দাবী দিবস

ফন্ট সাইজ:

     এমনিতর মানসিক পটভূমিকায় পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচিত হইতেছিল। শাসনতন্ত্র র্পূণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও যুক্ত নির্বাচন সন্নিবেশিত করিবার দাবীতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শেক মুজিবুর রহমান করাচী হইতে তার যোগে আমাকে ১৬ই মার্চ ‘দাবী দিবস’ ঘোষণা করিবার নির্দেশ দেন। তাঁহার করাচী অবস্থানকালে আমি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করিতাম। ১৬ই মার্চ ‘দাবী দিবস’ উপলক্ষে পল্টন ময়দানে জনসভা আহবান করি। মোহাজের নেতা মাওলানা রাগিব হাসানও ১৬ই মার্চ (১৯৫৬) অপরাহ্নে পল্টন ময়দানে জনসভা আহবান করেন। অনিবার্য সংঘর্ষ এড়াইবার উদ্দেশ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ও আমি মাওলানা রাগিব হাসানের সহিত তাঁহার বাসস্থানে দেখা করি। আমরা আলোচনায় ঐক্যমতে পৌছে যে, অপরাহ্ন ৪ ঘটিকা পর্যন্ত মাওলানা রাগিব হাসান সভা পরিচালনা করিবেন এবং উহার পর আমরা সভার কাজ আরম্ভ করিব। অতীব পরিতাপের বিষয়, অপরহ্ন ৪-৩০ মিনিট উত্তীর্ণ হইলেও এবং পুনঃপুনঃ অনুরোধ সত্ত্বেও সভার সভাপতি মাওলানা রাগিব হাসান কর্তৃক সভার সমাপ্তি ঘোষণার কোন লক্ষণ পরিলক্ষিত ইতেছিল না। আমাদের অনুরোধে কর্ণপাত না করায় আওয়ামী লীগ কর্মী ও জনগণের ধৈর্য্যচ্যুতি দেখা দিল। সভামঞ্চে দাঁড়াইয়া আমাদের একনিষ্ঠ তরুণ কর্মী মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম ‘‘মাইক্রোফোন টেস্টিং’’ বলা মাত্র মোহাজের সমাবেশের একাংশ ক্ষিপ্ত হইয়া আমাদের উপর ঝাঁপাইয়া পড়ে ও সভামঞ্চ তছনছ করিয়া ফেলে। লঙ্কাকান্ড ঘটিয়া যাইবার কিছুক্ষণের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান সভাস্থলে উপস্থিত হইয়াই হতভম্ব হইয়া পড়িলেন বটে, তবে, ক্ষণিকের মধ্যেই স্বীয় কর্তব্য স্থির করিয়া নিজ হাতে একটি লাঠি ও আমার হাতে একটি লাঠি দিয়া রণক্ষেত্রের দিকে দৃঢ় পদক্ষেপে রওয়ানা হইলেন। আমাদের সহকর্মীরা তখনও এদিক-ওদিক অর্থাৎ নিরাপদ দূরত্ব হইতে উকি-ঝুকি মারিতেছিলেন। সভাস্থলে আমাদের পদার্পন মাত্র জনতা চতুর্দিক হইতে সভামঞ্চের দিকে ধাবিত হইল এবং নিমিষের মধ্যে নিজেদের উদ্যেগে সভামঞ্চ পূণরায় নির্মাণ করিয়া ফেলিল। মাওলানা রাগিব হাসান আমাদের উভয়েরই শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ছিলেন। কারণ, তিনি ছিলেন ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারী বোর্ডে হাশিম-সোহরাওযার্দী গ্রুপভুক্ত অন্যতম নির্বাচিত সদস্য। স্বাধীনতার পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানে হিজরত করেন। কিন্তু ঘটনাচক্রে মূল রাজনীতির ধারা হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়েন এবং করাচীস্থ অবাঙ্গালী শাসকদের ক্রীড়ানকে পরিণত হন। ঐদিন অপরাহ্নে জনতার ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রচন্ডতা ও কার্যকারিত আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় সম্যক উপলব্ধি করি। পরিতাপের বিষয়, কায়েমী স্বার্থ সংশ্লিষ্ট চক্র সর্বহারা মোহাজের শ্রেনীকে পূর্ব বাংলার গণদাবীর বিরুদেধ ব্যবহার করিয়া স্থানীয় বাংলা ভাষাভাষী ও উর্দু ভাষাভাষীদের মধ্যে বিদ্যমান স্বাভাবিক হৃদতাপূর্ণ বন্ধন ছিন্ন করিবার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। সত্য বলিতে কি, ইহাদের চক্রান্তেই উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে তিক্ততার বীজ বপিত হয়। কালের অমোঘ গতিতে উর্দু ভাষাভাষী প্রভুত্বকামী সামরিক বেসামরিক প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের সর্বনাশা আত্মঘাতী প্রচেষ্টাই বাঙ্গালী- অবাঙ্গালী তিক্ততার বীজ হইতে উত্থিত কচি চারাকে সযত্নে মহীরূহে পরিণত করে। ভারত হইতে আগত উর্দু ভাষী মোহাজের সম্প্রদায় স্থানীয় বঙ্গ ভাষাভাষী সমাজে অঙ্গীভূত, একাত্ম ও একাকার হইয়া বাংলার মাটিকে মহামানবের মিলন ক্ষেত্রে পরিণত করিতে ব্যর্থ হয়। তাঁহাদের দৃষ্টিতে সুদূর করাচী, লাহোর, পিন্ডির উর্দু ভাষীরাই প্রতিবেশী বঙ্গ ভাষাভাষীদের চাইতে বহুগুণে ও সর্বদিক হইতে পরমাত্মীয়জন। তাঁহাদের মানসিক জগতে প্রতিবেশী বাঙ্গালীরা বহুযোজন দূরবর্তী, অনাত্মীয়, বিদেশী। পরাধীন ভারতে বসবাসকারী অহমষড় ওহফরধহ সন্তানগণ কি আমলা কি ব্যবসায়ী সবাই যেমন প্রতিবেশী ভারতবাসী হইতে সুদূর ইংল্যান্ডে বসবাসকারী ইংরেজদিগকে নিজেদের সুখ-দুঃখের সমভাগী মনে করিত, তেমনি পূর্ববঙ্গে উর্দূ ভাষী মোহাজেরগণও পশ্চিম পাকিস্তানীদেরকে তদ্রুপ জ্ঞান করিত। গণবিরোধী শাসক-শোষক শ্রেনীর প্ররোচনায় উর্দু ভাষী মোহাজেরদের মধ্যে প্রভুসুলভ ও অনাত্মীয় এই মানসিকতা ক্রমশঃ মারাত্মক ব্যধির ন্যায় প্রসার লাভ করে। উত্তরকালে ইহার অশুভ পরিণতি যে সর্বনাশা অভিশপ্ত পরিস্থিতির জন্ম দিয়াছিল, তাহারই হুতাশনযজ্ঞে লক্ষ লক্ষ নিরাপরাধ প্রাণকে আত্মহুতি দিতে হইযাছিল, লক্ষ পরিবারকে ভিক্ষার ঝুলি হস্তে পরমুখাপেক্ষী হইতে হইয়াছিল, লক্ষ লক্ষ নারীকে হারাইতে হইয়াছিল অমূল রত্ন সতীত্ব।