টাংগাইল উপনির্বাচন

ফন্ট সাইজ:
      আসাম হইতে আগত আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী দক্ষিণ টাংগাইল নির্বাচনী কেন্দ্র হইতে করটিয়ার জমিদার খুররম খান পন্নী ও অপর দুইজন প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করিয়া পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হইয়াছিলেন। নির্বাচনী ত্রুটির অপরাধে গভর্ণরের এক আদেশ বলে মওলানা ভাসানী, খুররম খান পন্নী ও অন্যান্য প্রার্থীকে ১৯৫০ সাল অবধি নির্বাচন প্রার্থী হইবার অযোগ্য বলিয়া ঘোষণা করা হয়। উপরোক্ত শূন্য আসন পূর্ণ করিবার প্রয়োজনে সরকার ২৬শে এপ্রিল (১৯৪৯) উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ ঘোষণা করে। এইবার মুসলিম লীগ সরকার স্বীয় স্বার্থেই খুররম খান পন্নীর পূর্ব ঘোষিত অযোগ্যতা বাতিল করে এবং তিনি অনুষ্ঠিতব্য উপনির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্ধন্ধিতা করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে পুর্ববঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধী গলা জন্ম না নিলেও মুসলিম লীগ সরকার বিরোধী মনোভাবের অন্তঃসলিলা প্রবাহের সক্রিয়া নেত্রত্বে ছিল ঢাকার ১৫০ নং মোগলটুলীতে অবস্থি পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগ কর্মীশিবির। তরুণ নেতা জনাব শামসুল হক উক্ত কর্মী শিবিরের নেতা ছিলন। তিনিই এই উপনির্বাচনে সরকারী প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্ধন্ধিতায় অবতীর্ণ হইলেন।
     খন্দকার মোশতাক আহমদ, ইয়ার মোহাম্মদ খান, আজিজ আহম, জনাব শওকত আলী, জনাব হজরত আলীর পরিচালনায় তরুণ কর্মীবৃন্দ সহায়-সাম্বলহীন অবস্থায় এমনকি জীবনের ঝুঁকি লইয়াও গরীব-নিঃস্ব প্রার্থী শামসুল হকের পক্ষে নির্বাচন প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণ করেন। মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন ও পরাক্রমশালী মুসলিম লীগ সংগঠনের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্বেও সরকার মনোনীত প্রার্থী জমিদার খুররম খান পন্নী সর্বত্যাগী, নিঃস্ব ও আদর্শস্থানীয় নেতা শামসুল হকের নিকট পরাজয়বরণ করেন। ইহার পর নুরুল আমিন সরকার ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত ৩৫টি শূন্য আসনে কোন উপনির্বাচন হইতে দেন নাই। ক্ষমতা আকড়াইয়া থাকিবার কি মারাত্মক মানসিক প্রবণতা! জনগণ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া যাওয়ায় মুসলিম লীগ সরকার উপনির্বাচনে জনগণকে মোকাবিলা করিবার সৎসাহস হারাইয়া ফেলিয়াছিল। এইভাবেই এই দেশে গণতন্ত্র হত্যার গোড়াপত্তন করিলেন নুরুল আমিন সরকার! যাহা হউক এই উপনির্বাচনে আইন পরিষদ সদস্য শামসুল হকের বিরুদ্ধে নির্বাচনী মামলা দায়ের করিল। বিচারপতি আমিনুদ্দিন, জেলা জজ উনায়েতুর রহমান ও শহরুদ্দিন সমবায়ে গঠিত নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল ১৯৫০ সালে জনাব শামসুল হকের নির্বাচন নাকচ করিয়া দেন। মওলানা ভাসানী তাহার মুরিদানের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসাম গেলে ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে আসাম কংগ্রেস সরকার তাহাকে গ্রেফতার করিয়া ধুবড়ী কারাগারে আটক করে। জনাব হজরত আলী ধুবড়ী কারাগারে বন্দী মওলানা ভাসানীর স্বাক্ষরিত একটি আবেদনপত্র জনাব শামসুল হকের স্বপক্ষে ভোটদানের জন্য প্রকাশও করেন। আবেদনপত্রে ধুবড়ী কারাগারের কোন সীলমোহর ছিল না। তাই ট্রাইব্যুনাল উক্ত আবেদন-পত্রকে জাল বলিয়া নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করেন।
      জনাব শামসুল হকের বিজয় কারাগারে আমাদের মনোবলকে বর্ণনাতীত-ভাবে বৃদ্ধি করে। আমরা টাংগাইল উপনির্বাচনে উল্লসিত ও আত্মহারা হইয়া পড়ি। ৮ই মে পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগ কর্মীশিবির নব নির্বাচিত পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদ সদস্য জননেতা শামসুল হককে ঢাকা নগরবাসীর পক্ষ হইতে ভিক্টোরিয়া পার্কে প্রাণঢালা গণসম্বর্ধনাজ্ঞাপন করেন।