২১ শে ফেব্রুয়ারীর ঘটনা

ফন্ট সাইজ:
২১ শে ফেব্রুয়ারী সকাল  ৯টার মধ্যে আমি বিশ্ববিদ্যালয় কলা ভবন প্রাঙ্গনে যাই আমার উপস্থিতিতে বিক্ষুব্ধ সাধারণ ছাত্র কর্মীবৃন্দ বিশেষতঃ যুবলীগ নেতা ও কর্মীরা দ্বিগুণ উদ্যমে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ফজলুল হক হরের পুকুর পাড়ে অনুষ্ঠিত ২০ তারিখ রাত্রির বৈঠকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয়াছিল এম,আর, অতাখতার মুকুল সেইকতা আমাকে জানান। এই সভায় যাঁহারা উপস্থিত ছিলেন তাঁহারা হইলেনঃ ১। গাজীউল হক (বিশিষ্ট আইনজীবী) , ২। হাবিবুর রহমান শেলী (বিচারপতি) ৩। মোহাম্মদ সুলতান (বামপন্থী নেতা, মরহুম) ৪। এম,আর, আখতার মুকুল  (লেখক), ৫। জিল্লুর রহমান (আওয়ামী লীগ নেতা), ৬। আবদুল মোমিন ( আওয়ামী লীগ সরকারের খাদ্যমন্ত্রী), ৭। এস,এ,বারী এ টি ( বিএনপি সরকারের উপ-প্রধানমন্ত্রী, মরহুম), ৮। সৈয়দ কামরুদ্দীন শহুদ (ঢাকা সচিব), ১০। মঞ্জুর হোসেন (ডাক্তার, মরহুম), ১১। আনোয়ার হোসেন । বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অন্যতম নেতা কাজী গোলাম মাহবুব এবং পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সহিত আমার সাক্ষাৎ হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে প্রবল ছাত্রমত তাঁহাদিগকে হাতাশাগ্রস্ত করিয়া ফেলে। পরিষদের আহবায়ক কাজী গোলাম মাহবুব ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করিব কিনা, আমার নিকট জানিতে চাহিলে আমি বলিলাম, ‘‘উহা সাধারণ ছাত্রসভায় স্থির হইবে। ’’ এই কথা বলিবার পর তাহাকো কোন প্রকার বচসা বা বাক-বিতন্ডার সুযোগ না দিয়াই আমি দ্রুত অন্যদিকে চলিয়া যাই। কারণ, ২০ শে ফেব্রুয়ারী দিবাগত রাত্রির সংগ্রাম পরিষদ সভায় কাজি গোলাম মাহবুব ও আমি পরস্পর বিরোধি বক্তব্য রাখিয়াছিলাম। অর্থাৎ কাজী গোলাম মাহবুব ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে দৃঢ়মত প্রকাশ করিয়াছিলেন আর আমি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে স্পষ্ট বক্তব্য পেশ করি। 
     ইতিমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, আর্টস ফ্যাকালটির ডীন ডঃ জুবেরী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যক্ষ ডঃ নিউম্যানকে লইয়া ভাইস চ্যালেন্সর ডঃ সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আগমণ করিলে ছাত্ররা ভাইস চ্যালেন্সর সাহেবকে ছাত্রসভায় সভাপতিত্ব করিতে অনুরোধ জানায় । ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করিবে না শর্তে তিনি সভাপতিত্বে করিতে সম্মত আছেন বলিয়া জানান। সাধারণ ছাত্রবৃন্দ বিণয়ের সহিত তাঁহার শর্ত গ্রহণ করিতে অসম্মতি জানায়। 
     যুবলীগ নেতা এম, আর আকতার (মুকুল ) এর প্রস্তাবক্রমে ও যুবলীয় কর্মী কমরউদ্দীন শহুদের সমর্থনে যুবলীগ নেতা জনাব গাজীউল হকের সভাপতিত্বে বেলা ১২ টার দিকে সাধারণ ছাত্রসভা শুরু হয়। পরিতাপের বিষয়, ২১ শে ফেব্রুয়ারীর পর আন্দোলনের দুর্যোগময় দিনগুলিতে এম,আর,আখতার মুকুল গা ঢাকা দিয়াছিলেন। শুধু তাই নয়, ২৭ শে ফেব্রুয়ারী তিনি কলিকাতায় পাড়ি জমান। যাহা হউক, সভা চলাকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব শাসসুল হক সভায় উপস্থিত হন। তিনি এবং জনাব মোঃ তোয়াহা উক্ত সভায় কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে অর্থাৎ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করিতে ছাত্র সাধারণের প্রতি আহবান জানান। সংগ্রাম পরিসদের আহবায়ক কাজী গোলাম মাহবুব ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক খালেক নেওয়াজ খানও বক্তৃতায় অনুরূপ মনোভাব ব্যক্ত করেন। এই সময়ে আমি সভা হইতে কয়েক গজ দূরে অবস্থি মঘুর ক্যান্টিনে বসা ছিলাম। সংগ্রামী কর্মীরা বক্তৃতা করিয়া পাল্টা শক্ত জবাব দিবার অনুরোাধ জানাইরে আমি তাঁহাদিগকে বুঝাইয়া বলি যে, আমি ১৪৪ ধারা ভাঙ্গিতে চাই। কিন্তু সেই সঙ্গে ইহাও চাই যে, সংগ্রাম পরিষদ অটুট থাকুক। এই মুহূর্তে আমি কোন বিতন্ডা চাই না। তাহাছাড়া আগামী দিনের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন পরিচালনার স্বার্থেই আমার পক্ষে প্রকাশ্য সভায় সংগ্রাম কমিটির প্রতি কোন প্রকার প্রকাশ্য অনাস্থা দেখানো ভুল হইবে। পরবর্তী ঘটনাবলী প্রমাণ করে যে, আমার এই সিদ্ধান্ত নির্ভুল ছিল। উল্লেখ্য যে, এই সভাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক আবদুল মতিন প্রত্যয়ব্যঞ্জক দৃঢ়তার সহিত তেজোদৃপ্ত কন্ঠে ঘোষণা করেন, ‘‘ জালেম সরকারের নিষেধাজ্ঞা ১৪৪ ধারাকে প্রতিরোধ করা না হইলে, অনাগত দিনে ন্যুনতম গণতান্ত্রিক অধিকারও অবশিষ্ট থাকিবেনা।” সভায় সবদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সীদ্ধন্তের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করিয়া সংগ্রাম পরিষদকে লুপ্ত ঘোষণা পূর্বক ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। অতঃপর ৬ জন, ৮ জন ও ১০ জনের ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠা করিবার দৃঢ় সংকল্পে স্বেচ্ছায় রাজপথে অপেক্ষমান পুলিশ বাহিনীর হস্তে গ্রেফতার হইবার জন্য ভীতিহীনচিত্তে অগ্রসর হইতে থাকে। আত্মপ্রত্যয় উজ্জীবিত যুব সমাজের শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল আইন ভঙ্গ আন্দোলনে পুলিশ বাহিনী হতচকিত হইয়া পড়ে। কিন্তু তাই বলিয়া সরকারী গোয়েন্দা বিভাগ কর্তৃক নিয়োজিত নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী উস্কানিদাতাদের উপস্থিতি যে ছিল না , তাহা নহে। শান্তিপূর্ণ মিছিলকে উচ্ছৃঙ্খল করিয়া তুলিবার অপপ্রয়াসে এই উস্কানিদাতাদল বিশ্ববিদ্যলয় প্রাঙ্গন হইতে পুলিশ বাহিনীর উপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করিতে শুরু করিয়া দেয়। জবাবে পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জমায়েত ছাত্রদের উপর কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে । প্রতিক্রিয়াস্বরূপ অল্পক্ষণের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের শান্ত- সুশৃঙ্খল আবহাওয়া উত্তপ্ত হইয়া উঠে। স্বাভাবিক কারণেই বিদ্রোহের আগুন জ্বলিয়া উঠে ছাত্র সাধারণের ধমণীতে। উত্তেজনার এই মুহূর্তেই রাওলাট এ্যাক্টের (১৯১৯) বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধী পরিচালিত সর্বভারতীয় অহিংস আইন অমান্য আন্দোলনের বিভিন্ন লোমহর্ষক ও রোমাঞ্চকর ঘটনাবলী আমার মনের দিগন্তে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। দেহ মনে এক অপূর্ব নৈতিক সাহস ও আত্ম প্রত্যয় সঞ্চারিত হইল। কোন এক অদৃশ্য শক্তি যেন ন্যায় ও সত্যের এই লড়াইয়ের দুর্গম ও বন্ধুর পথে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখিবার উৎসাহ ও উদ্যম জোগাইল। উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিকে আয়ত্তে আনিবার অজুহাতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতেই অবশেষে পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশ করে। পুলিশী হামলার মুখে ছাত্র সাধারণ ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়ে। কিন্তু অল্পকারের মধ্যেই আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল হোস্টেলের প্রধান ফটকের নিকট আবার জমায়েত হই এবং সেখান হইতেই পূর্ববঙ্গ আ্ইন পরিষদ ভবনগামী পরিষদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে আমাদের দাবী পেশ করিতে থাকি। ইহা ছিল ১৪৪ ধারা জনিত নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আমাদের বিক্ষোভ প্রদর্শনের অংশ। উল্লেখ্য যে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল তখনকার পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদ ভরনের (জগন্নাথ হল মিলনায়তন) অতি সন্নিকেটে বর্তমান শহীদ মিনার সংলগ্ন পিছনের বিস্তৃত এলাকায় অবস্থিত ছিল। মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের প্রধান প্রধান ফটকে বিক্ষোভ প্রদর্শনকালে একজন ছাত্রকমীর মারফত জানিলাম যে, ছাত্রসভায় সভাপতি জনাব গাজীউল হক কলা ভবনের দ্বিতলে হঠাৎ করিয়া জ্ঞানশূণ্য হইয়া পড়িয়াছেন। তাঁহাকে দেখিতে যাওয়া প্রয়োজন। আমি কালবিলম্ব না করিয়া তাঁহার উদ্দেশ্যে রাওয়ানা হইলাম। তাঁহাকে সাহস হারাইতে মান করিলাম। বলিলাম, আপনি এখন সুস্থ্য হইয়া উঠিয়াছেন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়া মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে আসুন। এই বলিয়া আমি মেডিকেল কলেজ হোস্টেল চলিয়া আসি। সেই চরম সংকটাপন্ন সময়ে তাঁহার অনুপস্থিতি আমাকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করিয়া তুলিয়াছিল। কিন্তু তাঁহার উপস্থিতি সংগ্রামের মুহূর্তে এত কাম্য হওয়া সত্ত্বেও তিনি আন্দোলনে স্নায়ুকেন্দ্রে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল এলাকায় উপস্থিতি হইতে পারেন নাই। এমনকি, ৭ই মার্চ আমার গ্রেফতা হওয়া অবধি জনাব গাজীউল হকের সহিত আমাদের আর দেখা হয় নাই। হয়ত বা গোয়েন্দা পুলিশ বাহিনীর চোখে ধূলা দিয়া, পর্বতপ্রমাণ দুর্লংঘনীয় বাধা অতিক্রম করিয়া আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্রে পৌঁছিবার সকল প্রচেষ্টাই তাঁহার ব্যর্থ হইয়াছিল। 
     এইদিকে পরিস্থিতির অবণতি ঘটিতে থাকে। সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী ও সংগ্রামী ছাত্র বিক্ষোভকারীদের পারস্পরিক ইট-পাটকেল বর্ষণের ফলে অবস্থা ক্রমশঃ আয়ত্বের বাহিরে চলিয়া যায়। এমনি ঘোলাটে পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ধৈর্য, সহনশীলতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় না দিয়া জেলা প্রশাসক কোরাইশী গুলী চালাইবার নির্দেশ দেন। হোস্টেল গেট সংলগ্ন ১১ নং ব্যারাকের পার্শ্বে অবস্থানরত রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের এম,এ,ক্লাসের ছাত্র আবুল বরকত বুলেটবিদ্ধ হইয়া ভুতলে পতিত হন। গুলীর আওয়াজে হতচকিত বিক্ষোভকারীরা সম্বিত ফিরিয়া পাইতে না পাইতেই আমরা সাদাশার্ট ও পায়জামা পরিহিত আবুল বরকতকে রক্তাপ্লুত ও ভুলুন্ঠিত অবস্থায় দেখিতে পাই। তাঁহাকে ধরাধরি করিয়া হাসপাতালের উত্তরদিকস্থ প্রবেশদ্বার পর্যন্ত পৌঁছিয়া হোস্টেল অভিমুখে রওয়ানা দিতেই দেখিতে পাই যে, সংগ্রামী বন্ধুরা আর একটি লাশ পাঁজকোল করিয়া আনিতেছে। নিকটবর্তী হইয়া মাথার দিকের কাপড় তুলিতেই দেখিতে পাইলাম ছাত্র বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম,এ, ক্লাসের সাহাউদ্দীনের মাথার খুলি নাই। কি হৃদয় বিদারক দৃশ্য! কেবলমাত্র প্রত্যক্ষদর্শীর পক্ষেই এই দৃশ্য অনুভব করা সম্ভব। ইহার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আমার দুর্বল লেখনীর সাধ্যাতীত। 

প্রতিক্রিয়া

পুলিশের গুলী শুরু হয় আনুমানিক তিন ঘটিকার পর। নিহত হন আববুল বরকত, সালাহউদ্দীন, জব্বার, শফিউর রহমান ও নাম না জানা আরও কয়েকজন। ছাত্র হত্যার খবর দাবানলের মত ছড়াইয়া পড়ে। ঢাকা শহরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অফিস-আদালত এবং যানবাহন ধর্মঘটে নামিয়া আসে। পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদে মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারী পার্টির সদস্য মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ মুলতবী প্রস্তাব আনয়ন করেন এবং জনাব খয়রাত হোসেন ও বেগম আনোয়ারা খাতুন উক্ত প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানান। গুলি চালনার স্বপক্ষে মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন কর্তৃক সাফাই গাহিবার প্রতিবাদে মাওলানা তর্কবাগীশ, খয়রাত হোসেন, দৈনিক আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শাসসুদ্দিন, বেগম আনোয়ারা খাতুন ও কংগ্রেস দলীয় সদস্যবৃন্দ আইন পরিষদ অধিবেশন হইতে ওয়াক আউট করেন। মাওলানা তর্কবাগীশ পার্লামেন্টারী পার্টি হইতে পদত্যাগ করিয়া লীগ সদস্যদের মধ্যে প্রথম বিরোধী দল গঠন করেন, আজাদ সম্পাদক জনাব আবুল কালাম শামসুদ্দিন প্রথমতঃ পার্লামেন্টারী পার্টি হইতে ও পর দিবস অর্থাৎ ২২ শে ফেব্রুয়ারী পরিষদ সদস্য পদ হইতে ইস্তফা দেন। 
     পূর্ববঙ্গ গভর্নর ও পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদ স্পীকার বরাবর লিখিত ইস্তফা পত্রটি ছিল নিম্নরূপঃ ‘‘বাংলাকে পাকিস্তানে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবী করায় ছাত্রদের উপর পুলিশ যে বর্বরাতার পরিচয় দিয়াছে তাহার প্রতিবাদে আমি পরিষদের আমার সদস্য পদ হইতে পদত্যাগ করিয়াছি। যে নূরুল আমিন সরকারের আমিও একজন সমর্থক, এই ব্যাপারে তাহাদের ভূমিকা এতদূর লজ্জাজনক যে, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকিতে এবং পরিষদের সদস্য হিসাবে বহাল থাকিতে আমি লজ্জাবোধ করিতেছি।” 
     ছাত্র হত্যার প্রেক্ষিতে মুহূর্তের মধ্যে ছাত্র আন্দোলন গণ-আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করায় সরকার ভীত, সন্ত্রস্ত্র ও দিশাহারা হইয়া কান্ডজ্ঞানহীন ব্যবস্থা গহণ করে। ২১ শে ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যা নাগাদ ঢাকা শহরে সান্ধ্য আইন জারি ও সেনাবাহিনী তলব করা হয়। গভীর রাত্রিতে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘেরাও করে ও মর্গ হইতে নিহত ছাত্রদের লাশ অন্যত্র অপসারিত করে। তাই, নিহতের মোট সংখ্যা সম্পর্কে দেশবাসীর মনে অনন্তকাল ধরিয়া একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন জাগিয়া থাকিবে। সরকারী তথ্য অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা মাত্র চারজন, প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে প্রচুর সংশয় রহিয়াছে। হাসপাতালে ভর্তিকৃত ২০ জন আহতের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকত ও আবদুল জব্বার এবং বাদামতলী কামর্শিয়াল প্রেসের মালিকের পুত্র রফিকউদ্দীন আহমদ (২৭) প্রাণ ত্যাগ করেন। বাকী ১৭ জনের অবস্থাই আশংকাজনক ছিল।

শাসসুল হকের আগমন

গুলির কিছুক্ষণ পর আনুমানিক অপরাহ্ন চার ঘটিকার দিকে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব শামসুল হক খবর পাঠাইলে আসি সেই শোকাবিভূত মুহূর্তে মেডিকেল কলেজের হোস্টেল হইতে হাসপাতাল ইমার্জেন্সী ওয়ার্ডের গেটের সম্মুখে চত্বরে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করি। সদ্য সংঘটিত মর্মান্তিক ও নৃশংস হত্যাকান্ডে আমরা উভয়েই মর্মাহত। হৃদয়বিদারক পরিস্তিতি আমাদের উভয়েরই বাকশক্তি যেন হরণ করিয়া নিয়াছিল। প্রকৃতিস্থ হইবার পর অতন্ত ধীর ও শান্ত কন্ঠে উদ্ভুত পরিস্থিতির মূল্যায়নে নিবিষ্টি হইলাম। জনাব শামসুল হকের প্রশ্নোত্তরে আমি নিবেদর দকরিলাম যে, সর্বপ্রকার মতবিরোধ ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব পরিহার করিয়া এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা সঠিক হইয়াছে কিনা, সেই অবান্তর প্রসঙ্গ উত্থাপন না করিয়া পরবর্তী কর্মসূচী গ্রহণপূর্বক ঐক্যবদ্ধভাবে হত্যাকরী জালেম সরকারের সমুচিত জওয়াব দিতে হইবে। আমি আরও বলিলাম যে, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে হইবে। অবশ্য জনাব হকের বক্তব্য ছিল যে, ২০ শে ফেব্রুয়ারী দিবাগত রাত্রির বৈঠকে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থনে গৃহীত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করবার সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করিবার ফলে সবদলীয় সংগ্রাম পরিষদের বিলুপ্তি ঘটিয়াছে। উদ্ভুত পরিস্থিতির পটভূমিকায় আমি তাহার সহিত দ্বিমত ব্যক্ত করিলাম এবং তাহাকে দৃঢ়ভাবে বলিলাম যে, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করাকে অপরাধ বিবেচনা না করিয়া আমাদের আমু কর্তব্য ও নৈতিক দায়িত্ব হইতেছে, সংগ্রাম কমিটির নামে সঠিক ও বীরোচিত নেতৃত্ব  দান। তদুত্তরে জনাব শামসুল হক দোষারোপ করিয়া মন্তব্য করিলেন, ‘‘তুমি ও তোমার পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ কর্মীরাই ১৪৪ ধারা ভঙ্গের জন্য সম্পূর্নরূপে দায়ী”। তাঁহার সহিত আলোচনা বৃথা বুঝিতে পারিয়া অযথা কালক্ষেপণ না করিয়া তাঁহাকে মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসে আসিবার অনুরোধ জানাইয়া বিদায় গ্রহণ করি। তিনি আমার অনুরোধের কোন জওয়াব না দিয়া কাজী গোলাম মাবুব ও মোঃ তোয়াহার অবস্থিতি সম্পর্কে জানিতে চাহেন। তাঁহাকে জানাই যে, গোলাম ও মোঃ তোয়াহা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে তখনও আসেন নাই। আমি আরও বলিযে, হয়ত সময় এবং সুযোগমত তাঁহারা আসিবেন। মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে সর্বদলীয় রাষ্টভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় সবার সহিত দেখা হইবে এই আমা প্রকাশ করিয়া আমি ছাত্রাবাস অভিমুখে প্রস্থান করি। 

পরবর্তী কর্মসূচী 

ছাত্র হত্যাজনিত বিশেষ পরিস্থিতিতে মেডিকেল কলেজ হোষ্টেলটি আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হইয়াছিল। মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসের উত্তরদিকস্থ বটবৃক্ষে মাইকের হর্ণ বাঁধিয়া ২০ নং ব্যারাক হইতে আন্দোলন সম্পর্কিত বিভিন্ন ঘোষাণা ও আহবান জনতার উদ্দেশ্যে অবিরাম প্রচার করা হইতেছিল। মেডিকেল কলেজে ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং যুবলীগের নেতৃস্থানীয় সক্রিয় ব্যক্তিবর্গের যৌথ সভায় আমরা নিম্ন লিখিত কর্মসূচী ঘোষণা করিঃ 
(ক) ২২ শে ফেব্রুয়ারী ভোর ৭টায় মেডিকেল কলেজ ছাত্রবাস প্রাঙ্গণে গণ-গায়েবী জানাযা এং (খ) গাযেবী জানাযা সমাপনের পর জনসভা ও জঙ্গী মিছিল্ মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসের কন্ট্রোল রুম হইতে জনতার জ্ঞাতার্থে কর্মসূচী মাইকে বারবার ঘোষণা করা হইল। 

নেতৃবর্গের ভূমিকা

এইদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলার তাগিতে আমাকেই উদ্যোগ গ্রহণ করিয়া ২১ শে ফেব্রুয়ারী রাত্রি ৯ ঘটিকায় মেডিকেল কলেজ হোস্টেলস্থ ৪নং ব্যারাকের ৩নং রুমে সাহসী ও উৎসাহী কর্মীদের এক সভা আহবান করিতে হয়। উক্ত বৈঠকে মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি ও সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যান্য সদস্যের অনুপস্থিতিতে আমাকে ও জনাব গোলাম মাওলাকে উক্ত বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হয়। সর্বজনাব শামসুল হক, মোঃ তোয়াহা, আবদুল মতিন, আবুল হাশিম, আবুল কাসে, খয়রাত হোসেন, শামসুল আলম (ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি), মুজিবুল হক( সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সহ- সভাপতি ) হেদায়েত হোসেন চৌধুরী (সাধারণ সম্পাদক, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল) ও অন্যান্য সবাই গা ঢাকা দিয়াছিলেন। ফলে ২১ শে ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যার পর আন্দোলনের দারুণ সংকটময় ও বিপজ্জনক মুহূর্তে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ নেতৃবর্গ ও সাধারণ কর্মীদের উপর আন্দোলন পরিচালনার সমগ্র গুরুদায়িত্ব বতাইয়াছিল। বলাই বাহুল্য যে, এই আন্দোলন জনতা ও নিঃস্বার্থ কর্মীরা অপূর্ব সংগ্রামী চেতনার পরিচয় দিয়াছিলেন। ২১ শে ফেব্রুয়ারী সম্পর্কে ইহাই ছিল প্রকৃত পরিস্থিতি। বিভিন্ন মহল বিভিন্ন সময়ে ২১ শে ফেব্রুয়ারীর ঘটনাবলীকে এবং উহার সত্যকে বার বার বিকৃত করিয়াছে।এই প্রবণতা এখনও অব্যাহত আছে। বাংলাদেশে অভ্যূদয়ের পর আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, ও তাহাদের খয়েরখাঁগণ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে চরমভাবে বিকৃত করিয়া সুবিধামত ব্যবহার করিয়াছে।