কারা জীবনে বৈচিত্র্য

ফন্ট সাইজ:

     বৈচিত্র্যহীন কারাজীবন মাঝে মাঝে বিভিন্ন ঘটনারাজীর সমাবেশে কিছুটা আনন্দদায়ক ও কৌতুকময় হইয়া উঠে। রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও জনাব বাহাউদ্দিন চৌধুরী আমার বন্ধু ছিলেন। তিনি বরিশালের বিখ্যাত উলানিয়া জমিদার পরিবার তনয়। মা-বাবার আদরের দুলাল। জেল ফটকে সাক্ষৎকারের সময় তাহাকে স্নেহময়ী মা স্বহস্তে তৈরী বরফী, মোরব্বা সমেত কিছু বিদেশী বিস্কুটের টিন দিয়া গিয়াছিলেন। আমার মায়ের স্বহস্তে তৈরী নানা সুস্বাদু দ্রব্য আমার মনে পড়িল। বাহাউদ্দিন সাহেব ঘুম-কাতর। সকালে বেশ বিলম্বেই তিনি শয্যা ত্যাগ করেন। গভীর রাত্রের অন্য সহবন্দীদের ঘোর নিদ্রার সুযোগে রহমান সাহেব নামক সাজাপ্রাপ্ত কয়েদী বন্ধুর প্ররোচনায় আমরা কয়েকজন বেশ আরামে তাহার মায়ের দেওয়া উপাদেয় বরফী, মোরব্বা, বিদেশী বিস্কুটগুলি সংযোগে রসনা তৃপ্ত করিলাম। তবে একেবারে নিঃশেষ করি নাই। বেশ কিছু অংশ নিদ্রামগ্নদের প্রাতঃরাশের নিমিত্ত রাখিয়া দিলাম। সকাল বেলা চৌধুরী সাহেব অভ্যাস মত ৯-৩০ মিঃ মি ১০ ঘটিকার দিকে নাস্তা করিতে বসিয়াই বোকা ও হতভম্ব হইয়া গেলেন। সব ভদ্রবন্দী, ওয়ার্ড তালাবব্ধ। বাহিরের অন্য কোন দুশ্চরিত্র সাজাপ্রাপ্ত বন্দীর প্রবেশ অসম্ভব। তিনি নিজে ভূতে বিশ্বাস করেন না অথচ কান্ডটা ভৌতিক। মুজিব বাইয়ের কানে ঘটনাটি উঠিল। মুখ চাওয়া-চাওয়ি, ‘‘তাইতো কি করিয়া হইল’’ ইত্যাদি অনুতাপ-আক্ষেপ ও মন্তব্য ছাড়া কাহারো কিছু বলিবার ছিল না। গোল বাঁধাইলেন রহমান সাহেব। তাঁহার পেটে কোন কথা থাকে না। অতএব চোর ধরা পড়িলাম। অগত্যা স্বীকার করিলাম, একটু আধ্টু-চুপিচাপি আহারাদি অন্যের অলক্ষ্যে করিয়া থাকি। ইহা আমার আশৈশব ‘প্রশিক্ষণ’ বা ‘অভ্যাস’। কিশোর বয়সে কালাজ্বর রোগাক্রান্ত হওয়া সত্বেও চিকিৎসকের নিষেধাজ্ঞা ও মায়ের সতর্ক দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়া গভীর রাত্রে কুপথ্য চিংড়ি মাছ চুরি করিয়া খাইতাম- মা অবশ্য বমাল ধরিয়া ফেলিয়াছিলেন। মুজিব ভাইকে বলিলাম, আমি একা নই, অনেকেই একযোগে এই সৎ কাজটি করিয়াছি। এক ঘেয়ে কারাজীবনে বৈচিত্রের স্বাদ সবাইকেই দিলাম, তাই ধন্যবাদ আমাদেরই প্রাপ্য। উল্লেখ্য যে জনাব বাহাউদ্দিন চৌধুরী ঢাকা নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন, মুজিব ভাইয়ের নেতেৃত্বে ৬ দফা আন্দোলনে দেশ যখন উথাল পাতাল ও প্রকম্পিত তখন তারই সুযোগ্য নেতৃত্বে ঢাকা নগরের আয়ূব মোনায়েম বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। পরবর্তীতে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের সরকারের তথ্য সচিব ছিলেন।