সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা

ফন্ট সাইজ:

     কলিকাতার হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হইলে ঢাকায় উহারতীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। দাঙ্গা প্রতিরোধকল্পে ঢাকার সর্বস্তরেরনাগরিকই সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ঢাকা প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত রাজনৈতিতকনেতা, ছাত্র,কর্মী, আইন পরিষদ সদস্য, আইনজ্ঞ ওসাংবাদিকদের এক যৌথ সভায় ‘ দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করা হয়। গভর্ণর মোনায়েম খান ও কনভেনশন মুসলিমলীগ ‘দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির’ তাৎপরতাকে সুনজরে দেখেন নাই। দাঙ্গা কবলিতদেরপুনর্বাসনে প্রশ্নে প্রশাসনিক যন্ত্রের কর্মশিথিলতা কর্মকর্তাদের সহিততর্কবিতর্ক ও বচসা এড়ান যাইতনা। গরীব হিন্দু কুমারদের বসতি এলাক রায়েরবাজার দাঙ্গায় বিধ্বস্ত হইয়াছিল। আমি, জনাব আবদুস সামাদ এবং ওজিউদ্দিন আহমদচৌধুরী ওই এলাকায় সাহায্য ও পুনর্বাসন কাজে ব্যাপৃত থাকাকালে উগ্র মেজাজীপ্রশাসনিক কর্মকর্তার সহিত কথা কাটাকাটি হয়। ক্ষমতা প্রদর্শনের নেশায়উন্মুক্ত উক্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তার অভিলাষেই ২৭ শে জানুয়ারী (১৯৬৪)প্রাদেশিক সার্কিট হাউসে অবস্থানরত আমার প্রাণপ্রতিম অনুজ মোহাম্মদআমিরুজ্জামান, সি,এস,পি’র কামরা হইতে নিরাপত্তা আইনে আমাকে গ্রেফতার করাহয়। কারাগারে প্রবেশে করিবার পর জনাব আবদুস সামাদের গ্রেফতারের খবর পাই।যাহা হউক, আমরা উভয়েই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ২৬ সেলের বাসিন্দা হইলাম।আমাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ২৮ শে কুমিল্লা জেলা হইলে নির্বাচিত প্রাদেশিকপরিষদ সদস্য জনাব সুলতান আহমদ প্রাদেশিক পরিষদে মূলতবী প্রস্তাব আনয়নকরেন।

      আমি ও আবদুস সামাদ দল পুনরুজ্জীবনের ঘোর বিরোধী ছিলাম।আমাদের সিদ্ধান্ত যতটা নীতিভিত্তিক ছিল, ততটা বাস্তবধর্মী ছিলনা। কর্মীবাহিনীর সমর্থন বিবর্জিত নীতি বা আদর্শের বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা সফল হয় না।বৈঠকী রাজনীতিতে অভ্যস্ত ও অন্যের কর্মদক্ষতায় বিব্রত জাতীয় গণতান্ত্রিকফ্রন্টের নেতারা মরহুম সোহরাওয়ার্দীর গতিশীল নেতৃত্বে সৃষ্ট সম্ভাবনাময় গণআন্দোলনের প্রতি প্রকারারান্তরে বিশ্বাসঘাতকতাই করেন এবং দেশের ভবিষ্যৎকেঅনিবার্য সর্বনাশের দিকে ঠেলিয়া দেন। আবার ইন্তেকাল

     ১৯৬৪সালের ২৯ শে জুলাই শ্রদ্ধেয় আব্বাজান ইন্তেকাল করেন। আমি ঢাকা কেন্দ্রীয়কারাগারে বন্দী। আব্বাজানের অন্তিম শয্যায় তাঁহার পার্শে¦ উপস্থিত থাকিবারঅনুমতি গভর্ণর মোনায়েম খান সরকার দেন নাই। বিদেশী ইংরেজী সরকার আমলেওপ্রিয়জনের রোগ এবং মৃত্যুশয্যা পার্শ্বে উপস্থিত থাকিবার জন্য প্যারলেসাময়িক মুক্তি দেওয়া হইত। করাচী হইতে প্রকাশিত ইংরেজী দৈনিক ‘ডন’ পাঠেমর্মান্তিক হৃদয় বিদারক ঘটনাটি জানিতে পারি। কি দুর্বহ যাতনা, কি দুঃসহবেদনা, ভাষায় তাহা  ব্যক্ত করা যায় না। শুধুমাত্র ভুক্তভোগীই তাহা মর্মেমর্মে উপলব্ধি করিতে পারে। জেল জীবনের ঐ কঠিন মুহূর্তগুলিকে নিরাপত্তাবন্দী শেখ ফজলুল হক (মনি) আমার পাশে পাশেই থাকিত ও আমাকে সান্ত¦না দিতেচেষ্টা করিত। ¯েœহভাজন মনির কোমল হৃদয়ের আন্তরিকতা আমার স্মৃতিকোটরেচিরসজীব থাকিবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ

১৯৬৪সালের ২২ শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিতব্য কনভোকেশন উপলক্ষেসম্ভাব্য গোলযোগ সৃষ্টির বিরুদ্ধে সতর্কমূলক ব্যবস্থা হিসাবে শেখ ফজলুল হকমনিকে সরকার নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করেন। কনভোকেশনে গোলযোগের কারণেবিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নি¤েœাক্ত ছাত্রদের বিরুদ্ধে বর্ণিত শাস্তিমূলকব্যবস্থা গ্রহণ করেন। যথাঃ শেখ ফজলুল হক (মনি) ও আসমত আলী এম,এ, ডিগ্রীবাতিল; কে,এম,ওবায়দুর রহমান, এ,কে, বদরুল হক, রাশেদ খান মেনন ও সত্তগাতআলম- পাঁচ বৎসরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বহিস্কার, হায়াৎ হোসেন, আনোয়ারুলহক চৌধুরী, নূরুল ইসলাম চৌধুরী, আনোয়ার আলী হায়দা খান, শহীদুল হক-৩ বৎসরেরজন্য বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বহিস্কার, গিয়াসুদ্দিন আহমদ চৌধুরী, মনসুরুদ্দিনআহমদ, জাকি আহমদ, আবদুল করিম, সৈয়দ মতিয়ুর রহমান, হুমায়ুন কবীর, কামালউদ্দিন সিকদার ও ফেরদৌস আহমদ কোরেশী -- দুই বৎসরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়হইতে বহিস্কা।

উল্লেখ্য যে, জাকী আহমদ ও আহমদ ফারুকের রীটআবেদনক্রমে ঢাকা হাইকোর্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ছাত্র বহিস্কারাদেশনাকচ ঘোষরা করিয়াছিলেন। বলাই বাহুল্য যে, জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন (এন,এস,এফ)সমগ্র দেশে গভর্ণর মোনায়েম খানের লাঠিয়াল বাহিনী হিসাবে কাজ করিত ওশিক্ষাঙ্গনে ছাত্র নামধারী এন,এস,এফ গুন্ডাবাহিনী সর্বপ্রকার অনাচার ও অসৎকর্মের হোতা ছিল  (যেমন ছিল বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ৪ খলিফা নূরে আলমসিদ্দিকী, শাহাজাহান সিরাজ, আ,স,ম আবদুর রব ও আবদুল কুদ্দুস মাখনেরনেতৃত্বাধীন ছাত্র লীগ) । ১৯৬৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরঅর্থনীতির অধ্যাপক ডঃ আবু নসর মাহমুদ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেআদালত অবমাননা মামলায় ঢাকা হাইকোর্টে জিতিলে অদৃশ্য হস্তের ইংগিতে জাতীয়ছাত্র ফেডাডরেশন গুন্ডারা ঐদিনই তাঁহাকে নির্মমভাবে প্রহার করে। ইহারঅব্যবহিহত পরপরই বিষাক্ত পরিবেশ হইতে মুক্তিলাভ মানসে সম্মানীয় অধ্যাপকআবদুর রাজ্জাক দেশ ত্যাগ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সভায় হইতেঅপসারিত হন। ঘটনার বিবর্তনের কি নির্মম পরিহাস যে, ডঃ আবদুল মতিন চৌধুরী১৯৭৩-৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর পদে। অধিষ্ঠিত থাকাকালেঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের ছাত্র অরাজকতা, নৈরাজ্য, মারামারি, কাটাকাটি, চরিত্রহীনতা, কথায় কথায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার সর্বোচ্চ সীমায় পৌছে। শিক্ষারপরিবেশকে দেওয়া হয় চিরবিদায়, ছাত্র-শিক্ষক ভূলিয়া যায় যে, বিশ্ববিদ্যালয়তপোবন বিশেষ। নিরীহ সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাত্র সম্প্রদায় মুষ্টিমেয় অস্ত্রধারীঅশুভ শিকারে পরিণত হইয়া পড়ে। তাহাদের ‘‘ছাত্র নং অধ্যয় নং তপঃ’’ প্রয়াসঅংকুরেই বিনষ্ট হয়।

দাঙ্গা প্রতিরোধের দায়ে মামলা

     ‘দাঙ্গাপ্রতিরোধ কমিটি’ কর্তৃক দাঙ্গা প্রতিরোধের আহ্বান জানাইয়া ‘‘পূর্বপাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও ’’ শিরোনামে একটি বিজ্ঞাপন ছাপানো ও বিলানো হয়।১৯৬০ সালের প্রেস পাবলিকেশন্স অর্ডিন্যান্সের ২ ধারার ‘গ’ উপধারার নির্দেশমোতাবেক বিজ্ঞাপনে প্রকাশকক ও মুদ্রাকরের নাম ছিল না। তাই বর্ণিতঅর্ডিন্যান্সের ৫০, ৫২ (২) মোতাবেক ১৯৬৪ সালের ৩০ শে এপ্রিল সর্বজনাবহামিদুল হক চৌধুরী, আতাউর রহমান খান, শেখ মুজিবুর রহমান, শাহ আজিজুর রহমান, ডঃ আলীম আল-রাজী, তফাজ্জল হোসেন, সম্পাদক দৈনিক ইত্তেফাক, জহুর হোসেনচৌধুরী, সম্পাদক দৈনিক সংবাদ, মাহমুদ আলী, মাহবুবুল হক, অলি আহাদ, কে, এম, ওবায়দুর রহমান, আলী আকসাদ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঢাকা (দক্ষিণ) মহকুমাপ্রশাসকের এজলাশে গভর্ণর মোনায়েম খান সরকার মামলা রুজু করেন। দীর্ঘ পাঁচবৎসরকাল এই মামলা লইয়া টানাটানির পর ১৯৬৯ সালের ৫ই এপ্রিল সরকার মামলাপ্রত্যাহার করে। এইভাবেই রাজনৈতিক কর্মীদের হয়রানি করা হয়।

কারামুক্তি

    জনাবসামাদ আমার বহু পূর্বেই কারামুক্তির ব্যবস্থা করিয়া আমাদের নিকট হইতেবিদায় গ্রহণ করেন। এমতাবস্থায় জনাব মাহমুদ আলী আমার মুক্তি দাবী করিয়া ঢাকাহাইকোর্ট হেবিয়াস কপার্স মামলা দায়ের করেন। বিচারপতি, এ,এম, চৌধুরী ওবিচারপতি আবদুল্লাহ্্ সমবায়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চে শুনানীর প্রারম্ভেই সরকারপক্ষীয় কৌসুলী সৈয়দ মাহমুদ হোসেন আদালতকে জানান যে, সরকার আমাকেমুক্তিদানের সিদ্ধান্ত নিয়াছেন, তাই পূর্বাহ্নে প্রাথমিক শুনানীতেই আমারপক্ষে প্রদত্ত রুল খারিজ হইয়া যায় এবং আমি ১৪ ই সেপ্টেম্বর মুক্তি লাভ করি।ঐদিনই আমার প্রাণপ্রতিম অনুজ মোহাম্মদ আমীরুজ্জামানের শুভবিবাহ সম্পন্নহয়। পাত্রী জনাব নূরুল আমিনের কন্যা হাসিনা।