শিক্ষা সম্মেলন

ফন্ট সাইজ:

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ছাত্রবেতন বৃদ্ধির পরিকল্পনা, ১৯৪১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী প্রতি দুই হাজার লোকের জন্য ১টি প্রাইমারী স্কুল, বিভিন্ন বিদ্যাভবন হইতে ছাত্র বহিস্কার, বাংলা ভাষায় আরবী হরফ চালু করার নিমিত্ত সরকারী উদ্যোগ ও খরচে সতেরটি কেন্দ্র চালু, পূর্ববঙ্গ সরকারের জয়েন্ট সেক্রেটারী মিজানুর রহমান কর্তৃক প্রবর্তিত উর্দূ-বাংলা সংমিশ্রিত ভাষা সৃষ্টির উদ্ভট প্রচেষ্টা ইত্যাদির বিরুদ্ধে অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে বন্ধ্যা শিক্ষানীতির ব্যাপারে সরকারকে সচেতন করিবার মানসেই আমরা ১৯৫০ সালের ১৫ ও ১৬ই সেপ্টেম্বর ঢাকায় নিখিল পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলন আহবান করি। আত্মগোপনকারী পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশন, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, পাকিস্তান ছাত্র এসোসিয়েশন ও নিরপেক্ষ কর্মীরা এক বৈঠকে সম্মেলন উদযাপনের উদ্দেশ্যে আমাকে সভাপতি ও জনাব রুহুল আমিনকে সম্পাদক নির্বাচিত করিয়া একটি শক্তিশালী অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করে। জনাব আবদুস সামাদও এই অভ্যর্থনা কমিটিতে যোগ দেন। শিক্ষা সম্মেলনের সাফল্য কামনা করিয়া ইংরেজী দৈনিক ‘পাকিস্তান অবজার্ভার’ সম্পাদক জনাব আবদুস সালাম, বাংলা দৈনিক ‘ইনসাফ’ সম্পাদক জনাব মহিউদ্দিন আহমদ, পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক সমিতির(East Pakistan Journalists Association) সম্পাদক জনাব জহুর হোসেন চৌধুরী, সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ সম্পাদক জনাব শাহেদ আলী ও দৈনিক পাকিস্তান অবজার্ভারের বার্তা সম্পাদক সৈয়দ নুরুদ্দিন আহমদ ১৯৫০ সালের ২৮শে আগস্ট এক যুক্ত বিবৃতি দেন। ১৫ই সেপ্টেম্বর অপরাহ্ন বেলা ২টা ৫০ মিনিটে ‘ঢাকা জেলা বার লাইব্রেরী’ সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন আরম্ভ হয়। জনাব কামরুদ্দিন আহমদ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। সরকার সমর্থক কতিপয় ছাত্র সম্মেলনের উপর হামলা করে এবং পুলিশ বাহিনী নীরব দর্শকের ভূমিকা গ্রহণ করে। যাহা হউক, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্মেলন অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে আমরা পরদিন সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশন সন্ধ্যা সাড়ে সাত ঘটিকায় ফজলুল হক মুসলিম হল মিলনায়তনে পুনরারম্ভ করি। সম্মেলনে চারশত প্রতিনিধি যোগদান করেন। ১৬ই সেপ্টেম্বরের অধিবেশনে গৃহীত প্রস্তাবাবলীর ভিত্তিতে আন্দোলন পরিচালনা করিবার নিমিত্ত এই সম্মেলনে গণশিক্ষা পরিষদ গঠিত হয়। এই গণশিক্ষা পরিষদ সেক্রেটারীয়েটের আহবায়ক নিযুক্ত করা হয় আমাকেই।

এম. কম. ক্লাসে ভর্তির আবেদন প্রত্যাখান
     বি. কম. পরীক্ষার ফল প্রকাশ হইবার পর আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম. কম. ক্লাশে অধ্যয়নের অনুমতি চাহিলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমার অনুমতি প্রার্থনা প্রত্যাখান করে। সমগ্র দেশের শিক্ষিত শ্রেণী ইহার বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হইয়া উঠেন। এমন কি প্রভাবশালী ইংরেজী দৈনিক ‘পাকিস্তান অবজার্ভার’ “ব্ল্যাক মেইল”(Blackmail) শিরোনামায় দীর্ঘ সম্পদকীয়তে মন্তব্য করে,“A student who has taken a rather prominent part in battle of the scripts and also in the B.P.C. movement has been denied admission into the University. That is tantamount to denying the possibility of acquiring high academic distinction to this boy who stood first in the examination leading to his graduation.”অর্থাৎ “বর্ণমালার সংগ্রাম ও বি.পি.সি. আন্দোলনে যে শিক্ষার্থী বস্তুতঃ বিশিষ্ট অংশগ্রহণ করিয়াছে তাহাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইতে দেওয়া হয় নাই। ইহা গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী পরীক্ষায় প্রথম স্থান দখল করিয়াছে, এমন একজন তরুণকে উচ্চ শিক্ষালাভের সুযোগ হইতে বঞ্চিত করবারই শামিল।”
     “বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা কোনদিন গাঁজাখোরের আড্ডার সঙ্গে তুলনা করতে রাজী নই। কিন্তু যখন দেখি ডে, দেশকে যে ছেলে ভালবাসে, নিজের শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে যে শ্রদ্ধা করে, অধ্যয়ন ও জ্ঞান চর্চার দ্বারা যে ছেলে মনীষার পরিচয় দেয়, তাকে বিশ্ববিদ্যালয় চেপে মারার আয়োজন করে তখন একে গাঁজাখোরের আড্ডা বলতে ইতস্ততঃ করার কি আছে? বিগত ভাষা আন্দোলনের সময়ে এবং অধুনা জনাব অলি আহাদের ভর্তি নাকচ করার ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে ফ্যাসিস্ট নীতি অবলম্বন করেছে তার থেকে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিচ্ছি যে, গণতন্ত্রকে ভালবাসলে, নিজের শিক্ষা-সংস্কৃতিকে বাঁচাবার চেষ্টা করলে এবং ভাল ছাত্র হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে চেপে দেয়। জাতির দুর্ভাগ্য এই যে, জ্ঞান সাধনার তীর্থভূমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি এই।”
     ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিষয়ে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রভোস্ট ডঃ এম, ও, গণির সহিত সাক্ষাৎ করিলে তিনি আমাকে দেশরক্ষা বিভাগে সৈন্য বাহিনীতে অফিসার পদে যোগ দিতে উপদেশ দেন এবং ইহার জন্য সরকারী তরফ হইতে মদদ দানের নিশ্চয়তা দিতে চান। তাঁহার প্রস্তাব আমি শ্রদ্ধার সাথে প্রত্যাখ্যান করি। ইহার পর অত্যল্পকালের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক চিঠিতে জানাইলেন, , “Mr. Oli Ahad be not admitted into the University of Dacca,”অর্থাৎ ‘জনাব অলি আহাদকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হইবে না।’’ এইভাবেই আমার উচ্চডিগ্রী লাভের সকল আশা নির্মূল হইয়া গেল।
 
মূলনীতি কমিটির রিপোর্ট
     ১৯৫০ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খান ভবিষ্যতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের ভিত্তি হিসাবে “মূলনীতি কমিটি” সুপারিশাবলী প্রকাশ করিলে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের সচেতন রাজনৈতিক অংশ এমন কি খোদ পূর্ব পাকিস্তান মুসলীম লীগ ক্ষুব্ধ হইয়া উঠিল। আমরা মূলনীতি কমিটি রিপোর্টের গণআন্দোলন করিবার নিমিত্ত ঢাকা চেম্বার অব কমার্স সভাপতি এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনের গৃহে এক সভায় মিলিত হই এবং (১) আতাউর রহমান খান, (২) কামরুদ্দিন আহমদ (আহবায়ক), (৩) সাখাওয়াত হোসেন, (৪) পাকিস্তান অবজার্ভার সম্পাদক আবদুস সালাম, (৫) অলি আহাদ প্রমুখ ব্যক্তির সমন্বয়ে Committee of Action for Democratic Constitution গঠন করি।
উক্ত সংগ্রাম কমিটির আহবানে ঢাকার আরমানিটোলা ময়দানে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসভায় আমরা মূলনীতি কমিটির সুপারিশাবলী বাতিল করিবার দাবী জানাই। সংগ্রাম পরিষদ ১৯৫০ সালের ৪ঠা ও ৫ই নভেম্বর ঢাকার বার লাইব্রেরী হরে মহাজাতীয় সম্মেলন (Grand National Convention) আহবান করে। জনাব আতাউর রহমান খান উক্ত মহাজাতীয় সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। শেরেবাংলা এ, কে, ফজলুল হক মূলনীতি কমিটির সদস্য ছিলেন এবং তিনি মূলনীতি কমিটির সুপারিশাবলীর অন্যতম প্রণয়নকারী ও স্বাক্ষরকারী ছিলেন। সম্মেলনে তাঁহার উপস্থিতিকে তরুণ সমাজ খুব একটা উৎসাহের সহিত অভিনন্দন জানায় নাই। এক প্রশ্নোত্তরে শেরেবাংলা তরল হাস্যকৌতুকের মাধ্যমে উত্তর দেন যে, “আংগুর রস পান করাইয়া তাঁহার নিকট হইতে মূলনীতি কমিটির সুপারিশাবলীতে সহি নিয়াছে।” বাঙ্গালী নেতারা যে করাচীর আবহাওয়ায় বাঙ্গালীর স্বার্থ হানিকর কাজ করিতে কোন দ্বিধাবোধ করেন না, তাহা বাঙ্গালীদের বুঝা দায়। কিন্তু ঢাকা প্রত্যাবর্তন করিলেই বাঙ্গালীদের মনোভাবের প্রতিধ্বনি করিয়া ভিন্নরূপ ধারণ করিতেও তাঁহারা মোটেই কুণ্ঠিত হন না। যাহা হউক, দুইদিনব্যাপী অধিবেশনে একটি বিকল্প মূলনীতি রচনা করা হয় এবং এই বিকল্প মূলনীতির ভিত্তিতে ‘সংবিধান রচনা আন্দোলন’ পরিচালনা করিবার নিমিত্ত কাউন্সিল ফর ডেমোক্রেটিক ফেডারেশন গঠন করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানবাসীর মনোভাব লক্ষ্য করিয়া পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগও মূলনীতি কমিটির বিপোর্ট সংশোধন দাবী সম্বলিত কতিপয সুপারিশ করে। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সংশোধনাবলী অত্যন্ত সতর্কতার সহিত বিবেচনা করিয়া কাউন্সিল ফর ডেমোক্রেটিক ফেডারেশন ১৯৫১ সালের ২০শে জানুয়ারীর সভায় নিম্মোক্ত প্রতিবাদ প্রস্তাব গ্রহণ করেঃ ‘অত্র সভা মূলনীতি কমিটির রিপোর্টের উপর পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ সাব কমিটির গৃহীত প্রস্তাবাবলীর যেমন দ্বি-কক্ষ আইন পরিষদ, ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানী-রফতানী বিষয়াবলীতে প্রাধান্য ও নিয়ন্ত্রণকারী ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারকে দান, “লাহোর প্রস্তাবানুযায়ী” পূর্ব পাকিস্তানকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ঘোষণা না করিয়া সামান্য প্রাদেশিক মর্যাদা দান, রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে কোন কিছু উল্লেখ না করাকে তীব্রভাবে নিন্দা করিতেছে।’