রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলনের পটভূমিকা

ফন্ট সাইজ:
     ১৯৪৯ সালের জুন মাসেই এনায়েত করিম, শাসসুল হুদা এবং আমি একই দিন শুক্রবার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার হইতে মুক্তি লাভ করি। কারা মুক্তির পরই পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগ কর্মী শিবির অফিস ১৫০নং মোগলটুলীতে জনাব শওকত আলীর সহিত সাক্ষৎ করিয়া নেতা শামসুল হক সাহেবের টাঙ্গাইলে উপনির্বাচনের বিজয় কাহিনী গর্বের সহিত শুনিলাম। তাহার নিকট আরো অবগত হইলাম যে, আগামী ২৩শে ও ২৪শে জুন ঢাকায় মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন আহবান করা হইয়াছে ও তদুপলক্ষে মওলানা আবদুল হামিদ খানকে (ভাসানী) সভাপতি ও ইয়ার মোহাম্মদ খানকে সম্পাদক করিয়া একটি শক্তিশালী অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করা হইয়াছে। ১৫০ নং মোগলটুলী, ঢাকা, ১৯৪৪ সাল হইতে মুসলিম বাংলার রাজনীতিতে প্রগতিশীল চিন্তাধারার প্রাণকেন্দ্র। ১৯৪৩ সালের ৬ই নভেম্বর বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কাউন্সিল সভায় জনাব আবুল হাশিম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ায় মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে নূতন যুগের সূচনা হয়। তিনি অনাগত পাকিস্তানের দর্শনের আলোকে সুবই সুস্পষ্ট ও পরিচ্ছন্নভাবে সাধারণ্যে তুলিয়া ধরিলেন। তাহার দার্শনিক ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় বুদ্ধিজীবি ও তরুণ মুসলিম ছাত্র সমাজ উদ্ধুদ্ধ হইলেও ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের বশংবদ ভূস্বামী, সুদখোর মহাজন ও ধর্মান্ধ শ্রেণীর লোকেরা দার্শনিক নেতা আবুল হাশিমের উপর খড়গহস্ত হইয়া উঠিল। যাহা হউক, আবুল হাশিম সাহেবের সাংগঠনিক শক্তির দ্বারাই পাকিস্তান হাসেল সম্ভব হয় এবং ইহার দ্বারা প্রতিক্রিয়াশীল ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের খুঁটি নওয়াব, স্যার, খান বাহাদুর ও খান সাহেবদের অশুভ প্রভাব হইতে মুসলিম লীগকে মুক্ত করা সম্ভব হয়। সাংগঠনিক তৎপরতা অন্যতম পদক্ষেপ হিসাবে তিনি ১৯৪৪ সালের ৯ই এপ্রিল তরুণ নেতা শামসুল হকের সুযোগ্য কর্তৃত্বাধীনে ঢাকায় ১৫০নং মোগলটুলীর দ্বিতল ও ত্রিতলে পূর্ববঙ্গ মুসরিম লীগ কর্মী শিবির প্রতিষ্ঠা করেন। ইহাতে সার্বক্ষণিক কর্মীদের আহার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা ছিল।
     ঢাকা জেলা মুসলিম লীগ ঢাকা নওয়াব বাড়ীর কুক্ষিগত ছিল। রক্ষণশীলতার দুর্গ ঢাকায় নওয়াব বাড়ীতে ১৯৪৪ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ঢাকা জেলা মুসলিম লীগ নির্বাচনে কর্মী শিবির মনোনীত প্রার্থীদ্বয় মানিকগঞ্জের আওলাদ হোসেন বিশ্বাস ও মুন্সীগঞ্জের কপর্দকহীন তরুণ নেতা শামসুদ্দিন আহমদ ঢাকা নওয়াব বাড়ি মনোনীত প্রার্থীগণের বিরুদ্ধে যথাক্রমে ঢাকা জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি ও সম্পাদক নির্বাচিত হইয়া নূতন চিন্তাধারার জয়যাত্রা সূচনা করেন। দ্বিতীয়তঃ ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসের সাধারণ নির্বাচনে মনোনয়ন দানকল্পে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারী বোর্ডের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই উপলক্ষে কলিকাতার মুসলিম ইনষ্টিটিউট হলে লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়; উহাতে হাসান ইস্পাহানীর ইংরেজী ‘দৈনিক ষ্টার অব ইন্ডিয়া‘ খাজা নূরুদ্দিনের ইংরেজী ‘দৈনিক মনির্ং নিউজ’ ও মওলানা মোহাম্মদ আকরম খার বাংলা ‘দৈনিক আজাদ’ প্রভৃতি পত্রিকার একচেটিয়া বিরোধীতা সত্ত্বেও দার্শনিক আবুল হাশিমের চিন্তায় উদ্বুদ্ধ তরুণ সম্প্রদায়ের একান্ত প্রচেষ্টায় পাঁচটি আসনে শহীদ-হাশিম জোট জয়লাভ করেন। ভারতবর্ষে ও বংগদেশ বিভক্তির পর খাজা নাজিমুদ্দিন পূর্ববঙ্গে মন্ত্রিসভা গঠন করেন। বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সভাপতি মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ পূর্ববঙ্গ আগমনের পর সাবেক প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সভাপতি মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ পূর্ববঙ্গ আগমনের পর সাবেক প্রাদেশিক লীগ ওয়ার্কিং কমিটির পূর্ববংগীয় সদস্যবর্গ ও আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সিলেট জেলার সদস্যবৃন্দ সহযোগে পূর্ববঙ্গ লীগ ওয়ার্কিং কমিটি গঠিত হয়। ইহাতে আসাম প্রদেশিক মুসলিম লীগ সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান (ভাসানী), সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ আলী, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ও দেওয়ান বাসেত সদস্য নিযুক্ত হইয়াছিলেন।  কিন্তু ব্যাপার বিশেষ সুবিধাজনক মনে না হওয়ায় পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটি ভাঙ্গিয়া দিয়া মওলানা আকরম খানকে চেয়ারম্যান, জনাব ইউসুফ আলী চৌধুরী ও জনাব আসাদুল্লাহকে যুগ্ম আহবায়ক, ডাঃ আবদুল মোত্তালেব মালিক ও সর্বজনাব আহমদ হোসেন (রংপুর), নূরুল আমিন, মাওলানা আবদুল্লাহিল বাকী, হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী ও সিলেটের মনোয়ার আলীকে সদস্য করিয়া পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটি পুর্নগঠন করা হইল। ইতিমধ্যে ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ই ডিসেম্বর করাচীতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের পাকিস্তান এলাকাভুক্ত কাউন্সিল সদস্যদের সমন্বয়ে চৌধুরী খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে পাকিস্তান মুসলিম লীগ গঠিত হয়।
     শহীদ হাশিম জোট সমর্থক মুসলিম লীগ ও ছাত্র কর্মীবৃন্দ কলিকাতা ও অন্যান্য স্থান হইতে হইতে ঢাকায় আসিয়া ১৫০ নং মোগলটুলীস্থ পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগ কর্মী শিবিরের শক্তি বৃদ্ধি ও ইহাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করিতে লাগিলেন। উজীরে আলা খাজা নাজিম-আকরম খাঁ জোট ১৫০ নং মোগলটুলী কর্মীশিবির বা ওয়ার্কারস ক্যাম্পকে মুসলিম লীগের রাজনৈতিক অংগন হইতে বিতাড়িত করিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। তাই বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ন্যাশনাল গার্ড নায়েব সালারে সুবা জহিরুদ্দিন আহমদকে উজীরে আলা খাজা নাজিমুদ্দিন  প্রথমে কারাগারে প্রেরণ ও পরবর্তীকালে পূর্ববঙ্গ হইতে বহিস্কার করিলেন। রাজনীতি আর কাহাকে বলে! ওয়ার্কারস ক্যাম্পের তরফ হইতে কর্মী শিবিরের তরুণ নেতৃবর্গ যথা শামসুল হকম ফজলুল কাদের চৌধুরী, অবদুস সবুর খান, আতাউর রহমান খান, খন্দাকর মোশতাক আহম, শেখ মুজিবুর রহমান, কামরুদ্দিন আহমদ ও মিসেস আনোয়ারা খাতুন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ কমিটি চেয়ারম্যানের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া প্রাথমিক সদস্য সাগ্রহ রসিদ বই সরবরাহ করিতে অনুরোধ জানাইলেন। মাওলানা আকরম খা অনুরোধ রক্ষা করিতে অস্বীকৃতি জানাইলে নারায়ণগঞ্জ রহমতুল্লাহ ইনস্টিটিউটে মুসলিম লীগ কর্মীদের সম্মেলন আহবান করা হয়। খান সাহেব ওসমান আলী এম.এল.এ কে সভাপতি নির্বাচিত করিয়া একটি শক্তিশালী অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করা হয়। রহমতুল্লাহ ইনস্টিটিউট ব্যবহারে সরকারী নিষেধাজ্ঞা জারি করা হইলে সম্মেলন পাইকপাড়া ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে সিথার হয় যে, সর্ব জনাব আতাউর রহমান খান, আবদুস সালাম খান, ফজলুল কাদের চৌধুরী, খয়রাত হোসেন  এম.এল, এ ও মিসেস আনোয়ারা খাতুন করাচী মুসলিম লীগ প্রধান চৌধুরী খালেকুজ্জামানের সহিত সাক্ষাৎ করিবেন। প্রকৃতপক্ষে জনাব আতাউর রহমান খান ও আনোয়ারা খাতুন করাচী গেলেন; চৌধুরী খালেকুজ্জামান প্রতিনিধিদ্বয়ের বক্তব্য আগ্রহ সহকারে শ্রবণ করিলেন বটে তবে প্রাথমিক সদস্য সংগ্রহে রসিদ বই সরবারাহ করিবার ব্যাপারে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করিতে অস্বীকৃতি জানাইলেন। মুসলিম লীগ আকরম খাঁ নাজিম চক্রের কুক্ষিগত হইল। এইভাবেই নিষ্ঠাবান দেশপ্রেমিক ও প্রগতিশীল যুবসম্প্রদায় মুসলিম লীগ সংগঠনে অপাংক্তেয় ও অবাঞ্চিত হইয়া পড়িলেন। বলিতে ভুলিয়াছি, ইতিমধ্যে ১৯৪৮ সালের ১৯শে অক্টোবর মাওলানা আকরম খাঁ সাহেবের নিজস্ব ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকা ঢাকায় স্থানান্তরিত ও প্রকাশিত হইয়াছিল এবং ‘আজাদ’ উহার নিজস্ব ধারায় প্রাচরকার্য চালাইয়া যাইতেছিল। যদিও দৈনিক আজাদ ব্যক্তি মালিকানাধীন পত্রিকা তথাপি আজাদ কর্তৃপক্ষ পত্রিকা প্রকাশের ব্যাপারে জমিজমাসহ সকল প্রকার সরকারী মদদ লাভ করিয়াছিলেন। এটাই আমাদের চরিত্রের নমুনা।