কায়েদে আযমের তিরোধান

ফন্ট সাইজ:
       দেশকে সংবিধান দেওয়ার পূর্বেই রাষ্ট্রের জনক কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দেশবাসীকে শোক সাগরে ভাসাইয়া ১১ই সেপ্টেম্বর (১৯৪৮) পরলোকগমন করিলেন। তাহার তিরোধানে জাতির ও গণতন্ত্রের যে অপুরণীয় ক্ষতি সাধিত হইয়াছে, তাহারই মাশুল উত্তরকালে দিতে হইয়াছে পাকিস্তানকে । 
      কায়েদে আযম ন্যাশনস্টেট ও ডোমোক্রেটিক মালটিপার্টি স্টেট বা গণতান্ত্রিক বহুদলীয় রাষ্ট্র গঠনে প্রয়াসী ছিলেন। তিনি পাকিস্তানকে আধুনিক রাষ্ট্রে রূপদান করিতে চাহিয়াছিলেন। মৃত্যুর মাত্র এক বৎসর আগে সভপতি হিসাবে ১০ই আগষ্ট (১৯৪৭) তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনেই উদ্ধোধনী ভাষণে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় পাকিস্তান জাতির গোড়াপত্তনের উদাত্ত আহবান জানানঃ“you may belong to any religion, or caste or creed: that has nothing to do with the business of the state: In course of time Hindus would cease to be Hindus and Muslims would cease to be Muslims not in the religious sense because that is the personal faith of each individual, but in the political sense as citizens of the State.”
      অর্থাৎ আপনি যে কোন ধর্ম, জাতির ও বিশ্বাসভূক্ত হইতে পারেন, রাষ্ট্রীয় ব্যাপারের সহিত তাহার কোন সম্পর্ক নাই। কালের গতিতে হিন্দু আর হিন্দু থাকিবে না, মুসলমান আর মুসলমান থাকিবে না, ধর্মীয় অর্থে নহে- কারণ, উহা প্রত্যেক ব্যক্তির বিশ্বাস-ইহা হইবে রাষ্ট্রীয় নাগরিক হিসাবে, রাজনৈতিক পথে।
      একই বক্তৃতায় কয়েদে আযম আরও বলেন, ‘আজ হইতে আমরা আর হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃস্টান জাতি নই, আমরা সকলে এক পাকিস্তানী জাতি‘।
      বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ১৯৪৭ এর ১০ই আগষ্ট ভাষণে বাবু যোগেন্দ্র নাথ মন্ডলের সভাপতিত্বেই পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবশেনের প্রারম্ভিক মুসলামানদের নাজুক সাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণা পরিবর্তনের ব্যাপারে কায়েদে আযমের প্রথম সুকৌশল মনস্তাত্বিক পদক্ষেপ।
       উল্লেখ্য যে পাকিস্তান গণ পরিষদের উক্ত উদ্ধোধনী অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তান হইতে নিম্নে বর্ণিত হিন্দু সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন -সর্বশ্রী কিরণ শংকর রায়, শরৎ চাট্যার্জী-কামিনী কুমার দত্ত, ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত, অধ্যাপক রাজকুমার চক্রবর্তী, ভুপেন্দ্র নাথ দত্ত, প্রেম হরি রমন, বিরাট চন্দ্র মন্ডল, ধনঞ্জয় রায়, অক্ষয় কুমার দাস প্রমুখঃ
      কায়েদে আযম বহু দলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। তদুদ্দেশ্যেই ১৯৪৮ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী করাচীতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের সভার পর গর্ভনর জেনারেল বাসভবন হইতে ২৫শে ফেব্রুয়ারী এক প্রেস বিজ্ঞাপ্তিতে তিনি ঘোষণা করেন, ‘মুসলিম লীগ এতকাল ভারতে সমস্ত মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব করিয়াছে। দেশ ভাগের পর মুসলিম লীগ এখন হইতে একটি দল হিসাবে কাজ করিবে; পূর্বের ন্যায় সমগ্র মুসলমান জাতির প্রতিনিধিত্ব করিবে না‘।
       আমি দৃঢ় মত পোষণ করি যে, কায়েদে আযমের মহাত্মা গান্ধীর ন্যায় কোন রাষ্ট্রীয় পদ গ্রহণ না করিলে সর্বাঙ্গীন তাহারই গ্রহণ করা একান্ত সমীচীন ছিল। তাহা হইলে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তি সঞ্চারিত হইত; ঘোষিত নীতি, আদর্শ ও বাস্তব কর্মকান্ডের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য ঘটিত না এবং পাকিস্তানের যাত্রপথে অশুভ ভবিষ্যতের সূচনা হইত না। রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় জীবনে পূর্বসূরীদের নীতিনিষ্ঠ বাস্তব কর্মকান্ডই জাতির অগ্রাভিযান ও অগ্রগতিতে উত্তরসূরীদের প্রেরণার মূলভিত্তি। প্রেরণার অভাব হইলেই জাতি উদ্দেশ্যবিহীন জাতিতে পরিণত হয়। শুরু হয় জাতীয় জীবনে অবক্ষয় ও অধঃপতন। ইতিহাসের পাতায় পাকিস্তান ইহার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। 
      কায়েদে আযমের ইহধাম ত্যাগের অব্যবহিত পরই পূর্ববঙ্গে উজীরে আলা খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হইলেন।