কারামুক্তি ও অন্তরীণাদেশ

ফন্ট সাইজ:
     ১৯৫৩ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর আমি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার হইতে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তরিত হই। কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে অধ্যাপক সর্দার ফজলুল করিমের সাহচর্য লাভ করি। তিনি একজন রাজনৈতিক কর্মী ও অমায়িক পুরুষ। সরকারী বহু প্রলোভনকে প্রত্যাখ্যান করিয়া দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করিয়াছেন। ১৯৫৫ সালে তিনি পাকিস্তানের গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে তিনি পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টরী পার্টিতে যোগদান করেন। কিন্তু আজীবন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের পুরোভাগে থাকা সত্বেও রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচে পড়িয়া প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর মার্কিন ঘেষা বৈদেশিক নীতি এবং সামরিক চুক্তি ও জোট সমর্থনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের আওয়ামী লীগ সদস্যদের সহিত একত্রে ভোট দেন। তাহার মত ত্যাগী রাজনৈতিক চিন্তাবিদের উপরোক্ত ভূমিকা আমাদিগকে বিস্মিত ও মর্মাহত করিয়াছে। ৩০শে সেপ্টেম্বর কুমিল্ল কেন্দ্রীয় কারাগার হইতে আমাকে মুক্তির আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই সাথে আমার নিজ গ্রাম ইসলামপুরে অন্তরীণ থাকিবার এক বৎসর মেয়াদী আদেশও জারি করা হয়। উক্ত আদেশে ইহাও বলা হয় যে, আমাকে প্রতি সপ্তাহে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থানায় সশরীরে হাজিরা দিতে হইবে। আমাকে এই আদেশপত্রটি স্বাক্ষর করিতে দিলে আমি ঘৃণাভরে সরকারী কর্মচারীর আবদার প্রত্যাখ্যান করি। উপায়ন্তর না দেখিয়া পুলিশ অফিসার কেন্দীয় কারাগারের গেটে আদেশনামাটি টাঙ্গাইয়া দিয়া আমার উপর প্রকাশ্য নোটিশ জারি করেন। ইংরেজ শাসনামলে কোন রাজবন্দীকে গৃহান্তরীণ করিলে ভরণ-পোষণের নিমিত্ত সরকার হইতে প্রয়োজনীয় মাসিক ভাতা দেয়া হইত। ইংরেজ বিদেশী শাসক কিন্তু জাতি হিসাবে সুসভ্য ছিল। যাহা হউক, স্বাধীন দেশের অঙ্গরাজ্য পূর্ব পাকিস্তানের সরকার অন্তরীণাবদ্ধ রাজবন্দীকে কোন ভরণ-পোষণ কিংবা কোন ভাতা দিতেন না। ফলে কেবল আমার ভরণ-পোষণ নহে, প্রতি সপ্তাহে আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাতায়াতের পূর্ণ রাহাখরচও চাকুরী হইতে অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ পিতাকেই বহন করিতে হইত। অর্থাৎ বোঝার উপর শাকের আঁটি আর কি! কারাগারে থাকিবার সময় বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশুনা করিবার যে সুযোগ পাইয়াছিলাম, তাহা আমি পূর্ণ ব্যবহার করি এবং কয়েকটি খাতায় নোট গ্রহণ করি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারীরা কারাগার অফিস হইতে আমার ঐ খাতাগুলিও নিয়া যান।