১৯৪৮ সালের ২১মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তিন লক্ষ লোকের সমাবেশে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলীর জিন্নাহর ভাষণঃ (অনুবাদ)

ফন্ট সাইজ:
আসসালামু আলাইকুম, 
আমি প্রথমে স¤¦র্ধনা আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যানের মাধ্যমে ঢাকাবাসী এবং প্রদেশের সবাইর নিকট, আমাকে এই সম্মান জানানোর জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। পূর্ব বাংলায় আমার এই সফর, আমার জন্য বড় আনন্দদায়ক মনে হচ্ছে। পূর্ববাংলা পাকিস্তানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ অংশে পৃথিবীর এক বিরাট সংখ্যক মুসলমান, একটা নির্দিষ্ট জায়গার ভিতরেই, অবিচ্ছিন্নভাবে বাস করছে। এই অঞ্চলে সফর করার প্রচন্ড আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ কারণে, আমার  সফরের কিছুটা দেরী হয়ে গেছে। 
 
আপনারা অবশ্যই কতগুলি জরুরী বিষয় জানেন যে, ভারত ভাগের সঙ্গে সঙ্গে পাঞ্জাবে কী ঘটনা ঘটে গেছে। পূর্ব পাঞ্জাব, দিল্লী এবং এর নিকটবর্তী এলাকাগুলি থেকে, ওখানে বসবাসরত লাখ লাখ মুসলমানদেরকে, তাদের জায়গা-জমি, ঘরবাড়ী থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব ভাগ্যহত মুসলমানদের বাঁচিয়ে রাখা, আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা এবং পুনর্বাসনের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে আমাদের ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে, এরূপ ঘটনা খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে যে, একটি নতুন রাষ্ট্রকে এত বড় কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আল্লাহর মেহেরবাণীতে, সদ্য প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের পক্ষে, এই বিরাট এবং কঠিন সমস্যা অত্যন্ত যোগ্যতা ও সাহসের সাথে মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে। আমাদের দুশমনদের মনের বাসনা ছিল, পাকিস্তান জন্মের সাথে সাথেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক। শক্রদের কামনাকে মিথ্যা প্রমান করে, তাদের চাপিয়ে দেওয়া কঠিন সমস্যা সমাধানে পাকিস্তান সক্ষম হয়েছে এবং পাকিস্তান দিনের পর দিন শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান টিকে থাকার জন্যই এসেছে এবং যে উদ্দেশ্য নিয়ে এদেশটির জন্ম হয়েছে, আমরা সেই লক্ষ্যপানে কাজ করে যাব। 
 
এই সম্বর্ধনা সভায় যে সব বক্তৃতা হলো, তাতে আপনারা বলেছেন যে, বিপুল সম্ভাবনাময় এই প্রদেশের কৃষিখাত এবং শিল্পখাতকে জোরদার করে তুলতে হবে। প্রদেশের সকল তরুণ, যুবক এবং নারীদের যোগ্য নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দানের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের সশস্ত্রবাহিনীতে এ অঞ্চলবাসী যেন যথাযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে, সে অবস্থাকে নিশ্চিত করতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দর উন্নয়নের কথা বলেছেন। পাকিস্তানের সাথে এই প্রদেশের যোগাযোগ সহজ এবং সুগম করার কথা বলেছেন। শিক্ষা বিস্তারের কথা বলেছেন। সবশেষে অপনারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, পাকিস্তানের এই পূর্ব অংশের প্রতিটি নাগরিক তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে যেন, কোনভাবেই বঞ্চিত না হয় এবং  সরকারের প্রতিটি স্তরে তাদের ন্যায্য হিস্সা নিশ্চিত করা হয়। 
 
আমি এখনই আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, আপনাদের উদ্বেগ নিরসন এবং ন্যায্য দাবীসমূহ কিভাবে এবং কত তাড়াতাড়ি পূরণ করা যায়, আমার সরকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা সহকারে উল্লিখিত আপনাদের দাবীসমূহের অনেকগুলি বাস্তবায়নের কাজ ইতিমধ্যে হাতে তুলে নিয়েছে এবং কোন রকম শিথিলতা ছাড়াই কাজ করে যাচ্ছে। বিষয়গুলি ভেবে দেখা হবে, এরকমের সময় নষ্ট করারও অবকাশ থাকবে না। পাকিস্তানের এই অংশ, তার ন্যায্য ও পূর্ণ পাওনা যত দ্রুত সম্ভব লাভ করবে। এই অঞ্চলের অতীত ইতিহাস বলে, পূর্ববাংলার মানুষের শৌর্যে, বীর্যে, পরিশ্রমে এবং মেধায় অনেক যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছে। সরকার এ প্রদেশের তরুণ যুবাদের জনশক্তিতে রূপান্তরের জন্য তাদেরকে প্রয়োজনীয় ট্রেনিং প্রদানের কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। সরকার এদেশের যুবকদের তাদের নিজ দেশের সশস্ত্রবাহিনী এবং পাকিস্তান ন্যাশনাল গার্ডে যথাযোগ্য ভূমিকা পালনের পথ খুলে দিয়েছে এবং খোলা থাকবে। আমি এ কথা জোর দিয়ে বলে যাচ্ছে দেশের সশস্ত্র বাহিনীতে পূর্ববাংলার তরুণেরা সকল সুযোগ সদ্ব্যবহার করে, নিজ দেশকে দুশমনদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য জীবন বিলিয়ে দেবার অধিকার থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করার কোন প্রশ্নই উঠতে পারবে না। 
 
এবার আমি এদেশের অন্য আরো কিছু নিয়ে কথা বলবো। সে কথা বলার আগে আমি পূর্ব বাংলার অধিবাসী এবং সরকারকে আরেকবার মোবারকবাদ জানাতে চাই এজন্য যে, গত সাত মাসে আপনারা দেশ গড়ার কাজে বহু কষ্ট এবং ত্যাগ স্বীকার করেছেন। ভারত ভাগ হওয়ার পরপরই যে অব্যবস্থা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়ে পড়েছিল, তার ঢেউ ঢাকার ওপরেও পড়েছে। সে অব্যবস্থাকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনতে এখানকার অনুগত ও ত্যাগী প্রশাসন যে পরিশ্রম দক্ষতা ও মেধার পরিচয় দিয়েছেন, তার জন্য তাদেরকে জানাই আমার শ্রদ্ধা এবং সালাম। ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট তারিখে ঢাকার সরকার নিজ দেশের মধ্যে যেন পরবাসী ছিল। ভারত থেকে চলে আসা হাজার হাজার সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এখানে মাথা গোজার মত, কোন স্থানেরই ব্যবস্থা ছিল না। গত বছরের (১৯৪৭) ১৫ আগস্টের আগে ঢাকা ছিল একটি মফস্বল টাউন মাত্র। সুশৃঙ্খল হয়ে উঠতে পারেনি, এমন একটি নবগঠিত প্রশাসনের নিকট বিরাট মাথা ব্যথার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, ভারতরে রেলওয়ে সহ অন্যান্য প্রায় ৭০ হাজার কর্মচারীদের পরিবার পরিজনদের আশ্রয় এবং পুনর্বাসন করা। ভারত বিভক্তির কারণে সৃষ্ট গোলযোগ, হুমকি এবং অনেকটা ভয়ের মুখে এসব লোকেরা কলকাতা ও ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে জীবন বাঁচাবার জন্য এখানে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। 
 
একইভাবে এখান থেকে হিন্দুরা পাইকারীভাবে দেশত্যাগ করার ফলে প্রশাসনে হঠাৎ শূন্যতা সৃষ্ট হয়ে যায়। প্রশাসন, যোগাযোগ এবং পরিবহন ব্যবস্থায় ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসে। এই সমযে প্রশাসনের সবচেয়ে জরুরী কাজ হয়ে দাঁড়ায়, কত দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রশাসন ব্যবস্থাকে সংগঠিত ও সচল করে তুলে প্রদেশকে অকল্পনীয় বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা থেকে বাঁচিয়ে তোলা। আমাদের এই নতুন প্রশাসন কঠিন পরীক্ষার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে,  
সীমাহীন ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে জাতিকে রক্ষা করেছেন। প্রশাসন সকল বাধা সরিয়ে ফেলে মানুষের জীবন যাত্রাকে স্বাভাবিক এবং সুগম রেখেছেন। আরেকটি মহাগুরুত্বপূর্ণ বিষয়, প্রশাসন কেবল নিজেদেরও সংগঠিত করে তুলেনি; প্রশাসনের অব্যবস্থার সুযোগে যে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, তাকেও মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে। নতুন প্রশাসন আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করার সুমহান দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করেছে। 
 
একই সাথে এসব ব্যাপারগুলি সমাধানের জন্য জনগণ বিপুল উৎসাহের সঙ্গে এগিয়ে এসেছেন। আপনাদেরকেও ধন্যবাদ জানাই। ধন্যবাদ এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমষ্টির প্রতি। তারা এ রাষ্ট্র গঠনে এবং পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ভারত বিভক্তির পরবর্তী কয়েকটি মাসে, লাগাতরভাবে, ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপর যে নারকীয় তান্ডব, জুলুম এবং হত্যা নেমে এসেছিল, এতসব উস্কানীর মুখেও এদেশবাসী চরম সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। এত ভয়াবহ অবস্থা ঘটে যাওয়া স্বত্ত্বেও পূর্ববাংলায় এবারের পূজার সময় হিন্দু ভাইয়েরা প্রায় ৪০ হাজার মিছিল করেছেন। এসব মিছিলে কোন অশান্তিও ঘটনা ঘটেনি এবং উৎসব পালনে কোন নির্যাতনের বা বাঁধার খবর আমার কাছে আসেনি। 
 
যে কোন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক আমার সাথে একমত হবেন যে, গত কয়েক মাসে সারা ভারত জুড়ে যে মহাতান্ডব ঘটে গেল, তার প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানে কিছুই ঘটেনি। বরং পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের জানমাল নিরাপত্তায় কঠোর নজর রাখা হয়েছিল। আপনারা নিশ্চয়ই একমত হবে যে, পাকিস্তান আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করতে সক্ষম। কেবল ঢাকার সংখ্যালঘুরা নয়। সারা পাকিস্তানের সংখ্যালঘুরা অনেক দেশের চেয়ে এখানে অধিক নিরাপদ এবং জীবনহানি ঘটনার কোন শংকায় শঙ্কিত নন। আমরা যে কোন মূল্যে, কঠোর হাতে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিরকে নিয়ন্ত্রনে রাখবো এবং শান্তি বিঘিœত হতে দেবো না। আমার সরকার কোনরূপ গণরাজত্ব অথবা বন্য গণআদালত সৃষ্টি হতে দেবে না। 
 
আমি আবারও একই কথা উল্লেখ করছি, সদ্য প্রতিষ্ঠিত একটি দেশে, ত্যাগ স্বীকারকারী একটি প্রশাসন গড়ে তোলা, অবশ্যম্ভাবী দুর্ভিক্ষ এড়ানোর জন্য প্রায় ৪ কোটি মানুষের  খাদ্যোর সংস্থান এবং শান্তি বজায় রাখা আমার সরকারের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল। অনেকে প্রশাসনের এসব বিষয়কে  বিবেচনায় আনতে চান না। এগুলি যে অতি সহজ সাধারণ ব্যাপার, তা ধারণা করাও মোটেই উচিত হবে না। সমালোচনা অতি সহজ । দোষ বের করা আরো সহজ। মানুষের জন্য যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয় জনতা অতি তাড়াতাড়ি সেসব ভুলে যায় এবং যেসব কাজ হাতে নেওয়া হবে এবং বাস্তবায়ন করা হবে তাও ভুলে যাবে। অথচ পাকিস্তানের আজাদীর সংগ্রামে আমাদেরকে কত পরীক্ষা, বিষাদ, মুসিবত এবং খুন ঝরাতে হয়েছে এবং পাকিস্তান লাভের পর গত কয়টি মাসের কঠিন সমস্যাগুলি সমাধান করতে কী সব দিন কেটে গেছে তা কী জনতার মনে পড়ছে? মনে আছে কী?  
 
প্রশাসনের কতা বার বার এসে যাচ্ছে। আমি জানি, আমরা যা যা আকাঙ্খা করছি তা পুরোটা বর্তমান প্রশাসন মিটাতে পারছে না অথবা এ শাসন ব্যবস্থায় অনেক খুত রয়ে গেছে। আমি বলিনা যে, এই অবস্থাকে উন্নত করা সম্ভব নয়। এমনটাও নয় যে, একজন দেশপ্রেমিকের সমালোচনা গ্রহণ করা যাবে না। বরং সৎ সমালোচনাকারীদের প্রতি আমার আহবান, আপনারা আমাদের ভুল ধরিয়ে দিতে সাহায্য করুন। কিন্তু আমি যখন দেখি, কিছু কিছু মহল কেবল অভিযোগের পর অভিযোগ করে যাচ্ছেন এবং আমাদের দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছেন; যেসব ভাল কাজ করা হয়েছে তার সামান্য প্রশংসা বা স্বীকৃতি দিতে বড় কুণ্ঠাবোধ করেন, তখন সরকারে যারা আছেন এবং প্রশাসনের নিবেদিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ যারা দেশের জন্য দিনরাত অক্লান্ত খেটে মরছেন তাদের মাঝে নেমে আসে গভীর হতাশা। আর এজন্য স্বাভাবিকবাবেই আমিই বেশি কষ্ট পাই।
 
ভাইদের বলবো, আমরা যেসব ভাল কাজ করেছি তার প্রশংসা না করতে পারুন তবে না করুন। অযথা অভিযোগ এবং সমালোচনা করে জনগণকে বিভ্রান্ত করবেন না। একটা দেশের বিরাট প্রশাসনের মধ্যে অবশ্যই ভুলক্রটি কিছু না কিছু ঘটতে পারে বা ঘটেছে। মানুষের পক্ষে শতকরা একশত ভাগ নির্ভুল ও সুবিচারপূর্ণ প্রশাসন নিশ্চিত করা সত্যি সম্ভব নয়। এতদসত্ত্বেও আমাদের লক্ষ্য থাকবে, পাকিস্তানের প্রশাসনকে যতটা সম্ভব অন্যায় ও ক্রটিমুক্ত রেখে সৎ, দক্ষ, গতিশীল, উপকারী এবং ন্যায় বিচারবোধ সম্পন্ন একটি কর্মচঞ্চল প্রশাসন হিসেবে গড়ে তোলা। 
 
আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন কী ভাবে এ ব্যবস্থা অর্জন করা যেতে পারে? হ্যাঁ, সরকারের উদ্দেশ্যকে সামনে এনে সে ব্যবস্থা অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। সেটা হলো সরকার কিভাবে জনগণের সেবা করতে চায়, সরকার কী কী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে এবং এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কী কী কর্মসূচী হাতে নিয়েছে তা জনগণকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে রাখতে হবে। 
 
আপনারা জেনে রাখুন, সরকার বদলের ক্ষমতা এখন আপনাদেরই হাতে। আপনাদেও যত দিন উচ্ছা এই সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে পারেন এবং যখনই অপছন্দ হবে এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দিতে পারবেন। ক্ষমতার এই পরিবর্তন অনিয়মতান্ত্রিক পথ ধরে করা যাবে না। আপনাদের হাতে যে ক্ষমতা এসেছে, সেই অধিকারকে নিয়ম মোতাবেক প্রয়োগ করার চর্চাকে অনুশীলন করতে হবে। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনার এবং পরিবর্তনের নিয়মগুলি রপ্ত করে নিতে হবে। শাসনতান্ত্রিক নিয়মের ভিত্তিতেই, এক সরকারের বদলে অন্য সরকার আসবে এবং যাবে। 
 
অতএব, সরকার বদলের ক্ষমতা এখন আপনাদের হাতে। আমি আপনাদের কাছে আকুল আরজ করবো, আপনারা আরো অধিক ধৈর্যের পরিচয় দিন। বর্তমানে যারা সরকারের হাল ধরে আছে তাদেরকে সমর্থন দিন। তাদের সাথী হোন। তারা যে, অসুবিধা, সীমাবদ্ধতা এবং দুরাবস্থার মধ্য দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করুন এবং তাদের পক্ষে আপনাদের সকল সমস্যা রাতারাতি পূরণ করা যে অনেকটা অসম্ভব সেটাও উপলদ্ধি করার চেষ্টা করুন। আপনারা সহযোগিতার হাত আরো বাড়িয়ে দিলে, আমাদের দেশের সমস্যা শুধু একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠার। 
 
আমার সবিনয় প্রশ্ন এই লক্ষ জনতার কাছে, আপনারা কী আপনাদের এবং আপনাদের পূর্ব পুরুষদের বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশটিকে রক্ষা করবেন নাকি আমাদের বোকামীর জন্য দেশটিকে ধ্বংস করে দেবেন? আপনারা কি চান এই দেশটি সমৃদ্ধ হয়ে উঠুক? আমি জানি, আপনারা নিজ দেশের ধ্বংস চাইবেন না বরং জীবনকে বিলিয়ে দিয়ে দেশটিকে রক্ষা করবেন। এরজন্য দরকার একটি কাজের। সেটি হলো আমাদের সকলের মধ্যে শীসার প্রাচীরের মত ঐক্য এবং সংহতি। আপনারা জেনে রাখুন, আমাদের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত দেশটির মধ্যে গোলযোগ সৃষ্টি করতে আমাদের দুশমনেরা বসে নেই। আমাদের মধ্য থেকে, আমাদের মানুষকে বেছে নিয়ে, অর্থ দিয়ে আমাদের ভবিষ্যতের সকল স্বপ্নকে ধ্বংস করে দিতে তারা ইতিমধ্যে উদ্যত হয়েছে। আমার আকুল আহবান, আপনারা এসব ষড়যন্ত্র স¤¦ন্ধে সতর্ক থাকেন। এদের মনভুলানো এবং আকর্ষণীয় শ্লোগানের মায়াজাল থেকে নিজেদের হেফাজত করুন। 
 
এরা বলা শুরু করেছে, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এবং পূর্ববাংলার প্রাদেশিক সরকার তাদের মাতৃভাষা বাংলা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র হাতে নিয়েছে। এর চেয়ে বড় মিথ্যা আর কিছুই হতে পারে না। আমি সুস্পষ্টভাবে এবং পরিস্কার ভাষায় বলতে চাই, আমাদের ঐতিহাসিক দুশমনদের এজেন্ট এবং অনেক কমিউনিষ্ট আমাদের মাঝে ঢুকে পড়েছে। আপনারা যদি এদের ব’্যাপারে সজাগ না থাকেন তবে এরাই আপনাদের ধ্বংস করে দিতে যথেষ্ট। আমি বিশ্বাস করি, ভারত থেকে পূর্ববাংলা বেরিয়ে আসাকে এরা মেনে নিতে পারেনি। এরা পূর্ববাংলাকে ভারতের সাথে মিশিয়ে দেখতে চায়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ষড়যন্ত্রকারীরা দিবাস্বপ্ন দেখছে। পূর্ববাংলার মুসলমানরা কখনও তাদের দেশকে ভারতে মিশিয়ে নেবে না এবং মিশতে দেবে না। আমাকে জানানো হয়েছে যে, প্রদেশ থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের বহুলোক দেশ ত্যাগ করেছে। ভারতের পত্রিকাগুলি দেশ ত্যাগের সংখ্যা দশ লক্ষেরও বেশি বলে মিথ্যা সংবাদ ছাপছে। আমাদের সরকারের হিসাব মতে এই সংখ্যা বেশী করে ধরলেও দুই লাখের উপরে যাবে না। এতে আমি একটা স্বস্তিবোধ করছি এজন্য যে, সংখ্যালঘু যেসব ভাইরা দেশ ত্যাগ করেছেন তারা কিন্তু মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের নির্যাতনের ফলে দেশ ত্যাগ করেছেন। আমাদের দেশের সংখ্যালঘুরা যে স্বাধীনতা এখানে ভোগ করেছেন এবং নিজেদের সহায় সম্পত্তি সংরক্ষণের যে গ্যারান্টি পাচ্ছেন ঠিক একই অধিকার ভারতের সংখ্যালঘুরা পাচ্ছেন না। তাদের দেশ ত্যাগের কারণগুলি তালাশ করলে দেখতে পাওয়া যাবে ভারতের সাম্প্রদায়িক ও যুদ্ধবাজ নেতাদের বেফাস কথাবার্তা একটি অন্যতম কারণ। তারা গুজব ছড়িয়ে দিচ্ছে পাকিস্তান ভারতের মধ্যে শীঘ্রই যুদ্ধ বেধে যাবে। এছাড়া ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সংখ্যালঘুদের ওপর যে অত্যাচার এবং নির্যাতন চলছে তার প্রতিক্রিয়া এখানেও  দেখা দিবে। অমলূক এই ভয় এবং নির্যাতনের আশংকায় অনেক হিন্দু দেশ ত্যাগ করছেন। তাছাড়া ভারতের কতিপয় পত্রিকায় হিন্দুদেরকে, পাকিস্তান ছেড়ে আসার জন্য অবিরতভাবে লেখালেখি চলছে। এদের লেখাগুলির মধ্যে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার, নির্যাতনের মনগড়া ও মিথ্যা কাহিনীকে তুলে ধরা হচ্ছে। ভারতের হিন্দু মহাসভা এদের মদদ দিয়ে যাচ্ছে। এতদ মিথ্যা প্রচারণা সত্ত্বেও এদেশে প্রায় সোয়া কোটি সংখ্যালঘু সমাজ শান্তি তাদের নিজ জন্মভূমিতে বসবাস করছে এবং অন্যদেশে যাওয়ার চিন্তা প্রত্যাখ্যান করছে। আমি আবার উল্লেখ করতে চাই, আমরা পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের ন্যায্য অধিকার ভোগ করার প্রশ্নে কোন শৈথিল্য বা দ্বিধার সুযোগ রাখবো না। ভারতের চাইতে পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের জানমালের হেফাজত সুরক্ষিত রাখার প্রশ্নে আমরা কঠিন সংকল্পবদ্ধ। পাকিস্তানের আইন, শৃঙ্খলা, শান্তি এবং প্রতিটি মানুষের পূূর্ণ নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে, আমরা কোন সম্প্রদায়, শ্রেণী এবং জাতির বিভেদকে বরদাস্ত করবো না। 
ভাল বলছি কী মন্দ বলছি জানিনা। সবার কাছে প্রীতিকর নাও হতে পারে। আমি কিছু নাজুক কথা এখন বলবো। আমাকে জানানো হয়েছে যে, এখানে আসা অবাঙালী মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোন কোন মহল স্থানীয় মুসলমানদের দিয়ে, জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে। একই সাথে পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কার্য পরিচালনার জন্য ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের অপেক্ষাধীন, উর্দু কী বাংলা ভাষা হবে, তা নিয়ে বেশ উত্তেজনা সৃষ্টির প্রয়াস চলছে। আমিও জানতে পারলাম যে, সুযোগ সন্ধানীরা তাদের দুরভিসন্ধিকে অর্জন করার লক্ষ্যে এবং প্রশাসনকে বিব্রত করে তোলার জন্য ঢাকার ছাত্র সমাজকে ব্যবহার করা শুরু করেছে। এই সভায় উপস্থিত আমার যুবক এবং ছাত্র বন্ধুরা, আমি তোমাদেরই একজন, যে কিনা তোমাদের জাতির ভালবাসার এবং তোমাদের বিকশিত জীবন গড়ে তোলার অকাংখায় গত দশটি বছর আরামাকে হারাম করে দিয়েছি। এরকমের একটি লোকের মুখ থেকে তোমাদেরকে সাবধান হওয়ার কথা শুনাতে চাই; তোমরা যদি কোন রাজনৈতিক দলের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে পড়ো, তবে যে ভুল ঘটে যাবে, তা হয়তো আর কোন দিন শোধরানো সম্ভব হবে না। তোমরা মনে রেখ, যে দেশটি এখন আমাদের, এটি একটি বিপ্লবের ফসল। বর্তমান সরকারতো আমাদের নিজেদের সরকার। আমরা তো এখন গোলাম জাতি নই। আমরা এখন একটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রের মালিক। আমাদের দেশকে আমরা কীভাবে চালাবো তা আমরাই ঠিক করে নেব। স্বাধীন দেশের মুক্ত নাগরিকের মতই আমাদের আচরণ হতে হবে। কারো রাজত্বের অধীনের বা কোন বিদেশী কলোনীর মধ্যে আমরা এখন আর বাস করছি না। আমরা গোলামীর শিকল ছিড়ে ফেলেছি, উপড়ে ফেলেছি। আমার যুবক বন্ধুরা, আমরা স্বপ্নের পাকিস্তানের তোমরাই নির্মাতা। তোমাদের কাছে আমার আকুল মিনতি, তোমরা বিভ্রান্ত হয়ো না। কারো চক্রান্তের শিকার হয়ো না। তোমরা নিজেদের মধ্যে সুমহান ঐক্য এবং সংহতি গড়ে তোল। যুবকরাই সকল কিছু বদলে দিতে পারে এমন নজির গড়ে তোল। তোমাদের আসল কাজ নিজেদের প্রতি সুবিচার করা। অর্থাৎ নিজেদেরকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। পিতা-মাতাকে সম্মান করা আর স্বদেশ, স্বজাতির কল্যাণে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করে রাখা। তোমরা যদি শিক্ষায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করতে পার তবে দেশ শিক্ষিত হয়ে উঠবে। শিক্ষিত দেশই কেবল শক্তিশালী দেশ হতে পারে। আমি তোমাদেরকে লেখাপড়ায় মনোযোগ দেওয়ার জন্য আকুল আহবান জানিয়ে গেলাম। তোমাদের শক্তি, প্রতিভাবে যদি অপচয় করে ফেল তাহলে তোমরাই ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং গভীর মনস্তাপে সরাটা জীবন দুঃময় হয়ে যাবে। তোমরা কলেজ ইউনিভার্সিটির পড়াশুনা শেষ করে, পূর্ণ বিবেচনা করার শক্তির অধিকারী হয়ে, দেশকে গড়ে তোলার জন্য সত্যিকারের অবদান রাখতে সক্ষম হবে। এতগুলি কথার মধ্য দিয়ে, আমি তোমাদেরকে পুনরায় হুশিয়ার করে জানিয়ে রাখতেই চাই পাকিস্তান এবং পূর্ববাংলার যে বিপদসমূহের কথা আগে বলেছি, তা আমাদের উপর থেকে এখনও কেটে যায়নি। আমাদের ঐতিহাসিক  দুশমনেরা পাকিস্তান সৃষ্টির বিরুদ্ধে শত চেষ্টা করে বিফল হয়েছে। তারা এখনও বসে নেই। এখন তারা তাদের কৌশল বদলিয়েছে। তারা এখন আমাদের দেশের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তাঁরা খুজছে। আর তারা ভাল করেই জানে, আমাদের মধ্যে প্রাদেশিকতা, আঞ্চলিকতা জাগিয়ে তুলতে পারলে, আমরা বিভক্ত হয়ে যাব এবং তাদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ হবে। আর আমরা যতক্ষণ না আঞ্চলিকতা এবং প্রাদেশিকতাকে আমাদের মন থেকে, চিন্তা থেকে এবং রাজনীতি থেকে ছুড়ে ফেলতে না পারবো, ততদিন পর্যন্ত আমরা একটি শক্তিশালী ও আধুনিক রাষ্টের জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত এবং গড়ে তুলতে পারবো না। আমরা কী এই পরিচয়ে পাকিস্তান করেছি যে, আমরা বাঙালী, পাঞ্জাবী, সিন্ধি, বেলচী, পাঠান, ইত্যাদি, ইত্যাদি। এগুলি অবশ্যই আমাদের জাতিসত্তার এক একটি ইউনিট। আমি আপনাদের কাছে জিজ্ঞেস করতে চাই তেরশ বছর আগে আমাদের কাছে যে হেদায়েত এসেছে, সে কথা কী অমরা ভুলে গেছি। 
 
আমি ইতিহাসের সত্য কথাটি বলতে চাই, এই পাকিস্তানে আমরা যে যেখানেই বাস করছি, আমরা সকলেই বহিরাগত। এই বাংলায় যারা বাস করছেন, তারা কেউই এখানের আদি অধিবাসী নন। সুতরাং আমরা বাঙালী, আমরা পাঠান, আমরা পাঞ্জাবী বলে কী লাভ? আমাদের সকলের প্রথম পরিচয় আমরা মুসলমান। 
 
ইসলাম আমাদেরকে এই কথাই শিক্ষা দিয়েছে। আমি মনে করি তোমরা আমার সাথে একমত হবে যে, আগে আমরা কি ছিলাম বা না ছিলাম, কিভাবে এখানে আসলাম, এসবের প্রাসঙ্গিকতার চেয়ে, বর্তমানে আমাদের  প্রধান পরিচয় আমরা মুসলিম। প্রিয় ছাত্রবন্ধুরা তোমাদের একটি স্বাধীন দেশ হয়েছে। এটা ছোট্ট একফালি জমির দেশ নয়। এখন একটি বিরাট ভু-খন্ড তোমাদের হয়েছে, এই ভু-খন্ডটির মালিক কোন পাঞ্জাবীর, কোন সিন্ধির, কোন বেলুচির, কোন পাঠানের বা কোন বাঙালীর নয়। এটি আমাদের, তোমারদের সবার। তোমরা একটা কেন্দ্রীয় সরকার পেয়েছো, যেখানে কল ইউনিটের প্রতিনিধি রয়েছে। তাই বলতে চাই, তোমরা যদি একটি শ্রেষ্ঠ জাতি হিসাবে দুনিয়ার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাও, তবে আল্লাহর কসম দিয়ে তোমাদের কাছে আরজ করছি, তোমরা প্রাদেশিক হিংসা, অঞ্চলিক ক্ষুদ্রতাকে ঝেড়ে ফেলে দাও। আঞ্চলিকতা এবং প্রাদেশিকতা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপ। বিভেদের আরো যেসব রয়েছে, শিয়া সুন্নী দ্বন্দ্ব এসবকেও দূরে সরিয়ে রাখ। 
 
এ ধরণের বিরাজিত অবস্থা নিয়ে, পরাধীন আমলের সরকারগুলির মাথা ব্যাথা ছিল না। তারা এরূপ অবস্থায় অস্বস্তিবোধ করতো না। তাদের লক্ষ্য ছিল বাণিজ্যের দিকে। ভারতবর্ষকে যেভাবে এবং যতভাবে শোষণ করা যায় তাকে নিরুপদ্রব রাখতেই আইন-শৃঙ্খলার প্রতি নজর রাখতো। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে গেছে। আপনাদেরকে একটা উদাহরণ দিচ্ছি, বর্তমান আমেরিকার কথা ধরুন, তারা যখন ব্রিটিশদের তাদের দেশ থেকে বের করে দিয়ে নিজেরা স্বাধীনতা ঘোষণা করলো, তখন তাদের দেশে এত জাতি-গোষ্ঠী ছিল যার বর্ণনার শেষ করা যাবে না। স্পেনিস, ফরাসী, জার্মান, ইতালিয়ান, ইংরেজ, ওলন্দাজ, ইত্যাদি ইত্যাদি। এদের নিজেদের ভিতর জাতিগত সমস্যাকে কাটিয়ে পৃথিবীর একটি শক্তিশালী জাতিতে পরিণত হয়েছে। আর আমাদের ভিতর এ ধরনের কোন জটিল সমস্যার অস্তিত্বই নেই। তাছাড়া, আমরা সবেমাত্র পাকিস্তান হাসিল করেছি। মনে করুন, আমেরিকায় ফরাসী বংশোদ্ভুত কেউ একজন যদি বলে, আমি একজন ফরাসীয়। আমি পৃথিবীর অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ জাতির সদস্য। আমার এই গৌরব রয়েছে। অন্যরাও যদি অনুরূপ কথা বলতো, তাহলে পরিস্থিতি বা কী দাঁড়াতো? তাদের মধ্যে তাদের নিজেদের সমস্যা উপলব্ধি করার যথেষ্ট শক্তি ছিল এবং এর ফলে অতি অল্প সময়ে তারা, তাদের ভিতরকার সমস্যাগুলি মিটিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছে এবং স্ব-স্ব জাতি, গোষ্ঠীর বিভেদের দেওয়ালকে সরিয়ে ফেলতে পেরেছ। তারা নিজেদের  জার্মান, ফরাসী, ইংরেজ, স্পেনিক পরিচয় মুছে দিয়ে আমেরিকান হিসাবে পরিচয় দিতে কোন কুণ্ঠাবোধ করেনি। তাদের ভিতর নিজ দেশের জাতিগত চেতনা, এত শক্তিশালী হয়েছে যে, তারা এখন গর্বভরে বলে থাকে আমি একজন আমেরিকান অথবা আমরা আমেরিকান। সুতরাং এরকম করেই কী আমরা নিজেদের চিন্তা করতে পারি না? আমরা সবাই কী আমাদের দেশ পাকিস্তান, আমি, আপনি এবং আমরা সবাই পাকিস্তানী, এই ধারণাকে আমাদের হৃদয়ের ভিতর প্রবেশ করিয়ে দিতে পারি না? আমি আবারও আপনাদের কাছে অনুরোধ করে যাচ্ছি আপনারা প্রাদেশিকতা এবং আঞ্চলিকতা থেকে নিজেদের মুক্ত করে ফেলুন। পাকিস্তানের রাষ্ট্র ব্যবস্থা বা রাজনীতিতে যদি প্রাদেশিকতার বিষ ঢুকে যায়, আপনারা কখনও শক্তিশালী জাতিতে পরিণত হবেন না। পাকিস্তানকে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করার যে সংকল্প পোষণ করি, তা অর্জিত হবে না। আপনারা মনে করবেন না, আমি আপনাদের পরিচয়ের অমর্যাদা করছি। এরকম অবস্থার মধ্য দিয়েই ধ্বংসকামী দুষ্ট চক্র জন্ম দেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। এরা এভাবে বলে থাকে পাঞ্জাবীরা বড় অহঙ্কারী আবার অবাঙ্গালী বা পাঞ্জাবীরা বলে থাকবে বাঙ্গালীরা এমন, এমন। এরা আমাদের পছন্দ করে না, তারা আমাদেরকে এদেশ থেকে বের করে দিতে চায়। এরকমের পরিস্থিতি সৃষ্টি করাই দুশমনদের কৌশল এবং চক্রান্তের বিষাক্ত জাল। এ ধরনের অবিশ্বাস ও সন্দেহ আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়ে গেলে সেটা সমাধান করা কারো পক্ষে সম্ভব হবে বলে, আমার মনে হয় না। দেশপ্রেমিক ভাইদের প্রতি আহবান জানাই, এসবের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করবেন না। 
 
ভাষাকে ইস্যু করে, যা কিনা আমি আগেও বললাম, মুসলমানদের মধ্যে একটা বিশৃংখলা সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। আপনাদের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি যে বিবৃতি দিয়েছেন তাতে আমি সন্তুষ্ট। তিনি বলেছেন, এ বিষয়কে ইস্যু করে কোন নৈরাজ্যবাদী রাজনৈতিক মহল, দুশমনদের