ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা

ফন্ট সাইজ:

      তদানীন্তন দৈনিক পত্রিকাগুলি কদাচিৎ সরকার বিরোধী সংগঠনের সংবাদ প্রকাশ করিত। এমনকি জনগণের বিভিন্ন সমস্যাও দৈনিক পত্রিকাগুলির পৃষ্ঠায় স্থান পাইত না। তাই, মওলানা ভাসানী সাপ্তাহিক ‘ইত্তেফাক’ প্রকাশের অনুমতি নিলেন। জনাব আছগর হোসেন এম.এল.এ-এর ঢাকাস্থ ৭৭ নং মালিটোলা বাসস্থানে অবস্থিত ছাপাখানা হইতে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক ১৫ই আগষ্ট (১৯৪৯) প্রকাশিত হয়। কিছুকাল পর ঢাকার কলতাবাজারে অবস্থিত করিম প্রিন্টিং প্রেস হইতে প্রকাশিত হইতে থাকে কিন্তু সরকারী হামলার ভয়ে মুদ্রণালয়গুলি সাপ্তাহিক ইত্তেফাক ছাপাইতে অস্বীকার করিল। সুতরাং অনুমতি প্রার্থনাকালে মজলুম নেতা মাওলানা ভাসানীর স্থলে জনাব ইয়ার মোহাম্মদ খান অত্র সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের প্রকাশক ও মুদ্রাকর হইলেন। ৯নং হাটখোলা রোডে অবস্থিত প্যারামাউন্ট প্রেস হইতে মুদ্রিত ও ৯৪ নং নবাবপুর রোড হইতে তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া)- এর সম্পাদনায় প্রকাশিত হইতে থাকে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও ইয়ার মোহাম্মদ খান এই সরকার বিরোধী পত্রিকা ও আওয়ামী লীগ মুখপত্র সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের অর্থ যোগান দিতেন। সাপ্তাহিক বা দৈনিক ইত্তেফাকের আর্থিক সমস্যা মোকাবিলায় পূর্ব পাকিস্তান সরকারের তদানীন্তন সেক্রোটারী ( সচিব) জনাব আজগর আলী শাহ্ (আই,সি,এস,বা ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস)-এর অবদান অপরিসীম। জনাব তফাজ্জল হোসেন কলিকাতা হইতে ঢাকা আগমন করিবার পর জনাব খয়রাত হোসেনকে সঙ্গে লইয়া ইয়ার মোহম্মদ খানের সহিত দেখা করেন ও ইত্তেফাক পত্রিকার সমস্যাবলী সম্পর্কে বিশদ আালোচনা করেন। যেহেতু জনাব তফাজ্জল হোসেন পূর্বে কলিকাতার দৈনিক ইত্তেহাদের সহিত সংশ্লিষ্ট ছিলেন, সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাও তাঁহার আছে; তদুপরি তিনি ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের গোঁড়া সমর্থক; সেহেতু আলোচনায় স্থির হয় যে, অতঃপর জনাব তফাজ্জল হোসেন সাপ্তাহিক ইত্তেফাক সম্পাদনার দায়িত্বভার গ্রহণ করিবেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর জনাব ইয়ার মোহাম্মদ খান লিখিতভাবেই জনাব তফাজ্জল হোসেনকে উক্ত ক্ষমতা দান করেন। মাওলানা ভাসানী ইহার প্রতিষ্ঠাতা ও জনাব ইয়ার মোহাম্মদ খান প্রকাশক ও মুদ্রাকর রহিয়া গেলেন। এইভাবে ১৯৫১ সালের ১৪ আগষ্ট জনাব তফাজ্জল হোসেন সাপ্তাহিক ইত্তেফাক সম্পাদনার সর্বময় ক্ষমতাপ্রাপ্ত হন। অতঃপর তাঁহার সুযোগ্য সক্রিয় সহায়তায় সাপ্তাহিক ইত্তেফাক জনপ্রিয় পত্রিকায় পরিণত হয়। ১৯৫৪ সালের মার্চে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া এই জনপ্রিয় সাপ্তাহিকটি দৈনিক করিবার ব্যবস্থা গৃহীত হয় এবং সেই অনুযায়ী ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর ইত্তেফাক দৈনিক পত্রিকা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। মোজাম্মেল হক ও আবদুল কাদের দৈনিক ইত্তেফাকের জন্মলগ্ন হইতে তাহাদের অক্লান্ত শ্রমে ইহাকে দাঁড় করান। সে সময় প্যারামাউন্ট প্রেসের মালিক জনাব হাবিবুর রহমান তার নিজের কামরা খানিও দৈনিক ইত্তেফাকের কাজের জন্য ছাড়িয়া দেন। উপরোক্ত ব্যবস্থাপনা অটুট থাকে। অর্থাৎ মাওলানা ভাসানী ইহার প্রতিষ্ঠাতা, ইয়ার মোহাম্মদ খান ইহার 

 

নির্বাচনের অব্যবহিত পরই বোধহয় কোন কোন অবাঞ্ছিত মহলের প্ররোচনায় দৈনিক ইত্তেফাকের পৃষ্ঠায় ‘প্রতিষ্ঠাতা’ মাওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু হয়। জনাব ইয়ার মোহম্মদ খান এই অপতৎপরতার প্রতি সম্পাদক জনাব তফাজ্জল হোসেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মাওলানা ভাসানীর সংগ্রামী বিবৃতি ও বক্তৃতা যুক্তফ্রন্টের অনেকেরই চক্ষুশূল ছিল। তাই স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্ররোচনায় পূর্ব পাকিস্তানের তদানীন্তন উজীরে আলা ( এপ্রিল-মে১৯৫৪) শেরে বাংলা এ,কে ফজলুল হকের নির্দেশে ঢাকা জিলার তদানীন্তন প্রশাসক সিলেট নিবাসী ইয়াহিয়া চৌধুরী ১৯৫৪ সালে ১৪ই মে গভীর রাত্রে অন্যায়ভাবে ইয়ার মোহাম্মদ খানের অজ্ঞাতসারেই সম্পাদক জনাব তফাজ্জল হোসেনকেই ইত্তেফাকের প্রিন্টার ও পাবলিশার করিবার ব্যবস্থা করেন। ইহার পর হইতেই দৈনিক ইত্তেফাকের শিরোনামায় মাওলানা ভাসানী আর ‘প্রতিষ্ঠাতা’ রূপে নয় বরং ‘পৃষ্ঠপোষক’ হিসাবে স্থান পাইতে থাকেন। উল্লেখ্য যে, সংগঠনের বৃহত্তর স্বার্থেই মাওলানা ভাসানী ও জনাব ইয়ার মোহাম্মদ খান ইত্তেফাকের উপর নিজেদের মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য আদালতের আশ্রয় গ্রহণ করেন নাই। এইদিকে কালের করালগ্রাসে দৈনিক ইত্তেফাকের শিরোনাম হইতে পৃষ্ঠপোষক মওলানা ভাসানীর নাম চিরতরে উধাও বা তিরোহিত হইয়া গেল। মাওলানা ভাসানীর মত জনপ্রিয় দেশবরেণ্য নেতাকেই যখন নোংরা রাজনীতির চোরাগোপ্তা মারের নিকট হার মানিতে হয়, তখন দেশের সাধারণ মানুষ অর্থাৎ যারা ইত্তেফাকেরই ‘লুব্ধকের’ ভাষায় ‘আকালু শেখ’, তারা কোন ছার!