পূর্ব পাকিস্তানের খাদ্য সংকট

ফন্ট সাইজ:

     পূর্ব পাকিস্তানের খাধ্যাভাবজনিত দুর্ভিক্ষ রোধকল্পে কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট হইতে ৫০ কোটি টাকা আদায়ের দাবীতে মাওলানা ভাসানী ৭ই মে (১৯৫৬) হইতে অনশন ধর্মঘট আরম্ভ করেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বসন্ত কুমার দাস ৭ই মে (১৯৫৬) নিম্নোক্ত লিপিতেত মাওলানা ভাসানীকে অনশন ধর্মঘট প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানঃ

বসন্ত কুমার দাস এম,এল,এ,এম,পি
এডভোকেট, সুপ্রীমকোর্ট অব পাকিস্তান,
ঢাকা হাইকোর্ট
ঢাকা-৭/৫/৫৬ ইং। 
আদাব পর নিবেদন এই, 
    মৌলানা সাহেব, আপনি অনশনব্রত গ্রহণ করিয়াছেন জানিতে পারিয়া খুবই উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িয়াছি। আপনি যে মহান উদ্দেশ্য নিয়া এই কঠিন ব্রত গ্রহণ করিয়াছেন, তৎপ্রতি আমার সহানুভূতি থাকা সত্ত্বেও আমি মনে করি যে, জাতির এই সংকট মুহূর্তে আপনার এই মূল্যবান জীবনকে এইভাবে বিপন্ন করিয়া জাতির ভবিষ্যতকেই বিপন্ন করিতেছেন। সেই জন্য আমার একান্ত অনুরোধ, আপনি এই অনশন হইতে বিরত হউন। আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে, আমাকে আগামীকাল সকালেই অন্যত্র যাইতে হইতেছে। নতুবা আমি আপনার নিকট উপস্থিত হইয়া আপনাকে ঐকান্তিক অনুরোধ জ্ঞাপন করিতাম। 
ইতিঃ 
নিবেদক
বসন্ত কুমার দাস। 
মৌলানা আবদুল হামিদ খান ভাসান। 
     পূর্ব পাকিস্তানের খাদ্য সংকট ক্রমশঃই দুর্ভিক্ষের রূপ ধারণ করিতে থাকে। চতুর্দিকে ভূখা মিছিল। এমনি অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ১৯ ও ২০ শে মে (১৯৫৬) ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্টিত হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমবায়ে ঐক্যবদ্ধ দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ আন্দোল।ন সংগঠিত করিবার প্রস্তাবের প্রশ্নে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত আমার প্রত্যক্ষ মতভেদ দেখা দেয় এভং শেখ সাহেবের তীব্র বিরোধিতার কারণে সর্বদলীয় খাদ্য আন্দোলন প্রস্তাবটি কাউন্সিল কর্তৃক বাতিল হইয়া যায়। অবশ্য পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চুক্তি সংস্থা বাগদাদ চুক্তি সংস্থা হইতে সদস্যপদ প্রত্যাহারের দাবীতে পেশকৃত আমার প্রস্তাব কাউন্সিল গ্রহণ করে। নেতা হোসেন শহীদ সোরাওয়ার্দী ইহাতে অত্যন্ত ক্ষূব্ধ হন এবং আমাকে তলব করিয়া আমার নিকট হইতে কৈফিয়ৎ চান আমি তাঁহার নিকট সা¤্রাজ্যবাদী চক্রান্তজাত সামরিক চুক্তির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ১৯৫৩ সালের ময়মনসিংহ কাউন্সিল অধিবেশন হইতে পূর্বাপর ধারাবাহিক বিরোধী ভূমিকা উল্লেখ করিয়া নতশিরে দাঁড়াইয়া রহিলাম। সোহরাওয়ার্দী সাহেব বিদগ্ধ ব্যক্তি, আমার গুরুজন। সুতরাং তাঁহার কটু মন্তব্য হজম করা ছাড়া গত্যন্তর ছিলনা। 
     সাংবিধানিক বিধান মোতাবেক মার্চ-এপ্রিল-এর স্থলে আর্থিক বৎসর জুন-জুলাই হইতে প্রবর্তিত হয়। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর হইতে গভর্ণরের সার্টিফিকেক্রমে মুখ্যমন্ত্রী আবু  হোসেন সরকারই বাজেট বর্দ্দা পাস করাইয়া আর্থিক দায়-দায়িত্ব সমাধা করিতেছিলেন। অবশেষে রাষ্ট্রপ্রধান ইস্কান্দার মীর্জা ও প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মোহাম্মদ আলী গভর্ণর শেরে বাংলা এ,কে, ফজলুল হককে ৩০ শে আগষ্টের মধ্যে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন আহবানের নির্দেশ দান করেন। বিরোধীদলের অনাস্থা প্রস্তাব ভয়ে ভীত ও শংকিত মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার ৩০ শে আগষ্ট (১৯৫৬) গভর্ণর সমীপে তাঁহার মন্ত্রিসভার পদত্যাগ পত্র পেশ করেন। ইতিপূর্বে আওয়ামী লীগের প্রচেষ্টায় প্রতিরোজই ভূকা মিছিল চলিতেছিল। জনতা দিন দিন হইয়া উঠিতেছিল মারমুখি। বিষ্ফোরণোম্মুখ এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ৪ঠা আগষ্ট জিনজিরা এলাকা হইতেত আগত এক বিরাট ভুখা মিছিল নদী অতিক্রম করিয়া ঢাকার চকবাজারে প্রবেশ করিলে, পুলিশ ভূখা জনতার উপর গুলি চালনা করে এবং পুলিশের গুলিতে অকুস্থলেই তিনজন নিহত হয়। বাজেট পেশ করিবার জন্য আহূত ১৩ই আগষ্টের পরিষদের অধিবেশন গভর্ণর শেরে বাংলা অত্যন্ত অযৌক্তিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেন। শেরে বাংলা তদীয় দল কৃষক শ্রমিক পার্টি নেতা আবু হোসেন সরকারের মন্ত্রী সভাকে বিরোধী দল আওয়ামী লীগের অনাস্থা প্রস্তাবের মুখে অবধারিত পরাজয় হইতে রক্ষা করিবার জন্যই যে এই অন্যায় পদক্ষেপটি গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহা না বলিলেও চলে। ইহার দরুনই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৭ই আগষ্ট ঢাকা অবস্থানকালে শাসক মহলের উদ্দেশ্য এই মর্মে সতর্কবাণী উচ্চারণ করিয়াছিলেন যে,
    "History records that it is an axiom that unconstitutional conduct on the part of the rulers breeds unconstitutional reaction on the part of the people, If for the rulers there is dictatorship, for people there is civil disobedience.'' অর্থাৎ ‘‘ইতিহাসের সাক্ষ্য, ইহা একটি স্বতঃপ্রতীয়মান সত্য যে, শাসক মহলের অনিয়মতান্তিত্রকক আচরণই জনতা কর্তৃক অনিয়মতান্ত্রিক পথে প্রতিহিংসা গ্রহণের কারণ। শাসক মহলের মন্ত্র একনায়কত্ববাদ হইলে, তদুত্তরে জনতার মন্ত্র হইবে আইন অমান্য। ’’ সোহরাওয়ার্দীর উচ্চারিত সতর্কবাণীর অব্যবহিত পর পরই ২২শে আগষ্ট রাষ্ট্রপ্রধান কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রীকে ৩০ শে আগষ্টের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন ডাকার নির্দেশ দেন। 
     ৪ঠা সেপ্টেম্বর গভর্ণর শেরে বাংলার সরকার ভূখা মিছিলের উপর গুলিবর্ষণ করে এবং পুলিশের গুলিতে চারজনকে প্রাণ দিতে হয়। বিচলিত গভর্ণর শেরে বাংলা বাধ্য হইয়া প্রাদেশিক পরিষদে বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান খানকে সরকার গঠনে আহবান করেন। নিহতদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপনের জন্য ও গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ৫ই সেপ্টেম্বর এক বিরাট জঙ্গী মিছিল সমগ্র ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ করে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির জরুরী বৈঠকে গভর্ণর কর্তৃক সরকার গঠনের আমন্ত্রণ আলোচিত হয়। সংগঠনের সভাপতি মাওলানা ভাসানীকে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণে অনুরোধ জানানো হইলে, তিনি সরকার গঠনের জন্য আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারী দলের নেতা আতাউর রহমান খানকে দায়িত্ব দেন। ৬ই সেপ্টেম্বর জনাব আতাউর রহমান খান আওয়ামী লীগ, গণতন্ত্রীদল, কৃষক শ্রমিক পার্টি(কফিল উদ্দিন চৌধুরী উপদল) সমবায়ে আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রীসভার শপথ গ্রহণ করান। পরবর্তীকালে পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস, ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ পার্টি ও (ধীরেন দত্ত গ্রুপ) আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন সরকারে যোগ দেয়।