পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন

ফন্ট সাইজ:
     সম্মেলন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করিবার প্রস্তাব উত্থাপিত হইলে আমি জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সকল নাগরিকের প্রবেশাধিকার দিয়া সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন করিবার প্রস্তাব করি। নারায়ণগঞ্জের তরুণ নেতৃদ্বয় সর্বজনাব আলমাস আলী ও আবদুল আওয়াল প্রস্তাবের বিরোধিতা করিতে গিয়া আমার উপর রোষে ফাটিয়া পড়েন। দেখা গেল, আমরা কতিপয় ছাত্র ব্যতীত আর সকরেই আওয়ামী মুসলিম লীগ কর্মী। আকরাম খাঁ, নুরুল আমিন, চৌধুরী খালেকুজ্জামান ও লিয়াকত আলী পরিচালিত মুসলিম লীগ হইল সরকারী মুসলিম লীগ এবং আমাদেরটি হইবে আওয়ামের অর্থাৎ জনগণের মুসলিম লীগ। ঢাকা হাইকোর্টে জনাব দবিরুল ইসলামের হেবিয়াস কর্পাস মামলা পরিচালনার জন্য জনাব সোহরাওয়ার্দী যখন ঢাকায় আসিয়াছিলেন, তখনই তিনি উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ নেতা মানকী শরীফের পীর সাহেবের অনুকরণে সংগঠনের নাম আওয়ামী মুসলিম লীগ রাখার পরামর্শ দিয়াছিলেন। স্মর্তব্য যে, জনাব সোহরাওয়ার্দী ছিলেন পাকিস্তান গণপরিষদে মুসলিম লীগ দলীয় সদস্য। বিরোধবশতঃ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খান স্বয়ং উদ্যোগী হইয়া ১৯৪৮ সালের শেষার্ধে জনাব সোহরাওয়ার্দীর গণপরিষদের সদস্যপদ বাতিল ঘোষণা করেন। অথচ এই দিকে ভারত সরকার সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষবশতঃ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নিকট ৬৭ লক্ষ টাকা আয়কর দাবী করিয়াছিলেন। ভারতে তাঁহার ব্যক্তিগত ব্যাংক একাউন্ট বাজেয়াপ্ত হইয়াছিল। এমন কি তাঁহার মোটর গাড়িটি পর্যন্ত ছিনাইয়া লওয়া হইয়াছিল। এইভাবেই বাস্তহারা সোহরাওয়ার্দীকে ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে ভারতভুমি ত্যাগ করিয়া কপর্দকহীন অবস্থায় লাহোর আসিতে হইয়াছিল। যাহা হউক, জনাব সোহরাওয়ার্দীর আসনে উপনির্বাচন ঘোষণা করা হইল এবং এই উপনির্বাচনে জনাব সোহরাওয়ার্দী মুসলিম লীগ মনোনীত প্রার্থী ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিবাসী জনাব শহীদুল হকের নিকট পরাজয় বরণ করেন। উল্লেখ্য যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হওয়ার এতকাল যাবৎ সরকার বিরোধী রাজনীতিতে যে সংগঠনিক শূন্যতা বিরাজ করিতেছিল, তাহা বিদুরিত হইল। বিশেষ করিয়া বিভাগ পূর্ব আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান (ভাসানী) ও টাঙ্গাইল উপনির্বাচনে সদ্য নির্বাচিত তরুণ নেতা জনাব শামসুল হক যথাক্রমে সভাপতি ও সাধরণ সম্পাদকের এই নব গঠিত সংগঠনের সহিত জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী একাত্মতা তাঁহাকে মুসলিম লীগ প্রধানমন্ত্রী নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খানের বিকল্প সর্ব-পাকিস্তানী নেতারূপে উপস্থাপিত করিল।
     এই দিকে জনাব সোহরাওয়ার্দীর মাধ্যমে মানকী শরীফের পীরের নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের সহিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের যোগসূত্র সৃষ্টির সম্ভাবনা উজ্জ্বল হওয়ায়, সংগঠন নিখিল পাকিস্তানী চরিত্র ও মর্যাদা লাভ করিতে শুরু করিল। এই বাস্তব পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িক নামের জন্য যদিও আমি আওয়ামী মুসলিম লীগের সদস্য হইতে অস্বীকৃতি জানাইয়াছিলাম তথাপি ইহার সহযোগী রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কাজ করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকরূপে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিটি কর্মসূচীকে সফল করিতে সর্বপ্রকার সক্রিয় সহযোগিতা করিয়াছি।
      যাহা হউক, সম্মেলনে নিম্নলিখিত নেতৃবর্গসহ চল্লিশ সদস্যবিশিষ্ট অর্গানাইজিং কমিটি গঠিত হইলঃ
মওলানা আবদুল হামিদি খান (ভাসানী)                            সভাপতি
আতাউর রহমান খান, এডভোকেট                                  সহ-সভাপতি
সাখাওয়াত হোসেন, প্রেসিডেন্ট, ঢাকা চেম্বর অব কমার্স       সহ-সভাপতি
আলী আহমদ কান, এম.এল.এ                                       সহ-সভাপতি
আলী আমজাদ খান, এডভোকেট                                   সহ-সভাপতি
আবদুস সালাম খান, এডভোকেট                                    সহ-সভাপতি
শামসুল হক                                                                সাধারণ সম্পাদক
শেখ মুজিবুর রহমান                                                    যুগ্ম সম্পাদক
খন্দকার মোশতাক আহমদ                                            সহ-সম্পাদক
এ,কে, এম, রফিকুল হোসেন                                          সহ-সম্পাদক
ইয়ার মোহাম্মদ খান                                                    কোষাধ্যক্ষ
 
      উল্লেখ্য যে, শেখ মুজিবর রহমান কারাগারে আটক থাকিবার দরুন উক্ত সম্মেলনে যোগদান করিতে পারেন নাই। আমরা জনকয়েক সদ্য কারামুক্ত ছাত্রের প্রস্তাবেই তাঁহাকে একমাত্র যুগ্ম সম্পাদক করা হইয়াছিল।
      ২৪শে জুন অপরাহ্নে সরকারী লীগের হুমকি ও হামলা উপেক্ষা করিয়া আরমানিটোলা ময়দানে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে নব গঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম প্রকাশ্য সভা অনুষ্ঠিত হয়।