বিভাগোত্তর সংখ্যালঘু সমস্যা

ফন্ট সাইজ:
      আমরা স্বল্প সংখ্যক তরুণ সাম্প্রদায়িক হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করিবার প্রতিজ্ঞায় ১৯৫০ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারী সুপারিন্টেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার বাবু জে,সি দাসের ৮নং র‌্যাংকিন স্ট্রীটস্থ বাসভবনের সম্মুখ চত্বরে মহৎপ্রাণ নাগরিকদের এক সভা আহবান করি। উক্ত সভায় নিম্নোক্ত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ঢাকা শান্তি রিলিফ কমিটি গঠিত হয়ঃ 
জনাব মোশাররফ হোসেন বি,সি,এ,     সভাপতি
শ্রী জে,সি, দাস সুপারিন্টেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার    সহ-সভাপতি
জনাব মীর্জা আব্বাস, ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট    সহ-সভাপতি
জনাব হামিদুর রসুল, ট্যাক্সেশন কমিশনার  সহ-সভাপতি
জনাব অলি আহাদ                                 সাধারণ সম্পাদক 
      উক্ত সভাতেই এই কমিটির একটি এক্সিকিউটিভ বডিও গঠিত হয়- ইহার সদস্য ছিল ১৩ জন। আমরা পশ্চিমবঙ্গ হইতে আগত উদ্বাস্তু পরীক্ষার্থী ছাত্রদের পরীক্ষার ব্যবস্থার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সহিত সাক্ষাৎ করি। কর্তৃপক্ষ আমাদের উপরোক্ত দাবীর যৌক্তিকতা মানিয়া নেন। সরেজমিনে অভিজ্ঞতা লাভের উদ্দেশ্যে ভারত হইতে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ডঃ প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ ও নিখিল ভারত কংগ্রেসের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদিকা মিস মৃদুলা সরাভাই এক শুভেচ্ছা মিশনে ঢাকা আগমন করেন। গুলিস্তানস্থ ঢাকা রেষ্ট হাউসে আমরা ঢাকা শান্তি কমিটির তরফ হইতে তাঁহাদের সহিত এক সৌজন্য ও শুভেচ্ছা বৈঠকে মিলিত হই। মত বিনিময়কালে ডক্টর প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ আমাদের সান্ত¦না ও উৎসাহ দান কল্পে বলেন “Determined minority rules the world”. 
      আমার সংঘাত ও ঝঞ্জাজর্জরিত জীবনে তাঁহার এই মন্তব্যটি আজও প্রতিনিয়ত আমার মনে সাহস ও ভরসা যোগায়। ইহাই বোধহয় মহৎ ও সৎ চরিত্রের যাদুকরী শক্তি। ডক্টর প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ পশ্চিমবঙ্গের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কালোবাজারী, মুনাফাখোর, বণিক শ্রেণী ও দূর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সরকারী দন্ড কঠোরভাবে ব্যবহার করিবার অপরাধে ধনিক বণিক ও অসৎ রাজনীতিবিদদের চক্রান্তে তাঁহাকে ১৯৪৮ সালের ১৫ই জানুয়ারী পদত্যাগ করিতে হয়। কায়েমী স্বার্থের যূপকাষ্ঠে সৎ শাসকদের যে কিভাবে বলী হইতে হয় ইহাই তাহার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। 
      সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার বিচলিত লিয়াকত আলী খান সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠিয়া অর্থহীন মান-মর্যাদার প্রশ্নভুলিয়া স্বীয় উদ্যোগে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সহিত বৈঠকে মিলিত হইতে দিল্লী গমন করেন। বৈঠকে উভয় দেশের সংখ্যালঘুদের রক্ষাকল্পে লিয়াকত-নেহরু জানমাল ইজ্জত বাঁচাইবার জন্য মহাত্মা গান্ধী ১৯৪৮ সালের ১লা জানুয়ারী পর্যন্ত নেহরু সরকার ও হিন্দু দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে একটানা অনশন করিয়া স্বীয় দাবী আদায় করেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির স্বার্থে মহাত্মাজী ও লিয়াকত আলী খানের এই উদ্যোগে ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকিবে। গান্ধীজীর মত মহৎ প্রাণ ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারী প্রার্থনা সভায় ধর্মান্ধ আততায়ীর হস্তে গুলীবিদ্ধ হইয়া প্রাণত্যাগ করেন। লিয়াকত আলী খানও নিহত হইয়াছিলেন ঘাতকের নিষ্ঠুর বুলেটে। এইভাবে যুগে যুগে বহু মহৎ প্রাণকে ধরাধাম ত্যাগ করিতে হইয়াছে।
      ১৯৪৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বহিস্কৃত হইবার পর হইতেই আমার অগ্রজ ভ্রাতৃদ্বয় আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিবার জন্য চাপ দিতেছিলেন। লন্ডনে ‘‘একচুয়ারী’’ পড়িতেও তাঁহারা পরামর্শ দিতেছিলেন। যে ভাই আমাকে রাজনীতি করিতে বাধা দিতেন না, সেই ভাই ডঃ এ, করিম তখন পি,এইচ.ডি করিতে বিদেশে অবস্থান করিতেছিলেন। ভাইদের পরামর্শ গ্রহণ করা আমার পক্ষে সম্ভব হইল না। তাই অন্যায়ের প্রতিকার করিবার উদ্দেশ্য রাজনীতি করিবার সংকল্প লইয়াই অবশেষে গৃহত্যাগ করি এবং অগ্রজসম তোয়াহা ভাইয়ের ঢাকার যোগীনগরস্থ বাসায় আশ্রয় লই। তোয়াহা সাহেবের স্ত্রী আমার প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ও স্নেহপরায়ণা ছিলেন। তাঁহার স্নেহের ঋণ শোধ করা আমার পক্ষে কখনো সম্ভব হইবে না।