শহীদ মিনার

ফন্ট সাইজ:
সেই দিনই অর্থাৎ ২২শে ফেব্রুয়ারী সূর্যাস্তের সময় মোঃ সুলতান কয়েকজন যুবলীগ কর্মীসহ আমার সহিত সাক্ষাৎ করেন এবং যেইখানে পূর্ববর্তী দিবসে (২১ শে ফেব্রুয়ারী) প্রথম গুলি চালনা করা হইয়াছে সেইখানে শহীদ মিনার নির্মাণের প্রস্তাব রাখেন। নিহত সহযোগী ভাইদের প্রতি প্রাণচঞ্চল কর্মীদের অকৃত্রিম মমত্ববোধ ও শ্রদ্ধার অভিব্যক্তি আমাকে অভিভূত করে। ভাষা আন্দোলনের ঘটনাবলী সম্পর্কে আজ যাহারা দলীয় বা ব্যক্তি স্বার্থে অসত্য বক্তব্য রাখিতেছেন, তাহাদের কেহই সেই আন্দোলনে কিংবা আবগেঘন ঐতিহাসিক লগ্নে উপাস্থিত ছিলেন না। সরল ও সর্বস্বত্যাগে প্রস্তুত দুঃসহাসী কর্মীদের হৃদয়ের অনুভূতি তাহারা বুঝিবেন না। মিথ্যার ফুলঝুরি রচনায় তাই তাহাদের বিন্দুমাত্র কুণ্ঠা জাগেনা। মাতৃভাষা ও দেশমাত্রকার জন্য প্রথম আত্মোৎসর্গকে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করিয়া রাখিবার প্রস্তাবে আমি সানন্দে সম্মতি দিলাম। কোথা হইতে ইট, সুরকী, সিমেন্ট ও অন্যান্য মালমশলা যোগাড় হইল জানিনা। তবে এই প্রাণচঞ্চল তরণরাই সারারাত ধরিয়া অমানুষিক পরিশ্রমে মেডিকেল কলেজের সিনিয়র ছাত্র বদিউল আলম কর্তৃক অংকিত নকশা মোতাবেক প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের কাজটি সম্পন্ন করেন। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে যিনি পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্যপদ হইতে ইস্তফা দিয়াছিলেন, ‘দৈনিক আজাদ’ সম্পাদক সেই আবুল কালাম শামসুদ্দিন ২৩ শে ফেব্রুয়ারী শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধন করিয়া একদিকে যুব ছাত্র জনতার কৃতজ্ঞতারভাজন ও অন্যদিকে জালেম সরকারের চক্ষুশূলে পরিণত হন। রাষ্ট্রিয় ও জাতীয় প্রশ্নে তাঁহা সহিত আমাদের মৌলিক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্বীকার করিতেই হয় যে, তাঁহার সাহিত্যিক মন সঠিক মুহূর্তেই বিদ্রোহ ঘোষণা কলিয়াছিল এবং সর্বপ্রকার আত্মস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠিয়া তিনি এই সংগ্রামী চেতনার সহিত আকাত্ম হইয়া গিয়াছেন। সত্যাশ্রয়ী ও হৃদয়বান মানুষেরা এইভাবেই ইতিহাসের অগ্রযাত্রায় নিজেদরে অবদান রাখেন।
     ২১ শে ফেব্রুয়ারী শোকাহত ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তৎকালীন ঢাকা কলেজের ছাত্র বর্তমানের প্রথিতযশা সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী ‘‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী ’’ এই কালজয়ী কবিতাটি লিখেন। প্রথমে এর সেরারোপ করেন আবদুল লতিফ পরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আলতাফ মাহমু সুরারোপ করেন। বর্তমানে যে সুরে গানটি গাওয়া হয় এবং সুরে এই কবিতাটির পক্তিমালা এদেশের মানুষের কন্ঠে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে আসছে সেটি আলতাফ মাহমুদেরই করা সুর। 
 
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী 
আমি কি ভুলিতে পারি 
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু-গড়া এ ফেব্রুয়ারী 
আমি কি ভুলিতে পারি 
আমার সোনার দেশের রক্ত রাঙানো ফেব্রুয়ারী 
আমি কি ভূলিতে পারি ॥ 
জাগো নাগিনীরা জাগো জাগো কালবোশেখীরা 
শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুর বসুন্ধরা, 
আমার দেশের সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবী 
দিন বদলের ক্রান্তি লগনে তবু তোরা পার পাবি? 
না, না, না, না, না, খুন রাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেওয়া তারই 
একুশে ফেব্রুয়ারী একুশে ফেব্রুয়ারী 
সেদিনো এমনি নীল গগণের বসনে শীতের শেষে 
রাত জাগা চাঁদ চুমো খেয়েছিল হেসে; 
পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকানন্দা যেনো, 
এমন সময় ঝড় এলো এক, ঝড় এলো ক্ষ্যাপা বুনো। 
সেই আঁধারের পশুদের মুখ চেনা, 
তাহাদের তরে মায়ের, বোনের, ভাইয়ের চরম ঘৃণা
ওরা গুলি ছোড়ে এদেশের প্রাণে দেশের দাবীকে রোখে 
ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই বাংলার বুকে 
ওরা এদেশের নয়, 
দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয় 
ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে। কাড়ি 
একুশে ফেব্রুয়ারী একুশে ফেব্রুয়ারী ॥
তুমি আজ জাগো তুমি আজ জাগো একুশে ফেব্রুয়ারী 
আজো জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর নারী 
আমার শহীদ ভাইয়ের আত্মা ডাকে 
জাগো মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাঠে বাঁকে 
দারুণ ক্রোধের আগুনে আবার জ্বালবো ফেব্রুয়ারী 
একুশে ফেব্রুয়ারী একুশে ফেব্রুয়ারী । 
 
     এইখানে উল্লেখ্য যে, ২৩ শে ফেব্রুয়ারী রাত্রে পুলিশ শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি ভাঙ্গিয়া চুরমার করিয়া দেয়। এই প্রথম শহীদ মিনার ভাঙ্গিয়া দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়যা তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা অনার্স ক্লাসের ছাত্র আলাউদ্দিন আল আজাদ ইকবাল হলে বসিয়া নিম্নোক্ত কবিতা রচনা করেনঃ 
স্মৃতির মিনার ভেঙ্গেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু আমরা এখনো 
চার কোটি পরিবার 
খাড়া রয়েছিতো যে ভিৎ কখনো রাজন্য
পারেনি ভাঙ্গতে 
হীরার মুকুট নীল পরোয়ানা, খোলা তলোয়ার 
খুরের ঝটিকায় ধুলার চুর্ণ যে পদপ্রান্তেত
যারা বুনি ধঅন 
গুন টানি আর তুলি হাতিয়ার হাপর চালাই
সরল নায়ক আমরা জনতা সেই অনন্য। 
ইটের মিনার 
ভেঙ্গেছে ভাঙ্গুক। ভয় কি বন্ধু দেখ একবার আমরা জাগরী 
চারক কোটি পরিবার। 
এ কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছ মৃত্যু এমন, 
শিয়রে যাহার ওঠে না কান্না, ঝরে না অশ্রু? 
হিমালয় থেকে সাগর অবধি সহসা বরং 
সকল বেদনা হযে উঠে এক পতাকার রং; 
এ কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
বিরহে যেখানে নেই হাহাকার? কেবল সে তার 
হ’য় প্রপাতের মোহনীয় ধারা, অনেক কথার 
পদাতিক ঋতু কলমের দেয় কবিতার কাল? 
ইটের মিনার ভেঙ্গেছে ভাঙ্গুক। একটি মিনার গড়েছি আমরা 
চার কোটি কারিগর 
বেহালার সুরে রাঙ্গা হৃদয়ের বর্ণ লেখায় 
পলাশের আর 
রামধনুকের গভীর চোখের তারায় তারায় 
দ্বীপ হয়ে ভাসে যাদের জীবন, যুগে যুগে সেই শহীদের নাম 
এঁকেছি প্রেমের ফেনিল শিলায়, তোমাদের নামে। 
তাই আমাদের 
হাজার মুঠির বজ্র শিখরে সূর্যের মতো জ্বলে শুধু এক 
শপথের ভাস্কর ॥
 
    যাহা হউক, ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে এককভাবে বিজয়ী যুক্তফ্রন্ট কর্তৃক প্রণীত নির্বাচনী ওয়াদায় ২১ শে ফেব্রুয়ারীর আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ওয়াদা ছিল। ১৯৫৬ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী পূর্ব পাকিস্তানের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী জনাব আবু হোসেন সরকার শহীদ মিনারের ভিত্তি স্থাপন করেন। ১৯৫৬ সালে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করিবার পর জনাব আতাউর রহমানকে নিযুক্ত করেন। শহীদমিনারের অঙ্গশোভা পরিকল্পনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন ও শিল্পী কামরুল হাসান। স্থপতি হামিদুর মূল নকশা ছিল নিম্নরুপঃ 
 
১। সম্ভগুলির সামনের চত্বরের মধ্যস্থলে একটি সরোবর। 
২। সরোবরে রক্তকমল শাপলা। 
৩। স্তম্ভগুলির অবণত মাথার  ছায়া। 
৪। স্তম্ভগুলির মধ্যবর্তী ফাঁকে ফাঁকে শিক। 
৫। মূল শহীদবেদীর দুই পার্শ্বে দুইটি সবুজ কামরা। একটি পাঠকাগার, অন্যটি যাদুঘর। 
৬। মূল চত্বরের বাহিরে একটি। উঁচুবেদী হইবে সাংস্কৃতির ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের স্থান। 
 
স্থপতির ব্যাখ্যাঃ 
১। মূল বেদীঃ জন্মভূমি 
২। অবণত মাথা, স্তম্ভগুলি ও পাশের স্তম্ভগুলিঃ জনতা। 
৩। স্বচ্ছজলঃ শহীদের আত্মা। 
৪। রক্তকমল শাপলাঃ আত্মদানের প্রতীক। 
৫। সরোবরে অবণত শিরের ছায়াঃ শহীদদের আত্মদানের প্রতি দেশবাসীর কৃতজ্ঞাতা। 
আতাউর রহমান খানের সরকার পরিকল্পনা প্রণয়নে দক্ষতার পরিচয় দিলেও দুই বৎসরাধিক ক্ষমতাসীন থাকা সত্ত্বেও স্থপতির ঐকান্তিক চেষ্টায় অঙ্কিত নকশা মোতাবেক শহীদ মিনার নির্মাণে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তানের তদানীন্তন উর্দূভাষী গভর্ণর লেঃজেঃ আযম খান বর্তমান শহীদ মিনারটি নির্মাণের ব্যবস্থা করেন এবং ১৯৬৩ সালে ২১ ফেব্রুয়ারী শহীদ বরকতের মা উক্ত মিনারটির উদ্বোধন করেন। বলাই বাহুল যে, লেঃ জেঃ আযম খান নির্মিত শহীদ মিনারটি স্থপতি হামিদুর রহমান কর্তৃক অঙ্কিত নকশার আংশিক বাস্তবায়ন মাত্র।