পাকিস্তানের রাজনীতিতে মার্কিনী প্রভাব

ফন্ট সাইজ:
     পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী জনাব নুরুল আমিন ২০শে ও ২১শে এপ্রিল সর্বজনাব মসিউর রহমান, ইমরান আলী, শাহ আজিজুর রহমান, এ,টি, এম, মোস্তফা, আজিজুর রহমান (কুমিল্লা), ফজলুল বারী (বগুড়া), গাজী লতিফ (যশোহর), কামাল আহমদ (চট্টগ্রাম)-এর নিকট মোহাম্মদ আররি প্রধানমন্ত্রীত্বকে সমর্থন না করিবার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। কিন্তু গদির নিরাপত্তার আশ্বাস পাওয়ামাত্র তিনি প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীকে সমর্থন দানের জন্য ওয়াদাবদ্ধ হইয়া ২৪শে এপ্রিল (১৯৫৩) ঢাকা প্রত্যাবর্তন করেন এবং ৯ই মে কার্জন হলে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ কাউন্সিল সভায় অবৈধ পন্থায় অধিষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী সরকারকে সমর্থন দান করেন। এইভাবেই পাকিস্তান সরকার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বশংবদের শিরোপা লাভ করে এবং ইহার পর হইতে দেশ ও জাতি ক্রমশঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ১৯৫৪ সালের মে মাসের ১৯ তারিখে করাচীতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাফরুল্লাহ খান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য এ্যাফেয়ার্স কেনেথ ইমারসন পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করিয়া দেশবাসীর উপর দাসত্ব-শৃঙ্খল চাপাইয়া দেয়।পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সাধারণ নির্বাচন ঘোষণার পর নির্বাচন প্রস্তুতিকল্পে ১৯৫৩ সালের ১৪ই ও ১৫ই নভেম্বর ময়মনসিংহে আহূত কাউন্সিল সভায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করিয়াছিল এবং একই সঙ্গে মোহাম্মদ আলী সরকারকে আমেরিকার সহিত কোন সামরিক চুক্তি সম্পাদন না করিতে আহ্বান জানাইয়াছিল। এই পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির প্রথম পরিচ্ছেদের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হইয়াছিল’ ‘‘যে উদ্দেশ্যে এই সাহায্য দেওয়া হইতেছে, পাকিস্তান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সহিত পুর্বাহ্নে চুক্তিবদ্ধ না হইয়া অপর কোন উদ্দেশ্যে উহা ব্যবহার করিতে পারিবে না।’’ প্রসঙ্গতঃ বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, অপ্রকাশিত ধারা অনুসারে পাক সৈন্য বাহিনীর চল্লিশ হাজার সৈন্যের যাবতীয় ব্যয়ভার মার্কিন যুক্ততরাষ্ট্র বহন করিত এবং ইহার পরিবর্তে পেশওয়ারের সন্নিকটে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের অনুমন্তি দেওয়া হইয়াছিল। ইহারই ব্যাখ্যা দিতে গিয়া ১৯৫৪ সালে পাক-ভারত সফর সময়ে মার্কিন পরারাষ্ট্রমন্ত্রী জন ফষ্টার ডালেস স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, পাকিস্তান মার্কিন প্রদত্ত অস্ত্র ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করিতে পারিবে না অর্থাৎ পাকিস্তান মার্কিন অস্ত্র গুদামজাত করিয়া রাখিবে কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রয়োজনেও মার্কিন অনুমোদন ব্যতীত ইহা ব্যবহার করিতে পারিবে না। পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির চতুর্থ পরিচ্ছেদের প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হইয়াছিল, ‘‘পাকিস্তান সরকার যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিকট হইতে যে সব কর্মচারী পাইবেন, তাঁহারা চুক্তি অনুসারে পাকিস্তানে থাকিয়া যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দায়িত্ব পালন করিবেন এবং চুক্তি অনুযায়ী প্রদত্ত সাহায্য কিভাবে ব্যবহৃত হইতেছে তাহা পর্যবেক্ষণ করিবার কর্তৃত্ব ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পাইবেন।’’ এইচুক্তি অনুযায়ী কর্মচারীরুপে পাকিস্তানে আগত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকগণ পাকিস্তান সরকারের সহিত সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসেরই অংশ বলিয়া পরিগণিত নির্দেশে পাকিস্তান সরকার উচ্চপদস্ত মার্কিন নৌ, বিমান ও স্থলবাহিনীর উপদেষ্টাদিগকে কূটনৈতিক মর্যাদা ভোগ করিবে বিধায় আমাদের সেনাবাহিনীর উপর বিদেশী প্রভাব বিস্তারিত হইবে।
পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির পঞ্চম পরিচ্ছেদেরে ২(ক) অনুচ্ছেদে বলা হইয়াছিল 
      ‘‘পারস্পরিক সাহায্যের নীতি অনুসারে পাকিস্তান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনে এমন সব কাঁচা মাল বা আংশিকভাবে নির্মিত দ্রব্যাদির উৎপাদন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি বা যুক্তরাষ্ট্রের নিকট হস্তান্তর করিবে যাহা পাকিস্তানে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন স¤¦ব।’’ ইহার পরিস্কার অর্থ হইলঃ পাকিস্তানের স্বীয় অর্থনীতির স্বাধীনতা নস্যাৎ হওয়া এবং এই দেশের অর্থনীতির উপর যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য কায়েম।
     পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে বর্ণিত হইয়াছিল, ‘‘পারস্পরিক নিরাপত্তার প্রয়োজনে বিশ্ব-শান্তির পক্ষে বিঘ্নস্বরুপ এমন সব রাষ্ট্রের সহিত বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে পাকিস্তান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সহিত সহযোগিত করিবে।’’ মার্কিুন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত নীতি অনুসারে চীন ও রাশিয়ার বলয়ভুক্ত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিই বিশ্ব শান্তির পক্ষে বিঘ্নস্বরুপ। অতএব বিশ্বের এক অতি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সহিত গরীব পাকিস্তান রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ব্যতীত কোন প্রকার বাণিজ্যিক লেনদেন করিতে পারিবে না।
     পরবর্তীকালে পাকিস্তান বাগদাদ ও সিয়াটো চুক্তিভুুক্ত হয়। শর্ত মোতাবেক চুক্তিভুক্ত কোন দেশ যদি ‘‘আভ্যন্তরীণ ধ্বংসাত্মক কার্যাবলীর’’ দ্বারা বিপদাপন্ন হয়, তবে চুক্তিভুক্ত অন্যান্য দেশ বিপদাপন্ন মিত্রদেশে পুলিশ ও ফৌজ পাঠাইয়া সাহায্য করিবে। এই চুক্তিভুক্ত দেশগুলির অন্যতম ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। আভ্যন্তরীণ সরকার যতই গণবিরোধী, জালেম, শোষক ও একনায়কত্ববাদীই হউক না কেন, জনসাধারণ স্বীয় অস্তিত্ব রক্ষার্থে কোন প্রকার প্রতিবাদ করিতে পারিবে না। তাই দেখা যায়, ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসের প্রথমার্ধে পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিেিদর দ্বারা ৩রা এপ্রিল শেরে বাংলা এ,কে, ফজলুল হকের নেতৃত্বে যে সরকার গঠিত হইয়াছিল কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত মোহাম্মদ আলী সরকার ৩০ শে মে মামুলী এক অজুহাতে কলমের এক খোঁচায় উহাকে নাকট করে ও গভর্ণরী শাসন কায়েম করে। শুধু তাই নয়, ইহার বিরুদ্ধে জনসমষ্টির প্রতিবাদকেও আভ্যন্তরীণ ধ্বংসাত্মক কার্যাবলী বলিয়াই আখ্যা দেওয়া হয়।