আন্দোলন পরবর্তী ঘটনাবলী

ফন্ট সাইজ:
১৯৫২ সালের ফেব্র“য়ারীর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অব্যবহিত পরই পাকিস্তান সরকারের প্রস্তাবক্রমে পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে অবাধ যাতায়ত নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে পাসপোট-ভিসা প্রথা প্রবর্তন করা হয়। পাসপোর্ট-ভিসা প্রবর্তনের পূর্ব মুহূর্তে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে কমিউনিস্ট রাজবন্দীদের নিকট সরকারের তরফ হইতে প্রস্তাব দেওয়া হয় যে, যাঁহারা পাকিস্তান ত্যাগ করিয়া ভারত গমণে প্রস্তুত তাঁহাদের কারা মুক্তির প্রশ্ন সরকার গুরুত্বের সহিত বিবেচনা করিবেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার হইতে কমরেড অমর চক্রবর্তী, বেনু ধর, শিবানী আচার্য, সুশীল সেন, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার হইতে কমরেড মনসুর হাবিব, সুবোধ রায়, কৃষ্ণ বিনোদ রায় ও অন্য কয়েকজন বন্দী মাতৃভুমি ত্যাগ করিয়া নিরাপত্তার অন্বেষণে ভারতভূমি মুখে পাড়ি দিলেন। এইভাবেই প্রায় পনর হাজার কমিউনিস্ট পার্টি নেতা ও কর্মী দেশ বিভাগের পর মাতৃভূমি ত্যাগ করে।
     রমজান মাসে দ্বিপ্রহরে রান্না করা ভাহ-তরকারী আগরাত ও সেহরীর জন্য একই সঙ্গে অপরাহ্ন ৪টা হইতে কারা নিবাসীদের সরবরাহ করা হইত। ভোর রাত ৪টার দিকে ঐ ভাত-তরকারী গরমের কারণে পঁচিয়া অখাদ্যে পরিণত হয়। ইংরেজ আমল হইতে প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতিবাদে মজলুম নেতা মওলানা ভাসানী আমরাসহ বন্দীদের নিয়া ২৭শে মে (১৯৫২) সন্ধ্যা হইতে না খাইয়া রোজা পালন আরম্ভ করেন। এই প্রতিবাদের ফলেই উত্তরকালে কারাবন্দীরা সেহরীর সময় গরম ভাত-তরকারী খাওয়ায় সুব্যবস্থা ভোগ করিয়াছেন।
     রাজবন্দীর মুক্তি ও অন্যান্য দাবীতে মওলানা ভাসানী লেবুরস পানে রোজা রাখিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আমরা বন্দীমুক্তি ও কতিপয় দাবীর ভিত্তিতে পূর্ণ অনশন ধর্মঘটের পরিবর্তে ২৭শে মার্চ (১৯৫৩) মওলানা ভাসানীর পরামর্শ মত ৩৫ দিন অনুরুপ রোজা রাখি।
     মজলুম নেতার রোজ আন্দোলনে অংশগ্রহণকল্পে আমি পূর্বপাক সরকারের প্রধানমন্ত্রীর নিকট নিম্মোক্ত পত্র প্রেরণ করিঃ

To

         The Premier
         Gove.of East Bengal, Dacca

          Sir,
         In sympathy with Maulana Abdul Hamid Khan (Bhasani) now detained in the Dacca Central Jail we too are on fast since the 27th of March 1953 on the following demands:

         (a) Immediate Release of All political prisoners
         (b) Abolition of East Bengal Public Safety Ac
         (c) Recognition of Bengali as one of the State Languages of Pakistan

                                                                                                Yours faithfully
                                                                                               Sd/-Oli Ahad

বঙ্গানুবাদ
 
বরাবর, 
প্রধানমন্ত্রী
পূর্ববঙ্গ সরকার
ঢাকা,
জনাব
     বর্তমানে ঢাকা কারাগারে আটক মওলানা হামিদ খান (ভাসানী)-এর সহিত সমমর্মিতা প্রদর্শন করিয়া আমরাও নিম্মোক্ত দাবীসমূহের ভিত্তিতে ২৭শে মার্চ (১৯৫৩) হইতে রোজা পালন করিয়া আসিতেছিঃ
 
১। অবিলম্বে সকল রাজবন্দীর মুক্তি দান।
২। পূর্ববঙ্গ জননিরাপত্তা আইন বাতিল করা
৩। বাংলাকেপাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতিদান
আপনারই বিশস্ত
স্বাঃ অলি আহাদ
কারাগারে রোজাব্রত পালনকালে মজলুম নেতাকে জেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। জেল হাসপাতাল হইতে তিনি আমাকে একটি চিঠি লেখেন। আমি কারাগারের ৫ নং এসোসিয়েশন ওয়ার্ডে অবস্থানকালে বাহিরের ঘটমান পরিস্থিতিতে তাঁহার মন কতটা বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছিল চিঠিটিতে তাহার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। চিঠিটি নীচে দেওয়া হইলঃ
 
প্রিয় অলি আহাদ
আমি তোমাদের কথায় মোটেই রাগ করি নাই এবং তোমাদের কথা বহুলাংশে সত্য তাহাও চিন্তা করিয়াছি। কিন্তু কয়েকদিন যাবৎ বাহিরে থাকা হইতেছে তাহাতে মনে বিশেষ দুঃখ পাইয়াছি। নিজের জীবন তুচ্ছ মনে হইতেছে। আমার সঙ্গে কথা ছিল বন্দীমুক্তি ও রাষ্ট্রভাষার দাবী আদায় করিতে বিরোধী দল যে মত বা পথেরই হউক না কেন, সকলে একত্র হইয়া আন্দোলন চালাইয়া যাইবে। কোনপ্রকার দলাদলি করিলে আত্মহত্যার তুল্য হইবে। সকলেই আমার নিকট পাক্কা ওয়াদা দিয়াছিল কিন্তু এখন দেখিতেছি মূল আদর্শ হইতে দূরে গিয়া আগামী নির্বাচনকেই মূল আদর্শ গ্রহণ করিতে নেতৃত্বের কোন্দল আরম্ভ করিয়াছে। এমতাবস্থায় আমার একমাত্র সম্বল জীবন দেওয়া ছাড়া আর কি উপায় আছে, আমার মুক্তির সময় নাকি শীঘ্রই আসিতেছে। তাহাতে মন আরও বিদ্রোহী হইয়া উঠিতেছে। আদর্শহারা অবস্থায় আর কেন-বেচার কাজ করিবার প্রবৃত্তি নাই। তুমি ভালভাবে চিন্তা করিয়া যাহা দেশের ও জাতির জন্য কল্যাণ মনে কর তাহাই জানাইও। তোমরা যে সিদ্ধান্ত করিবে সে সমস্ত দাবী আদায় করিতে যখন যাহা সঙ্গত মনে কর তাহাই গ্রহণ করিতে আমার কোন আপত্তি থাকিবে না। যদি তারিখ পরিবর্তন করিয়া পরে করা যুক্তিসঙ্গত মনে কর তাহাতে আমার কোন আপত্তি নাই। রোগে ও বাহিরের স্বার্থপরতার তাড়নায় মাথা ঠিক নাই। 
মোঃ আবদুল হামিদ খান ভাসানী
     ইতিপূর্বে আমরা কারারুদ্ধ থাকাকালে রাজনৈতিক আকাশে কিছু শুভ ও কিছু অশুভ ঘটনা ঘটে। মাটির সন্তানকে কেন্দ্র করিয়া ও সাম্প্রদায়িকতা সযত্নে পরিহার করতঃ রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনেকেই দারুণভাবে অনুভব করিতেছিলাম। ১৯৫৩ সালের জানুয়ারী মাসে জনাব মাহমদ আলীর প্রচেষ্টায় ‘পাকিস্তান গণতন্ত্রীদল’ গঠিত হয়। গণতন্ত্রীদল গঠনকালে আহূত সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তান হইতে আজাদ পাকিস্তান পার্টির দুই নেতা মিঞা ইফতেখার উদ্দিন ও শওকত হায়াত খান যোগদান করেন। এই সম্মেলনেই হাজী মোঃ দানেশকে সভাপতি ও জনাব মাহমুদ আলীকে সাধারণ সম্পাদক (সেক্রেটারী জেনারেল) নির্বাচিত করিয়া ‘পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল’ গঠন করা হয়।
     কায়েদে আযমের তিরোধানের পর হইতেই পাকিস্তানে ক্ষমতার লড়াই প্রকটভাবে দেখা দিয়াছিল। সে সময়ে ক্ষমতায় আসীন থাকিবার জন্য কায়েমী স্বার্থ চরিতার্থ করিবার জন্য যে কেহ যে কোন নোংরা কৌশল অবলম্বন করিতে কখনও দ্বিধাবোধ করে নাই। 
‘খাতামুন্নবীর’ অর্থ ও ব্যাখ্যার প্রশ্নে ধর্মান্ধ ও অসহিষ্ণু ভাবধারার ধারক ও বাহক মোল্লা সম্প্রদায়ের পৈশাচিক ভ্রাতৃহত্যা, ধনসম্পদ লুণ্ঠন অগ্নি সংযোগ, অবাধ নারী ধর্ষণকে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মমতাজ মোহাম্মদ খান দওলাতানা পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দিয়াছিলেন। বাধ্য হইয়াই কেন্দ্রীয় সরকারকে পাঞ্জাবে সামরিক আইন জারি করিতে হইয়াছিল। সামরিক আইন প্রশাসক লেঃ জেঃ আযম খান অত্যন্ত কঠোর হস্তে এই দাঙ্গা দমন করেন। উক্ত দাঙ্গার হোতা অখন্ড ভারত সমর্থক মওলানা মওদুদীকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। কিন্তু গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ তাঁহাকে ক্ষমা পদর্শন করিয়া মৃত্যুদন্ড মওকুফ করেন। প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন মমতাজ দওলাতানাকে বরখাস্ত করিয়া পাঞ্জাবে গর্ভনরী শাসন প্রবর্তন করেন। পরবর্তীকালে পুর্ববঙ্গের গভর্নর মালিক ফিরোজ খান নূনকে মমতাজ দওলাতানার স্থলে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়। পূর্ব বঙ্গের গভর্নর থাকাকালে ফিরোজ খান নূন এই মর্মে এক অসত্য ও অশোভন মন্তব্য করেন যে, ‘বাংগালী মুসলমানের খৎনা করায় না।’ এক শ্রেণীর নেতার এই ধরনের বানোয়াট হীন-উদ্দেশ্য প্রণোদিত বাংগালী-বেদ্বেষী মন্তব্য-বক্তব্য ও আচার-আচরণের জন্যই শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানকে চরম মূল্য দিতে হইয়াছে।
     কারান্তরালে থাকাকালে ৬ই মার্চের পত্রিকায় জানিতে পারি যে, বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র সোভিয়েট রাশিয়ার ডিকটেটর জোসেফ স্টালিন দীর্ঘ তিরিশ বৎসরকাল অত্যাচারের প্রতীক হিসাবে শাসনভার পরিচালনার পর (১৯৫৩ সালের ৫ই মার্চ) প্রাণত্যাগ করিয়াছেন। তাঁহার মৃত্যুতে বিশ্বব্যাপী কিমিউনিস্ট আন্দোলনের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়। বিশেষ করিয়া কমিউনিস্ট বিশ্বের উপর সোভিয়েট রাশিয়ার একাধিপত্যের দ্রুত অবসান ঘটে এবং কমিউনিষ্ট আন্দোলনের Mono Centrism বা এককেন্দ্রীকতার স্থলে Poly-Centrism অর্থাৎ বহু কেন্দ্রীকতার সূচনা হয়।