুর রব -সাধারণ সম্পাদক 

১৯৭০-৭২ 

  • নূরে আলম সিদ্দিকী -সভাপতি
  • শাহজাহান সিরাজ -সাধারণ সম্পাদক