সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ স্বাক্ষর অভিযান

ফন্ট সাইজ:
আমাদের দাবীঃ
(১) অবিলম্বে বাংলাকে পাকিস্তানে হাত থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলা ঘোষণা করা হউক। 
(২) অবিলম্বে ইংরেজীর পরিবর্তে পাকিস্তানের জাতীয় দাবী সমূহের প্রচলন করার ব্যবস্থা করা  হউক। 
 
ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত 
     পূর্বাহ্নে বর্ণিত ফজলুল হক হল ছাত্রসভা, সলিমুল্লাহ হল ছাত্রসভা ও মেডিকেল কলেজ ছাত্র সভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে গৃহীত সিদ্ধান্ত ফজলুল হক হরের ছাত্র আবদুল মমিন ও মেডিকেল করেজের ছাত্র জনাব এম,এ আজমল আমাকে সভা চলাকালেই সভাকক্ষের বহিরে ডাকিয়া জ্ঞাত করান এবং আমি বিশ্বস্ততার সহিত তাহাদের দেয় বার্তা সভার সদস্যবৃন্দের বিবেচনার জন্য উপস্থাপিত করি। মেডিকেল কলেজের ছাত্র জনাব আমল হোসেনই ২১ শে ফেব্রুয়ারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ হইতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত প্রথম দলটির নেতৃত্ব দান করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় সদর দরজা সংলগ্ন পূর্বদিকস্থ রাজপথে অপেক্ষমান পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতা হন। এইভাবে গ্রহণ করিয়া ২০ শে ফেব্রুয়ারী রাত্রে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ সভায় মেডিকেল করেজের ছাত্রদের বিদ্রোহত্মক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্তর্নিহিত গুরুদায়িত্বের প্রতি স্বীয় সচেতনাত, পরিচ্ছন্ন আন্তরিকতা ও সততার স্বাক্ষর রাখেন। ভুল ও মিথ্যা ইতিহাস বর্ণনার ফাঁদে তিনি আজ হারাইয়া গিয়াছেন, যদিও বাস্তবে একুশের ইতিহাস রচনাকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। এই রূঢ় সত্য একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলন সর্বক্ষণ প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীর পক্ষেই লিপিবদ্ধ করা সম্ভব। অপরের জবানী বা বয়ান হইতে শুনিয়া এবং অনুমানকে অবলম্বন করিয়া ইতিহাস রচনার প্রয়াস অন্ধের হস্তী দর্শনের ন্যায়। 
     যাহা হউক, সবশেষে সভাকক্ষ হইতে বিমর্ষ মনে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে নিস্ক্রান্ত হইয়াইয় নবাবপুর রোডে জগন্নাথ কলেজের ছাত্র ও যুবলীগ কর্মী নিয়ামুল বশীরের সহিত সাক্ষাত হয়। নিয়ামুল  ও তাহার সংগীগণ আমার অপেক্ষায় দাঁড়াইছিল। তাহাদিগকে খুবই সুশৃঙ্খলভাবে ২১শে ফেব্রুয়ারী ভোর বেলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগ প্রাঙ্গনে উপস্থিত হইতে নির্দেশ দিলাম। গভীর রাত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক ও অনাবাসিক যুবলীগ কর্মীবৃন্দ সগর দফতর ৪৩/১, যোগীনগরে আমার সহিত সাক্ষাৎ করেন। ইতিমধ্যে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নির্ভিক স্থির-প্রতিজ্ঞ দৃঢ়চেতা তরুণ যুবলীগ কর্মীবৃন্দ আলোচনায় যোগ দেন। তাঁহারা আসিয়াছেন, যুবলীগের নির্দেশ জানিতে, তাঁহারা সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তে মর্মাহত ও বিক্ষুব্ধ। তাঁহাদের সহিত আলোচনায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচী গ্রহণ করি। বস্তুতঃই সাহসী, অকুতোভয়, সরলপ্রাণ যুবলীগ কর্মীরাই ২১শে ফেব্রুয়ারীর অগ্নিপরীক্ষায় স্বীয় জীবন তুচ্ছ জ্ঞান করিয়া ১৪৪ ধারা জনিত নিষেধাজ্ঞাকে ভঙ্গ করিয়াছেন এবং ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য স্থাপন করিয়া গিয়াছেন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সেই দিনকার চরম সন্ধিক্ষণে যুবলীগ কর্মীদের এই নিঃস্বার্থ কর্মধারা ও নির্ভূল নেতৃত্বই পূর্ব পাকিস্তান তথা পাকিস্তানের রাজনীতির আমুল পরিবর্তনের সূচনা করে। ইহাই ছিল পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম বলিষ্ঠ পদক্ষেপ এবং দৃঢ় ভিত্তিপ্রস্তর। 
     শেখ মুজিবর রহমান ১৯৫০ সালের ১ লা জানুয়ারী হইতে কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিলেন। চিকিৎসার কারণে সরকার তাঁহাকে ১৯৫২ সারের ফেব্রুয়ারী মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেন। প্রহরী পুলিশের ইচ্ছাকৃত নির্লিপ্ততার সুযোগ গ্রহণ করিয়া আমরা তাঁহার সহিত হাসপাতালেই কয়েক দফা দেখা করি। তিনি ও নিরাপত্তা বন্দী মহিউদ্দিন আহমদ ১৬ই ফেব্রুয়ারী হইতে মুক্তি দাবীতে অনশন ধর্মঘট করিবেন, সেই কথা শেখ সাহেবই আমাদিগকে জানাইয়াছিলেন। উল্লেখ্য যে, বরিশাল জেলা মুসলিম লীগের সম্পাদক জনাব মহিউদ্দিন আহমদ পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগ নেতা হামিদুল হক চৌধুরী সাহেবের গ্রুপভুক্ত ছিলেন। তাহা ছাড়াও ছিলেন ১৯৫০ সালে বরিশালে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অন্যতম প্রধান অংশগ্রহণকারী বলিয়া পরিচিত । এই কারণে আমি তাঁহার প্রতি কোন প্রকার সহানুভুতি প্রদর্শন করিতে কুন্ঠাবোধ করিতেছিলাম। তবে আমরা নীতিগতভাবে যে কোহকেও বিনা বিচারে আটক রাখার বিরোধী ছিলাম। তাই জনাব মহিউদ্দিনের মুক্তি দাবী জানাইতে আমরা সম্মত হই। ১৫ ফেব্রুয়ারী ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার হইতে শেখ মুজিবর রহমানকে ফরিদপুর জেলা কারাগারে যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে নারায়নগঞ্জ নেতৃবৃন্দের সহিত শেখ মুজিবর রহামানের সাক্ষাৎ ঘটে। কথোপকথনকালে তিনি যুবলীগ নেতৃদ্বয় জনাব শামসুজ্জোহা ও শফি হোসেন খানকে জানান যে পথিমধ্যে স্টীমারেই ১৫ ই ফেব্রুয়ারী দিবাগত রাত ১২ টার পর নিজ মুক্তির দাবীতে তিনি আমরণ অনশন ধর্মঘট আরম্ভ করিবেন। এই অনশন ধর্মঘট এবং আমাদের আন্দোলনের ফলেই সরকার ১৯ শে ফেব্রুয়ারী শেখ মুজিবর রহমানকে কারামুক্তি দেয়। উল্লেখ্য যে, ইতিমধ্যে ফরিদপুর করাগার হইতে তাঁহাকে গোপালগঞ্জ জেলে স্থানান্তরিত করা হয় এবং ২৬ শে ফেব্রুয়ারী ’ ৫২ কারামুক্তির পর তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়াতেই অবস্থান করিতেছিলেন।