সরকারী হিংস্রতার একটি নজির

ফন্ট সাইজ:
      আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকিবার কারণে নিয়মিত ক্লাসে যোগ দিতে না পারায় পড়াশুনা করিবার প্রয়োজনীয়তায় আমি রমজানের ছুটিতে বাড়ী না গিয়া হলেই থাকিবার সিদ্ধান্ত নেই। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। ইন্টারমিডিয়েট সায়েন্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি. কম. ক্লাসে ভর্তি হইয়াছিলাম। কমার্সের সবকিছুই ছিল আমার নিকট নূতন। তাই ছুটির সময় পড়াশুনার ক্ষতি পূরণ করিবার তাগিদেও বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীর সুযোগ গ্রহণ করিবার নিমিত্ত বাড়ী যাই নাই। এমনি একদিন রমজানের বোধ হয় ২৭ তারিখ অর্থাৎ ১৪ জুলাই অপরাহ্নে আমার ১৭৭ নং রুমের জানালার নিকট বসিয়া কাজ করিবার সময় দেখিলাম, সলিমুল্লাহ হলের দক্ষিণ পাশ্বস্থ রাজপথ বাহিয়া সেনাবাহিনী ভর্তি গাড়ী লালবাগ অভিমুখে দ্রুত ছুটিয়া যাইতেছে। ইহার প্রায় ৩০ কি ৪৫ মিনিট সময়কালের মধ্যে অনবরত গুলির আওয়াজ শুনিতে পাইলাম। প্রকাশ, ধর্মঘটী পুলিশদের দখল হইতে লালবাগ থানার অস্ত্রাগার মুক্ত করিবার প্রয়াসে নাকি সেনাবাহিনী সেইদিন গুলি চালাইয়াছিল। লালবাগ থানার অস্ত্রাগারের পার্শ্বে রক্তসিক্ত স্থান ঘুরিয়া ঘুরিয়া দেখিবার কালে আমাকে গ্রেফতার করা হয় এবং থানার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ২৪ ঘন্টা আটক রাখা হয়। সেইদিন সেই গুলীতে কতজন ধর্মঘটী পুলিশ কনস্টেবল নিহত হইয়াছেন, কেহ সঠিক সংখ্যা  বলিতে পারেন নাই। গুলীর পর পরিস্থিতি আয়ত্তে আসিলে যথেচ্ছ গ্রেফতার ও মামলা রুজু শুরু হয়। ধর্মভীরু বলিয়া কথিত উজীরে আলা খাজা নাজিমুদ্দিনের কি চমৎকার প্রাশাসনিক দাওয়া ! আমি দৃঢ় প্রত্যয়ের সহিত বলিতে পারি ধর্মঘটী পুলিশ কনস্টেবল কেহই রাষ্ট্রদোহী ছিলেন না; কোন ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপও ছিল তাহাদের কল্পনাতীত। কিছু বেতন বৃদ্ধি ও ছোট খাট অবশ্য প্রয়োজনীয় কয়েকটি ন্যূনতম দাবীই ছিল তাহাদের সেই দিনের ধর্মঘটের উদ্দেশ্য।
      এই নূন্যতম দাবী পুরণ সরকারের পক্ষে অতি সহজ ছিল। কন্তিু কথিত ধর্মভীরু সৈন্য বাহিনী লেলাইয়া দিয়া হত্যা করিতে বুকে এতটুকু কম্পন বোধ করেন নাই। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ভাষা আন্দোলনের পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগরে আটক থাকাকালে এই ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করিবার অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত কতিপয় পুলিশ কনস্টেবরের সহিত আমার সাক্ষাৎ হয়। তাহাদের জবানীতে পূর্ণ কাহিনীটি অবগত হই। বন্ধী পুলিশ কনস্টেবলদের নিকট হইতে সম্পূর্ণ ঘটনা শুনিবার পর আমার মনে হইয়াছে, বহুল প্রচারিত পরহেজগার খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন সরকারের এই নিষ্ঠুরতা নজিরবিহীন।