দারুণ আর্থিক সংকটে বি.কম পরীক্ষা

ফন্ট সাইজ:
      বহিষ্কারাদেশপ্রত্যাহার করা হইলে ১৯৫০ সালে আমি বি.কম. পরীক্ষা দিবার সিদ্ধান্ত নিলাম। লজ্জায় কাহাকেও আর্থিক অনটনের কথা বলিতে পারিনা। অবিভক্ত বঙ্গীয় মুসলিম লীগের প্রগতিশীল গোষ্ঠীর অন্যতম নেতা জনাব এম,এ, জলিল আমার পরীক্ষার ফী ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অর্থ যোগান দেন। মামুলী প্রশংসা স্তুতি বাক্য ব্যবহার করিয়া আজ তাঁহাকে আমি ছোট করিব না। ভারত বিভাগ পূর্ব বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের দার্শনিক বিপ্লবী নেতা আবুল হাশিম কর্তৃক প্রতিষ্ঠত ও সুসাহিত্যিক কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস কর্তৃক সম্পাদিত সাপ্তাহিক মিল্লাত কলিকাতার ওয়েইলসলী ৩নং স্ট্রীটস্থ ইস্টার্ণ পাকিস্তান প্রিন্টিং প্রেস হইতে জনাব এম,এ, জলিল কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইত। মুসলিম লীগের বিপ্লবী প্রগতিশীল অংশের মূখপত্র ছিল সাপ্তাহিক মিল্লাত। সেইদিনকার মত সংকটাপন্ন সময়ে তাঁহার আর্থিক সাহায্য না পাইলে আমার বি.কম. পরীক্ষা বোধহয় দেওয়া সম্ভব হইত না। তিনি বলিতেন, রাজনৈতিক জীবনে পর্বত-প্রমাণ বাধা-বিপত্তি আসে। পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই রাজনৈতিক জীবনে অগ্রযাত্রা সম্ভব। তিনি আমাকে সর্বদাই সান্তনা দিতেন; বলিতেন, ইহা দান নহে, ইহার দ্বারা আমি আমার রাজনৈতিক দায়িত্বই পালন করিতেছি।
কিছুকালের মধ্যেই আরেক সমস্যা দেখা দিল। তোয়াহা ভাই ও ভাবী আমার পরীক্ষার মাত্র কিছুকাল আগে তাঁহাদের গ্রামের বাড়ীতে গেলেন। তাঁহাদের অনুপস্থিতিতে আমাকে অনেক দিন শুধু ছাতু ভিজাইয়া সেই ছাতুর নাড়ু খাইয়াই পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে হইয়াছে। পাশ্ববর্তী বাড়ীতেই আবুল হাসানাত ও আবুল বরকত ভাতৃদ্বয় থাকিতেন। তাঁহারা আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধু; কিন্তু তাঁহাদের নিকট ইহা প্রকাশ করা আমার চরিত্র বিরুদ্ধ। হয় আবুল বরকত কিছুটা আঁচ করে এবং আমাকে তাঁহার সহিত আহার করিতে অনুরোধ 
জানায়। আমি নানা কথার ফাঁকে তাহা এড়াইয়া যাই। 
      পরীক্ষার পড়াশুনায় ব্যাপৃত। এমনি সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ত্যাগী নেতা এম,এ, ওয়াদুদ ও ইব্রাহীম তাহা বাংলা ভাষায় আরবী হরফ প্রচলনের সরকারী অপচেষ্টা বাধা দানকল্পে কর্মসূচী গ্রহণের জন্য আলোচনা করিতে আমার নিকট আসেন। আলোচনা মোতাবেক পরদিন বিশ্ববিদ্যালয় গিয়া মধুর ক্যান্টিনে চা পানকালে শুনিতে পাই যে,বি,কম, পরীক্ষার তারিখ পিছাইবার জন্য একদল আড্ডাবাজ পরীক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উপর চাপ সৃষ্টি করিতেছে এবং কর্তৃপক্ষও তাহাদের চাপে নতি স্বীকারের মনোভাব দেখাইতে শুরু করিয়াছেন। আমি মধুর ক্যান্টিন হইতে তৎক্ষণাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার জনাব আবদুল হাদী তালুকদারের সহিত সাক্ষাৎ করি এবং পূর্ব নির্ধারিত তারিখে পরীক্ষা গ্রহণ করিতে অনুরোধ জানাই। আমার যুক্তি ছিল; অধিকাংশ পরীক্ষার্থী ছাত্রকে গরীব বাপ-মায়ের অতি কষ্টে অর্জিত অর্থে পরীক্ষার কারণে ঢাকায় থাকিতে হয়। রেজিস্ট্রার হাদী সাহেব আমার মত সর্বক্ষণ আন্দোলনমুখী ছাত্রের এই অনুরোধ প্রথমে সহজভাবে নিতে পারেন নাই, অর্থাৎ বিশ্বাসই করেন নাই। যাহা হউক, আমার কয়েকটি যুক্তি শ্রবণ করিয়া তিনি গম্ভীর মুখে কঠোর ভাষায় বলিলেন, ‘‘যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইহাকে কেন্দ্র করিয়া হট্টগোল হয়, তবে তাহার দায়িত্বও তোমাকেই বহন করিতে হইবে।’’
      পরদিন মধুর ক্যান্টিনে আড্ডাবাজ পরীক্ষার্থী ছাত্ররা আমাকে ঘিরিয়া ধরিল। তাহারা আমার নিকট হইতে পরীক্ষার তারিখ সম্পর্কে প্রশ্ন তুলিলে আমি অতি সহজ কণ্ঠেই জবাব দিলাম, ‘আন্দোলন করি, জেল খাটি, শিক্ষালয় হইতে বহিস্কৃত হই, ক্ষতিটা সর্বাংশে আমার হয়। অতএব পরীক্ষা পিছাইবার দাবী করাটা আমার পক্ষেই স্বাভাবিক।  আমার মত অধিকাংশ পরীক্ষার্থী ছাত্রই পরীক্ষা নির্ধারিত তারিখে দিতে চায়। কারণ, প্রথমতঃ পরীক্ষা পিছাইবার কারণে গরীব ছাত্রদের বাপ-মায়ের স্বল্প আয়ের উপর বাড়তি বোঝা বর্তায়, দ্বিতীয়তঃ মেধাবী পরীক্ষার্থী ছাত্রদের সময়ের অপচয় হয়, তৃতীয়তঃ অনেকেই পরীক্ষার পর পরই পরিবারের প্রয়োজনে জীবিকার অন্বেষণে আত্মনিয়োগ করে। তাহারা আমার উক্তি ও যুক্তি শুনিয়া অস্বস্তিবোধ করিতেছিল এবং নির্বাক দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকাইতেছিল। যাহা হইক, পরীক্ষা পূর্ব নির্ধারিত তারিখেই যথারীতি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হইল। পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের পর দেখিয়াছি মুজিবী শাসনামলে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার নামে কী জঘন্য ঘটনা ঘটিয়া গিয়াছে। দুঃখের সাথেই অনুভব করিয়াছি, ভবিষ্যতে এইসব অশিক্ষিত ডিগ্রীধারী তৈরীর জন্য জাতিকে অকল্পনীয় খেসারত দিতে হইবে। ইহাই ভবিতব্য, ইহার ব্যতিক্রম কোন কারণেই ঘটিবে না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলার অধ্যাপক আবুল ফজল সেই সময়ে বিবেককে বিক্রি না করিয়া দেশ ও জাতির স্বার্থে স্বীয় জীবনের ঝুঁকি লইয়াও শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা ও শিক্ষার পরিবেশ ফিরাইয়া আনিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। শিক্ষাঙ্গনের সাধারণ একজন কর্ণধার হইয়াও সেই সময়ে মুজিব সরকারের সর্বনাশা মত ও নীতির বিরুদ্ধে যে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করিয়াছেন, জাতির অগ্রযাত্রার তাহা স্বর্ণক্ষরে লিখা থাকবে।