নারায়ণগঞ্জে আন্দোলন

ফন্ট সাইজ:
২১ শে ফেব্রুয়ারী ছাত্র হত্যার পর বিদ্রোহবহ্নি দাবানলের ন্যায় সর্বত্র ছড়াইয়া পড়ে। রাজপথে, জনপদে, নগরে, গঞ্জে, গ্রামে, কোটি কোটি বাঙ্গালীর শিরায়-উপশিরায়, ধমনীতেত, রক্তকণায় প্রজ্বলিত জয় মুক্তির প্রদীপ্ত মশাল, যার চরম সীমাপ্রাপ্তি ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর, পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যূদয়। 
     যাহা হউক, পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচী মোতাবেক নারায়ণগঞ্জ রহমতুল্লাহ ইনস্টিটিউশনে বিভিন্ন বক্তা পুলিশের গুলীতে ঢাকার ছাত্রহত্যার বিস্তৃত বিবরণ পেশ করেন। সভাশেষে বিরাট মিছিল পুলিশের গুলীর প্রতিবাদে সমগ্র শহর প্রদক্ষিণ করে। ২২ শে ফেব্রুয়ারী সাধারণ হরতাল পালনের আহবান জানান হয়। ২৩ শে ফেব্রুয়ারী সমগ্র নারায়ণগঞ্জ শহর ও শিল্প এলাকায় পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ সহ-সভাপতি শামসুজ্জোহা, নারায়ণগঞ্জ যুবলীগ নেতা সফী হোসেন খান,  ডাঃ মজিবর রহমান ও অন্যান যুবলীগ নেতা আন্দোলন বিমুখ আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতা আলমাস আলী ও আবদুল আওয়ালে শত বাধাকে উপেক্ষা করিয়া পূর্ণ হরতাল পালনে নের্তৃত্ব দেন। হরতাল শেষে ইষ্ট পাকিস্তান ফেডারেশন অব লেবারের সভাপতি জনাব ফয়েজ আহমদের সভাপতিত্বে তুলারাম কলেজ প্রাঙ্গণে এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। করাচির ইংরেজী দৈনিক সম্পাদক জেড, এইচ, সুলেরী এই সভায় বক্তৃতা করেন এভভং বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাদানের অকুণ্ঠ সমর্থন জানান। উল্লেখ্য, ২২শে ফেব্রুয়ারী হইতে ২৮ শে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত অব্যাহত আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জ মহকুমার বিচক্ষণ এস,ডি,ও অবাঙ্গালী জনাব ইমতিয়াজীর প্রশাসন কোন প্রকার প্রতিবন্ধকততা বা হস্তক্ষেপ করে নাই। 
     নারায়ণগঞ্জ মর্গান হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষযিত্রী মমতাজ বেগম ছিলেন নারায়ণগঞ্জ ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী। সরকার ও সমাজের সর্বপ্রকার রক্তচক্ষুকে অবজ্ঞার সহিত উপেক্ষা করিয়া এই অপ্রতিরোধ্য তেজস্বিনী নেত্রী যুবলীগ নেতা শামসুজ্জোহা, সফি হোসেন খান ও ডাঃ মুজিবর রহমানের সহিত হাতে হাত ও কাঁধে কাঁধ মিলাইয়া শহীদের রক্ত-শপথে নারায়ণগঞ্জবাসীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দেলনে উজ্জিবীত করেন। অধুনা পথে-ঘাটে অগ্নিকন্যা দাবীভূষিত বহুনেত্রীর নাম মুনা যায়; কিন্তু তাঁহারা কেহ কি মিসেস মোমতাজ বেগমের ন্যায় অগ্নি অতিক্রম করিয়া জনতার চেতনায় স্বীয় ত্যাগ ও কর্মোদ্যম দ্বারা এভং জানমাল ইজ্জতের পূর্ণ ঝুঁকি নিয়া আন্দোলনের আগুন ছড়াইতে কখনও সক্ষম হইয়াছেন? সরকার মমততাজ বেগমের এই সাংগঠনিক শক্তি ও সাহস লক্ষ্য করিয়াছিল। তাই ২৯ শে ফেব্রুয়ারী, মর্গান স্কুল হইতে যুবলীগ নেতা শামসুজ্জোহার বাড়ী ‘হীরামহল’ গমনকালে পথিমধ্যে পঁচিশ হাজার টাকা তহবিল তসরুফের মিথ্যা বানোয়াট অভিযোগে পুলিশ বাহিনী মিসেস মোমতাজ বেগমকে গ্রেফতার করেন। তাঁহাকে নারায়ণগঞ্জে কোর্টে লইয়া যাওয়া হয় ও তাঁহার পক্ষে জামিন প্রার্থনা করা হইলে, উহা না মঞ্জুর হয়। এমনকি ভাষা আন্দোলন সমর্থক কয়েকজন সহৃদয় ব্যক্তি নগদ দশ হাজার টাকা, মহামান্য আদালতের নিকট জামিন হিসাবে তৎক্ষণাৎ জমা দিতে যাওয়া সত্ত্বেও মিসেস মোমতাজ বেগমকেক জামিনে মুক্তি দেওয়া হয় নাই। ইতিমধ্যে তাঁহার গ্রেফতারে উৎকন্ঠিত ও উত্তেজিত হাজার হাজার জনতা কোর্ট ঘেরাও করিয়া ফেলে এবং মোমতাজ বেগমকে লইয়া পুলিশ বাহিনী ঢাকার পথে অগ্রসর হইবার চেষ্টা করিলে ক্ষুব্ধ জনতা সরকারী কারসাজির বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়া রুখিয়া দাড়াঁয়। বিদ্রোহী জনসমুদ্রের অটল অবিচল দৃঢ়তা উপেক্ষা করিয়া পুলিশ ভ্যান জনতার উপর দিয়া অগ্রসর হইতে ব্যর্থ হয়। ক্রোধান্বিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ অবশেষে পশুশক্তি প্রয়োগের আদেশ দেয়। পুলিশ জনতাকে বেদম প্রহার শুরু করিলে জনতা সাময়িক ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়ে; এবং সেই সুযোগে বন্দী মোমতাজ বেগমকে নিয়া পুলিশ ভ্যান ঢাকা অভিমুখে রওয়ানা হয়। কিন্তু ছাষাড়া রেলওয়ে ক্রসিং-এ বিক্ষুব্ধ জনতা রেলওয়ে গেট ফেলিয়া দিয়া পুলিশ ভ্যানের গতিরোধ করে। এইস্থলে জনতা ও পুলিশে আরেক দফা সংঘর্ষ বাঁধে। জজকোর্টে মোমতাজ বেদমের জামিনের জণ্য জনাব শামসুজ্জোহা ও ডাঃ মুজিবর রহমান ঢাকায় চলিয়া আসায় যুবলীগ নেতা সফি হোসেন খানকেই সেইদিনকার সেই সংকটময় মুহূর্তে নের্তৃত্ব দিতে হয়। পুলিশের আক্রমণে নিরস্ত্র বিদ্রোহী জনতা এক পর্যায়ে রেলওয়ে রাস্তার পাথর খন্ডগুলিকে পুলিশের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার শুরু করে। পুলিশ-জনতা সংঘর্ষে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা রাজপথের উভয় পার্শ্বস্থ গ্রামগুলি হইতে হাজার হাজার জনতা আন্দোলনে শরীক হয়। তাহারা চাষাড়া হইতে পাগলা পর্যন্ত দীর্ঘ ৬ মাইল রাস্তায় একশত ষাটটি বটগাঠ কাটিয়া ঢাকামুখী পথকে অবরুদ্ধ করিয়া ফেলে। বেগতিক অবস্থাকে আয়ত্তে আনিবার নিমিত্ত কর্তৃপক্ষ শেশমেষ ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলসকে তলব করে। পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদ সদস্য খান সাহেব ওসমান আলরি বাসস্থান ‘বায়তুল আমান’ খানা তল্লাশি করা হয়। খানা তল্লাশি কালে ‘বায়তুল আমানের ’বহু টাকা পয়সা ও সোনাগহনা লুট হয়, বাড়ী ঘরের ও বিস্তর ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয় এবং শুধু খান সাহেব ওসমান আলীকেই নহে পুলিশ তাঁহার পুত্র মোস্তফা সারওয়ারকেও গ্রেফতা করে। সেই আন্দোলনের মূলকর্ণধার যুবলীগ নেতা সফি হোসেন খান, মিস্ত্রী ইলা বকশী ও ছাত্রী বেলুও গ্রেফতার হন। গ্রেফতাকৃত অপর বন্দী কামরুদ্দীন দবিরকে পুলিশ বেদম প্রহার করে। দিন কয়েকের মধ্যেই শামসুজ্জোহ, জামিল , লুৎফর রহমান এবং সাত বৎসর বয়স্ক বালক মেসবাহউদ্দীন কারারুদ্ধ হন। ২৯ শে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ঢাকা কোতওয়ারী থানায় জিজ্ঞাসাবাদরে পর ১লা মার্চ বন্দীদিগকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চালান দেওয়া হয়। অপরিণামদর্শী নূরুল আমিন সরকার ক্ষিপ্তত হইয়া পাঁচজন আইন পরিষদ সদস্য যথা মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, খয়রাত হোসেনন, খান সাহেব ওসমান আলী, গোবিন্দ লাল ব্যানার্জী ও মাদার বক্সকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। 
     বিশেষভাবে উল্লেখখযোগ্য যে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করিবার কারণে অনেককেই গুরুতর মাশুল দিতে হইয়াছে। কারাগার হইতে বন্ড সহি করিয়া মুক্তি ক্রয় করিতে অস্বীকার করিলে মিসেস মোমতাজ বেগমকে তাঁহার স্বামী তালাক দেন। এই ভাবেই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে যোগ দিবার অপরাধে নারায়ণগঞ্জ মর্গান হাইস্কুলের হেড মিসেট্রেসস মোমতাজ বেগমের সংসার তছনছ হইয়া যায়। তাহাঁর এই ত্যাগ আমরা মূল্যায়ন করিতে সক্ষম হইয়াছি কি? এবং সেই অনুযায়ী জাতির কর্ণধারগণ তাঁহাকে যথোপযুক্ত সম্মান দেখাইয়াছেন কি?
 
     চট্টগ্রাম বন্দর নগরীতে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন স্তরের সংবেদনশীল ব্যক্তিবর্গ ও বিভিন্ন দলে সমবায়ে একটি সংগ্রাাম পরিষদ গঠিত হয়। চট্টগ্রাম জেলা যুবলীগ আহবায়ক এবং মুক্ত হাওয়ায় মুক্ত চিন্তার বাহন ‘সীমান্ত’ পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক জনাব মাহবুব-উল-আলম চৌধূরী সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক নির্বাচিত হন। ঢাকায় পুলিশের গুলীতে আহত নিহতদের খবর পাওয়ার পর সন্ধ্যা ৭টায় রোগশয্যা হইতে এই বিদগ্ধ কবি ‘‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’’ কবিতাটি রচনা করেন জনাব মাহবুল-উল-আলম চৌধুরী রচিত কবিতাটি নিম্নে দেওয়া হইলঃ 
কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি
মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী
ওরা চল্লিশজন কিংবা আরো বেশী 
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে রমনার রৌদ্রদগ্ধ
কৃষ্ণচূড়ার গাছের তলায় 
ভাষার জন্য, মাতৃভাষার জন্য বাংলার জন্য 
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে 
একটি দেশের সংস্কৃতির মর্যাদার জন্য 
আলাওলে ঐতিহ্য 
রবীন্দ্রনাথ, কায়কোবাদ, নজরুলের
সাহিত্য ও কবিতার জন্য। 
যারা প্রাণ দিয়েছে
ভাটিয়ালি, বাউল, কীর্তন, গজল
নজরুলের ‘‘খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি 
আমার দেশের মাটি”
এই দুইটি লাইনের জন্য। 
রমনার মাঠের সেই মাটিতে 
কৃষ্ণচূড়ার ঝরা পাঁপড়ির মতো 
চল্লিশটি তাজা প্রাণ আর 
অঙ্কুরিত বীজের খোসার মধ্যে 
আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের অসংখ্য বুকের রক্ত 
রামেশ্বর, আবদুস সালামের কচি বুকের রক্ত 
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সেরা কোন
ছেলের বুকের রক্ত। 
আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের প্রতিটি রক্তকণা 
রমানার সবুজ ঘঅসের উপর 
আগুনের মতো জ্বলছে, জ্বলছে আর জ্বলছে 
এক একটি জীবের টুকুরোর মত 
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছেলে চল্লিশটি রত্ন
বেঁচে থাকলে যারা হতো 
পাকিস্তানের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ 
যাদের মধ্যে লিংকন রল্যা 
আরাগঁ, আইনস্টাইন আশ্রয়া পেয়েছিল
যাদের মধ্যে আশ্রয় পেয়েছিল
শতাব্দীর সভ্যতার 
সবচেয়ে প্রগতিশীল কয়েকটি মতবাদ 
সেই চল্লিশটি রত্ন যেখানে প্রাণ দিয়েছে
আমরা সেখানে কাঁদতে আসিনিন 
যারা গুলী ভরতি রাইফেল নিয়ে এসেছিল ওখানে 
যারা এসেছিল নির্দয়ভাবে হত্যা করার আদেশ নিয়ে 
আমরা তাদের কাছে 
ভাষার জন্য আবেদন জানাতেও আসিনি আজ 
আমরা এসেছি খুনী জালিমের ফাঁসির দাবী নিয়ে
আমরা জানি তাদের হত্যা করা হয়েছে 
নির্দয়ভাবে তাদের গুলী করা হয়েছে
ওদের কারো নাম তোমারী মত ‘ওসমান’ 
কারো বাবা তোমারই বাবার মতো 
হয়তেতা কেরানী কিংবা পূর্ববাংলার 
নিভৃত কোন গাঁেয় কারো বাবা 
মাটির বুক থেকে সোনা ফলায় 
হয়তো কারো বাবা কোন 
সরকারী চাকুরে। 
তোমারই আমারই মতো 
যারা হয়তো আজকেও বেঁচে থাকতে পারতো 
আমারই মতো তাদের কোন একজনের
হয়তো বিয়ের দিন পর্যন্ত ধার্য হয়েছিল
তোমারই মতো তাদের কোন একজনের হয়তো 
মায়ের সদ্যপ্রাপ্ত  চিঠিখানা এসে পড়ার আশায় 
টেবিলে রেখে মিছিলে যোগ দিতে গিয়েছিল
এমন এক একটি মূর্তিমান স্বপ্নকে বুকে চেপে
জালিমের গুলীতে প্রাণ দিল
সেইসব মৃত্যুর নামে 
আমি ফাঁসির দাবী করছি 
যারা আমার মাতৃভাষাকে নির্বাসন দিতে 
চেয়েছে তাদের জন্য আমি ফাঁসির দাবী করছি 
যাদের আদেশে এই দূর্ঘটনা ঘটেছে তাদের জন্য 
ফাঁসি দাবী করছি 
যারা এই মৃতদেহের উপর দিয়ে 
ক্ষমতার আসনে আরোহণ করেছে 
সেই বিশ্বাসঘাতকদের জন্য 
আমি ওদের বিচার দেখতে চাই 
খোলা ময়দানে সেই নির্দিষ্ট জায়গাতে শাস্তি প্রাপ্তদের গ্রলীবিদ্ধ অবস্থায় 
আমার দেশের মানুষ দেখতে চায়। 
পাকিস্তানের প্রথম শহীদ 
সেই চল্লিশটি রত্ন
দেশের চল্লিশজন সেরা ছেলে 
মা, বাবা, বৌ আর ছেলে নিয়ে
এই পৃথিবীর কোলে এক একটি 
সংসার গড়া যাদের 
স্বপ্ন ছিল
যাদের স্বপ্ন ছিল আইনস্টাইন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে 
আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার 
যাদের স্বপ্ন ছিল রবীন্দ্রনাথের 
কিভাবে মাুনষের কাজে লাগনো যায় 
তার সাধনা করার 
‘বাঁশীওয়ালার’ চেয়েও সুন্দর 
একটি কবিতা রচনা করার। 
সেই সব শহীদ ভাইয়েরা আমার 
যেখানে তোমরা প্রাণ দিয়াছ
যেখানে হাজার বছর পরেও 
সেই মাটি থেকে তোমাদের রক্তাক্ত চিহ্ন 
মুছে দিতে পারবে না সভ্যতার কোন পদক্ষেপ 
যদিও অসংখ্য মিছিল অস্পষ্ট নিস্তব্ধভাবকে ভঙ্গ করছে 
তবুও বিশ্ববিদ্যালযের সেই ঘন্টাধ্বনি
প্রতিদিন তোমাদের মৃত্যুক্ষণ 
ঘোষণা করবে 
যদিও আগামীতে কোন ঝঞ্ঝা ঝড় বিশ্ববিদ্যালয়ের 
ভিত্তি পর্যন্ত নড়িয়ে দিতে পারে 
তবুও তোমাদের শহীদ নামের উজ্জ্বল্য 
কিছুতেই মুছে যাবে না। 
খুনী জালিমের নিপীড়নকারীর কঠিন হাত 
কোনদিনও চেপে দিতে পারবে না
তোমাদেরও সেই লক্ষ দিনের আশাকে 
যেদিন আমরা লড়াই করে জিতে নেব 
ন্যায়-নীতির দিন 
হে আমার মৃত ভায়েরা 
সেই নিস্তব্ধতার মধ্য থেকে 
তোমাদের কণ্ঠস্বর
স্বাধীনতার বলিষ্ঠ চিৎকার 
ভেসে আসবে  
সেইদিন আমাদের দেশের জনতা 
খুনী জালিমকে ফাঁসির কাষ্টে 
ঝুলাইবে ঝুলাবে 
তোমাদের আশা অগ্নিশিখার মতো জ্বলবে 
প্রতিশোধ এবং বিজয়ের আনন্দে । 
(চট্টগ্রাম। ২১ শে ফেব্রুয়াী ১৯৫২, রাত ৭টা 
মূল কবিতার প্রথমাংশ)। 
জনাব মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী রোশয্যায় পুলিশ প্রহরাধীন থাকিবার কারণে চট্টগ্রাম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহবায়কের দায়িত্ব বর্তায় চট্টগ্রাম হইতে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘আওয়াজ’ সম্পাদক বিল্পবী জননেতা চৌধুরী হারুন-উর-রশীদের স্কন্ধে। আন্দোলনের সক্রিয় নেতৃত্ব দানের কারণে তিনি পূর্বপাক জননিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হইয়া বিনাবিচারে রাজবন্দী জীবন-যাপন করেন।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পরিচালনার তাগিতে নিম্ন লিখিত ১৭ সদস্যবিশিষ্ট বগুড়া জেলা সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। পরিষদ সদস্যবৃন্দরা হইলেনঃ 
বগুড়া যুব লীগ সম্পাদক জনাব ছমিরুদ্দিন মন্ডল, যুগ্ম সম্পাদক জনাব গোলাম মহিউদ্দিন ও শেখ হারুনুর রশীদ, জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি মজিরুদ্দিন আহমদ, জেলা আওয়ামী লীগ সম্পাদক এ.কে. মুজিবর রহমান, কবিরাজ শেখ আবদুল আজিজ, সিরাজুল ইসলাম, বগুড়া ছাত্রলীগ নেতা আবদুস শহীদ, নূরুল হোসেন মোল্লা, মোটর শ্রমিক নেতা কমরেড সুবোধ লাহিড়ী, বিড়ি শ্রমিক নেতা শাহ আহমদ হোসেন, রিকশা শ্রমিক নেতা মোখলেসুর রহমান, কৃষক নেতা ফজলুর রহমান, তমদ্দুন মজলিস নেতা খন্দকার রুস্তম আলী ও লুৎফর রহমান, কৃষক প্রজা পার্টির কবিরাজ মোফাজ্জল বারী। আওয়ামী লীগ নেতা জনাব মজিরুদ্দিন আহমদ ও যুবলীগ নেতা জনাব গোলাম মহিউদ্দিনকে যথাক্রমে চেয়ারম্যান ও কনভেনর নির্বাচিত করা হয়। 
আন্দোলন স্তিমিত হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে ২৯ শে ফেব্রুয়ারী সর্বজনাব গোলাম মহিউদ্দিন, শেখ হারুনুর রশীদ, ছমিরুদ্দিন মন্ডল, নূরুল হোসেন মোল্লা, আবদুল মতিন ও বাবু সুবোধ লাহিড়ীকে পূর্বপাক নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে ও বগুড়া জেলা কারাগারে বিনাবিচারে আটক রাখে।