গ্রেফতার

ফন্ট সাইজ:
৫ই মার্চ আহূত সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী সাধারণ হরতাল, মিছিল ও সভা সরকারী কঠোর দমননীতির জন্য আশানুরূপভাবে সফল হইতে পারে নাই। এমতাবস্থায় কর্তব্য নির্ধারণকল্পে ৭ই মার্চ শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় ৮২ নং শান্তিনগরে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের এক সভা আহবান করা হয়। ৮২ নং শান্তিনগরে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের এক সভা আহবান করা হয়। ৮২ নং শান্তিনগরে যাওয়ার পথে জগন্নাথ কলেজের ছাত্র যুবলীগ কর্মী আনিসুজ্জাম আমার পথ প্রদর্শক ছিলেন। সভায় আমি ব্যতীত কাজী গোলাম মাহবুব, জনাব আবদুল মতিন, মীর্জা গোলাম হাফিজ, জনাব মুজিবুল হক (সহ-সভাপতি, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদ), হেদায়েত হোসেন চৌধুরী( সাধারণ সম্পাদক, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদ) এবং মোঃ তোয়াহা উপস্থিত ছিলেন। ইহা ব্যতীত মোঃ সাদেক খান ও আবদুল লতিফ, হাসান পারভেজ ও আনিসুজ্জামানও উক্ত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। আমাদের সভা সমাপ্ত প্রায়, এমন সময়ে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী ৮২ নং শান্তিনগর ঘেরাও করে। অংশগ্রহণকারী সদস্যদের পুনঃপুনঃ সতর্কবাণী সত্ত্বেও জনাব মোঃ  তোয়াহার অতিরক্তি বক্তব্য ও একই বক্তব্য বারবার বলার প্রচেষ্টায় সভার কাজে অনর্থক কালক্ষেপণ হইতেছিল। জনাব তোয়াহার অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘায়িত বক্তব্যই এই দূর্ঘটনার জন্য সম্পূর্ণ দায়ী। পুলিশের পদধ্বনি পাওয়ামাত্র তাকাইয়াা দেখি আমরা পুলিশ পরিবেষ্টিত। তথাপি পুলিশের গ্রেফতারী এড়াইবার চেষ্টায় কেহ চাকর সাজিয়া কেহ বা ঘরের কোণায় গৃহবাসী হইয়া পুলিশকে ফাঁকি দিতে চাই। কিন্তু কিছুই হয় নাই। তবে কাজী গোলাম মাহবুব ঘরে বার্ঁশের মাচার উপর এমনভাবে শয়ন করিয়াছিলেন যে, পুলিশের শ্যেনদৃষ্টিও তাঁহাকে আবিস্কার করিতে পারে নাই; যদিও সংবাদদাতার তালিকায় কাজী গোলাম মাহবুবের নাম ছিল। হাসান পারভেজ ও আনিসুজ্জামান ( পরবর্তীকালে ডক্টরেট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক) গ্রেফতার হয় নাই। আমাদের বৈঠকের স্থানের সামনে দিয়া লম্বা ছিপছিপে একটি লোক সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করিতেছিল। গলা হইতে মুখমন্ডলের দুই পাশের দুই কানসহ মাথার উপর দিয়া গরম কমফার্টার বাঁধা থাকায় তাহাকে চেনা দুস্কর ছিল। হয়তো বা গোয়েন্দা বিভাগের সহিত সম্পর্কিতত লোকও হইতে পারে। 
যাহা হউক, গ্রেফতারকৃত সবাইকে নিয়া কোতোয়ালী থঅনা হাজতে আটক রাখা হয়। খবর পাওয়ামাত্র ঢাকা সিটি পুলিশ সুপারিন্ডেন্ট জনাব মাসুদ মাহমুদ হন্তদন্তত হইয়া আমাদিগকে দেখিতে আসিলেন। এক নজর আমাদের দিকে তাকাইয়া তিনি থানা অফিসারকে জিজ্ঞাসা করিলেন "Have you linched them'' অর্থাৎ বেত্রাঘাত করিয়াছ কি?” তাহার প্রশ্নে আমরা ক্ষোভে, অপমানে ও ক্রোধে গড়গড় করিতেছিলাম। 
     ঢাকা ওয়াইজঘাটে অবস্থিত গোয়েন্দা বিভাগের সদর দফতরে আমাকে ও আবদুল মতিনকে স্থানান্তরিত করা হয়। ৮ই মার্চ সকাল নয়টায় গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান তদানীন্তন আই,জি,পি, জাকির হোসেন, ডি,আই,জি, ওবায়দুল্লাহহ, গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ডি,আই,জি, হাফিজুদ্দিন ও গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান সুপারিন্টেডেন্ট তসলিম আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আমার দিকে চাহিয়া মজার প্রশ্ন করেন আই, জি, পি, জাকির হোসেন, ‘‘এই নাকি প্রধানমন্ত্রী?’’ উক্ত মন্তব্যের নিগূঢ় অর্থ অনুধাবন করিতে ব্যর্থ হইয়া হতচকতভাবে তাঁহার দিকে তাকাইলাম। পরবর্তীকালে অবগত হই যে, আমরা নাকি সুইসাইড স্কোয়াড করিয়াছি এবং আমার নেতৃত্বে নাকি অস্থায়ী বিকল্প সরকারও গঠিত হইয়াছে। বাহবা দিতে হয় সংবাদদাতাগণকে। গোয়েন্দা বিভাগ যে কাল্পনিক তথা সংগ্রহে কত পারদর্শী, উপরে বর্ণিত তথ্যাবলী হইতেই উহার প্রমাণ পাওয়া যায়। 
     গোয়েন্দা বিভাগ সদর দফতরে পাঁচদিন পাঁচ রাত্রি আমাকে অবিরাম জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদকালে তাহাদের প্রশ্নের উত্তর বড় একটা দিতাম না। ইহাতে ক্ষিপ্ত হইয়। তাহারা নানারকম ভয়ভীতি দেখাইত, অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করিত ও সময়ে সময়ে প্রহার করিত। তাহাদের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল এই যে, আমা ভারতীয় অর্থ ও কারসাজিতেই এই ভয়াবহ গণআন্দোলন সৃষ্টি করিয়াছি। অথচ তাহাদের এই অভিযোগ আদৌ সত্য নহে। ইহা মিথ্যা ও বানোয়াট। ইহা আমরা স্বপ্নেও চিন্তা করি নাই। সুতরাং আমার জবানীতে মিথ্যা স্বীকারোক্তি কেন করিতে যাইব? ১২ই মার্চ সন্ধ্যা রাতে এক হাওলাদার আমাকে ক্যান্টনমেন্টে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি লইতে খবর দিয়া গেল। উদ্দেশ্য ফৌজি ছাউনিনতে দৈহিক নির্যাতন চালান। তাহা হইলেই সকল গোপনীয় খবর প্রকাশ করিয়া দিব। আমি মনে মনে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালাকেই স্মরণ করিয়া মানসিক প্রস্তুতি নিলাম। দৈহিক নির্যাতন যতই হউক মিথ্যা স্বীকারোক্তি করিব না। যে ষড়যন্ত্রের বিন্দুবিসর্গও জানিনা, তাহার খবর বলিব কোথা হইতে? যাহা হউক, পুলিশ রাত্রিভর জিজ্ঞাসাবাদ করিয়াছে বটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাহারা আমাকে ক্যান্টনমেন্টে লইয়া যায় নাই। পথ হইতেই ফিরাইয়া আনিয়াছিল। ক্যান্টনমেন্ট যাওয়ার পথে কেবল ‘‘ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল গান’’ রচনাকারী জুলিয়াস ফুঁচিকের অকথ্য পাশবিক অত্যাচার সহ্য করিবার কাহিনীই আমার মনে সাহস ও মনোবল যোগাইত। 
     ১৩ই মার্চ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠাইবার পূর্বক্ষণে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ডি,আই,জি হাফিজুদ্দিন আহমদের সহিত আমর পুনঃপুনঃ সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়। কারাগারের দেওয়ানী ওয়ার্ডে আমাকে পাঠানো হয়। দেওয়ানী ওয়ার্ড খন্দকার মোশতাক আহমদ, মীর্জা গোলাম হাফিজ, মোঃ তোয়াহা, দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালাম পূর্ব হইতেই ছিলেন। উল্লেখ্য , ‘‘দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার’’ ১২ই ফেব্রুয়ারী সংখ্যায় CRYPTO FASCISM ঋঅঝঈওঝগ শিরোনামে এক সম্পাদকীয় লিখার কারণে ১৩ই ফেব্রুয়ারী এক সরকারী আদেশে পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়। তাঁহারা সবাই ভাষা আন্দোলনের শিকার। কিছুদিনের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিধ্যালয় ইন্টারন্যাশনাল বিভাগ প্রধান ও রীডার ডঃ পি,সি, চক্রবর্তী আমাদের সহিত যোগ দেন। ডঃ চক্রবর্তীকে সঙ্গদান প্রয়োজনে দেওয়ানী ওয়ার্ডে বেশীর ভাগ সময় তাস(ব্রীজ) খেলিতে হইত। কারণ, শ্রদ্ধেয় ডঃ চক্রবর্তীকে প্রফুল্লচিত্ত রাখার মিত্ত সঙ্গদান আমাদের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য ছিল। কয়েকদিনের মধ্যে মুচলেকা সহি করিয়া, রাজনীতি করিব না অঙ্গীকার করিয়া মীর্জা গোলাম হাফিজ কয়েদখানা হইতে মুক্তি ক্রয় করিলেন। 
     ইতিমধ্যে সর্বজনাব শামসুল হক, দকাজী গোলাম মাহবুব, সৈয়দ নূরুল আলম ও মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী জেলা প্রশাসকের নিকট হাজিরা দিয়া নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির জয়ধ্বনি স্বেচ্ছায় কারন্তরালে প্রবেশ করিলেন। জেলা কর্তৃপক্ষ আমাদিগকে দেওয়ানী ওয়ার্ড হইতে ৫নং ওয়ার্ডে স্থানান্তরিত করি। ৫নং ওয়ার্ডে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আবুল হাশিম, শামসুল হক, মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ, খয়রাত হোসেন, খান সাহেব ওসমান আলী, খন্দকার মোশতাক আহমদ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী অধ্যাপক অজিত গুহ, কাজী মাহবুব, খালেক নেওয়াজ খান, আজিজ আহমদ, মোঃ তোয়াহা, মওকত আলী, হাশিমুদ্দিন আহমদ, আবদুল মতিন, ফজলুল করিম ও আমি একত্রে বাস করিতাম। সর্বকালে আশা-নিরাশার আলো ছায়া খেলার বৃদ্ধ মাওলানা ভাসানী সকলের নিকট পিতৃসুলভ স্নেহ, মায়া, মমতা এবং সাহস, উৎসাহ ও দৃঢ়তার মূর্তপ্রতীক ছিলেন। আমাদের খাওয়া-দাওয়া ও ওষুধ-পত্রে যাহাতে অসুবিধা না হয় তাহার জন্য তিনি জেল কর্তৃপক্ষকে সুকৌশলে জয় করিয়া রাখিতেন। মোদ্দাকথা, তাঁহার অপত্য স্নহ ও নির্ভীক মন সেই দুর্লভ প্রেরণার উৎস ছিল। 
     ভীরু নেতারা মন্ত্রী , মেম্বার, সমাজে গণ্যমান্য হইবার খায়েশ রাখেন কিন্তু সরকারী লাঠিপেটা খাইতে প্রস্তুত নহেন। ময়মনসিংহ জেলা আওমাী মুসলিম লীগ সম্পাদক জনাব হাশিমুদ্দিন আহমদ ময়মনসিংহ জেলা কারাগার হইতে স্থানান্তরিত হইয়া ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে আসেন। জনাব আবুল মনসুর আহমদ ময়মসিংহ হইতে এক চিঠিতে হাশিমুদ্দিন সাহেবকে বন্ড সহি করিয়া মুক্তি ক্রয় করিতে উপদেশ দিয়া পাঠান। কত সামান্যের জন্যই না আমাদের বিবেক বিক্রয় হইতে প্রস্তুত! আর নেতার চরিত্রই যখন এইরূপ, তখন অনুসারীদের চরিত্র উচ্চমানের হওয়ার সুযোগ কোথায়? বোধহয় নেতৃবৃন্দের মেরুদন্ডহীন চরিত্রের কারণেই গণতান্ত্রিক রাজনীতি একনায়কত্ববাদী দর্শনে বিশ্বাসী রাজনীতির নিকট ক্রমশঃ পরাজয়বরণ করিতেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত অমান্য করিয়া ১৪৪ ধারা ভঙ্গকে নীতি বিহর্গিত বলিয়া আমার নিন্দা করিতেন; কিন্তু অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও অধ্যাপক অজিত গুহ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্তের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করিতেন। ১৪৪ ধঅরা ভঙ্গের যাহারা বিরোধী তাহাদের কাহাকেও গ্রেফতা করা ন্যায়তঃ সঠিক হয় নাই। তবে নির্যাতনই যে সরকারের অস্তিত্বের ভিত্তি, তাহাদের পক্ষে শাসনদন্ডের বিবেকপ্রসূত ও নীতিগত ব্যবহার নহে বরং বিদ্বেষমূলক ব্যবহারই স্বাভাবিক, কেননা মূল প্রতিপাদ্য লক্ষ্যই হইল সর্বপ্রকার বিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ করিয়া দেওয়া । 
     ইতিমধ্যে জাস্টিস এলিস-এর নেতৃত্বে ২১শে ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মৃত্তিকা বিভাগের প্রধান ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রভোষ্ট ডঃ এম এ গণি তদন্ত কমিশন সমীপে সাক্ষ্য দানকালে বলেন যে, তিনি ২১ শে ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অনুষ্ঠিত ছাত্র সভায় মাত্র দুইজন অছাত্র জনাব শামসুল হক (সাধারণ সম্পাদক, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ) ও অলি আহাদকে দেখিয়াছেন। ডঃ গণির এই সাক্ষ্যদানে আমার নামোল্লেখ দেখিয়া মোশতাক ভাই বলিলেন যে, উস্কানিদাতা হিসাবে আমার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হইতে পারে। কেননা জনাব তোয়াহাও ছাত্র ছিলেন না। কিন্তু তাঁহারা যেহেতু ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে বক্তৃতা করিয়াছেন। সেইহেতু তাঁহাদের নাম উল্লেখ হউক বা না হউক তাহাঁদের বিরুদ্ধে এই ধরণের মামলার প্রশ্নই উঠেনা। 
     আমাদের গ্রেফতারের কিছুদিনের মধ্যেই জনাব আতাউর রহমান খানকে আহবায়ক নির্বাচিত করিয়া সর্বদলীয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ পুনর্গঠিত করা হয়। ইহারই ফলশ্রুতি ১৯৫২ সালের ২৭ শে এপ্রিল ঢাকা বার লাইব্রেরী হলে সমগ্র দেশ হইতে আগত ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ৫০০ শত সংগ্রামী সৈনিক এক সম্মেলনে সমবেত হন। জনাব আতাউর রহমান খান সভাপত্তি করেন। উক্ত সম্মেলনে মফস্বল জেলাসমূহের প্রতিনিধিদের মধ্য হইতে একজন করিয়া বক্তৃতা দেন। যাহারা দেন তাহারা হলেনঃ 
     সর্বজনাব শামসুল হক (রাজশারী) , আবদুল গফুর ( গফুর (খুলনা), আবুল হোসেন (ফরিদপুর), আবুল হাশেম (বরিশাল), আজিজুর রহমান (চট্টগ্রাম), হাতেম আলী  তালুকদার (ময়মনসিংহ), হাবিবুর রহমান (সিলেট), শফিকুল হক (কুমিল্লা), এস হোসেন (রংপুর), আবদুস সাত্তার বি.এল( বগুড়া), আবদুল বারী বি.এল. (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), মোহাম্মদ আলী (দিনাজপুর), আবদুল মোমেন (পাবনা) সাইদুর রহমান (কুষ্টিয়া), আলমগীর সিদ্দিকী (যশোহর), আনিসুর রহমান(নোয়াখারী)। তমদ্দুন মজলিসের পক্ষ হইতে মিঃ ফকরুজ্জামান খান, ইসলামিক ভ্রাতৃসংঘের পক্ষ হইতে জনাব ইব্রাহীম তাহা, উর্দু লেখক সংঘের পক্ষে জনাব হাসান পারভেজ, পূর্ব পাক যুবলীগের সভাপতি জনাব মাহমুদ আলী, পূর্বপাক ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জনাব কামরুজ্জামান, ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের পক্ষে জনাব ওবায়দুল্লাহ, মেয়েদের পক্ষ হইতে মিস হালিমা খাতুন (মেডিকেল স্কুল ২য় বর্ষ) মিস হালিমা খাতুন  মেডিকেল স্কুল ৪র্থ বর্ষ), সম্পাদক জনাব শেখ মুজিবুর রহমানও বক্তৃতা করেন। উল্লেখ্য যে, শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ শে ফেব্রুয়ারী কারামুক্তি পান। প্রত্যাশা ছিল ঢাকা আসবেন, আন্দোলনকে জোরদার করবেন। তিনি তাহা করলেন না। ইহা অদ্যাবধি রহস্যাবৃত। সম্মেলনে গৃহীত নিম্নোক্ত প্রস্তাবাবলী সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের ৫ই মে (১৯৫২) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়ঃ 
১। কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যেগের অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিবৃন্দের এই সম্মেলন যে সকল শহীদ বুলেট, অমানুষিক অত্যাচার, দমননীতির এবং বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা দাবীকে দমাইয়া রাখিবার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের মুখে চরম ত্যাগের পরাকাষ্ঠ প্রদর্শন করিয়াছেন, তাঁহাদের পবিত্র স্মৃতির প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শন করিতেছে। 
     এই সম্মেলন জনসাধারণকে এই মর্মে আশ্বাস দান করিতেছে যে, শহীদদের লহু বৃথাই প্রবাহিত হয় নাই এবং যতদিন পর্যন্ত না বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারুপে তাহার ন্যায় মার্যাদয় প্রতিষ্ঠিত না হয়, ততদিন পর্যন্ত দেশের কোন প্রকৃত দেশভুক্ত লোকই নিশ্চেষ্ট হইবে না। 
২। গণপরিষেদের কতিপয় ভূয়া যুক্তি সৃষ্টি করিয়া রাষ্টভাষা প্রসঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্থগিত রাখিবার বিষয় বিবেচনা করিয়া সম্মেলন এই মত পোষণ করিতেছে যে, ইহা গড়িমসি নীতির দ্বারা জনগণকে দাবীর পাশ কাটকাইয়া যাইবার জন্য গদিতে আসীন দলের আর একটি প্রচেষ্টা মাত্র। 
     ভাষার দাবীতে সমগ্র জনমত জাগরিত হওয়ার এবং কতিপয় যুবক শাহাদৎ বরণ করিবার পরও রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে তাড়াহুড়া করিবার কোন প্রয়োজন নাই বলিয়া সরকার যে হাস্যকর যুক্তি প্রদর্শন করিয়াছেন, এই সম্মেলন তাহার তীব্র প্রতিবাদ করিতেছে। 
৩। সকল বাস্তব প্রয়োজনের জন্যই ইংরেজী অন্ততঃ আরও ২০ বৎসর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার আসনে আসীন থাকিবে বলিয়া মুসলিম লীগ নেতৃবর্গ এবং তাঁহাদের সরকার যে মন্তব্য করিয়াছেন, এই সম্মেলন তাহাতে গভীর আশংকা প্রকাশ করিতেছে। এই সম্মেলন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করিতেছে যে, রাষ্ট্রৃভাষা প্রসঙ্গে পাশ কাটাইয়া যাইবার জন্য ইহা আর একটি অসদুদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রচেষ্টা। 
৪। এই সম্মেলন মনে করে যে, গত ৫ বৎসর কালের মধ্যে গণপরিষদ যে কেবলমাত্র একটি শাসনতন্ত্র প্রণনেই শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হইয়াছে তাহা নহে, বরঞ্চ জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাবলীর একটিরও সমাধান করিতে তাঁহারা সক্ষম হন নাই। কাজেই এই সম্মেলন অবিলম্বে গণপরিষদ ভাঙ্গীয়া দিয়া স্থলে বয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচনের দ্বারা নূতন একটি পরিষদ গঠনের দাবী জানাইতেছে। 
৫। ভাষা আন্দোলনের বহু কর্মী ও নেতাকে আটক রাখিবার জন্য এই সম্মেলন পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকারের মনোভাবের তীব্র নিন্দা করিতেছে এবং অবিলম্বে তাঁহাদের বিনা শর্তে মুক্তি দাবী করিতেছে। 
৬। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকারসমূহ যেইভাবে ‘নিরাপত্তা’ ও ‘সিকিউরিটি’ আইনের বলে শাসনকার্য চালাইতেছে এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহ পদদলিত করিতেছে, তাহাতে উদ্বেগ ও ঘৃণা প্রকাশ করিয়া এই সম্মেলন সকল অগণতান্ত্রিক, অমানুষিক ও গণবিরোধী আইনসমূহের অবিলম্বে প্রত্যাহার দাবী করিতেছে এবং এই সকল ‘‘ কালা-কানুনে ’’ ধৃত সকল বন্দীদের অবিলম্বে মুক্তি দাবী করিতেছে। 
৭। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও এই আন্দোলনের সহিতত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দলের নেতা ও কর্মীদের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগ ও তাহার সরকার অবিরাম যে সকল হীন প্রচারণা চালাইয়া যাইতেছে, এই সম্মেলন তাহাতে ঘৃণা প্রকাশ করিতেছে।
৮। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সহিত সংশ্লিষ্টদের উপর পুলিশী গুলিবর্ষণ এবং অন্যান্য জুলুমের ফলে শহীদের পরিবারবর্গ ও আহতদের যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দানের জন্য এই সম্মেলন সরকারের নিকট দাবী জানাইতেছে। 
৯। এই সম্মেলন সকল নিরাপত্তা বন্দীর পরিবারবর্গের ভাতা দানের জন্য সরকারের নিকট দাবী জানাইতেছে এবং অন্যান্য সভ্যদেশের রাজনৈতিক বন্দীদের ন্যায় এই সকল রাজনৈতিক বন্দীদিগকে সর্বপ্রকার সুযোগ-সুবিধা দান করিয়া প্রথম শ্রেণীভুক্ত বন্দী করিবার দাবী জানাইতেছে। 
১০। এই সম্মেলন নারায়ণগঞ্জে রাইফেলের গুলিতে নিহত কনস্টেবলের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করিয়া সরকারের নিকট দাবী জানাইতেছে যে, গুলির আঘাতে সংশ্লিষ্ট ঘটনা রহস্যাবৃত থাকিয়া যাওয়ায় দুইজন হাইকোর্টের বিচারপতি এবং একজন জনপ্রতিনিধি কর্তৃক উক্ত ঘটনার বিস্তৃত ও প্রকাশ্য তদন্ত করা হউক। 
১১। এই সম্মেলন মুসলিম লীগ সরকার কর্তৃক সংবাদপত্র সমূহের স্বাধীনতা হরণের তীব্র নিন্দা করিতেছে।
১২। এই সম্মেলন পাক প্রধানমন্ত্রীর নিকট আত্মীয়ের সংবাদপত্র মর্নিং নিউজের জনস্বার্থবিরোধী, ভিত্তিহীন, মিথ্যা, ঘৃণ্য দূরভিসন্ধি ও উদ্দেশ্যমূলক ভূমিকার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করিতেছে।
১৩। কোন প্রমাণ্য যুক্তি ব্যতিরেকেই এবং সকল প্রকার গণতান্ত্রিক নীতির খেলাফ করিয়া সরকার পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার উপর যে নিষেধাজ্ঞা জারি করিয়াছেন, এই সম্মেলন তাহার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করিতেছে। কোন স্বার্থ প্রণোদিত গোষ্ঠির উদ্দেশ্য সাধন এবং বিরোধী দলের ও জনসাধারণের কণ্ঠরোধের জন্যই উপরোক্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হইয়াছে বলিয়া এই সম্মেলন মনে করে এবং অনতিবিলম্বে উক্ত পত্রিকার উপর হইতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবী জানাইতেছে।
১৪। এই সম্মেলন পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে প্রীতি ও সৌহার্দ্যভাব স্থাপনের উদ্দেশ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের স্কুলসমূহে বাংলাকে বাধ্যতামূলক ভাষা হিসাবে গ্রহণ করিবার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ও পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানের সরকারসমূহকে অনুরোধ জানাইতেছে এবং যতদিন এই পন্থা অবল¤¦ন করা না হয় ততদিন উর্দুকে পূর্ব পাকিস্তানের স্কুলসমূহের স্বেচ্ছাধীন ভাষা হিসাবে রাখিবার জন্য পূর্ব পাকিস্তান সরকারকে অনুরোধ জানাইতেছে।
১৫। এই সম্মেলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করিতে এবং বিভিন্ন ভাষার লিখিত পুস্তকাবলী বাংলা ভাষায় অনুবাদ করিতে একটি ‘‘ব্যুরো’’ স্থাপন করিবার জন্য এবং তজ্জন্য অন্ততঃ সাড়ে চাড়ি লক্ষ টাকা মঞ্জুর করিবার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে অনুরোধ করিতেছে।
     আন্দোলন যখন সার্বজনীন রুপ ধারণ করে সংগ্রামী জনতা তখন মাঠে হোমরা-চোমরা নেতাদের মুখ-নিঃসৃত বাক্যের অপেক্ষায় থাকে না। আন্দোলনের আেিগ বহুনেতা, উপনেতা, তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও মেকী দেশসেবক আসর জমাইবার সার্বিক প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়। উদ্দেশ্য কিছু ফায়দা লুটা যায় কি না; অথবা ফটকাবাজারীতে ফাঁকতালে জনতার নেতা হওয়া যায় কিনা। আন্দোলন যতই ভয়ালরুপ ধারণা করে, অগ্নি পরীক্ষা ততই নিকটবর্তী হয়-মোনাফেক, কাপুরুষ, স্বার্থান্বেষী নেতৃবৃন্দ জনতাকে অসহায় অবস্থায় আগ্নেয়গিরি উদগারিত উত্তপ্ত লাভার উত্তাল তরঙ্গে ফেলিয়া দিয়া স্বীয় প্রাণ লইয়া দৃশ্যপট হইতে হাওয়া হইয়া যায়। আন্দোলন যখন সফলতা অর্জন করে ও আন্দোলনকাল উত্তীর্ণ হইয়া পরিস্থিতি শান্তভাব ধারণ করে, তখনই ঐ সকল বিশ্বসঘাতক, সুযোগসন্ধানী, অতি চতুর ব্যক্তি সময়োপযোগী মুখোশ পরিধান করিয়া সংগ্রামী, জনদরদী ও দেশদরদীর লেবাসে সর্বত্র বুক ফুলইয়া পাঁয়তারা করিতে থাকে। বর্ণিত বক্তব্য তিক্ত বটে কিন্তু নিরেট সত্য ও আমার নির্মম অভিজ্ঞতাপ্রসূত। কেহ কেহ আন্দোলন সম্পর্কিত বই লিখেন, খবরের কাগজে প্রবন্ধ ছাপেন, রেডিও-টেলিভিশনে আন্দোলনের কাহিনী বিবৃত করেন, অথচ আন্দোলনের অগ্নিক্ষরা সন্ধিক্ষণ মুহূর্তে তাঁহাদের অনেকের টিকিটি পর্যন্ত দেখা যায় নাই। কেহ কেহ আবার আন্দোলনে স্বীয় ন্যক্কারজনক ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়া নিজ নিজ বিবেকের নিকট লজ্জাবোধ করা দূরে থাকুক, বেমালুম প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী বলিয়া দাবী করিয়া বিকৃত ইতিহাস বয়ান করিতে থাকেন। ইহাদের পক্ষে প্রকাশ্যে কিছু বয়ান করিবার পূর্বে আয়নায় স্বীয় চেহারাটা দেখা বোধহয় দোষের হইবে না। যাহা হউক, কারাগারের কথা বলিতেছিলাম। বিভিন্ন ওয়ার্ডে বন্দীদের মেলামেশা করিবার কোন নিয়ম নাই। তবুও কর্তৃপক্ষের হাজার সতর্ক দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়াই বিভিন্ন পন্থায় যোগাযোগ করা হয়, যেমন-জুম্মার নামাজের দিন মসজিদে আমাদের পরস্পরের দেখা সাক্ষাৎ হইত ও সেখানেই আমরা প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সংলাপ সম্পন্ন করিয় লইতাম। অথবা চিকিৎসার অজুহাতে হাসপাতালে গমন করিলেই পূর্ব খবারাখবর মোতাবেক নির্দিষ্ট ব্যক্তির সহিত দেখা হইত ও পূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনা হইত। শেখ মুজিবুর রহমান এই দুইটি পন্থার কথাই অবহিত ছিলেন। তাই বোধহয় ক্ষমতাসীন হইবার পর ১৯৭২ সাল হইতে কয়েদখানায় জুম্মার নামাজ আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট মসজিদটি তুলিয়া দিয়াছিলেন এবং কারাগারে জুম্মার নামাজ বন্ধ করিয়া দিয়াছিলেন। ১৯৭৪-৭৫ সালে শেখ মুজিবর রহমানের শাসনামলে কারান্তরালে থাকাকালেই দুঃখের সহিত আওয়ামীলীগ সরকারের এই মর্মান্তিক সিদ্ধান্তটি অবগত হই।