১১ই মার্চের (১৯৪৮) হরতাল

ফন্ট সাইজ:

 

      গণপরিষদের অধিবেশনে ১৯৪৮ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি উর্দু ও ইংরেজীর সহিত গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম ভাষা হিসাবে ব্যবহারের স্বপক্ষে দাবী উত্থাপন করেন বাবু ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত। এই অপরাধে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খান ও অন্যান্য বক্তা অসৌজন্যমূলক ভাষায় তাঁহাকে আক্রমণ করেন। ঢাকায় পুনঃপুনঃ দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিয়া পূর্ববঙ্গের উজীরে আলা খাজা নাজিমুদ্দিন গণপরিষদ অধিবেশনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করিবার পক্ষে ওকালতি করেন। ইহার প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানের ৪ কোটি ৪০ লক্ষ অধিবাসীর মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় সংকল্পবদ্ধ তরুণ ছাত্র সমাজ বিভিন্ন শিক্ষায়তন হইতে ২৬শে ফেব্রুয়ারি (১৯৪৮) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমবেত হয় এবং অধ্যাপক আবুল কাসেমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বাবু ধীরেন্দ্র নাথ দত্তকে অভিনন্দন জানায়। শুধু তাই নয়, খাজা নাজিমুদ্দিনের এই উক্তির প্রতিবাদে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে সাংগঠনিক রূপদান করিবার প্রয়োজনে ২৭শে ফেব্রুয়ারি (১৯৪৮) তমদ্দুন মজলিসের রশিদ বিল্ডিংস্থ অফিসে অধ্যাপক আবুল কাসেমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সলিমুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র জনাব শামসুল আলমকে আহবায়ক নিয়োগ করিয়া আমরা Committee of Action for state Language অর্থাৎ রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদ গঠন করি। ইতিপূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রসায় বিভাগের অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁইয়া তমদ্দুন মজলিসের রাষ্ট্রভাষা সাব-কমিটির আহবায়ক ছিলেন। একই বৈঠকে ১১ই মার্চ হরতাল, সভা ও বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচী পালনের মাধ্যমে সমগ্র দেশব্যাপী ‘‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম বিদস‘‘ ঘোষণা করা হয়। 
       রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকে ব্যাপক প্রতিনিধিত্বশীল করিবার নিমিত্তে ২রা মার্চ (১৯৪৮) ফজলুল হক হলে অনুষ্ঠিত সভায় পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, গণ-আজাদী লীগ, পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক ইয়ুথলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ছাত্র সংসদ এবং কলেজ প্রতিনিধিবৃন্দকে লইয়া পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধিত্বশীল কমিটি গঠন করা হয় পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদে সোহরাওয়ার্দী সমর্থক মুসলিম লীগ দলীয় সদস্যদের তরফ হইতে জনাব তফাজ্জল আলী, জনাব আলী আহমদ খান ও মিসেস আনোয়ারা খাতুন কমিটির সহিত যোগাযোগ রক্ষা করিতেন। তবে, একমাত্র মিসেস আনোয়ারা খাতুনই ১১ই মার্চেও হরতাল সাফল্যমন্ডিত করিবার জন্য সর্বোতভাবে সহায়তা করিয়াছেন। ১১ই মার্চ আয়োজিত সাধারণ ধর্মঘট সাফল্যমন্ডিত করিবার আহবান জানাইয়া ৩রা মার্চ ঢাকা হইতে নিম্নোক্ত ব্যক্তিবর্গ এক বিবৃতি দেন। উহা কলিকাতার ইংরেজী দৈনিক অমৃতবাজারে প্রকাশিত হয়। এই বিবৃতি দানকারীরা হইলেন, জনাব শামসুল আলম, আহবায়ক, রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ; অধ্যাপক এম, এ, কাসেম, সেক্রেটারী, তমদ্দুন মজলিস, জনাব নঈমুদ্দিন আহমদ, আহবায়ক, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ; জনাব তফাজ্জল আলী এম এল এ, মিসেস আনোয়ারা খাতুন এম এল এ, সম্পাদিকা, পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সমিতি; জনাব আলী আহমদ খান এম এল এ, জনাব কমরুদ্দিন আহমদ, প্রক্তন অফিস সম্পাদক, ঢাকা জিলা মুসলিম লীগ; জনাব শামসুল হক, সংগঠক, মুসলিম লীগ (পূর্ববঙ্গ); জনাব এ, সালাম সম্পাদক, দৈনিক পূর্ব পাকিস্তান; জনাব এস, এম, বজলুল হক, সম্পাদক, কাফেলা; জনাব সৈদয় নজরুল ইসলাম, সহ-সভাপতি, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল; জনাব মোঃ তোয়াহা,     সহ-সভাপতি ফজলুল হক মুসলিম হল; জনাব অলি আহাদ আহবায়ক, ঢাকা নগর মুসলিম ছাত্রলীগ; জনাব আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী, সম্পাদক ইনসান। বিবৃতির কিয়দংশ নিম্নে দেওয়া হইলঃ 
      “For some time past considerable agitation is going on to make Bengali as the (i) official language of East Pakistan, (ii) as one of the State Languages of the Central Pakistan, (iii) as one of the languages of Pakistan consembly” 
      “Bengali is the mother tongue of the two third population of the whole of Pakistan. It is a matter of shame that agitation has become necessary to establish this language in the life of the state………. To record a protest against these, the East Pakistan Muslim Students League & the Tamadum Majlish have declared a general strike on Thursday, March 11. We appeal to all political cultural and educational institutions & all students & citizens  irrespective of cast & creed of East Pakistan to observe this strike according to the programme of this joint State Language sub-committee peacefully & with discipline……………..Our agitation should not be mistaken in Central Pakistan & in the consembly. We believe that if instead of treading down this democratic demand, the Bengali Language is conceded, it will be the basis of Unity of East & West Pakistan”. 
     অর্থাৎ ‘‘(১) বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক ভাষা, (২) কেন্দ্রীয় পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা ও (৩) পাকিস্তান গণপরিষদের অন্যতম ভাষা করিবার দাবীতে কিছুকাল যাবৎ ব্যাপক আন্দোলন চলিতেছে। 
      ‘‘বাংলা সমগ্র পাকিস্তানের দুই-তৃতীয়াংশ অধিবাসীর মাতৃভাষা। লজ্জার বিষয় যে, এই ভাষাকেই রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত করিতে আন্দোলনের প্রয়োজন হইয়া পড়িয়াছে........... ইহার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করিবার জন্যই পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমদ্দুন মজলিস ১১ই মার্চ রোজ বৃহস্পতিবার সাধারণ হরতাল ঘোষণা করিয়াছে। সংযুক্ত রাষ্ট্রভাষা সাব-কমিটির কর্মসূচী অনুযায়ী শান্তিপূর্ণভাবে ও শৃঙ্খলার সহিত ধর্মঘট পালন করিবার জন্য আমরা সকল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাঙ্গন এবং পূর্ব পাকিস্তানের জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল ছাত্র ও নাগরিকদেও প্রতি আবেদন জানাইয়াছি। ........... কেন্দ্রীয় পাকিস্তান ও গণপরিষদে আমাদের আন্দোলনকে ভুল বুঝা উচিত হইবে না। এই গণতান্ত্রিক দাবীকে দমন না করিয়া বাংলা ভাষাকে মানিয়া লইলে, আমরা বিশ্বাস করি ইহাই হইবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের একতার ভিত্তি।’’ 
     রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ৪ঠা ও ৫ই মার্চেও সভায় ১১ই মার্চের সাধারণ হরতালকে সফল করিবার জন্য বিস্তারিত কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়। ১০ই মার্চের সভায় সরকার কতর্ৃৃক ১৪৪ ধারা জারি করা হইলে, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হইবে কি হইবে না ইহা লইয়া বিতর্ক উঠিলে, আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানাইয়া দিয়াছিলাম যে, ‘‘ আমরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করিবই, সরকারী কোন বিধি নিষেধের নিকট আত্মসমর্পণ করিয়া আন্দোলন প্রত্যাহার করিব না।’’ সেই সভায় আমি ইহাও বলিয়াছিলাম যে, ‘‘যাহারা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি বা আন্দোলনের দোহাই পাড়েন, তাঁহাদিগকে পুনর্বিবেচনা করিতে আমি অনুরোধ জানাই।’’ এই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রত্যেকটি ছাত্রাবাসের (হল) দেওয়ালে দেওয়ালে স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা টাঙ্গাইয়া দেওয়া হইল। ১১ই মার্চ সাধারণ হরতাল আহবানের সংবাদ পত্রিকায় পাঠ করিয়া আন্দোলনে অংশগ্রহণ করিবার নিমিত্তে শেখ মুজিবুর রহমান গোপালগঞ্জ হইতে ১০ই মার্চ রাত্রে ঢাকায় আসেন।
      সকাল নয়টা বাজিবার সঙ্গে সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান, আবদুল ওয়াদুদ এবং আমি সেক্রেটারিয়েট ভবনের প্রথম গেটে উপস্থিত হই তখনও সেক্রেটারিয়েটের কর্মচারীবৃন্দ আসেন নাই। ইতিমধ্যে তরুণ জননেতা জনাব শামসুল হক কয়েকজন কর্মীসহ আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল, তিন হইতে পাঁচজন সেক্রেটারিয়েটের গেটগুলির প্রত্যেকটিতে পিকেটিং করিব এবং এক গ্র“প ধরা পড়িলে পরবর্তীতে গ্রুপ পিকেটিং করিবে। পূর্বাহ্ন বেলা ৯-৩০ মিনিট হইতে ১০ টার মধ্যে সেক্রেটারিয়েটগামী কর্মচারীদিগকে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে বাধা দিতে শুরু করিলাম। সিটি এস, পি, আবদুল গফুরের হুকুমে পুলিশ তৎপর হইয়া উঠিল। ইংরেজ ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিম মিঃ চ্যাথাম লাঠি চালনার আদেশ দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে শামসুল হক ও তাঁহার গ্রুপের কতিপয় কর্মী গ্রেফতার হইলেন।
      ইহার পর শেখ মুজিবুর রহমান আর এক গ্রুপসহ গ্রেফতার হইলেন। পুলিশ বাহিনী অধৈর্য হইয়া উঠিল এবং বেপরোয়া লাঠি চালনা আরম্ভ করিল। জনাব আবদুল ওয়াদুদ ও আমি পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত হই। পুলিশ আমাদের আহত অবস্থায়ই জীপে বস্তাবন্দী করিয়া ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়া তথাকার হাসপাতালে ভর্তি করাইল। পুলিশের আঘাত ও ধ্বস্তাধ্বস্তির সময় আমার হাত ঘড়িটি উধাও হইয়া গিয়াছিল। পুলিশের লাঠি-পিটায় প্রায় জ্ঞানহারা অবস্থায় উত্তেজিত কণ্ঠে এ্যাংলো ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্জেন্টকে লক্ষ্য করিয়া শাসাইয়া বলিয়াছিলাম ‘‘ ক্ষমতায় আসিলে তোমাকে দেখাইয়া দিব’’। প্রত্যুত্তরে সার্জেন্টটি  বলিল, “Whats of that to me whether Nazimuddin stays or Suhrawardy comes. Whatever the Govt. I shall carry on.’’ সন্ধ্যা নাগাদ ৬৯ জনকে গ্রেফতার করিয়া সরকার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক করিল।
      কারাগার একটি ভিন্ন জগত। যত অসৎ চরিত্র ব্যক্তিরাই কারাগারবাসী। আইন-শৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন ও দুঃসাধ্য। কারাগারে আগন্তকদের প্রথমে ‘ফাইল-গাইল-ডাইল’ সসম্যার ধাক্কায় মুর্চ্ছা যাইবার উপক্রম হইতে হয়। ১৩ই মার্চ সন্ধায় আমাদের ওয়ার্ডের দরজা বন্ধ করিবার পূর্বে বন্দী সংখ্যা গুণিবার বিধি অনুযায়ী জমাদার আমাদিগকে শৃঙ্খলার সহিত ফাইলে বসিতে অনুরোধ জানাইল। তরুণ ছাত্র বন্দীদের অত ঝামেলা পোহাইবার মত মানসিক প্রস্তুতি ছিল না। জমাদার তিন তিনবার গুণিয়া তিনটি ভিন্ন সংখ্যা পায়। সে স্বাভাবিকভাবেই বিরক্ত হইয়া মেজাজ দেখায়। ইহাতে উত্তেজিত ছাত্রবন্দীগণ তাহাকে প্রহার করিতে উদ্যত হইলে জমাদার এক লাফে ওয়ার্ডের বাহিরে গিয়া সংকেত বাঁশি বাজাইতেই সমগ্র জেলে পাগলা ঘন্টি পড়ে। ইহা এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। সাধারণতঃ পাগলা ঘন্টি বাজার সঙ্গে সঙ্গে কারাগার রক্ষী বাহিনী ও বাহির হইতে আগত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কারাগার অভ্যন্তরের সংক্ষুব্ধ এলাকায় বন্দীদের যথেচ্ছ অমানুষিক নির্যাতন শুরু করে। কোন কোন সময় নিরস্ত্র বন্দীদের উপর গুলী চালনা করা হয়। পাগলা ঘন্টি পড়িবার সাথে সাথে তাই দরদী ও বুদ্ধিমান কার্যরত টহলদার সিপাহীটি আমাদের দ্বিতীলস্থ ওয়ার্ডটি ত্বরিৎ তালাবদ্ধ করিয়া অকুস্থল হইতে অন্যত্র সরিয়া পড়িয়াছিল। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় কারাগার সুপারিন্টেনডেন্ট ইংরেজ সন্তান মিঃ বিল আগত উন্মত্ত বাহিনীকে স্বস্ব স্থানে ফিরিবার আদেশ দান করিয়া আমাদের কামরায় প্রবেশ করিলেন। মিঃ বিল বন্দী সংখ্যা গণনার প্রয়োজনীয়তা আমাদিগকে ব্যাখ্যা করিয়া কারাগার আইন-কানুন পালনের গুরুত্ব সম্বন্ধে আমাদের বিনয়ের সহিত অবহিত করিলেন। কারাধ্যক্ষ মিঃ বিন যদি বিচক্ষণতার সহিত প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন না করিতেন, তাহা হইলে আমাদের বন্দীশালায় সেইদিন লঙ্কাকান্ড ঘটিত এবং ছাত্র বন্দীদের উপর নির্যাতনের কোন ইয়ত্তা থাকিত না।
      ১২ই মার্চের পত্রিকা পাঠে অবগত হইলাম যে, শেরেবাংলা এ, কে, ফজলুল হক ১১ই মার্চ পুলিশী হামলার প্রতিবাদে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদ হইতে পদত্যাগের আহবান জানাইয়াছেন। কিন্তু কৌতুকের বিষয়, ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া অবধি নিজেই পদত্যাগ করেন নাই। এই ধরনের বহু ঘটনা জীবনে বহুজনের ব্যাপারে বহু বারই প্রত্যক্ষ করিয়াছি। দেখিয়াছি, একশ্রেণীর নেতা গদীর অন্বেষণে বিভিন্ন সংকটময় মুহূর্তে দেশবাসীকে প্রতারিত করেন এবং স্বীয় উদ্দেশ্য চরিতার্থ করিবার প্রয়াস পান। 
      ১১ই মার্চ, পুলিশী নির্যাতন ও আমাদের কারান্তরালে নিক্ষেপের ফলে সমগ্র ঢাকা নগরীর রাজপথ মিছিলে মিছিলে, বিভিন্ন ধ্বনি ও প্রতিধ্বনিতে প্রকম্পিত হইয়া উঠে। ১৫ই মার্চ পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের বাজেট অধিবেশন চলাকালে ভীত সন্ত্রস্ত খাজা নাজিমুদ্দিন সরকার রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদের সদস্যদের সহিত এক বৈঠকে মিলিত হন। উভয়পক্ষ এক খসড়া চুক্তি প্রণয়ন করেন। চুক্তি পত্রটি ১১ই মার্চ ধৃত বন্দীগণ কর্তৃক অনুমোদনের জন্য অধ্যাপক আবুল কাসেম ও জনাব কমরুদ্দিন আহমদ কারান্তরালে আমাদের সহিত বৈঠকে মিলিত হইলেন। জনাব শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান ও আমি বন্দীগণের পক্ষ হইতে খসড়া চুক্তির শর্তাবলী পরীক্ষা নিরীক্ষার পর নাজিমুদ্দিন ও রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদের পক্ষ হইতে জনাব কমরুদ্দিন আহমদ স্বাক্ষর করেন। নিম্নে চুক্তিনামাটি দেওয়া হইলঃ 
১। ২৯ শে ফেব্রুয়ারি (১৯৪৮) হইতে বাংলা ভাষার প্রশ্নে যাহাদিগকে গ্রেফতার করা হইয়াছে, তাহাদিগকে অবিলম্বে মুক্তিদান করা হইবে। 
২। পুলিশী অত্যাচারের অভিযোগ সম্বন্ধে উজীরে আলা স্বয়ং তদন্ত করিয়া এক মাসের মধ্যে এই বিষয়ে বিবৃতি দিবেন। 
৩। ১৯৪৮ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদে বেসরকারী আলোচনার জন্য নির্ধারিত তারিখে বাংলাকে অন্যতম রাষ্টভাষা করিবার এবং ইহাকে পাকিস্তান গণপরিষদে এবং কেন্দ্রীয় চাকুরী পরীক্ষা দিতে Central services Examination উর্দুর সম-মর্যাদাদানের নিমিত্তে একটি বিশেষ প্রস্তাব উত্থাপন করা হইবে। 
৪। পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদে এপ্রিল মাসে একটি প্রস্তাব তোলা হইবে যে, প্রদেশের অফিস-আদালতের ভাষা ইংরেজীর স্থলে বাংলা হইবে। 
৫। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কাহারো বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে না। 
৬। সংবাদপত্রের উপর হইতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হইবে। 
৭। ২৯ শে ফেব্রুয়ারি হইতে পূর্ববঙ্গের যে সকল অংশে ভাষা আন্দোলনের কারণে ১৪৪ ধারা জারি করা হইয়াছে, তাহা প্রত্যাহার করা হইবে। 
৮। সংগ্রাম পরিষদের সহিত আলোচনার পর আমি এই ব্যাপারে, নিঃসন্দেহ হইয়াছি যে, এই আন্দোলন রাষ্ট্রের দুশমনদের দ্বারা অনুপ্রাণিত নয়। 
চুক্তি মোতাবেক ঐদিন (১৫ই মার্চ) অপরাহ্নেই আমাদের মুক্তির আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট মামলার অজুহাতে জনাব শওকত আলী ও কাজী গেলাম মাহবুব এবং কমিউনিস্ট পার্টি সদস্যভুক্ত অজুহাতে বাবু রনেশ গুপ্তকে কারামুক্তির আদেশ দেওয়া হয় নাই। আমারা উপরোক্ত বন্দীগণ ব্যতীত কারামুক্ত হইতে অস্বীকৃতি জানাইলে, সরকার কালবিলম্ব না করিয়া তাহাদিগকেও আমাদের সহিত মুক্তিদানের আদেশ জেল গেটে পাঠাইয়া দেন। মুক্তির পর ফজলুল হক হলে আমাদিগকে সংবর্ধনা দানকালে কতিপয় ছাত্রের মধ্যে এক চাপা অসন্তোষ লক্ষ্য করিলাম। তাহারা ছিলেন সশস্ত্র বিপ্লবে বিশ্বাসী-আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশ্য কর্মী। তাহাদের পার্টির দায়িত্বই ছিল আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে বিভেদ, ভুল বুঝাবুঝি ও কলহের বীজ বপন করা। গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের মধ্যে বা বিরুদ্ধে বিভেদ সৃষ্টি করিতে পারিলেই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সাধারণ জনতাকে ভ্রান্তপথে পরিচালিত করিয়া ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে প্ররোচিত করা সহজ হয়। আন্দোলনে যাহাতে ফাটল বা অনৈক্য সৃষ্টি হইতে না পারে, সেই জন্য আমরা ১৬ই মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিলতলায় এক সাধারণ ছাত্রসভা আহবান করি। সদ্য কারামুক্ত শেখ মুজিবুর রহমান সভায় সভাপতিত্ব করেন। পূর্ববঙ্গ কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম ও কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফেডারেশন কর্মীবৃন্দ এই সাদারণ ছাত্র সভাকে বানচাল করিতে নানাভাবে আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। কিন্তু সাধারণ ছাত্রের সচেতন সংগ্রামী চেতনা উপরোক্ত প্রয়াসকে ব্যর্থ করিয়া দেয়। যাহা হউক, উক্ত সভায় পুলিশী জুলুম তদন্তের জন্য তদন্ত কমিশন গঠন, চুক্তিনামার ৩ ও ৪ ধারা কার্যকর করিবার জন্য আইন পরিষদ অধিবেশনে নিদিষ্ট তারিখ ধার্য ও পাকিস্তান গণপরিষদ সদস্যবর্গের ও পূর্ববঙ্গের মন্ত্রিসভার পদত্যাগ দাবী জানাইয়া প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবগুলি পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের হস্তে প্রদান করিবার জন্য সভার অপর এক প্রস্তাবে আমার উপরে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই মর্মে আমি উক্ত প্রস্তাবগুলি যথাসময়ে মুখ্যমন্ত্রীর নিকট প্রদান করি।  
      উল্লেখ্য যে, এই সভা হইতে এক বিক্ষোভ মিছিলসহ আমরা পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদ ভবন (জগন্নাথ হল মিলনায়তন) অভিমুখে যাত্রা করিয়াছিলাম। মিছিলের ধ্বনি ছিল ‘‘ পাকিস্তান-জিন্দাবাদ‘‘ ‘‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’’ ’’উর্দু বাংলা ভাই ভাই’’ ‘‘বাংলার সহিত উর্দুর বিরোধ নাই’’। যাহা হউক, পরিষদ ভবন গেটে আমরা মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সাক্ষাৎ প্রার্থী হইলে কয়েক মিনিটের মধ্যে স্থান পরিত্যাগ করিতে সতর্কবাণী উচ্চারণ করিয়া পুলিশ বাহিনী হিংস্র মূর্তি ধারণ করে ও আমাদের  উপর লাঠিচার্জ আরম্ভ করিয়া দেয়। লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করিবার অন্য একটি উদ্দেশ্য ছিল ঘেরাওকৃত আইন পরিষদ সদস্যদের মুক্ত করা মন্ত্রীদের বাড়ী যাইবার পথ সুগম করা। মিছিলকারীরা ছত্রভঙ্গ হইয়া কিছু অংশ ইঞ্জিনিয়ারিং করেজ প্রাঙ্গনে প্রবেশ করে এবং কিছু অংশ সলিমুল্লাহ হল ও জগন্নাথ হলের মধ্যবর্তী মাঠে জমায়েত হয়। সন্ধ্যার পর পুনরায় কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করিলে আমরা ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়ি ও পূর্ববঙ্গে তদানীন্তন জি, ও, সি, আইয়ুব খানের (পরবর্তীকালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট) জবানীতে জানিতে পারি, উজীরে আলা পরিষদ ভবন ত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছেন। অর্থাৎ সেই দিনের সেই অবস্থা হইতে পরিত্রাণের নিমিত্ত ভীত মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন সৈন্য বাহিনীর তলব করিয়াছিলেন। 
      নাজিমুদ্দিন সরকারকে সমালোচনা করিবার কারণে সোহরাওয়ার্দী প্রতিষ্ঠিত ও কলিকাতা হইতে প্রকাশিত জনপ্রিয় দৈনিক ইত্তেহাদের পূর্ববঙ্গে প্রবেশ ১৯৪৭ সালেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হইয়াছিল। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে দৈনিক ইত্তেহাদের অনন্য অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকিবে। এই প্রসঙ্গে কলিকাতা হইতে প্রকাশি দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা, দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক স্বাধীনতার বলিষ্ঠ ভূমিকাও পূর্ববঙ্গ সরকারের রোষের কারণ হওয়ায় এবং ১৩ই মার্চ দৈনিক অমৃতবাজার, দৈনিক আনন্দবাজার ও দৈনিক স্বাধীনতা পূর্ববঙ্গে প্রচার নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। যুগান্তর ইতিপূর্বেই সরকারী কোপানলে পতিত হইয়াছিল। 
       ১৬ই মার্চ পরিষদ ভবনে বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশী জুলুমের প্রতিবাদে ১৭ই মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের  বেলতলায় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহবায়ক নঈমুদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এক সভার আয়োজন করা হয়। সভার প্রারম্ভেই পূর্ববঙ্গ কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশ্য নেতা অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম কতিপয় সমর্তকদের সহায়তায় গোলযোগ সৃষ্টির  প্রাণপণ চেষ্টা করেন। ইহা নাকি তাহাদের বিপ্লবের স্বার্থে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কর্মসূচীভুক্ত। তাহারা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিত্ব দাবী করিতেছিলেন। দ্বিতীয়তঃ বিপ্লবের নেশার ঘোরে গণ-বিপ্লব দ্বারা সরকারের উৎখাতের প্রয়োজনে ধ্বংসাত্মক কর্মসূচী দাবী করিতেছিলেন। তরুণ নেতা শামসুল হক ও কাজী গোলাম মাহবুবের বক্তৃতার পর শেখ মুজিবুর রহমান ও আবদুর রহমান চৌধুরীর পীড়াপীড়িতে আমাকে সভাপতির আহবানে বক্তৃতা দিতে হইয়াছিল। সেই দিনের সেই সবার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রয়াসকে শক্ত ভাষায় আক্রমণ করিয়া বলিয়াছিলাম,’’ যাহারা কলিকাতায় সদ্য অনুষ্ঠিত ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে অংশ গ্রহণ করিয়া বিপ্লবের অলীক স্বপ্নের বার্তা বহন করিয়া আনিয়াছেন এবং ’ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়’ বলিয়া প্রকাশ্যে গণবিদারী আওয়াজ তুলিতেছেন, তাহারা দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী করে না। সুতরাং ’কমিটি অব এ্যাকশন’ বা কর্ম পরিষদে তাহাদের কাহাকেও গ্রহণের প্রশ্নই উঠে না। আমরা মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন করি, ছাত্র সমস্যা সমাধানের আন্দোলন করি, সরকারের গণবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াই, কিন্তু দেশের আজাদীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করি না।’’ 
       আমার বক্তৃতার সমর্থনে সাধারণ ছাত্রদের একাত্মতা লক্ষ্য করিয়া গোলযোগ প্রিয় কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থকগণ সভা হইতে বিষন্ন বদনে পিছটান দিলেন। সভায় ১৬ তারিখ অপরাহ্নে পরিষদ ভবন সম্মুখে পুলিশী জুলুমে আহতদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করিয়া পুলিশী জুলুমকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করা হয়। জাতির জনক কায়েদে আযমের আসন্ন পূর্ববঙ্গ সফরকে স্বাগত জানাইয়া তাঁহাকে যথাযথ সংম্বর্ধনা দানের আহবানের মধ্য দিয়া সভাপতি সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন। 
      ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে পরলোকগত সাংবাদিক সাপ্তাহিক ইনসানের সম্পাদক মরহুম আবদুল ওয়াহেদের ভুমিকা লিপিবদ্ধ করা আমার পবিত্র দায়িত্ব বলিয়া আমি মনে করি। কারণ, অনেকেই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ না করিয়াও অধুনা নানাভাবে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করিয়া ইতিহাসে চিহ্নিত থাকিবার লোভে বিভিন্ন বন্ধু-বান্ধবের কলমের আঁচরে আনুকুল্য কুড়াইতেছেন। করাচীর কুচক্রী ও তাহাদের দোসর বঙ্গ সন্তাদের ন্যাক্কারজনক প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার মরণপণ সংগ্রামে শাসকচক্রের রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করিয়া সর্বপ্রকার অত্যাচার, নির্যাতনকে তুচ্ছ জ্ঞান করিয়া তরুণ সমাজকে ঝাঁপাইয়া পড়িতে জনাব ওয়াহেদ বলিষ্ঠ তেজোদ্দীপক সম্পাদকীয়ের মাধ্যমে উদাত্ত আহবান জানাইতেন। তাঁহার সম্পাদকীয় সংগ্রামী ও সচেতন তরুণ ছাত্র সমাজকে আত্মত্যাগের মন্ত্রে দারুণভাবে উৎসাহিত ও উদ্ধুদ্ধ করিয়াছিল। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠান দিবস ৮ই মার্চ, খেলাধুলা প্রতিযোগিতার ফাঁকে ফাঁকে সমবেত ছাত্র, শিক্ষক ও দর্শকদিগকে ১১ই মার্চ রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন দিবসের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করি এবং সংগ্রামে অংশগ্রহণ করিতে অনুপ্রাণিত করিবার মানসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জিমনেসিয়াম মাঠে মাইকের মাধ্যমে জনাব ওয়াহেদ কর্তৃক লিখিত সম্পাদকীয় পুনঃ পুনঃ পাঠ করিয়া শুনাইয়াছিলাম। সম্পাদক ওয়াহেদ সাহেব স্বয়ং জিমনেসিয়াম খেলার মাঠে আমাদের সাথে ছিলেন। অতি তরুণ বয়সেই তিনি ইহধাম ত্যাগ করিয়া পরপারে পাড়ি জমাইয়াছেন। আজও ব্যথাবিধুর হৃদয়ে তাঁহাকে স্মরণকরি।