সরকারী জুলুমের আরেক পর্যায়ে

ফন্ট সাইজ:
২৩ শে ফেব্রুয়ারী দিবাগত রাত্রিতে জনাব আবুল হাশিম, পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল রশীদ তর্কবাগীশ এবং জনাব খয়রাত হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও জগন্নাথ কলেজের অধ্যাপক অর্জিত গুহকে নিরাপত্তা আইনে কারারুদ্ধ করা হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোষ্টেল ও অন্যান্য ছাত্রাবাসের কন্ট্রোল রুম হইতে সরকারের সশস্ত্র বাহিনী মাইক ছিনাইয়া লইয়া যায় এবং নবনির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটি চুরমান করিয়া দেয়। সরকার শুধু ইহাতেই ক্ষান্ত হয় নাই। 
     অবস্থা আয়ত্বাধীন নহে অজুহাতে এবং শান্তিপূর্ণ ধর্মঘট, সভা শোভাযাত্রাকে বলপ্রয়োগ দমাইয়া দেওয়ার অশুভ চিন্তা হইতেই সরকার আকস্মিকভাবে ২৪ শে ফেব্রুয়ারী পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের বাজেট সেশন অনির্দিষ্টকালে জন্য মূলতবী ঘোষণা করেন। জ্ঞাততাপস ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি সরকারের চন্ডনীতির বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করিলে আকস্মিকভাবেই ২৫ শে ফেব্রুয়ারী অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয় এবং আবাসিক ছাত্রদিগকে ছাত্রাবাস ত্যাগ করিতে বাধ্য করা হয়। পুলিশ বাহিনী দুইঘন্টাকাল ব্যাপি সলিমুল্লাহ হলে তল্লাশি চালায়। একই সঙ্গে হলের হাউস টিউটর অধ্যাপক ডঃ মফিজুদ্দিনকে আটক এবং তাঁহার সহিত ৩৯ জন ছাত্রকেও গ্রেফতার করে। 
     কিন্তু সরকারের শত কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন সত্ত্বেও ২৫ শে ফেব্রুয়ারী ঢাকা শহরে পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। উল্লেখ্য যে, ঢাকার কোন প্রেস নগদ পয়সাতেও ২৫ শে’র হরতাল পালন সংক্রান্ত ইশতেহার ছাপাইতে স্বীকৃত না হওয়ায় যুবলীগ যগ্ম সম্পাদক জনাব মোঃ সুলতান ও কাজী আজিজুর রহমান নরসিংদী বা ভৈরব হইতে বিজ্ঞাপন ছাপাইতে আনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। যদিও সেই মুহূর্তে ঢাকা শহরে সামরিক বাহিনী, সশস্ত্র ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ই,পি,আর), সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী, গোয়েন্দা বাহিনী এক বিভীষিকার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করিয়াছিল, তথাপি ২৪ শে ফেব্রুয়ারী দ্বিপ্রহরের মধ্যে বিজ্ঞাপন ছাপাইয়া বিলি করা হয়। পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ কর্মীদের অকৃত্রিম দেশপ্রেম, ত্যগী চরিত্র, সুনিপুর্ণ কর্মকৌশল, কঠোর পরিশ্রম, অদম্য সাহস ও উদ্যেগ, কর্তব্যনিষ্ঠা, অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, সর্বোপরি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার দৃঢ়চিত্ততা ছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও অন্যান্য ভীরু ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠরি আন্দোলন পরিচালনায় আপোষমূলক নিন্দনীয় ভূমিকার বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য ভরসাস্থল। পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ ২১ শে ফেব্রুয়ারী ছাত্র রক্তক্ষরণের পর ভাষা আন্দোলনের মূল সাংগঠনিক শক্তিতে পরিণত হয় এবং সাধারণ ছাত্রকর্মীরা সহায়ক শক্তিরুপে নজীরবিহীন আত্মসচেতনতার সাক্ষ্য বহন করে। মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর ভবিষ্যদ্বণী ‘মুসলমান সম্প্রদাযের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ গর্বের সহিত বলেন যে, উর্দুই বাঙালী মুসলমানের ভাষা কিন্তু আমার প্রত্যয় যে, একদিন বাঙালীর সহজ শুভবুুদ্ধি প্রমাণ করিবে যে, বাংলা হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই মাতৃভাষা। ’ কবি রবীন্দ্রনাথের অর্ন্তদৃষ্টি কত নিখূঁত ছিল, ২১ শে ফেব্রুয়ারীই উহার রক্ত স্বাক্ষর।