আওয়ামী মুসলিম লীগের নব পর্যায়

ফন্ট সাইজ:
১৯৫১ সালে কারামুক্তির পর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও সাধারণ সম্পদক শামসুল হক দেশবাসীকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করিবার নিমিত্ত সমগ্র দেশব্যাপী অবিরাম কর্মিসভা, জনসভা ইত্যাদি করিয়া যাইতেছিলেন। মুসলিম লীগ ও মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন সরকার কোথাও ১৪৪ ধারা জারি করিয়া আবার কোথাও গুন্ডামীর আশ্রয় গ্রহণ করিয়া আওয়ামী মুসলিম লীগের কর্মসূচী পালনে সর্বপ্রকার ব্যাঘাত সৃষ্টি করিতে থাকে। কিন্তু জনতা মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে অবিচল আস্থা জ্ঞাপন করিয়া ক্রমশঃ আওয়ামী মুসলিম লীগের পতাকাতলে কাতারবন্দী হইতে শুরু করে। পরিতাপের বিষয়- এই সময়ে কোন কাগজী ও ভতিু নেতাকেই কোর্ট-কাছারী , ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবার পরিজন বেষ্টিত সুখী জীবন ত্যাগ করিয়া বৃদ্ধ মাওলানা ভাসানীর সহিত সফরে যাইতে কখনও দেখা যায় নাই। শৌর্য, বীর্ষ ও ত্যাগের মূর্ত প্রতীক অক্লান্ত পরিশ্রমী মাওলানা ভাসানী একাই আহার, নিদ্রা বিশ্রাম ও আরামকে হারাম জ্ঞান করিয়া উল্কার মত সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান সফর করিয়া বেড়াইয়াছেন। জনতাকে মুসলিম লীগের কুশাসনের বিরুদ্ধে সচেতন কলিয়া তুলিতে আপ্রাণ চেষ্টা করিয়াছেন। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের তরুণ ছাত্র কর্মীরাই ছিল অগ্রনায়ক মাওলানা ভাসানীর সহচর। নামসর্বস্ব নেতারা দুইটি য়সা দিয়াও সাহায্য করেন নাই। কোন সময়ে অর্থের অভাবে বদ্ধ নেতাকে রেলের তৃতীয় শ্রেণীতে ভ্রমণ করিতে হইয়াছে। এইভাভে তাঁহার একক পরিশ্রম ও ত্যাগে পূর্ব পাকিস্তানের ঘরে ঘরে আওয়ামী মুসলিম লীগের বাণী পৌঁছে। ইহাই ঐতিহাসিক সত্য এবং এই সত্যকে অস্বীকার করিবার অর্থই হইল মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ ও ঐতিহাসিক তথ্য বিকৃতির অপচেষ্টা । স্মর্তব্য যে, হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী করাচীত হইতে মাঝে মাঝে ঢাকায় বিভিন্ন মামলা পরিচলানায় আসিতেন ও ফি বাবদ অর্জিত অর্থ আওয়ামী মুসলিম লীগ সংগঠনের জন্য ব্যয় করিতেন। 
এই সময়ে মুসলিম লীগ সরকারের অত্যাচার, নির্যাতন ও বিরোধী সমালোচকদের কন্ঠরোধের বিরদ্ধেপ্রতিরোধ আন্দোলন গড়িয়া তুলিবার নিমিত্ত নাগরিক স্বাধীনতা লীগ (Civil Liberties League)গঠন করি। সিভিল লিবার্টিস লীগ ৫ই নভেম্বর (১৯৫১) ৩/১, জনসন রোডে অবস্থি অবজার্ভার পত্রিকার অফিসে সম্পাদক জনাব আবদুস সালামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় মুখ্যমন্ত্রীর সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্তত এক প্রতিনিধি দল গঠন করে। এই প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন সর্বজনাব আবদুস সালাম, আতাউর রহমান খান, কফিলউদ্দিন আহামদ চৌধুরী, কামুদ্দিন আহমদ, অলি আহাদ, মীর্জা গোলাম হাফিজ, তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া), আবদুল বারী, আবদুল আওয়াল, আবদুল ওয়াদুদ, শামসুল হক চৌধুরী ও মীর্জ গোলাম কাদের । 
সভার অন্য এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা মুসলিম লীগ দলভুক্ত আইন পরিষদের সদস্যবর্গকে কালাকানুন জননিরাপত্তা আইন (বিনা বিচারে আটক রাখার আইন) বাতিল করিবার জন্য অনুরোধ জানাই। ইতিপূর্বে জুন মাস (১৯৫১) হইতে লাহোর ও করাচীতে সাংবাদিকদের গ্রেফতার, পশ্চিম পাকিস্তানে প্রগতিশীল লেখকদের গ্রেফতার, সিন্ধু প্রদেশে হারি কমিটির নেতৃবৃন্দের গ্রেফতার, লাহোরে আজাদ পাকিস্তান পার্টি অফিসে পুলিশী তল্লাশী, সীমান্ত প্রদেশে জনপ্রিয় নেতৃবর্গের গ্রেফতার ও জিন্নাহ আওয়ামী মুসলিম লীগ আহবায়ক শহীদ সোহরাওয়াদীর সীমান্ত প্রদেশে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা প্রভৃতি ঘটনা ঘটিতেছিল। বলাই বাহুল্য যে, এইগুলি ছিল পাকিস্তানে গণতন্ত্রের মৃত্যুডঙ্কা বাজাইবার পূর্বাভাস মাত্র। পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ গণতন্ত্র কন্ঠরোধের এই সরকারী প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সদা সর্বদাই অত্যন্ত সজাগভাবে সংগ্রাম করিয়া গিয়াছে এবং প্রতিটি প্রতিরোধ প্রচেষ্টাকে সর্বতোভাবে সহায়তা দিয়াছে। 
     প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ আইন পরিষদের ৩৮ টি আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ মাত্র ১৭ টি আসন দখল করিতে সমর্থ হইয়াছিল, বাকী ২১ টি আসন লাভ করিয়াছিল অখন্ত ভারত সমর্থক খান আবদগুল দফফার খানের পার্টি। গফফার খানের ভ্রাতা ডাঃ খান সাহেবের নেতৃত্বেরই সীমান্ত প্রদেশে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং মানকী শরীফের পীর ও জাকোরী শরীফের পীরের অক্লান্ত প্রচারণা ও প্রচেষ্টায় সীমান্ত প্রদেশবাসীর রায় পাকিস্তানের পক্ষে যায়। জনাব সোহরাওয়ার্দী লাহোর আগমণের পরই সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু প্রদেশ ও পাঞ্জাব প্রদেশের নেতৃবর্গ তাাঁহার নেতৃত্বে পাকিস্তানে বিরোধীদলের গোড়াপত্তন করিতে উৎসাহিত হইয়া উঠেন। ১৯৫১ সালের মার্চ মাসো পাঞ্জাবের সাধারণনির্বাচনে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে পাঞ্জাবের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী খান ইফতেখার হোসেন খান (মামদোতের নওয়াব, যিনি ইতিপূর্বে জিন্নাহ মুসলিম লীগ গঠন করেন) যৌথভাবে নির্বাচনে অবতীর্ণ হইবার ইচ্ছায় সোহরাওয়ার্দীর  সহিত জিন্নাহ আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। জিন্নাহ আওয়ামী মুসলিম লীগ পাঞ্জাবের সাধারণ নির্বাচনে ১৯৭টি আসনের মধ্যে ৩২ টি আসন ও ১৯৫৩ [সালে সিন্ধু প্রদেশের সাধারণ নির্বাচনে বিরোধী ঐক্যফ্রন্ট ৪০টি আসনের মধ্যে ৭টি আসন দখল করে। এই ভাবে ধীরে ধীরে স্বৈরাচারী শাসকচক্রের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করিয়া সরকার বিরোধী গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রসার লাভ করে। 
     মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বো পরিচালিত পূর্ব পাকিস্তন আওয়ামী মুসলিম লীগ, সীমান্ত প্রদেশে মানকী শরীফের পীরের নেতৃত্বে পরিচালিত আওয়ামী মুসলিম লীগ ও সোহরাওয়াদী মামদোত পরিচালিত জিন্নাহ আওয়ামী মুসলিম লীগ সংগঠনগুলির বক্তব্য ও ম্যানিফেস্টোর মধ্যে মিরের চাইতে গড়মিলই ছিল অথ্যাধিক এবং কোন কোন বিষয় ছিল পরস্পর বিরোধী। জনাব শহীদ সোহরাওয়ার্দী গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ছিলেন আস্থাশীল। তিনি উপরে বর্ণিত সরকার বিরোধী রাজনৈতিক সহযাত্রীদলগুলির মধ্যে সক্রিয় যোগসূত্র ছিলেন। 
     ১৯৫৩ সালে নিখিল পাকিস্তান সাংগঠনিক রূপদানের উদ্দেশ্যে লাহোরে জিন্নাহ আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের এক প্রতিনিধি দল সম্মেলনে যোগদান করে। নীতিগত প্রশ্নে মতভেদ প্রকট আকার ধারণ করিলে জিন্নাহ মুসলিম লীগের সংগঠক পাঞ্জাবের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মামদোতের নওয়াব ইখতেখার হোসেন খানকে বহিস্কার করা হয় এবং জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নিখিল পাকিস্তান নিযুক্ত হন। 
১৯৫১ সালের মার্চ মাসে মেজর জেনারেল আকবর খান নিয়ামতান্ত্রিক সরকার উৎখাতের যে বীজ বপণ করেন ও প্রধানমন্ত্রী নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খান ক্ষমতার দাপটে বিরোধী দলীয় নেতৃবর্গের প্রতি অসহিষ্ণুতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তাহাই ক্রমশঃ পল্লবিত হইয়া উঠে। জনসাধারণকে ক্ষমতা লাভের নিয়ামক শক্তি না ধরিয়া চক্রান্তের চোরাগোপ্তা গলি ও পন্থাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখরের একমাত্র অবলম্বনে পরিনত করে। ইহারই ফলশ্রুতি হইল ১৯৫১ সালে ১৬ অক্টোবর সামরিক বাহিনীর সদর দতর রাওয়াপিন্ডি ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ভাষণদানকালে প্রধানমন্ত্রী নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খানের প্রকাশ্য দিবালোকে আততায়ীর গুলীতে শাহাদৎ বরণ, অথচ পাকিস্তান রাষ্ট্র ভাঙ্গিয়া দুই টুকরা হওয়ার পরও এই নারকীয় হত্যাকান্ডের হোতাদের কোন প্রকার বিচার হয় নাই। ক্ষমতাসীন চক্রের এমন সততা ও সাহস ছিলনা যে, লিয়াকত হত্যা তদন্ত রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করে। পর্দার অন্তরালে লুক্কায়িত নাটকের অভিনেতাদের বিচার কল্পনাই ছিল অলীক স্বপ্নবৎ । তাই বেগম রানা লিয়াকত আলীর পুনঃপুনঃ প্রকাশ্য দাবী সত্ত্বেও পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন চক্র উহার প্রতি কোন প্রকার কর্ণপাতই করে নাই। অনেকের ধারণা, লিয়াকত আলী খানকে হত্যার অন্তরালে উচ্চাভিলাষী পাঞ্জাবী প্রাসাদ কূচক্রীদলই দায়ী। লিয়াকত হত্যার পর পাঞ্জাব নিবাসী আমলা প্রতিনিধি গোলাম মোহম্মদ ও সরকারী চাকুরে চৌধুরী মোহাম্মদ আলী যথাক্রমে পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল ও অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত হন। পূর্ববঙ্গের খাজা নাজিমউদ্দিন প্রধানমন্ত্রী পথে অধিষ্ঠিত হইরেন বটে, তবে তিনি পাঞ্জাবী চক্রের পুতুল বিশেষ ছিলেন । লিয়াকত হত্যার ষড়যন্ত্র এত নিখুঁত ছিল যে, আততায়ী আকবর খানকে অকুস্থলেই পরিকল্পনা মোতাবেক ধরাধাম হইতে বিদায় দেওয়া হয়। কারণ আততাায়ীর স্বীকারোক্তিতে ষড়যন্ত্রকারীদের গর্হিত চেহারা জনসমক্ষে প্রকাশ হইয়া পড়িতে পারিত। ইহাতেই প্রমাণিত হয় যে, ইহা সামরিক বেসামরিক উচ্চ শাসকমহলের সংঘবদ্ধ জঘণ্য চক্রান্তের ফল। অতঃপর প্রাসাদ চক্রান্তই ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতাচ্যুতির চাবিকাঠিতে পর্যবসিত হয় এবং জনগণ পরিণত হয় নেপথ্য শক্তিতে। সরকার পরিবর্তনে জনগণের সার্বভৌমত্ব কার্যতঃ অস্বীকৃত হওয়ায় যুবসমাজের প্রতিটি সরকারী অত্যাচার, নির্যাতন খাদ্য সংকট, লবণ সংকট, বেকার সমস্যা ইত্যাদির বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন গড়িয়া তোলা ব্যতীত গত্যন্তর ছিল না। সংগ্রামের সংকটময় মুহূর্তে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের অধিকাংশ নেতার আন্দোলন বিরোীধ মনোভাব সংগ্রাম যুব সমাজকে হতাশ ও নিরাম করে। তাই নির্যাতন ও দুর্বল নেতৃত্বের মুখোমূখি দাড়াইয়া সংগ্রামী যুব কর্মীদিগকে ঐক্যবদ্ধ করিবার অপরিহার্য প্রয়োজনেই পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগকে ব্যাপকভাবে সংগঠিত করিতে হয়। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সংকটময় মুহূর্তে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের দুর্বলচেতা সদস্যরা যখন নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির দোহাই দিয়া সরকারের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ ভূমিকা গ্রহণে পশ্চাদপসরণ করে, তখন পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের নেতা ও কর্মীরাই সরকারী হামলার বিরুদ্ধে জীবন বাজি রাখিয়া সফল নেতৃত্ব দান করেন এবং সংগ্রামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় সংযোজন করেন।