ক্লার্ক রিপোর্ট

ফন্ট সাইজ:
     প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর অংশীদার হিসাবে শেরে বাংলার নেতৃত্বে আস্থাশীল যুক্তফ্রন্ট সংবিধান রচনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। ২১ দফা ভিত্তিক শাসনতন্ত্র প্রণয়নে সহায়তা দানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ মুজাফফর আহমদ চৌধুরী ও অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের পাকিস্তান গণপরিষদের উপদেষ্টা পদে নিয়োগ করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষাকালে জনৈক বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদ প্রণীত রিপোর্ট তাঁহাদের নজরে পড়ে। অর্থনীতিবিদ কলিন ক্লার্ক ১৯৫২ সালে তাঁহার রিপোর্টে বিস্তীর্ণ ভুমি এলাকা পশ্চিম পাকিস্তানে কৃষির উপর এবং ঘনবসতিপূর্ণ স্বল্পভূমির এলাকা পূর্ব পাকিস্তানে কলকারখানা স্থাপনের উপর জোর দিবার সুপারিশ করেন। 
নিম্নে প্রাসঙ্গিক অংশটি উদ্ধৃত হইলঃ
     ''For some years at least West Pakistan will get richer as East Pakistan gets poorer until it becomes possible to make a Further construction of industry in East Pakistan or else for some of the population to migrate elsewhere.''
     অর্থাৎ ‘‘যতদিন পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান শিল্পায়িত না হইবে কিংবা এর অধিবাসীদের এক অংশের অন্য কোথাও চলিয়া যাওয়া সম্ভব না হয়, ততদিন পর্যন্ত কয়েক বৎসর পশ্চিম পাকিস্তান সম্পদশালী হইতে থাকিবে। ’’ কলিন ক্লার্কের উপরোক্ত মন্তব্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তাই ১৯৫৫ সালে আমি পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের যৌক্তিকতা দেশবাসীর সামনে তুলিয়া ধরিবার উদ্দেশ্যে ‘পূর্ববঙ্গ শ্মশান কেন?’’ পুস্তিকাটি রচনা করি। উল্লেখ্য যে, পুস্তিকাটি বহুল ভাবে প্রচারিত হইয়াছিল। 
     অর্থনীতিবিদ কলিন ক্লার্কে সুপারিশ মোতাবেক পূর্ব পাকিস্তানকে শিল্পায়িত করিবার সর্বাত্মক প্রচেষ্ঠা দূরে থাকুকব, এমনকি ১৯৫৭ সালে মার্কিন সাহায্য আই,সি,এ (International co-operation Adminitration) ১টি ডলার পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প সম্প্রসারণ ও আধুনিককরণের মানসে সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক বরাদ্দকরণ, পূর্ব পাকিস্তান দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় ২৮ লক্ষ টন খাদ্য ক্রয়ে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাকরণ, বিদেশী মুদ্রা দুই অঞ্চলের মধ্যে সমবন্টন নীতি গ্রহণ এবং পূর্ব পাকিস্তান ও অন্যান্য অনুন্নত প্রদেশে নূতন আমদানীকারক নীতি নির্ধারণের ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও বণিক শ্রেণী অত্যন্ত বেসামাল হইয়া উঠে। তাই তাহারা প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীকে ক্ষমতাচ্যুত করিবার অপচেষ্টায় সর্বপ্রকার চক্রান্ত প্রচারণায় লিপ্ত হইল। ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রিজ-এর সভাপতি বার্ষিক ভোজসভায় প্রধান অতিথি রাষ্ট্র প্রধান ইস্কান্দার মীর্জাকে অভিনন্দনপত্রে সোহরাওয়ার্দী সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদগারকালে নিম্নোক্ত মন্তব্য করেনঃ "Parity in political sphere may be a workable compromise but its application to economic planing without considering other important economic facts may lead us into blind alleys from where there may be no way out.'' অর্থাৎ ‘‘রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সংখ্যাসাম্য কাজ চালানো গোছের অনেক মীমাংসা দিতে পারে, কিন্তু অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক যথার্থতা বিবেচনা না করিয়া অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় সমবন্টন বা সংখ্যাসাম্য প্রয়োগ আমাদিগকে এমন এক কানাগলিতেত নিয়া যাইবে, যেখান হইতে নিস্ক্রমনের কোন পথই থাকিবে না।’’ ইহার ফলশ্রুতিতে প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী মাত্র তের মাস সরকার পরিচালনার পর ১৬ই অক্টোবর (১৯৫৭) পদত্যাগ করিতে বাধ্য হন। অর্থনীতিবিদ কলিন ক্লার্কের সুপারিশানুযায়ী সর্বাত্মক শিল্পায়নে বৈদেশিক মুদ্রা বরাদ্দ করা দূরে থাকুক, কেবলমাত্র সমান সমান বৈদেশিক মুদ্রার বরাদ্দনীতি পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানী কায়েমী স্বার্থ ও করাচীর অবাঙ্গালী শাসকরা সহ্য করিতে পারেন নাই।