সুয়েজ খাল জাতীয়করণ

ফন্ট সাইজ:

     ২৬ শে জুলাই (১৯৫৬) মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুন নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অর্থনীতির প্রয়োজনে নীল নদের উপর আসোয়না বাঁধ নির্মাণের ব্যয় নির্বাহের কারণেই তাঁহাকে সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করিতে হইয়াছিল। পূবাহ্নে স্বীকৃত হইয়াও পরবর্তী পর্যায়ে বিশ্বব্যাংক আসোয়ন হাইড্যাম নির্মাণকল্পে পূঁজি বিণিয়োগে অস্বীকৃতি জানাইলে বাধ্য হইয়াই প্রেসিডেন্ট নাসের উপরোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, একশত তিন মাইল দীর্ঘ সুয়েজ খালটি ফরাসী নাগরিক ফার্ডিন্যান্ড দ্য লেসেপস ১৮৫৯ সালের ১লা এপ্রিল খনন শুরু করেন ও ১৮৬৯ সালের ১৭ই নভেম্বর উক্ত খালে জাহাজ চলাচল শুরু হয়। ১৮৭৫ সালে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডিজরেইলী মিসরের শাসনকর্তা খেদিব ইসমাইল হইতে চল্লিশ লক্ষ স্টার্লিং পাউন্ড মূল্যে সুয়েজ খালের শেয়ার ক্রয় করিয়া ইংগ-ফরাসী যৌথ মালিকানার সুত্রপাত করেন। তাই বৃটিশ ও ফরাসী সরকার ইসরাইলের সহায়তায় আন্তর্জাতিক নদীপথ সুয়েজ খালটির আয়ের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব রক্ষার বদমতলবে সুয়েজ খান কোম্পানী জাতীয়করণের তিন মাসের মধ্যে মিসরের উপর সশস্ত্র হামলা পরিচালনা করে। ইসরাইল ২৮ শে অক্টোবর (১৯৫৬) সিনাই উপদ্বীপ দখল করে; বৃটেন ও ফ্রান্স ৩১ অক্টোবর (১৯৫৬) মিসরের রাজধানী কায়রোতে বিমান হামলা ও বোমাবর্ষণ করে। মিসরের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী হামলার প্রতিবাদে ঢাকা শহর বিক্ষোভে মিছিলের শহরে পরিণত হয়। এমনকি ৩রা নভেম্বর (১৯৫৬) এক পর্যায়ে ক্ষিপ্ত ও উত্তেজিত জনতা পুরানো পল্পনস্থ বৃটিশ ইনফরমেশন সার্ভিস ভবনটি অগ্নিসংযোগে ভস্মীভূত করিয়া দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পর্দার অন্তরাল হইতে ইংগ-ফরাসী মক্তিদ্বয়কে সশস্ত্র আক্রমণের বিরুদ্ধে তাহার কঠোর মনোভাব জানাইয়া দেয় এবং সোভিয়েট রাাশিয়া প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রশ্চেভ প্রকাশ্য চমপত্রে ঘোষণা করেন যে, সশস্ত্র আক্রমণ বন্ধ না করিলে রাশিয়া পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে বাধ্য হইবে। বিশ্বজগত ও এই দুই মহাশক্তিদ্বয়ের কঠোর মনোভাবের নিকট ইংগ-ফরাসী সরকারদ্বয় নতি স্বীকার করিয়অ ১২ই নভেম্বর (১৯৫৬) সশস্ত্র হামলা প্রত্যাহার করিতে বাধ্য হয়। সংকটময় এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দী এক অস্পষ্ট, অপরিচ্ছন্ন ও দ্ব্যর্থবোধক ভূমিকা গ্রহণ করেন। এমনিক সুয়েজ সমস্যার উপর ১২ই নভেম্বর দিল্লীতে আহূত কলোম্ব শক্তিসমূহের (ঈড়ষড়সনড় চড়বিৎং) সম্মেলনে আমন্ত্রণ গ্রহণ করা সত্ত্বেও ইরানের রাজধানী তেহরানে আহূত বাগদান প্যাক্ট কাউন্সিল সভায় যোগদানের জন্য প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জসহ তিনি তেহরান গমন করেন। ফলে জাতিসংঘ কর্তৃক সুয়েজ খাল এলাকায় প্রেরিতব্য আন্তর্জাতিক পুলিশ ফোর্সে পাকিস্তান সৈন্য সোহরাওয়ার্দী কায়রো সফরের ইচ্ছা প্রকাশ করিলে মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুন নাসের অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। সোহরাওয়ার্দী অনুসৃত নীতি বস্তুতঃ আরব জাহানে পাকিস্তানকে বিরাগভাজন রাষ্ট্রে পরিণত করে। এইদিকে দিল্লীতে আহূত কলম্বো পাওয়ারস সম্মেলনে যোগদান না করায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাকিস্তান একঘরে হইয়া পড়ে। প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর বিস্ময়কর এই ভূমিকা অগ্রাহ্য করিয়াই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান প্রকাশ্য বিবৃতির দ্বারা মিসরের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানান। মাওলানা ভাসানী ৯ই নভেম্বরকে ‘মিসর দিবস’ হিসাবে ঘোষণা করেন ও আওয়ামী লীগ সরকার ‘মিসর দিবসকে’ সরকারী ছুটির দিন হিসাবে ঘোষণা জারি করে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এই বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করা সত্ত্বেও অবস্থার চাপে উল্লিখিত কর্মসূচিীর বিরোধীতা করা হইতে বিরত থাকেন।