স্বাধীন বাংলার আওয়াজ

ফন্ট সাইজ:

কারামুক্তির পর অত্যন্ত সতর্কতার সহিত লক্ষ্য করিতেছিলাম যে, পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-যুব সমাজে ও রাজনৈতিক অংগনে স্বাধীন বাংলার আওয়াজ একটি সোচ্চার আওয়াজে পরিণত হইয়াছে। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কার্যকলাপে উদ্বিগ্ন পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কাউন্সিল) সভাপতিত খাজা নাজিমুদ্দিন ২৭ শে নভেম্বর (১৯৬২) রাত্রিতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত কাউন্সিল সভায় ভাষণদানকালে মন্তব্য করেন,"During the last five years that I have been in Dacca people from all sections of East pakistan have called on me mostly my friends, colleagues and co-workers & it has pained me to learn that a whispering campaing among a large section of people is going on contemptating secession.......Unfortunately this idea is also finding support amongst every small section of west pakistan. The other day at a dinner party very high official from west pakistan told me what is the harm if we have confederation''?  অর্থাৎ পাঁচ বৎসরকাল ঢাকায় অবস্থানকালে বিভিন্ন স্তরের লোকজন যাহার অধিকাংশই আমার বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মী আমার সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছেন। তাহাদের নিকট হইতে আমি জানিতে পারিয়া ব্যথিত হইয়াছি যে, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিচ্ছিন্ন হইবার ব্যাপারে কানাঘুষা চলিতেছে। দূর্ভাগ্যবশতঃ পশ্চিম পাকিস্তানীদেরও একটি অতি ক্ষুদ্র অংশশ এই মতের সমর্থক সম্প্রতি এক নৈশভোজে পশ্চিম পাকিস্তানের একজন অতি উচ্চপদস্থ কর্মচারী আমাকে বলেন যে, কনফেডারশন গঠন করিলে ক্ষতি কি? ’’ 

১৯৬৩ সালেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ঘোষণা করেন যে, পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত মার্কিন সাহায্য হইতে পূর্ব পাকিস্তানের অংশ পূর্বাংহ্নেই নির্দিষ্ট করিয়া দেওয়া হইবে । ইহার ফলে পূর্ব পাকিস্তানীরা মার্কিন যুক্তরষ্ট্রকেই পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় সরকারের চাইতে অধিকতর সহানুভূতিশীল মনে করিবার ইন্ধন পাইয়া গেল। সুকৌশলে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানী জনতাকে উস্কানি দান করাই ছিল উপরোক্ত মন্তব্যের লক্ষ্য। প্রেসিডেন্ট আইউব এই সময়ে সমাজতান্ত্রির বিশ্ব চীন-সোভিয়েটের সহিত ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে সা¤্রাজ্যবাদী সামরিক জোটের প্রতি উৎসাহ হারাইয়া ফেলেন। কেন্দ্রীয় সরকারকে বেকায়দায় ফেলিবার জন্যই মার্কিন সরকার নানাভাবে প্রচেষ্টা চালাইতে থাকে। এই প্রচেষ্টায় শেখ মুজিবুর রহমান দাবার গুটি হইতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেন নাই। শক্তিশালী দোসর হিসাবে তাঁহার সহিত যোগ দেয় দৈনিক ইত্তেফাক। পক্ষান্তরে আইউব সরকার কর্তৃক পুনঃপুনঃ লাঞ্ছিত হওয়া সত্ত্বেও শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের সংহতি, একাত্মতা ও অখন্ডত্ব রক্ষায় সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। কোন প্রকার প্রলোভন বা প্ররোচনা তাঁহাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট ও বিচলিত করিতে পারে নাই। 
১৯৬২ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অবস্থানকালে ময়মনসিংহ নিবাসী রাজবন্দীদ্বয় আবদুর রহমান সিদ্দিকী ও আবু সৈয়দের নিকট হইতে আমি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের বিষয়াদি অবগত হই। ভারতে মুদ্রিত বিচ্ছিন্নতাবাদ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন ময়মনসিংহ ও বিভিন্ন জেলায় বিতরণকালেই তাঁহারা গ্রেফতার হইয়াছিলেন। 
এমনি বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক শূণ্যতায় ‘‘৯ নেতার’’ ঐতিহাসিক বিবৃতির সূত্র ধরিয়া জনাব সোহরাওয়ার্দী ১৯৬২’র সংবিধান ‘গণতন্ত্রায়নের’ আওয়াজ তোলেন এবং পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনৈতিক নেতা, কর্মী এবং জনতাকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের উদ্বুদ্ধ করিবার শুরু দায়ত্ব গ্রহণ করেন; কিন্তু বিধিবাম! অচিরেই সোহরাওয়ার্দী অসুস্থ হইয়া পড়েন এবং চিকিৎসার উদ্দেশ্যে লন্ডন গমন করেন। জনাব সোহরাওয়ার্দী লন্ডন গমনে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের রাজনৈতিক তৎপরতা স্তিমিত হইয়া পড়ে। তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে নেতৃবৃন্দ তখনও কিছুটা সক্রিয় ছিলেন যেমন, জুলাই মাসে (১৯৬৩) চট্টগ্রাম জেলা বন্যাকবলিত হইয়া পড়িলে তাঁহারা সাহায্য ও পূনর্বাসন কাজে কিছুটা তৎপরতা দেখান। 
 
টাঙ্গাইল-বাসাইল উপ নির্বাচন
টাঙ্গাইল-বাসাইল উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করিবার প্রয়াসে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট, সাবেক আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, কৃষক পার্টি ও অপুনরুজ্জীবিত মুসলিম লীগ অংশ এবং মুসলিম লীগ(কাউন্সিল), নেজামে ইসলাম পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর ২৩ শে আগষ্ট (১৯৬৩)-এর সম্মিলিত বৈঠকে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের আসন্ন উপনির্বাচন সুষ্ঠুভাবে তত্ত্বাবধানের জন্য আমাকে আহবায়ক নিয়োগ করিয়া সাত সদস্যবিশিষ্ট এক ‘‘নির্বাচন সমন্বয় কমিটি’’ গঠন করে এবং উপরে বর্ণিত রাজনৈতিক সংস্থাগুলি সম্মিলিত বিরোধী দল নামে উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতার সিদ্ধান্ত নেয়। টাঙ্গাইল-বাসাইল প্রাদেশিক পরিষদ উপনির্বাচনে প্রেসিডেন্ট আইউব খানের নেতৃত্বে পরিচালিত মুসলিম লীগ (কনভেনশন) প্রার্থী ছিলেন করটিয়ার জনাব বায়জিদ খান পন্নী ও সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী ছিলেন টাঙ্গাইলের খোদা বকস। সরকারী প্রার্থী প্রশাসনযন্ত্র ব্যবহার করিয়া মৌলিক গণতান্ত্রিদের (নির্বাচনী কলেজ) ভোটে নির্বাচিত হন। পূবাহ্নে বিচক্ষণ সোহরাওয়ার্র্দী লন্ডনের রোগশয্যা হইতে সতর্কবাণী উচ্চারণ করিয়া সংবাদপত্রে এই মর্মে বিবৃতি দিয়াছিলেন যে, “Going will be heavy'' অর্থাৎ ‘‘যাত্রাপথ হইবে বন্ধুর’’। এই সময়ের পল্লী উন্নয়ন কাউন্সিলের সদস্যদের দেওয়া হইয়াছিল ইহার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তাহাদের পকেটস্থ হইযা পড়ে। এই অবস্থায় সরকার মনোনীত প্রার্থী এইসব মৌলিক গণতন্ত্রীর ভোটে নির্বাচিত হওয়াটাই স্বাভাবিক এবং হইয়াছিল তাহাই। 
 
এন,ডি,এফ-এর দূর্বলতা
স্বাস্থ্যগত কারণে জনাব সোহরাওয়ার্দীর বিদেশ অবস্থানকালে জাতীয় গণতান্ত্রীক ফ্রন্ট নেতৃবৃন্দের নিস্ক্রিয়তার সুযোগে মাওলানা হামিদ খান ভাসানী নিজের সংগ্রামী ঐতিহ্য ও আদর্শবোধ ত্যাগ করিয়া প্রাসাদ কুচক্রীদের কবলে পতিত হন। এই ব্যাপারে বিশেষ ভুমিকা গ্রহণ করেন পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদ্বয় জনাব মউিদ্দিন আহমদ ও আহমাদুল কবীর। লাহোরের ব্যারিষ্টার মিয়া মাহমুদ আলী কাসুরীর বাসভবনে প্রেসিডেন্ট আইউব খানে মিলিটারী সেক্রেটারী ব্রিগেডিয়ার পীরজাদার সহিত তাঁহাদের গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। উহাতে আইউব-ভাসানীর গোপন আঁতাতের ভিত রচিত হয়। কিসের বিনিময়ে উক্ত দুই ভদ্রলোক এবং মাওলানা ভাসানী জনগণের সার্বভৌমত্ব  প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রামে এইভাবে ছুরিকাঘাত করিয়াছিলেন ভবিষ্যৎ ইতিহাস সে বিষয়ে সাক্ষী দিবে। আইউব-ভাসানী দূতদের গোপন মিলনের প্রত্যক্ষ ফসল ১৯৬৩ সালের ২২ শে জুন রাওয়ালপিন্ডিতে আই্উব-ভাসানী সাক্ষাৎকার। বলাই বাহুল্য যে, প্রেসিডেন্ট আইউব খানের একনায়কত্বের বিরুদ্ধে জনগণের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের সংগ্রামকে নস্যাৎ করিবার উদ্দেশ্যই এই দুই উদ্যোক্তা ভাসানী-আইউব সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করেন। জাতীয় পরিসদ সদস্য ও পরিষদে বিরোধী দলীয় সোচ্চার কণ্ঠ জনাব মশিউর রহমান প্রেসিডেন্ট আইউব ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর নিমকের মর্যাদা রক্ষার জন্য পর্দার অন্তরালে নাটের গুরুর ভূমিকা পালন করিতে থাকেন। পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির পরবর্তী রাজনৈতিক ভূমিকার ক্রমবিকাশ উপরোক্তত তিক্ত সত্যের ফলশ্রুতি মাত্র। উত্তরকালে জনাব মশিউর রহমান গর্বের সহিত একই দালালীর ভূমিকা অবৈধ প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া ও অবৈধ প্রেসিডেন্ট সেনাপতি লেঃ জেঃ জিয়াউর রহমানের কালেও পালন করিয়াছিলেন। 
ভাসানী-আইউব সাক্ষাৎকারের অব্যবহিত পরই ৩০ ও ৩১শে আগষ্ট এবং ১লা সেপ্টেম্বর ঢাকায় পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সাংগঠনিক কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। মিঞা মাহমুদ আলী কাসুরী সংগঠন পুনরুজ্জীবনের পক্ষে জোরালো বক্তব্য পেশ করেন এবং চক্রান্তকারীরা তাঁহাকে জোর সমর্থন জানান। কিন্তু পূর্বাহ্নে ২৮  ও  ২৯ শে আগষ্ট ৩/৮, লিয়াকত এভিনিউ (জনসন রোড) ঢাকায়, দুই দিবসব্যাপী বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সাংগঠনিক কমিটি জাতীয় গণতান্ত্রিক ফন্টকে জোরদার করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছিল। তাই কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় আমি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি পুনরুজ্জীবনের তীব্র বিরোধীতা করি। সভায় শেষ পর্যন্ত আমাদের বক্তব্যই গৃহী হয় এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টকে শক্তিশালী করিবার সিদ্ধান্ত গহণ করা হয়। ঐক্যের এই পথকে বিঘিœত করিবার প্রয়াসেই মাওলানা ভাসানী পল্টনে আহুত জনসভায় এক জোরালো বক্তৃতা দিলেন এবং এই বক্তৃতা মঞ্চ হইতে পার্টির অভিমত না নিয়াই এককভাবে ১৯৬৩ সালের ডিসেম্বর মাসে আইন অমান্য আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা করিলেন। 
১৯৬৩ সালের ১লা অক্টোবর প্রেসিডেন্ট আইউব খানের সরকারী প্রতিনিধি দলের নেতা হিসাবে মাওলানা ভাসানী নয়া চীনের প্রজাতন্ত্র দিবসে অংশগ্রহণ করেন। প্রতিনিধিদলের অন্যান্য সদস্য ছিলেনঃ সর্বজনাব মশিউর রহমান, সদস্য জাতীয় পরিষদ; আখতার উদ্দিন আহমদ, সদস্য জাতীয় পরিষদ; ডঃ জাবেদ ইকবাল, শওকত আলী, বার-এট-ল, কায়সার আহমদ, পি,এফ,এস (পাকিস্তান ফরেন সার্ভিস) ও জেনারেল হাবীবউল্লাহ। চীন সফর হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়াই মাওলানা ভাসানী তাঁহার ঘোষিত আইন অমান্য আন্দোলন বাতিল ঘোষণা করেন এবং আইউব সরকারের প্রতিত সমর্থনদানের জন্য জনগণের প্রতি আহবান জানাইতে থাকেন। ইহাই ব্যক্তিপূজা রাজনীতির অভিশাপ। 
সোহরাওয়ার্দীর তিরোধান
শেখ মুজিবুর রহমান করাচী-পিন্ডিতে সরকারী উচ্চ মহলের দোসর পুঁজিপতি শ্রেনীর একটি বিশেষ অংশের অবাঞ্ছিত প্রভাবে আইউব বিরোধী ঐক্য সংস্থা ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টকে জোরদার করিবার প্রয়াস পরিত্যাগ করেন। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবনের প্রস্তাব লইয়া তিনি জনাব সোহরাওয়ার্দী সমীপে লন্ডন পর্যন্ত গমন করেন। বিচক্ষণ সোহরাওয়ার্দী অন্তদৃষ্টি বলেই শেখ মুজিবুর রহমানের প্রস্তাবের আড়ালে করাচী-পিন্ডি কুচক্রী মহলের কুৎসিৎ চেহারগুলি অবলোকন করিতে পারিয়াছিলেন। তাই জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে একনিষ্ঠ সোহরাওয়ার্দী তাঁহার রোগ শয্যাপার্শ্বে দন্ডায়মান শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবনের প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টকে শক্তিশালী করিবার ব্যাপারে তাঁহাকে নির্দেশ দান করিতে পারেন নাই। কিন্তু জাতির দূর্ভাগ্য যে, ইহার কিছুকাল পরেই হৃদরোগে আক্রন্ত জাতির কান্ডারী ১৯৬৩ সালের ৫ই ডিসেম্বর লেবাননের রাজধানী বৈরুতের ‘কন্টিন্যান্টাল’ হোটেলে আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু বান্ধব ও শুভানুধ্যায়ী বিবর্জিতত পরিবেশে পরলোকগমন করেন। ৭ই ডিসেম্বর সকাল ১১-৫০ মিঃ সোহরাওয়ার্দীর মৃতদেহসহ বিমান করাচী বিমান বন্দরে অবতরণ করে। করাচীর শোকাকুল জনতা কর্তৃক অনুষ্ঠিত জানাযায় ইমামতি করেন মাওলানা আবদুস সাত্তার নিয়াজী। দাফনের জন্য দিন অর্থাৎ ৮ই ডিসেম্বর সকাল ১০-১৭ মিঃ শবাধারবাহী বিমানটি ঢাকা (তেজগাঁও) বিমান বন্দরে অবতরণ করিলে লক্ষ লক্ষ শোকাভিভূত ও অশ্রুবিগলিত জনতা এক অবিস্মরণীয় মর্মান্তিক দৃশ্যের অবতারণা করে। ইহা কেবল উপলব্ধি করা যায়, বর্ণনা করা যায় না। ‘‘সোহরাওয়ার্দী নাই’’ কঠিন সত্যটি গ্রহণ করিয়াই ঢাকার রেসকোর্সে পীর মোহসেন উদ্দিন আহমেদের ইমামতিতে জনসমুদ্র জানাযা নামাজ আদায় করে এবং অপরাহ্ন ২-৩০ মিঃ ঢাকা হাইকোর্টের পাশ্ববর্তী জমিনে তাঁহাকে দাফন করা হয়। পরিতাপের বিষয়, তাঁহার নশ।বর দেহকে ঢাকার মাটিতে শায়িত রাখিয়া তাঁহার উত্তরসূরীগণ তাঁহার গণতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণাকে অবমাননা করিতে বিন্দুমাত্রও বিবেক দংশনবোধ করে নাই। গণতন্ত্রের মানসপুত্র বলিয়া অভিহিত সোহরাওয়ার্দীর প্রতি ব্যঙ্গ আর কাহাকে বলে! 
একনায়কত্ববাদী সরকারের বিরুদ্ধে গনতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জনাব সোহরাওয়ার্দী ছিলেন একমাত্র নির্ভরশীল কান্ডারী। সোহরাওয়ার্দী জনগণকে ক্ষমতার মূল উৎস মনে করিতেন। তাই জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁহার রাজনীতির মূলমন্ত্র। রাষ্ট্রীয় বা জীবন-দর্শনে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁহার দৃষ্টিভঙ্গী ও আমাদের অনেকের দৃষ্টিভঙ্গীতে পর্বতপ্রমাণ পার্থক্য ছিল; তবে, তাঁহার দৃষ্টিভঙ্গী ছিল অন্তঃশক্তিপ্রসূত এবং কখনই উহা ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তপ্রসূত ছিলনা। 
রাজনৈতিক শূন্যতা
সোহারায়ার্দীর তিরোধান জাতিকে সম্বিৎহারা করিয়াছে; কিন্তু বাঁচাইয়াছে আইউব-মুজিব চক্রান্তের রাজনীতিকে। শেখ মুজিব কালবিলম্ব না করিয়াই স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করিলেন এবং অদৃশ্য হস্তের অংগুলী হেলনে পশ্চিম পাকিস্তানে পাড়ি জমাইলেন। তাঁর পশ্চিম পাকিস্তান সফরের উদ্দেশ্য ছিল সুস্পষ্ট। উল্লেখ যে, পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সভাপতি নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান, পশ্চিম পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মিঞা মাহমুদ আলী কাসুরী ও কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা খাজা মোহাম্মদ সফদার ২১ শে জানুয়ারী এক যুক্ত সাংবাদিদক সম্মেলনে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠনের সংবাদ প্রকাশ করেন। ইহারও আগে ২৬, ২৭ ও ২৮ শে জানুয়ারী (১৯৬৩) করাচী বৈঠকেক দশ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠিত হইয়াছিল। উক্ত বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাবের দায়ে মে মাসে (১৯৬৩) ঐ সদস্যদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র বিরোধী মামলা দায়ের করা হয়। এইভাবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট যখন জন গণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় যুগপৎ আন্দোলন চালাইয়া যাওয়ার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত, ঠিক তখনই শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তান গমন করেন। এবং আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত হইল। ঢাকা ফিরিয়া ২৫ শে জানুয়ারী (১৯৬৪) স্বীয় বাসভবনে (৬৭৭, ধানমন্ডি আবাসিক এলাক, সড়ক নম্বর ৩২) শেখ মুজিবর রহমান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটি, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সম্পাদকবৃন্দ এবং জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যবৃন্দের এক যুক্ত সভা আহবান করেন  এবং উক্ত সভায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে নভেম্বর মাসে ( ১৯৬৩) অনুষ্ঠিত অনুরূপ সভায় আওয়ামী লীগকে পুনরূজ্জীবনে দাবী উঠিয়াছিল। কিন্তু আগেই বলিয়াছি, জনাব সোহরাওয়ার্দী লন্ডনে উপস্থিত শেখ মুজিবকে স্পষ্টভাবে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত না করিবার নির্দেশ দিয়াছিলেন। ব্যর্থ মনোরথ শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডন হইতে ফিরিয়া সোহরাওয়ার্দীর বক্তব্য নেতৃবৃন্দকে জানাইবার জন্য ৭ই ডিসেম্বর (১৯৬৩) জনাব আতাউর রহমান খানের বাসভবনে(৫০০-এ, ধানমন্ডি আ/এ, সড়ক নং-৭) পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির এক সভা আহবান করেন; কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর আকস্মিক ইন্তেকালের কারণে এই সভা মূলতভী হইয়া যায়। 
আমি ও আবদুস সামাদ কারান্তরালে আটক থাকাকালেই পকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সাংগঠনিক কমিটি আওয়ামী লীগের পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়াই২৮ ও ২৯ শে ফেব্রুয়ারী ও ১লা মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে দল পুনরুজ্জীবনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই ভাবেই কৃষক শ্রমিক পার্টি ব্যতীত অন্য সকল রাজনৈতিক দল পুনরুজ্জীবিত করিয়া জাতীয় সেই সংকটকালে শ্রমিক পার্টি ব্যতীত অন্য সকল রাজনৈতিক দল পুনরুজ্জীবিত করিয়া জাতীয় সেই সংকটকালে নেতৃবৃন্দ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকেই দূর্বল করেন। কনভেনশন মুসলিম লীগ গঠনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট আইউব যাহ চাহিয়াছিলেন-এইভাবেই নেতৃবর্গের অবিমৃষৎকারিতায় অর্থাৎ নিজ নিজ দল পুনরুজ্জীবনে আইউবের সেই আকাংখাই পূর্ণ হইয়াছিল এবং পরিণতিতে আইউবের প্রভুত্বব্যঞ্জক শাসন ব্যবস্থা হইয়াছিল আরও দৃঢ়।