শান্তি কমিটি

ফন্ট সাইজ:
১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে জাপানের হিরোশিমায় ও ৯ই আগস্ট নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত আণবিক বোমার ধ্বংসলীলায় পারমাণবিক অস্ত্রের মানব সভ্যতা বিধ্বংসী ভয়াবহ শক্তি সম্পর্কে সমগ্র বিশ্ববাসী আতংকগ্রস্ত হইয়া উঠে। সকল মহলে এই আশংকা বৃদ্ধি পায় যে, সভ্যতা ও সৃষ্টিবিধ্বংসী আণবিক বোমা, হাইড্রোজেন বোমা ও অন্যান্য মারাত্মক আণবিক অস্ত্রশস্ত্রই হইবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের হাতিয়ার। সমর উপকরণ উৎপাদনে উন্নত দেশগুলি হাজার হাজার কোটি ডলার খরচ করিতেছে অথচ অনুন্নত ও আজাদীপ্রাপ্ত দরিদ্র দেশগুলির মানবগোষ্ঠী অর্ধাহারে-অনাহারে রহিয়াছে। শোষক শ্রেণী বিশ্বব্যাপী শোষণের জাল বিস্তার করিয়া শোষণ অব্যাহত রাখিবার তাগিদে স্রষ্টার সৃষ্টিকেই ধ্বংস করিতে উদ্যত। ইহারই প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ববিবেক জাতি-ধর্ম-স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষ সর্বনাশা মারণাস্ত্র উৎপাদন ও সমর প্রস্তুতির বিরুদ্ধে সকল মানুষকে এক কাতারবন্দী হইবার নৈতিক আহবান জানায়। পূর্ব পাকিস্তানকে শান্তি আন্দোলনের শক্তিশালী অংশীদার করিবার প্রয়াসে নিযুক্ত ব্যক্তিবর্গ ১০ই সেপ্টেম্বর (১৯৫০) ঢাকা বার লাইব্রেরী হরে সমবেত হইবার জন্য ৯ই সেপ্টেম্বরের দৈনিক ‘পাকিস্তান অবজার্ভারের’ মাধ্যমে এক আবেদন জানানঃ সর্বজনাব আবদুস সালাম, সম্পাদক, ‘পাকিস্তান অবজার্ভার’, কাজী মোহাম্মদ ইদরিস, শাহাদাত উল্লাহ সম্পাদক, ‘প্রগ্রেসিভ রাইটার্স এসোসিয়েশন’, মহিউদ্দিন আহমদ, সম্পাদক, দৈনিক ‘ইনসাফ’, মোস্তফা নূরুল ইসলাম, মাহবুব জামাল জাহেদী, আশরাফ সিদ্দিকী, বজলুল হক ‘জিন্দেগী’, নজরুল ইসলাম, সভাপতি, প্রগ্রেসিভ রাইটার্স এসোসিয়েশন, অলি আহাদ, সভাপতি অভ্যর্থনা কমিটি, নিখিল পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলন, এম, এ, আওয়াল, আহবায়ক, সিভিল লিবার্টি লীগ, কে, জি, মোস্তফা, দৈনিক ইনসাফ, আনিস চৌধুরী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ ইউসুফ হাসান, সাধারণ সম্পাদক উর্দু প্রগ্রেসিভ রাইটার্স এসোসিয়েশন, মোহাম্মদ আলী, আবদুল হক দৈনিক আজাদ, সরলানন্দ সেন, দৈনিক আজাদ, এহতেশাম আহমদ, এডভোকেট মোহাম্মদ আলী, জহুর হোসেন চৌধুরী, জয়েন্ট এডিটর, ইংরেজী দৈনিক পাকিস্তান অবজার্ভার, মিসেস এফ, সামাদ, এডিটার ‘মিনার’।
     ১০ই সেপ্টেম্বর ঢাকা বার লাইব্রেরীতে অনুষ্ঠিত সভায় আমর জনাব মোঃ তোয়াহাকে সম্পাদক করিয়া শান্তি কমিটি গঠন করি। পূর্ব পাকিস্তানের শান্তি আন্দোলন হইতেছে আত্ম-নিধন-ধর্মী-বিশ্বযজ্ঞ মহা-সমারোহের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। ১৯৫০ সালের মত ভয়াবহ দিনগুলিতে রাষ্ট্রদ্রোহী ও কমিউনিষ্ট আখ্যাকে অগ্রাহ্য করিয়া সাম্রাজ্যবাদী মহলের অনুচর মুসলিম লীগ সরকারের রক্তচক্ষুকে পরোয়া না করিয়া যুদ্ধবাজদের রিরুদ্ধে শান্তি আন্দোলনের গোড়াপত্তন করিতে পারিয়া গর্ববোধ করিতেছি। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করিবার অপরাধে কারাগারে আটক থাকাকালে মহা চীনের রাজধানী পিকিং-এ ২রা অক্টোবর এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক শান্তি সম্মেলন শুরু হয়। উক্ত সম্মেলনে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতা মানকী শরীফের পীরের নেতৃত্বে সর্বজনাব আতাউর রহমান খান, শেখ মুজিবুর রহমান, মিঞা ইফতেখার উদ্দিন, ইংরেজী দৈনিক ‘পাকিস্তান টাইমস’-এর সম্পাদক মাজহার আলী ও তাঁহার স্ত্রী বেগম তাহেরা মাজহার ও খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস যোগদান করেন। সম্মেলনে ৩৭টি দেশের তিনশত সাতষট্টি জন প্রতিনিধি কর্তৃক ১২ই অক্টোবর নিযুক্ত ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়ঃ
 
     “এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জনগণ যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম চালাইয়া যাইতে বদ্ধপরিকর। তাহারা এই মর্মেও দৃঢ়প্রত্যয়ী যে, শুভেচ্ছাপূর্ব সকল লোকের সহিত সহযোগিতায় তাহারা সেই ভীতিপ্রদ শোচনীয় পরিনামকে নিবৃত করিতে, যুদ্ধের অন্ধকার মেঘকে দূরীভূত করিতে এবং সার্বজনীন বন্ধুত্বের মানব দিগন্তকে মেঘমুক্ত করিয়া স্থায়ী শান্তির অভ্যুদয় সম্ভব করিয়া তুলিতে সক্ষম হইবে।”
     স্বার্থ-সংঘাত ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বিশ্বে পারমাণবিক যুদ্ধ আজ মানুষের দ্বারা উপস্থিত। নিযুক্ত বর্ণিত তথ্যাবলীই প্রমাণ করে যে, বিশ্বে পারমাণবিক যুদ্ধ আজ মানুষের দ্বারা উপস্থিত। নিযুক্ত বর্ণিত তথ্যাবলীই প্রমাণ করে যে, বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মানবসভ্যতা বিধ্বংসী পারমাণবিক ও অপারমাণবিক যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্বের মনীষীবৃন্দের সোচ্চার কণ্ঠ এবং শান্তি আন্দোলনের যথার্থতা ও অপরিহার্যতা। যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও নিরস্ত্রীকরণ সংস্থার (United States Arms Control & Disarmament Agency) এক সমীক্ষানুসারে ১৯৭৩ সারে একশত ছত্রিশটি দেশ সামরিক নিরাপত্তা খাতে ২৫০০০ কোটি ডলার ব্যয় করিয়াছে, ইহার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে নর্থ-আটলান্টিক ট্রিটি অরগানাইজেশন (North Atlantic Treaty Organisation-NATO) ১১০০০ কোটি ডলার এবং সোভিয়েট রাশিয়ার নেতৃত্বে ওয়ারশ প্যাক্ট (Warsaw pact) ৯৪০০ কোটি ডলার ব্যয় করিয়াছে। শুধু ইহাই নয়, ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের মতে ১৯৭৪ সালে শিল্পোন্নত আমেরিকান ও ইউরোপীয় দেশসমূহ অনুন্নত দেশসমূহে ১৮০০ কোটি ডলারের মারণাস্ত্র সরবরাহ করে। ১৯৫০-১৯৭৪ পর্যন্ত  যুক্তরাষ্ট্র ৮৬০০ কোটি ডলার মূল্যের ও সোভিয়েট রাশিয়া ৩৯০০ কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রয় করে। বৃহৎ শক্তিধারী দেশসমূহ নিজ নিজ প্রভাব বলয় সুপ্রতিষ্ঠিত ও বিস্তারের স্বার্থে অস্ত্র উৎপাদন ও সমর সজ্জার সর্বনাশা প্রতিযোগিতায় সবিশেষ ব্যস্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েট রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিরাপত্তার অজুহাতে ‘মার্চেন্টস অব ডেথস’ বা অস্ত্র ব্যবসায়ীদের নিকট হইতে সমরোপকরণ ক্রয় করিয়া আত্মনিধনের বিশ্বযজ্ঞে তৎপর হইয়া উঠিয়াছে, উহার সরস বর্ণনা লিপিবদ্ধ আছে বিশ্ববিখ্যাত নাট্যকার জর্জ বার্নার্ডশয়ের ‘মেজর বারবারা’ নাটকে। একশতটি উন্নয়নকামী দেশে ২০০ কোটি বাসিন্দার মধ্যে চরম দারিদ্র প্রপীড়িত ৮০ কোটি লোককে অর্ধাহারে-অনাহারে নিশ্চিত মৃত্যুকবল হইতে রক্ষাকল্পে ১৯৪৭ সালের শেষ ভাগ হইতে ১৯৭৫ সালের প্রথম ভাগ পর্যন্ত ১ কোটি টন খাদ্য সাহায্য জোগাইতে জাতিসংঘের মহাসচিব ডঃ কুর্ট ওয়েল্ডহেইম ও বিশ্বখাদ্য ও কৃষি সংস্থার মহাপরিচালক উৎপাদনের বিরুদ্ধে শান্তি তথা প্রগতির পক্ষে বিশ্বশান্তি আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেন এবং মানব সভ্যতা ও কৃষ্টি সংহারক যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী দুর্জয় শান্তি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে থাকেন। উপরোল্লিখিত ঘটনাস্রোত হইতে অনুমিত হয় যে, বিশ্বের বুক হইতে শান্তি যেন ক্রমশঃই অপসৃয়মান, যদিও বৃহৎ শক্তিবর্গ বিশেষতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েট রাশিয়া, মহাচীন ইত্যাদি শক্তি দ্বিপক্ষীয় ও বহু পক্ষীয় চুক্তি মারফত পারস্পরিক সমঝোতায় পৌছানোর জন্য নিরন্তর প্রয়াসী। তাই, আক্ষেপের সহিত বলিতে হয় peace in the dream of wise and war is the history of man অর্থাৎ শান্তি মনীষীদের স্বপ্ন আর যুদ্ধ মানবের ইতিহাস।