জঙ্গী মিছিল

ফন্ট সাইজ:
যাহা হউক, পূর্ব ঘোসিত কর্মসূচী অনুযায়ী আমরা লক্ষাধিক জনতার জঙ্গী  মিছিল সহ রাজপথে বাহির হইয়া পড়ি। এই বিপ্লবী জনতার বিদ্রোহী কাফেলার পদভারে রাজধানীর রাজপথ প্রকম্পিত হয়। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। অবর্ণনীয় ! শুধু হৃদয়ংগম করা যায়; অভিজ্ঞতার কোটরে রাখা যায়, কিন্তু ভাষায় রূপ দেওয়া যায় না। 
     ‘‘নারায়ে তাকবীর-আল্লাহু আকবর’’, ‘‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’’, ‘‘উর্দু- বাংলায় বিরোধ নাই’’ ‘‘ খুনী নূরুল আমিনের বিচার চাই’’ ‘‘ খুনের বদলা খুন চাই’’ ইত্যাদি গগণবিদারী ধ্বনি দিতে দিতে দৃপ্ত পদক্ষেপে মিছিল হাইকোর্ট ও কার্জন হল মধ্যস্থিত রাজপথ বাহিয়া আবদুল গণি রোডের দিকে মোড় নেয়। সেক্রেটারিয়েট-ইডেন বিল্ডিং আক্রমণ হওয়ার অহেতুক সংশয়ে ভীত পুলিশ বাহিনী মিছিলকে ছত্রভঙ্গ করিবার প্রয়াসে লাঠিচার্জ শুরু করে ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে । এই অবস্থায় মিছিলের একটি অংশ কার্জন হল, ফজলুল হক হল ও ঢাকা হল প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে। আমরা আপ্রাণ প্রচেষ্টায় তাহাদিগকে পুনঃসংগঠিত করি। আপোষহীন শপথের স্বাক্ষর বহনকারী ৬০/৭০ হাজার লোকের এই জঙ্গী মিছিলটি অতঃপর ঢাকা হলের পশ্চিম দিকস্থ গেট দিয়া ধীর পদক্ষেপে নাজিমুদ্দিন রোড, চকবাজার, মোগলটুলী, ইসলামপুর ও পাটুয়াটুলীর উপর দিয়া সদরঘাট অভিমুখে অগ্রসর হইতে থাকে। সশস্ত্র সামরিক বাহিনী ভর্তি অসংখ্য ট্রাক পুরান ঢাকা শহরের রাজপথগুলিতে অবিরত টহল দিতেছিল। সুদীর্ঘ পথ অতিক্রমকালে রাস্তার উভয় পার্শ্বে অবস্থিত বাড়ীর ছাদ, দ্বিতল ত্রিতল বারান্দা হইত আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা, কিশোর-কিশোরী ও পুরবাসিনী সজল নয়নে কোথাও হাত নাড়িয়া, কোথাও পুষ্প বর্ষন করিয়া, কোথাওবা দেশাত্মবোধক শ্লোগান দ্বারা আমাদিগকে অভিনন্দন জানাইতে ও উৎসাহ দিতে থাকে। যাহা হউক, মিছিলটি সদরঘাট মোড় হইতে ভিক্টোরিয়া পার্ক (বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্ক ) অভিমুখে রওয়ানা হইয়া জগন্নাথ কলেজের পুর্ব দিকস্থ গেটের নিকটবর্তী হইতেই পুলিশ বাধা প্রদান করে। কর্ডন ভাঙ্গিতে চেষ্টা করিতেই পুলিশ মিছিলকারীদের বেদম প্রহার শুর করে ও বেপরোয় কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করিতে থাকে। অবিরাম লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপে টিকিতে না পারিয়া আমাদের অভ্যন্তরে আশ্রয় গ্রহণকরি। আমি প্রথমে ড্রেনের ঢাকনীর নিচে ও পরে জগন্নাথ কলেজের দারোয়ানের নিকট হইতে অবগত হই যে, পূবাহ্নে সদরঘাট এলাকা হইতে সংগঠিত মিছিল ইংরেজী দৈনিক মর্নিং নিউজ অফিসে অগ্নি সংযোগ করে। তাই পুলিশ কোন মিছিলকে অগ্রসর হইতে দিতেছে না। 
     রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ভারতীয় চর ও হিন্দু দ্বারা পরিচালিত মর্নিং নিউজ এই নামে এক মিথ্যা,  বানোয়াট ও অমর্যাদাকর সংবাদ পরিবেশন করায় অত্র এরাকার  ছাত্র জনতা ক্রোধান্বিত হইয়া বাঙ্গালী-বিদ্বেষী পত্রিকাটি জুবিলী প্রেস অগ্নিদগ্ধ করে। জগন্নাথ কলেজের পার্শ্ববর্তী বাড়ীর মালিকের অনুমতি গ্রহণ পূর্বক সহকর্মী বন্ধুরা আমাকে কিছুক্ষণ ঐ বাড়ীতে লুকাইয়া রাখে। অবস্থা কিছুটা শান্তভাব ধারণ করিলে দৃঢ়চিত্তে, সদা সচেতন ও জাগ্রত সহকর্মী বন্ধুদের কড়া পাহারাবেষ্টিত হইযা চোরারাস্তা ও অলিগলি বাহিয়া অতি সন্তর্পণে ও সাবধানতার সহিত আন্দোলন পরিচালনা কেন্দ্র মেডিকেল করেজ ছাত্রাবাসের পথে রওয়ানা দেই। সহকর্মী বন্ধুদের সতর্কতা অবলম্বনের কারণ এই ছিল যে, পাছে গোয়েন্দা বাহিণী কিংবা মুসলিম লীগ দালালদের কবলে পড়ি। তাহাদের এই অকৃত্রিম ভালবাসা, দরদ ও আমার স্মৃতিপটে অমূল্যনিধি হিসেব আমৃত্যু বিরাজ করিবে। যাহা হউক, এই সন্তপর্ণ প্রস্থানের পথেই কায়েৎটুলী মোড়ে রেলওয়ে ক্রসিং অর্থাৎ ঢাকা মিউজিয়ামের দক্ষিণ দিকস্থ রাজপথের দক্ষিন দিকের রাস্তায় পৌছিলে সাইকেলে গমনরত বন্ধুবর জনাব তাজুদ্দিন আহমদের সাক্ষাৎ ঘটে। সে আমাকে অনুযোগ ও ধমকের সুরে শীঘ্র সাইকেলে উঠিবার নির্দেশ দিয়া বলে ‘‘ এই ভাবে চলিলে যে কোন মুহূর্তে গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেফতার করিয়া লইয়া যাইবে।’’ আমি কোন বাক্যব্যয়  না কলিয়া তাহার সাইকেলের সিট ও হ্যান্ডেবারের মর্ধবর্তী ডান্ডায় বসিয়া পড়ি। তাজুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে আমাকে নামাইয়া প্রস্তানোদ্যত হইলে আমি তাহাকে সক্রিয়ভাভে আন্দোলনে যোগ দিতে বলি। প্রত্যুত্তরে কিছু না বলিয়া সে মুহূর্তের মধ্যে অন্তর্ধান হইয়া যায়। কোন সংকটজনক পরিস্থিতিতে পড়িরে কোন প্রকার উচ্চবাক্য না করিয়া হাসিয়া অন্য প্রশ্নের অবতারণা করা ছিল তাহার স্বভাব। সরকার ও সরকর বিরোধী তথা কর্তৃপক্ষ ও কর্তৃপক্ষ বিরোধী শক্তিদ্বয়ের সংঘাতে ছাত্রজীবনে সবসময় সে গা বাচাইয়া চলিত। তাই ছাত্রজীবনে তাহার গায়ে কর্তৃপক্ষের সামান্যতম আঁচড়ও লাগে নাই।