ভাষা আন্দোলনের আরেক পর্যায়

ফন্ট সাইজ:
     পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম ছাত্রলীগ গঠনের অব্যবহিত পরই ৮ই জানুয়ারি (১৯৪৮) সলিমুল্লাহ মুসলিম হল সংসদেও সহ-সভাপতি শফিউল আজম, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ আহবায়ক নঈমুদ্দিন আহমদ, আবদুর রহমান চৌধুরী, আবদুল মতিন খান চৌধুরী, মোঃ তোয়াহা ও আমি ছাত্রদের বিভিন্ন সমস্যা, মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনার জন্য মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সহিত তাঁহার বাসভবন বর্ধমান হাউসে সাক্ষাৎ করি। এই বৈঠকে পূর্ববঙ্গ সরকারের শিক্ষা দফতরের সচিব এফ, এ, করিম উপস্থিত ছিলেন। তাঁহার সহিত বাংলা ভাষার ইতিহাস ও তত্ত্ব নিয়া তর্ক-বিতর্কে শফিউল আজম সাহেব বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করিয়া ছাড়িলেন। উল্লেখ্য যে, ভারত বিভাগের পর পরই ঢাকায় আসিবার পর হইতেই জনাব ফজলে করিম (শিক্ষা দফতরে সেক্রেটারী) সলিমুল্লাহ হল মসজিদে নামাজ আদায়ের জন্য আসিতেন এবং মোনাজাতের পর ইসলামী তাহজীব ও তমদ্দুন বিষয়ে উর্দু ভাষায় সবিস্তারে ব্যাখ্যা করিতেন। এই ধরণের এক শ্রেনীর অবাঙ্গাল উর্দুভাষী বাঙ্গালী মুসলমানদিগকে ইসলামী তাহজীব ও তমদ্দুন শিক্ষা দিবার ব্যাপারে অতিগরজী মানসিকতাই বাংলা ভাষা-ভাষী মধ্যবিত্ত মুসলমান শ্রেণীর অসন্তুষ্টি ও বিরাগের অন্যতম কারণ। যাহা হউক, সেইদিন আমাদের প্রতিনিধি দলকে খাজা নাজিমুদ্দিন এই মর্মে আশ্বাস দিয়াছিলেন যে, বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারী ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যমে ও কেন্দ্রে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রীয় ভাষা করা হইবে।
      কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক ডাক টিকিট, মনিঅর্ডার ফরম, মুদ্রা এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশন, সেনা বিভাগ, নৌ-বিভাগ ও বিমান বিভাগের পরীক্ষায় উর্দুর যথেচ্ছা ব্যবহার এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার সম্পূর্ণ অনুল্লেখ ছাত্র সমাজকে অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ করিয়া তুলিল। এই তপ্ত হাওয়ায় অনুষ্ঠিত সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আমরা সরকার বিরোধী বক্তব্যেও মাধ্যমেই সরকার সমর্থন নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ (নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের পরিবর্তিত নাম) প্রার্থী রেজাউর রহমানকে পরাজিত করিয়া সৈয়দ নজরুল ইসলামকে বিপুল ভোটে হল সংসদ সহ-সভাপতি পদে জয়যুক্ত করি। পরিতাপের বিষয়, নির্বাচিত হওয়ার পরেও সরকারী রক্তচক্ষু ও সরকারী কোপানলে পতিত হওয়ার ভয়ে সৈয়দ নজরুল ইসলাম সক্রিয়ভাবে কোন আন্দোলনে আমাদিগকে সাহায্য-সহায়তা করেন নাই; উপরন্তু তিনি পাকিস্তান সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় প্রতিযোগিতা করিয়া সরকারের আয়কর অফিসার (Income Tax Officer) পদে যোগ দিয়াছিলেন। অবশ্য পরবর্তীকালে চাকুরী ত্যাগ করিয়া আইন ব্যবসায় যোগদান করেন এবং উত্তরকালে বাংলাদেশ সরকারের উপরাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন। নব নির্বাচিত ছাত্র সংসদের অভিষেক অনুষ্ঠানে ২রা ফেব্র“য়ারি (১৯৪৮) ভাষণ দানকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু ভাষী ভাইস চ্যা›েসলর ডঃ মাহমুদ হাসান বাংলাকেই শিক্ষার মাধ্যম করার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বারোপ করেন। তাহার উক্ত অভিনন্দনযোগ্য মন্তব্যে আমাদের মনোবল দ্বিগুণ হইল।
      ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সরকার বিরোধী প্রগতিশীল নেতা মোঃ তোয়াহা তাঁহার মনোনীত কেবিনেটসহ বিপুল ভোটাধিক্যে জয়লাভ করিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে যথাক্রমে বাবু অরবিন্দ ঘোষ ও জনাব গোলাম আযম নির্বাচিত হন।
      পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠিত হইবার পর হইতে সংগঠনটিকে নেতৃস্থানীয় সংগঠনে পরিণত করিবার মানসে আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করি। তাই ২৬শে ফেব্র“য়ারি হইতে ৬ই মার্চ অবধি কলিকাতায় অহূত দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় যুব সম্মেলনে শর্তাধীনে প্রাথমিকভাবে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিঃ
      প্রথমতঃ খাজা নাজিমুদ্দিন সরকার সমর্থন শাহ আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ (উত্তরকালে নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ) সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পাইলে, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করিবে না; দ্বিতীয়তঃ পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ মনোনীত প্রতিনিধিই সম্মেলনে পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের নেতা হইবেন। শর্ত পরিপূরিত হইল। তদনুযায়ী পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কমিটির সদস্য আবদুর রহমান চৌধুরীই পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দান করিলেন। ইহাতে আমাদের সংগঠনের মর্যাদা বৃদ্ধি পাইল এবং ইহাই ছিল আমাদের কাম্য। প্রতিনিধিদলের অন্যান্য সদস্য ছিলেন, জনাব শাসসুল হক (পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ) শহীদুল্লাহ কায়সার (পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশন) মিসেস লিলি খান ও মিস লুলু বিলকিস বানু (মহিলা অবজার্ভার) এবং মিস লায়লা আরজুমান্দ বানু (আমন্ত্রিত)।