প্রাসাদ ষড়ষন্ত্রের অভ্যুদয়

ফন্ট সাইজ:

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খান রাওয়ালপিন্ডির সামরিক ছাউনিতে বক্তৃতারত অবস্থায় আততায়ীর গুলীতে নিহত হইলে গভর্নর জেনারেল খাজা নাজিমুদ্দিন তড়িঘড়ি প্রধানমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত হন। কিন্তু কালের গতিতে সেই উম্মুক্ত সদর দরজা পথেই প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের এই বরপুত্রকে ক্ষমতার আসন হইতে বিদায় লইতে হয়। ষড়যন্ত্রের এই বীজ কালক্রমে বিষবৃক্ষে পরিণত হয়। পশ্চিম পাকিস্তানে খাদ্য সংকট মোকাবেলা করিবার নিমিত্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হইতে সাত লক্ষ টন খাদ্যশস্য আমদানী চূড়ান্ত করিবার অজুহাতে রাষ্ট্রদূত বগুড়া নিবাসী মোহাম্মদ আলী রাজধানী করাচীতে আগমন করেন। প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন ছিলেন বৃটিশ ঘেষা। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বীয় বশংবদ মোহাম্মদ আলীকে প্রধানমন্ত্রী পদে বসাইবার প্রয়াস পাইতেছিল। খাদ্য সংকটের মোক্ষম সুযোগ সদ্ব্যবহার করিয়া গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ও প্রধান সেনাপতি জেনারেল আইউব খান সামরিক বেসামরিক অফিসার চক্রের সহায়তায় এক অবৈধ আদেশ জারি করিয়া ১৯৫৩ সালের ১৭ই এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীকে গদিচ্যুত করেন। এইভাবেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত পাকিস্তানে ক্ষমতা দখলের নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হয় এবং জনগন নেপথ্য শক্তিতে পর্যবসিত হয়। ১৯৪৭ সালে ইংরেজ কর্তৃক ক্ষমতা হস্তান্তরকালে প্রণীত ভারত-পাকিস্তান স্বাধীনতা আইন মোতাবেক প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করিবার এক্তিয়ার বা ক্ষমতা বা অধিকার গভর্নর জেনারেলের ছিল না। বরং মন্ত্রীসভাই ছিল গভর্নর জেনারেল নিয়োগ বা অপসারণ করিবার একমাত্র আইনগত সংস্থা। কিন্তু ষড়যন্ত্রের বিচিত্র গতির মারপ্যাঁচে পড়িয়া উপরোক্ত বিধান সম্পূর্ণ অর্থহীন হইয়া পড়ে। ১৯৪৭ সাল হইতে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত যেই দেশের সরকার সংবিধান রচনা করিতে চরমভাবে ব্যর্থ হইয়াছে, গণরায়ে ক্ষমতাসীন হইয়াও পুনরায় গণরায়ের জন্য সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিমুখ রহিয়াছে, সেই দেমে অনিয়মই যে নিয়ম হইবে এবং ষড়যন্ত্রের যে মুখ্য নিয়ামক শক্তি হইবে, ইহা বিস্ময়কর কিছু নহে। ১৭ই এপ্রিল (১৯৫৩) ঢাকার পল্টন ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত জনসভায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী গভর্নর জেনারেল গোলম মোহাম্মদ কর্তৃক খাজা নাজিমুদ্দিনের এই অন্যায়  ও অবৈধ পদচ্যুতির আদেশকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানান। পক্ষান্তরে সদ্য কারামুক্ত মজলুম নেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী খাজা নাকিমদ্দিনের এই পদচ্যুতির জন্য গভর্নর জেনারেল গোলম মোহাম্মদকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করেন এবং এই আদেশকে সম্পূর্ণ বেআইনী ও অবৈধ বলিয়া রায় দেন। একজন আইনজ্ঞ রাজনীতিক, আর অন্যজন দৈনি ক ইত্তেফাকের সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন ওরফে মানিক মিয়ার রাজনৈতিক মঞ্চের ভাষায় ‘লুংগি সর্বস্ব মাওলানা’ রাজনীতির এই দুই দিকপালের মধ্যে কাহার বক্তব্যে ভবিষ্যৎ মঙ্গল নিহিত ছিল, পরবর্তী ঘটনারাজিই ইহার নির্ভুল উত্তর দিয়াছে। পদলোভী ও ভীরু খাজা নাজিমুদ্দিন গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের এই বেআইনী ও অবৈধ পদচ্যুতি বেমালুম হজম করিয়া দেশ ও জাতির  মহাসর্বনাশ সাধন করিয়া গিয়াছেন। জনগণ হইতে বিচ্ছিন্ন দুর্নীতিবাজ ও মেরুদন্ডহীন মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ সাহস করিয়া গভর্নর জেনারেলের আদেশের বিরুদ্ধে সামান্যতম প্রতিবাদও উচ্চারণ করেন নাই। জনভিত্তি হারাইয়া ফেলিলে এমনি অবস্থাই হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমালের মর্মান্তিক বিয়োগান্তক নাটকের খবরে আপামর জনগণ উল্লাসে যে কিরুপ আত্মহারা হইয়া পড়িয়াছিল, তাহা কাহারও অজানা নাই।