বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বহিষ্কার

ফন্ট সাইজ:
      ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকাকালে ২৯শে মার্চ (১৯৪৮) এক্সিকিউটিভ  কাউন্সিলর নিম্নলিখিত ২৪ জন ছাত্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ছাত্রদের অপরাধ- তাহারা নিম্ন বেতনভুক কর্মচারীদের ধর্মঘটের সমর্থনে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করিয়াছিল।
(ক) ৪ বৎসরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বহিস্কারঃ
(১) দবিরুল ইসলাম (আইন ছাত্র), ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, 
(২) আবদুল হামিদ চৌধুরী (এম.এ.ক্লাস), (৩) অলি আহাদ (বি.কম.দ্বিতীয় বর্ষ), (৪) আবদুল মান্নান (বি.এ.ক্লাস), (৫) উমাপতি মিত্র (এম.এস.সি পরীক্ষার্থী), (৬) সমীর কুমার বসু (এম.এ.ক্লাস)
(খ) বিভিন্ন হল হইতে বহিস্কারঃ
(১) আবদুর রহমান চৌধুরী (আইন ছাত্র), সহ-সভাপতি, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র  সংসদ (২) মোল্লা জালাল উদ্দিন আহমদ (এম.এ. ক্লাস) , (৩) দেওয়ান মাজবুব আলী (আইন ছাত্র), (৪) আবদুল মতিন (এম.এ.ক্লাস), (৫) আবদুল মতিন খান চৌধুরী (আইন ছাত্র), (৬) আবদুর রশিদ ভুইয়া (এম.এ.পরীক্ষার্থী), (৭) হেমায়েত উদ্দিন আহমদ (বি.এ.ক্লাস), (৮) আবদুল মতিন খান (এম.এ.পরীক্ষার্থী), (৯) নূরুল ইসলাম চৌধুরী (এম.কম.ক্লাস) (১০) সৈয়দ জামাল কাদেরী (এম.এস.সি.ক্লাস), (১১) আবদুস সামাদ (এম. কম.ক্লাস), (১২) সিদ্দীক আলী (এম.এ.ক্লাস) (১৩) আবদুল বাকী (বি.এ.ক্লাস) (১৪) জে, পাত্রনবিশ (এম.এস.সি ক্লাস), (১৫) অরবিন্দ বসু (আইন ছাত্র), সহ-সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ।
(গ) পনেরো টাকা জরিমানাঃ
(১) শেখ মুজিবুর রহমান (আইন ছাত্র), (২) কল্যাণ দাস গুপ্ত, (এম.এ.ক্লাস) সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা হল ছাত্র সংসদ, (৩) নঈমুদ্দিন আহমদ, (এম.এ.ও ল’র ছাত্র) আহবায়ক, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ (৪) মিস নাদেরা বেগম (এম.এ. ক্লাস), (৫) আবদুল ওয়াদুদ (বি.এ.ক্লাস)
(ঘ) দশ টাকা জরিমানাঃ
মিস লুলু বিলকিস বানু (আইন ছাত্রী)।
বিশ্ববিদ্যালয় হইতে ৪ বৎসরের জন্য বহিস্কৃত আমরা ছয়জন ছাত্র ব্যতীত বিভিন্ন সাজাপ্রাপ্ত বাকী একুশ জনকে ১৭ই এপ্রিলের মধ্যে লিখিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট মুচলেকা দাখিল করিবার নির্দেশ জারি করা হয়।
      ইংরেজ সাম্রাজ্য রক্ষার প্রয়োজনে প্রবর্তিত ও আমলাতান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় অর্জিত বিকৃত মূল্যবোধসম্পদন্ন উচ্চশিক্ষত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অভুক্ত, অর্ধভুক্ত, স্বল্প বেতনভুক কর্মচারীদের বিরুদ্ধে জঘন্য ও হিংস্র সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করিয়াছিল। ১৯৪৮ সালে পূর্ববংগ আইন পরিষদে বাজেট অধিবেকশন চলাকালে ঢাকা নগরে ছাত্র আন্দোলনের যে তিক্ত-অভিজ্ঞতা সরকারের হইয়াছিল ইহার প্রেক্ষিতেই ভীতসন্ত্রস্ত নুরুল আমিন সরকার ১৯৪৯ সালের ১১ই মার্চ আহূত বাজেট অধিবেশনকালে ছাত্র বিক্ষোভ এড়াইবার উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনির্দিষ্টকালে জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করিবার পরামর্শ দান করেন। কর্তার ইচ্ছায় কীর্তন। হই হইল। ইহার পর ছাত্র আন্দোলন দমনের নিমিত্ত নুরুল আমিন সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধা অবস্থায়ই আমরা সাতাশ চন ছাত্রের বিরুদ্ধে উপরোক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
     কর্তৃপক্ষের প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিকারের প্রয়াসে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয় খোলার তারিখে অর্থাত ১৭ই এপ্রিল (১৯৪৯) সাধারণ ছাত্র ধর্মঘট ঘোষণা করে। পরিতাপের বিষয়, ইতিমধ্যে জনাব নঈমুদ্দিন আহমদ, আবদুর রহমান চৌধুরী, দেওয়ান মাহবুব আলী, আবদুল মতিন খান চৌধুরী প্রমুখ ছাত্রনেতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মোতাবেক মুচলেকাপত্র বা বন্ড স্বাক্ষর করিয়া স্বীয় অতীত কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত বলিয়া ক্ষমা প্রার্থী হইয়াছিলেন। তাহাদের নীতিহীন ভূমিকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট হয়, ছাত্র সভা হয় ও ছাত্র সভাস্থল হইতে মিছিল সহাকারে আমরা ছাত্র বহিস্কারাদেশ বাতিলের দাবীতে ভাইস চ্যান্সেলর ডঃ মোয়াজ্জেম হোসেনের বাসভবনে গমন করি। ভাইস চ্যান্সেলর সাক্ষাৎ দিতে অস্বীকৃতি জানাইলে রাত্রি ১০টা পর্যন্ত অবস্থান ধর্মঘট পালন করি। পরদিন পুনরায় ছাত্র ধর্মঘট ও ছাত্র সভার পর আমরা আবারো মিছিল সহকারে ভাইস চ্যান্সেলরের বাসভবনে গমন করি। আনুমানিক অপরাহ্ন পাঁচ-ছয় ঘটিকার দিকে জনাব আবদুল হামিদ চৌধুরীর উদ্যোগে ঢাকা মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান সুসাহিত্যিক অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ, মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডাঃ টি, আহমদ, প্রফেসর আবদুল হালিম, ঢাকা হলের প্রভোষ্ট ডঃ পি,সি চক্রবর্তী, পুর্ববঙ্গ সরকারের জয়েন্ট সেক্রেটারী মিজানুর রহমান ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রভোস্ট প্রফেসর ডঃ ওসমান গণি প্রমুখ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলরের সদস্যের সহিত ভাইস চ্যান্সেলরের বাসভবনেই আমাদের আশাব্যঞ্জক আলাপ-আলোচনা হয়। কিন্তু গভীর রাত্রিতে পর্দার অন্তরালে অদৃশ্য হস্তের খেলায় সবকিছুই ভন্ডুল হইয়া গেল। অবস্থাদৃষ্টে শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের সহিত আলোচনা করিয়া অবস্থান ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কর্মপরিষদের আহবায়ক আবদুর রহমান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট আত্মসমর্পন করায় আমাকে আহবায়ক নিযুক্ত করিয়া ছাত্র কর্মপরিষদ পুনর্গঠিত করা হইল। ২০শে এপ্রিল ঢাকা শহরে ছাত্র ধর্মঘট, সভা, বিক্ষোভ  মিছিল ২৫শে এপ্রিল দেশব্যাপি সাধারণ হরতাল আহবান করা হইল। ইতিমধ্যে কর্তৃপক্ষের আহবানে ভাইস চ্যান্সেলরের বাসভবনে সশস্ত্র ও লাঠিধারী পুলিশ মোতায়েন হয়। গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারীগণও অবস্থান ধর্মঘটের সংবাদে আমাদের চারিদিকে আনাগোনা আরম্ভ করে। সন্ধ্যার দিকে গ্রেফতার হইবার কিছু পূর্বে শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে আন্দোলন পরিচালনার স্বার্থে গ্রেফতার এড়াইবার নির্দেশ দিলেন। আমি তদানুযায়ী ভাইস চ্যান্সেলরের বাসভবন পরিত্যাগ করি। এই ১৯শে এপ্রিলই অবস্থান ধর্মঘট পালন অবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমানসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করিয়া ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক করা হয়। কিন্তু আমাদের ধর্মঘট অব্যাহত থাকে। ২০শে এপ্রিল ধর্মঘটের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জিমনেসিয়াম মাঠে যথারীতি ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাস্থল হইতে মিছিলসহকারে আগাইয়া যাওয়ার সময় জিমনেমিয়াম মাঠ এবং ঢাকা হলের মধ্যবর্তী রাজপথে পুলিশ বাহিনীর সহিত সংঘর্ষ ঘটে। শোভা যাত্রা ছত্রভংগ করিবার নিমিত্ত পুলিশ লাঠিচার্জ করে ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। পুলিশের সহিত এক পর্যায়ে হাতাহাতি-ধস্তাধস্তি চলাকারে আমাকে গ্রেফতার করিয়া ঢাকা জিলা গোয়েন্দা বিভাগ অফিসে লইয়া যাওয়া হয়। তথায় কিছু জিজ্ঞাসাবাদের পর সন্ধ্যা ৬ ঘটিকার দিকে আমাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণ করে। কেন্দ্রীয় কারাগারের ৫ নং ওয়ার্ডে ঢোকা মাত্রই মুজিব ভাই আমাকে বকাবকি করিতে লাগিলেন। শান্ত হইলে বুজাইয়া বলিলাম, আমার কোন দোষ নাই। গোয়েন্দা কর্মচারীবৃন্দ কম সর্তক ছিল না, তাই আমাকে মিছিল হইতেই পাকড়াও করিতে পারিয়াছে। ইতিমধ্যে জনাব আবদুল মতিন, নিতাই গাঙগুলি, এনায়েত করিম, বাহউদ্দিন চৌধুরী, আবুল হাসনাত, আবুল বরকত, (শহীদ বরকত নয়) খালেক নেওয়াজ খান, আতাউর রহমান, মাজহারুল ইসলাম, মফিজুল্লাহ প্রমুখ গ্রেফতার হইয়া জেলখানায় নীত হন। আমরা গ্রেফতার হইবার পর আন্দোলনে স্বাভাবিকভাবেই ভাটা পড়ে। পত্রিকাপাঠে মনে হইল ২৫শে এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ হরতালের ডাক সম্পূর্ণভাবে সাফল্যমন্ডিত হয় নাই। ইহারই অবশ্যম্ভাবী ফল হিসাবে ২৭শে এপ্রিল হইতে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস চলিতে থাকে।