জাতীয় কংগ্রেস ও কমিউনিষ্ট পার্টি

ফন্ট সাইজ:
       ১৯৪৭ সালের আগষ্ট মাসে আজাদী লাভের পর জাতীয় কংগ্রেস পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদে ও  পাকিস্তান গণপিরষদের বিরোধী দলীয় প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু পরিষদের বাহিরে অবস্থার বিপাকে পড়িয়াই কংগ্রেস হিন্দু সম্প্রদায়ের সংকীর্ণ স্বার্থ রক্ষায় জড়িত হইয়া পড়ে। কংগ্রেসে নেতৃত্ব ও কাঠামো স্বাভাবিকভাবেই ছিল হিন্দু অধ্যূষিত। এইদিকে ভারত বিভাগজনিত কারণে পাক-ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুণগত যে পরিবর্তন দেখা দেয়, উহার ফলে সেই বাস্তব সত্যকে অস্বীকার করিয়া পাকিস্তানের মাটিতে, তাহাদের পক্ষে প্রকাশ্যে কার্যকর রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ পরিচালনা রড একরুপ অসম্ভব হইয়া পড়িয়াছিল, তাহা স্বীকার করিতেই হইবে।
      কমিউনিষ্ট পার্টির অবস্থা ছিল কিছুটা ভিন্ন। সাধারণ সম্পাদক পূরণ চন্দ্র যোশীর (পি,সি,যোশী) পরিচালনায় ভারতীয় কমিউনিষ্ট পার্টি আজাদী লাভের পর অর্থাৎ ইংরেজ কর্তৃক ক্ষমতা হস্তান্তরের পর পাক-ভারত উভয় সরকারকে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সমর্থনদানের নীতি ঘোষণা করে। সরকারের সহিত সহযোগিতার নীতির আড়ালে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে ভাতে হইতে কমরেড ভবানী সেন ঢাকা আগমন করেন এবং কোন মহল হইতে বাধাপ্রাপ্ত না হইয়াই ঢাকা সদরঘাটস্থ করনেশন পার্কের এক জনসভায় বক্তৃতা দেন। এমন কি কমরেড মোজাফফর আহমদও কলকাতা হইতে অসিয়া ঢাকার রথ-খোলার ন্যাশনাল বুক এজেন্সীর দ্বারোদঘাটন করেন। গোল বাঁধিল কলিকাতায় ১৯৪৮ সালের ২৮শে ফেবু্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ভারতীয় কমিউনিষ্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস অধিবেশনের পর। এই অধিবেশনেই কমরেড ভালচন্দ্র ত্রিথৃক রনদিভের (ভি,টি,রনদিভ) তত্ত্ব অনুযায়ী কমিউনিষ্ট পার্টি সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাদের মূলোচ্ছেদ, ইংগ-মার্কিন সরকারদ্বয়ের দোসর ধনিক-বণিক, ভূস্বামী প্রতিবু পাক-ভারত সরকারকে উচ্ছেদ করিবার প্রয়োজনে সমাজতান্ত্রিক সশস্ত্র বিপ্লব সংগঠনের আহবান জানায়।
 
এই দিকে ভারতীয় উত্তর প্রদেশবাসী কমরেড সাজ্জাদ জহিরকে সম্পাদক নিযুক্ত করিয়া পাকিস্তান কমিউনিষ্ট পার্টি গঠিত হয়। কমিউনিষ্টদের নবদীক্ষা ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনছান ভুখা হ্যায়’ পাক-ভারত সরকারদ্বয়কে ক্ষিপ্ত করিয়া তুলে। ইহারই বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় ঢাকায় ১১ই মার্চ (১৯৪৮) কমউনিষ্ট পার্টি কাপ্তানবাজারে অবস্থিত কেন্দ্রীয় দফতর ও কোর্ট হাউস স্ট্রীটে অবস্থিত ঢাকা নগর দফতরের উপর জনতার আক্রমণে। কমিউনিষ্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন, ছাত্র ফেডারেশন, শ্রমিক সংগঠন, রেইল রোড ওয়ার্কাস ইউনিয়ন ও কৃষক সংগঠন এবং কিষাণ সভার বহু কর্মী সশস্ত্র পথে সরকার উৎখাত করিবার নীতির প্রতিক্রিয়া স্বরূপ কারারুদ্ধ হন। ১৯৪৮ সালের ৩০ শে জুন অপরাহ্নে সদরঘাটস্থ করনেশন পার্কে সুসাহিত্যিক মুনির চৌধুরীর সভাপতিত্বে কমিউনিষ্ট পার্টি আহূত জনসভা অনুষ্ঠিত হয়; কিন্তু জনতার আক্রমণে ভীত-সন্ত্রস্ত কমিউনিষ্ট কর্মীরা স্ব স্ব-প্রাণ বাঁচাইবার প্রয়াসে সভাস্থল হইতে ঊর্ধ্বশ্বাসে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেন। সরকার সমর্থক মুসলিম ছাত্র লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহ আজিজুর রহমান বীরদর্পে বক্তৃতা মঞ্চে আরোহণ করিয়া জনতার উদ্দেশে নাতিদীর্ঘ ভাষণ দান করেন। এইভাবেই রাষ্ট্রদ্রোহী, ধর্মদ্রোহী ও নাস্তিক বলিয়া অভিযুক্ত কমিউনিষ্ট পার্টির কর্মীবৃন্দ ধীরে ধীরে প্রকাশ্য কর্মসূচী বর্জন করিয়া গোপন সংগঠনের দিকে মনোনিবেশ করে।
      আত্মগোপন অবস্থায় কমরেড মনি সিংহ ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোনা মহকুমার অন্তর্গত দুর্গাপুর অমুসলমান হাজং এলাকায়, কমরেড ইলা মিত্র রাজশাহী জেলার নওয়াবগঞ্জ মহকুমা অন্তর্গত অমুসলমান সাঁওতাল সম্প্রদায় অধ্যুষিত নাচোল এলাকয়, কমরেড সুব্রত পাল সিলেট জেলার বিয়ানী বাজার থানার অন্তর্গত অমুসলমান, নমঃশূদ্র ও দাস সম্প্রদায় অধ্যুষিত সানেস্বর এলাকায়, পার্টি নেতৃত্ব খুলনা জেলার ডুমুরিয়া ও অমুসলমান নমঃশূদ্র প্রধান ধানমুনিয়া এলাকায়, যশোহর জেলার সদর মহকুমা ও নড়াইল মহকুমাভুক্ত বামাপাড়া ও নড়াইল থানা অন্তর্গত জামদিয়া, সেখাটি, তুলারাপুর, নড়াই ও কলোরা ইউনিয়নগুলির অমুসলমান নমঃশূদ্র এলাকায় সশস্ত্র কৃষক অভ্যূত্থান ঘটায়। এইভাবেই অমুসলিম সম্প্রদায়ের স্বাভাবিক অন্ধ পাকিস্তান বিদ্বেষকে মূলধন করিয়া পার্টি কমরেডগণ শ্রেণী সংগ্রামের ভাওতা ও দোহাই দিয়া পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায়  সশস্ত্র অভ্যূত্থান ঘটাইবার বহু চেষ্টা করিয়াছে। রুঢ় হইলেও বাস্তব সত্য এই যে, কমিউনিষ্ট পার্টি পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা আশি হইতে পঁচাশি জন মুসলিম অধিবাসীর বিন্দু মাত্র আস্থা অর্জন করিতে পারে নাই।
     উল্লেখ্য যে, পাকিস্তান কমিউনিষ্ট পার্টি সম্পাদক কমরেড সাজ্জাদ জহির সশস্ত্র বিপ্লবের কদর্থ করিয়া সরকার উতখাতের উন্মুক্ততায় সামরিক বাহিনীতে উচ্চাভিলাষী সমর নেতাদের চক্রান্তের সহিত জড়াইয়া পড়েন এবং মেজর জেনারেল আকবর খাঁনের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাইবার চেষ্টা করেন; জনগণ হইতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার দরুন এই ধরনের উগ্র ও বিকৃত মানসিকতা দেখা দেওয়া মোটেও বিচিত্র নয়। এইভাবে ভূল কর্মসূচী গ্রহণের ফলে সম্ভাবনাময় কমিউনিষ্ট পার্টির বিভিন্ন গণসংগঠন যদিও ভাঙ্গিয়া চুরমার হইয়া গেল তবুও তাঁহাদের সংগ্রামের ফলে সৃষ্ট সাধারণ সরকার বিরোধী মনোভাব আওয়ামী লীগ সংগঠনকে অগ্রযাত্রায় বহুলভাবে সহায়তা করিয়াছিল।