কারাগারে অনশন ধর্মঘট ও কমিউনিষ্ট পার্টির হঠকারিতা

ফন্ট সাইজ:
     কারাগারে অধিকাংশ নিরাপত্তা বন্দীই ছিল কমিউনিষ্ট পার্টিভুক্ত। ১৯৪৮ সালে ফেব্র“য়ারী মাসে কলিকাতায় অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস সশস্ত্র বিপ্লবের মারফত সরকার উৎখাতের ডাক দেয়। সদ্য আজাদীপ্রাপ্ত পাক-ভারত রাষ্ট্রদ্বয়ের সরকারের পিছনে অকুণ্ঠ গণ-সমর্থন ছিল এবং ইহাতে প্রশ্নের কোন অবকাশ ছিল না। প্রায় দুই শত বৎসর অবর্ণনীয় ক্লেশ ও ত্যাগ স্বীকার করিয়া ইংরেজদের তাড়াইয়া স্বাধীনতা অর্জন করা হইয়াছে। এমনি বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক জনগণের নিকট উন্মাদ বিশেষের প্রলাপ মনে হইবে, তাহাতে আর বিচিত্র কি। এই অবাস্তব নীতির দরুণই কমিউনিষ্ট পার্টিকে ১৯৪৮-৫০ এই তিন বৎসর উভয় সরকারের প্রচন্ড দমননীতির দুর্বিষহ স্টিমরোলার সহ্য করিতে হয়। পার্টির এই বাস্তব বিবর্জিত, অসার, অলীক ও উন্মাদ নির্দেশকে বৃহত্তর কর্মকান্ডের অংশ হিসাবে মানিয়া লইয়া আটক নিরস্ত্র, অসহায়, স¤¦লহীন কমিউনিষ্ট রাজবন্দীগণ কারান্তরালেই সংগ্রামের পথ বাছিয়া লইলেন এবং কারাগারে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দাবীতে ১৯৪৯ সালে ১১ই মার্চ অনশন ধর্মঘট আরম্ভ করেন। দাবী গৃহীত বা আলোচিত হইবার পূর্বেই অনশনরত বন্দীগণ ঢাকা কারাগারে চার দিনের মধ্যে এবং রাজশাহী কারাগারে আটত্রিশ দিনের মধ্যে অনশন ধর্মঘট ভঙ্গ করেন।
      ১৯৪৯ সালে ২২শে মে তাহারা পুনরায় অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের মৌখিক প্রতিশ্র“তিতে বা আশ্বাসে অনশনরত কমিউনিষ্ট বন্দীগণ ঢাকা কারাগারে মে-জুন মাসে চব্বিশ দিন পর এবং রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে একচল্লিশ দিন পর অনশন ভঙ্গ করেন। তাহাদের অনশাকালে আমরাও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিরাপত্তা বন্দী হিসাবে আবদ্ধ ছিলাম। আমাদের সঙ্গে অনশন বিষয়ে তাহারা কোন যোগাযোগ করেন নাই। পর পর দুইটি অনশন ধর্মঘট ব্যর্থ হইল। তথাপি জনগণ হইতে বিচ্ছিন্ন ক্রিয়াকলাপ তাহারা পরিত্যাগ করে নাই। ১৯৪৯ সালের সেপ্টে¤¦রে তাহারা পুণরায় অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। এইবারও কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অনশনরত কমিউনিষ্ট রাজবন্দীগণ সেপ্টে¤¦র-অক্টোবর মাসে চল্লিশ দিন পর ও রাজশাহী কারাগারের বন্দীগণ পঁয়তাল্লিশ দিন পর অনশন ধর্মঘট ত্যাগ করেন। কর্তৃপক্ষের মিথ্যা আশ্বাসে বিভ্রান্ত হইয়া অনশন ধর্মঘট পুণঃ পুনঃ প্রত্যাহার সত্বেও বাস্তবে কোন ফলোদয় না হওয়ায় কমিউনিষ্ট রাজবন্দীগণ ১৯৪৯ সালের ২রা ডিসে¤¦র পুনঃ অনশন ধর্মঘটের আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অনশনরত বাবু শিবেন রায় ৮ই ডিসেম্বর দিবাগত রাত্রে প্রাণত্যাগ করেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অনশনরত কমিউনিষ্ট রাজবন্দী ও সরকারের মধ্যে আপোষ-আলোচনার চুক্তি মোতাবেক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে অনশরনত  রাজবন্দীগণ যাথাক্রমে ডিসেম্বর-জানুয়ারী মাসে আটান্ন দিন ও একষট্টি দিন পর অনশন ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন। চুক্তিপত্র নিম্নরূপঃ
(১) বন্দীগণকে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত করা,
(২) প্রতি সপ্তাহে একটি চিঠি লিখিবার অধিকার,
(৩) প্রতি পনের দিনে আত্মীয়স্বজনের সহিত সাক্ষাৎ করান,
(৪) খেলাধুলার সুযোগ, কাপড়-চোপড়, সাবান, টুথব্রাশ, টুথপেষ্ট ইত্যাদি সরবরাহ।
উল্লেখ্য যে, রাজবন্দীর এই মর্যাদা অর্জনকল্পে এগার মাসের মধ্যে কমিউনিষ্ট রাজবন্দীগণকে সর্বমোট ৪টি ধর্মঘটে ঢাকা কারাগারে একশত সাতাশ দিন ও রাজশাহী কারাগারে একশত পঁচাশি দিন অনশন ধর্মঘট করিতে হয়।
অনশনরত বন্দীদের দাবী ছিল নিম্নরূপঃ
১) নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বন্দীকে বিনাশর্তে অবিলম্বে মুক্তিদান অন্যথায়-
ক) দৈনিক খাদ্য বাবদ তিন/চার টাকা।
খ) খাট, তোষক, হাড়ি, বাসন, আসবাাপত্র ও দুইশত পঞ্চাশ টাকা প্রাথমিক ভাতা।
গ) ব্যক্তিগত ভাতা মাসিক পঞ্চাশ টাকা,
ঘ) পারিবারিক ভাতা মাসিক একশত টাকা, 
ঙ) প্রতিমাসে চারটি চিঠি বাহির পাঠান, দুই সপ্তাহ অন্তর দেখা, উপযুক্ত থাকার স্থান, খেলাধুলার ব্যবস্থা,
চ) হাজত ও অন্যান্য বিচারাধীন রাজবন্দীদিগকে প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা দান,
ছ) অন্য সকল রাজনৈতিক বন্দীর জন্য দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদা দান,
জ) উন্নত খাদ্য ব্যবস্থা, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা, দৈনিক খবরের কাগজ, পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা চালু, উন্নততর জীবন-যাপন, সরকারী খরচায় ধুমপানের ব্যবস্থা, ‘এ’ ওয়ার্ডে রেডিও বসান এবং নির্দেশিত সমস্ত খবরের কাগজ ও পত্রপত্রিকা সেন্সার না করিয়া দেওয়া এবং সেলে রেডিও স্থাপন।
      ১৯৫০ সালের ৫ই এপ্রিল কমিউনিষ্ট বন্দীদের প্রেরণায় কতিপয় দাবীর ভিত্তিতে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের সাধারণ কয়েদীগণ অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। ইহা কমিউনিস্ট বন্দীদের সর্বাত্মক বৈপ্লবিক কর্মধারায় একটি দিক। কারা বহির্ভাগে সমগ্র দেশবাসী যখন তাহাদের সশস্ত্র বিপ্লবের ডাকে কোনপ্রকার আমলই দেয় নাই, তাহাদের ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যয়, লাখো ইনসান ভূখা হ্যায়‘ মুখোরোচক আওয়াজকে কতিপয় বিভ্রান্ত আদম সন্তানের মতিভ্রম বলিয়া জ্ঞান কারিয়াছে, তখন তাহারা কারান্তরালেই সরকার উৎখাতের বৈপ্লবিক প্রেরণায় সাধারণ কয়েদীদিগকে প্ররোচিত করেন। একাত্মতা প্রকাশের নাম করিয়া কমিউনিষ্ট বন্দীগণ ৭ই এপ্রিল হইতে অনশনরত সাধারণ বন্দীদের দাবীর সমর্থনে অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। সরকারের সহিত আপোষ-মীমাংসায় স্থির হয় যে, কয়েদীরা নিজের পয়সায় কারান্তারালে ধুমপান করিতে পারিবে, দ্বিতীয়তঃ কয়েদীগণকে দিয়া গানি টানানো হইবে না; তৃতীয়তঃ কয়েদীদিগকে অযথা প্রহার করা হইবে না। দাবী মানিয়া লইবার পর ১৫ই এপ্রিল কয়েদীগণ অনশন ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন।