আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়া

ফন্ট সাইজ:
     ১৯৫৫ সালের ২১,২২ ও ২৩ শে অক্টোবর তারিখে ঢাকা রূপমহল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনের প্রস্তাবে বলা হয়, ‘‘ এই কাউন্সিল অধিবেশনের বিশ্বাস করিবার করিবার যথেষ্ট কারণ আছে, পাকিস্তান সরকার গত কয়েক বৎসর পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি, বাগদাদ চুক্তি, সিয়াটো চুক্তি প্রভৃতি এমনসব চুক্তিতে আবদ্ধ হইয়াছে, যে সকল চুক্তির দ্বারা দেশের সার্বভৌমত্ব এবং দেশের অর্থনৈতিক, ব্যবসাত ও বাণিজ্যিক স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হইয়াছে। ’’ ১৯৫৬ সালের ১৯ ও ২০ শে মে ঢাকা নগরীতে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কাউন্সিলের প্রস্তাবে পুনর্বার সুষ্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়, ‘’কোন বৈদেশিক রাষ্ট্রের লেজুড় হিসাবের না থাকিয়া আমাদের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নীতির অনুসারী হইতে হইবে এবং আমরা বিশ্বাস করি, কেবলমাত্র এই নীতিই পাকিস্তানকে পৃথিবীর বুকে সমৃদ্ধশালী ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসাবে গড়িয়া তুলিতে পারে।’’ উক্ত ঘোষণায় অরো বলা হয়, ‘‘ বিভিন্ন সামরিক চুক্তি বিষেশতঃ বাগদাদ চুক্তিতে অংশগ্রহণ করিয়া পাকিস্তান মুসলিম জাহানের অধিকাংশ রাষ্ট্রের সহানুভূতি হারাইয়াছে। অতএব কাউন্সিল এই প্রকারের সকল সামরিক চুক্তির নিন্দা ও বিরোধীতা হারাইয়াছে। অতএব কাউন্সিল এই প্রকারের সকল সামরিক চুক্তির নিন্দা ও বিরোধীতা করিতেছে।’’ ১৯৫৪ সালের নির্বাচনত্তোরকালের সর্বজনাব আতাউর রহমান শেখ, শেখ মুজিবুর রহমান, মাহমুদ আলী হাজী মোঃ দানেশ, ইয়ার মোহাম্মদ খান প্রমুখ ১৬৭ জনব সদস্য নির্বাচিত পূর্ব পাকিস্তান অনি পরিষদ সদস্য ২১ এপ্রিল (১৯৫৪) এক যুক্ত বিবৃতিত্বে কঠোর ভাষায় পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তিকে নিন্দা করেন ও উহা বাতিলের দাবী জানান অথচ ১৯৫৬ সালে ক্ষমতাসীন হইবার পর গদির মোহে পড়িয়া জনাব আতাউর রহমান খান ও শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারী পার্টি সদস্যই প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশিত পথে সংগঠনের বৈদেশিক নীতির বরখেলাফে পাক-মার্কিণ সামরিক চুক্তি, বাগদাদ চুক্তি ও সিয়োটো চুক্তির গোঁড়া সমর্থকে পরিণত হন। ইহার প্রমাণ ১৯৫৭ সালের ৭ ও ৮ই ফেব্রুয়ারী কাগমারীতে (টাঙ্গাইল জেলা) অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান অওয়ামী লীগ কাউন্সিল অধিবেশন। এই অধিবেশনে প্রদানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী ও তাঁহার মন্ত্রীবর্গ, পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্যমন্ত্রী জনাব আতাউর রহমান খান ও তাঁহার মন্ত্রীসভার সদস্যবৃন্দ, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পার্লামেন্টারী পার্টির সদস্যরা সংগঠনের ঘোষিত নীতির বিরুদ্ধাচারণ করেন। সামরিক চুক্তি ও সামরিক জোট বিরোধী নীতির প্রতি তাঁহাদের এই বিরোধিীতা ও অশ্রদ্ধা অমাদের চরমভাবে মর্মাহত করে। ১৯৫৬ সালে ৯ই ডিসেম্বর সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সভায় পাক প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রকাশ্যভাবে সামরিক চুক্তি ও সামরিক জোটের পক্ষে ওকালতি করিয়াছিলেন। তবে ইহা অনস্বীকার্য যে, জনাব সোহরাওয়ার্দী আগাগোড়াই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কর্তৃক গৃহীত বৈদেশিক নীতির ঘোর বিরোধী ছিলেন।
     পাক মার্কিন সামরিক চুক্তির প্রধান সমর্থক এই শেখ মুজিবুর রহমানই অবার বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পর ভিন্নরূপে আত্মপ্রকাশ করিয়াছিলেন। একচ্ছত্র নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি ১৯৭২ সালের ১৯শে মার্চ রাজধানী ঢাকায় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সহিত শান্তি ও মৈত্রীর নামে বন্ধুত্ব, সহযোগিত ও শান্তি চুক্তি নামক পঁচিশ বৎসর মেয়াদী এক চুক্তি স্বাক্ষর করেন। শুধু তাহাই নয়, তিনিই অবাধ সীমান্ত বাণিজ্য চুক্তি ও আওয়ামী নেতৃবৃন্দের ভারত অবস্থানকালে অপ্রকাশ্যে গোপন চুক্তির অনুমোদন দান করিয়া বাংলাদেশকে ভারতের আশ্রিত রাষ্ট্রে পরিণত করেন। ইহা ছিল শেখ সাহেবের ১৯৫৬-৫৭-৫৮ সালে ন্যাক্কারজনক ভূমিকারই পূনরাবৃত্তি মাত্র। বস্তুতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খাঁটি অনুচর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একই পদার্থের তৈরি। ক্ষমতার লোভে দেশ ও জাতিকে বিকাইয়া দিতে তাঁহারা উভয়ই বিবেকের সামান্যতম দংশনও বোধ করেন নাই। 
     ভারত বিবাগের মূল বাস্তবতা অস্বীকার করতঃ শেখ আবদুল্লাহ কাশ্মীরবাসীদের স্বাধীন মতামত দানের সুযোগ না দিয়াই কাশ্মীরকে ভারতীয় রাষ্ট্রের অঙ্গীভূত করিয়া ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তবে কিছুকালের মধ্যে তাঁহার মোহ ভঙ্গ হইলে স্বাভাবিক কারণেই দিল্লি সরকার ও শ্রীনগর সরকারের মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়। ১৯৫৩ সালে শেখ আবদুল্লাহ কেবল পদচ্যুতই হন নাই, কারাগারেও নিক্ষিপ্ত হন। বস্তুতঃ হায়দারাবাদ, জুনাগড় ও মানভাদর দখল করিয়া পাক-ভারত ক্ষমতা হস্তান্ত বিধিকে লংঘন করিতে ভারত মোওে কুণ্ঠাবোধ করে নাই। তাই, উপরে বর্ণিত নীতির সূত্রি ধরিয়াই নেহরুজীর সুযোগ্য কণ্যা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী পররাজ্য গ্রাস লালসায় ১৯৭৪ সালে সিকিম রাজ্যের স্বাধীনতা নির্লজ্জের মত অত্যন্ত সুচারুরুপে হরণ করিয়া ভারতীয় রাষ্ট্রীয়ভুক্ত করিতে পারিয়াছিলেন। তবে নেপোলের উপরেও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের লোভাতুর দৃষ্টি পুনঃপুনঃ পতিত হইতেছিল। বাংলাদেশের প্রশ্নে ভারতীয়দের সুচতুর খেলা কাহারও দৃষ্টি এড়াইবার নহে। তবে বাংলার জনগণ আজ সম্পূর্ণ সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ।