সরকারী ত্রাস ও সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক

ফন্ট সাইজ:

      এই ভাবে ৩০ শে জানুয়ারী, ৪ঠা ফেব্রুয়ারী এবং ১১ই ও ১৩ই ফেব্রুয়ারী বিভিন্ন সভা অনুষ্ঠান ও মিছিলের ফরে ঢাকার সাধারণ গণমাস সজাগ ও সচেতন হইয়া উঠে। অবস্থা এমন দাড়াইয়াছিল যে, বিভিন্ন মহ প্রতিরোধের সক্রিয় কর্মসূচীই সংগ্রাম কমিটির নিকট হইতে আশা করিতেছিল। জনমনে ত্রাস ও ভিীতি সৃষ্টি করিবার চিরাচরিত পন্থায় সরকার গ্রহণ করি।। ২০ শে ফ্রেব্রুয়ারী অপরাহ্নে নূরুল আমিন সরকার ঢাকা শহরে এক মান মেয়াদী ১৪৪ ধারা জারি করিয়া সভা ও শোবাযাত্রায় উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। উদ্ভুত পরিস্থিতি বিবেচনার জন্য সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ঐ তারিখেই সন্ধ্যা ৭ ঘটিকায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ৯৪ নং নবাবপুর রোডস্থ অফিসে এক জরুরী বৈঠকে মিলিত হয়। ইতিমধ্যে সরকারী ঘোষণায় বিভিন্ন হলের ছাত্রবৃন্দ বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠে। পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র এস,এ,বারী এটি নিজস্ব উদ্যেগে আহূত সলিমুল্লাহ মুসলিম হল বাসিন্দা ছাত্রদের এক বৈঠকে সরকার কর্তৃক ঘোষিত ১৪৪ধারা জনিত নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অনুরূপ ভাবে ফজলুল হক মুসলিম হল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সভাও ২১শে ফেব্রুয়ারী ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে রায় প্রদান করে। 

     প্রসঙ্গতঃ এইস্থলে অগ্রজ প্রতীম জহুর হোসেন চৌধুরীর কয়েকটি সতর্কবাণী উল্লেখ করা  প্রযোজন মনে করিতেছি। জহুর ভাই আমার রাজনৈতিক জীবনকে বিভিন্ন দিক হইতে বিভিন্নভাবে প্রভাবান্বিত করিয়াছেন। সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মীরাও রক্ত-মাংসের মানুষ। শত অভাব, অনটন, মিথ্যা, নিন্দা ও অপবাদের উর্ধ্বে উঠা তাহাদের পক্ষে সবসময় সম্ভব হয় না, হইলেও হৃৃদয়মন থাকে বেদনার্ত ও রক্তাপ্লুত। জহুর ভাই স্নেহাবিষ্ট পরিবেশ সৃষ্টি করিয়া অগ্রযাত্রায় আমাকে সবসমং উৎসাহিত করিতেন বটে কিন্তু তাই বলিয়া নীতির প্রশ্নে তিনি নির্মম কঠোর ভাষা ব্যবহার করিতেও সামানতম দ্বিধা করিতেন না। যেহেতু তিনি মুসলিম লীগ সরকারের ভাষা বাংলা মুখপত্র দৈনিক সংবাদের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন, সেহেতু সরকারী উচ্চ মহলে তাহার আনগোনা ও উঠবসা ছিল অবাধ। এই সুবাদেই ২ শে ফেব্রুয়ারীর কর্মসূচীর প্রতি সরকারী মহলের কঠোর মনোভাব তিনি অবগত ছিলেন। ২ শে ফেব্রুয়ারী যতই নিকটবর্তী হইতেছিল, জহুর ভাই ততই আমাকে আইন ভঙ্গ করিবার চিন্তা পরিহার করিবার চাপ দিতেছিলেন। ১৯ শে ফেব্রুয়ারী তাঁহার বাসাভবনে আলোচনাকালে তিনি আমাকে সতর্ক কলিয়া দিয়া বলিলেন যে, তাঁহার খবর অনুযায়ী আন্দোলন দমন করিতে সরকার প্রয়োজনবোধে সৈন্য বাহিনী তলব ও ট্যাঙ্ক ব্যবহার করিতে পারে । আমি তাঁহাকে বিনয়ের সহিত উত্তর দিয়াছিলাম Better dead than slave অর্থাৎ ‘দাসত্বের চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়।’ কেননা নিরস্ত্র সংঘবদ্ধ গণশক্তির বিরুদ্ধে সরকারী দমনমূলক ব্যবস্থা পরাভব স্বীকার করিতে বাধ্য হয়। ইহাই ইতিহাস। উল্লেখ্য যে, জহুর ভাই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের গোঁড়া সমর্থক ছিলেন। তাঁহার আশংকা ছিল যে, ২১ শে ফেব্রুয়ারী আন্দোলন দমনের উছিলায় সরকারী নির্মম আঘাত হয়তো গণতান্ত্রিক শক্তিকেই নির্মূল করিয়া ফেলিবে এবং অদূর ভবিষ্যতে আর কোন সরকার বিরোধী আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়া উঠিতে পারিবে না। 
      উল্লিখিত সম্ভাব্য সংঘর্ষের পটভূমিকার ২০শে ফেব্রুয়ারী রাত্রে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ সদর দফতরে (৯৪ নবাবপুর রোড) সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক বসে। উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন জনাব আবুল হাশিম। বৈঠকে মাওলানা ভাসানীর উপস্থিতি বাতির করিতে অনুরোধ করি এবং সম্ভাব্য জরুরী অবস্থা মোকাবিলা কজরিবার জন্য তাহার ঢাকা উপস্থিতি অপরিহার্য বলিয়া জানাই। কিন্তু মাওলানা ভাসানী তাহার সফরসূচী বাতিল না করায় এবং জনাব আতাউর রহমান খান আইন ব্যবসার প্রয়োজনে ময়মনসিংহ কোর্টে মক্কেলের মামলা পরিচালনায় ব্যাপৃত থাকায় উভয়ই ২০ ও ২১ শে ফেব্রুয়ারী ঢাকায় অনুপস্থিত ছিলেন। 
      যাহা হউক, উক্ত সভায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তাহাদের সহযোগী সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ, খেলাফতে রাব্বানী পার্টি, পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস, সরকার সমর্থক বিভিন্ন হল ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিবর্গ প্রায় সবাই ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব প্রকাশ করেন। সভায় তাহাদের পক্ষ হইতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব শামসুল হক নিন্মোক্ত যুক্তির অবতারণা করেন। 
     প্রথমঃ আওয়ামী মুসলিম লীগ নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে, দ্বিতীয়তঃ গোলযোগের সুযোগ গ্রহণ করিয়া সরকার প্রস্তাবিত সাধারণ নির্বাচন অনিশ্চতারা গর্ভে নিক্ষেপ করিবে, এবং তৃতীয়তঃ রাষ্ট্র বিরোধী ও ধ্বংসাত্মক শক্তি মাতাচাড়া দিয়া উঠিবে। 
সভাপতির অনুমতিক্রমে আমি আমার বক্তব্য পেশ করিতে উঠি। বক্তৃতাকালে জনাব শামসুল হকের বর্ণিত যুক্তিগুলির প্রয়োজনীয় অংশের উত্তর দানের পর বলিলাম, ‘‘১৯৪৯ সারে টাঙ্গাইল উপনির্বাচনে জয়ী হওয়া সত্ত্বেও পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদে জনাব শাসসুল হককে সদস্য হিসাবে কর্তব্য পালনের অধিকার হইতে বঞ্চিত করা হইয়াছে। তাঁহার সদস্যপদ চক্রান্ত করিয়া খারিজ ঘোষণা করা হইতেছে। এমন কি টাঙ্গাইল উপনির্বাচনের পরাজিত হইবার পর মুসলিমলীগ সরকার অদ্যাবধি আর কোন উপনির্বাচন দেয় নাই। শুধু তাই নয়, বিনা অজুহাতে আমাদের পুনঃপুনঃ ঘেঅষিত শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে বচানচাল করিবার অসুদুদ্দেশ্যেই সরকার ১৪৪ধারা জারি করিয়াছে। অতএব ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করিয়া সরাকারকে সমুচিত জবাব দিব। Come what may যাহা হয় হইবে। ইহাতে দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবকাম নাই। এইবার যদি সরকারের জালিম ও হটকারী মনোভাব রুখিতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে সামান্যতম প্রতিবাদও করিতে পারিব না। গত বৎসর অর্থাৎ ১৯৫১ সালের মার্চ মাসেরও সরকার ১৪৪ ধারা জারি করিয়া ঢাকা জেলা বার লাইব্রেরী হলে যুব সম্মেলনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করিয়াছিল। এই মুহূর্তে সম্মিলিত গনশক্তি যদি সরকারের অন্যায় আদেম প্রতিরোধ করিতে ব্যর্থ হয়, তাহা হইলে আর কখনো প্রতিরোধ করিতে পারিবে না সুতরাং ''Now of Never" উল্লেখ্য যে, পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের সহ-সভাপতি জনাব মোহাম্মদ তোয়াহা স্বীয় মত জ্ঞাপনকালে আমার মতে প্রতিধ্বনি না করিয়া ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন। রাত প্রায় ১টা ৩০ মিনিটে জনাব শাসসুল হক সংগ্রাম পরিষদের এই সভায় বিবেচনার জন্য নিম্নোক্ত পেশ করেনঃ " Resolved that in view of the promulgation of the section 144 cr, p.c the programmes of the 21 st February are with drawn & if any member of the all party committee of Action for State Language defies the decision, the committee will ipso facto stand dissolved.''  উপরোক্ত প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আমি তৎক্ষণাৎ উচ্চস্বরে ‘না, না, না, বলিয়া প্রতিবাদ করিয়াম। প্রস্তাবের পক্ষে বিপক্ষে ভোট গ্রহন করা হইলে আমার সহিত সর্বজনাব শাসসুল আলম, সহ-সভাপতি, ফজলুল হক মুসলিম হল, আবদুল মতিন , আহবায়ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়া রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, গোলাম মাওলা, সহ-সভাপতি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদ প্রস্তাবের বিপক্ষে অর্থাৎ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে ভোট দান করেন। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার স্বাক্ষর অভিযানে জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দ্দির সহি।