মূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধ আন্দোলন

ফন্ট সাইজ:

     পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রতিনিধিবর্গ এই সভায় খাদ্যও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধ আন্দোলনে পূর্ন সমর্থন ও সহানুভূতি জ্ঞাপনকরে বটে, তবে পার্টি সভাপতি মাওলানা ভাসানীর অনুমতির অপেক্ষায় থাকেন এবংমাওলানা ভাসানীর অনুমতি আর  আসে নাই। ১৯৬৩ সালে আইউব-ভাসানি সাক্ষাৎকারেরপর হইতে মাওলানা প্রকৃত পক্ষে সরকার বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণেতীব্র অনীহা প্রকাশ করিতেন এবংকালক্রমে ঘটনাস্রোতে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিপ্রেসিডেন্ট আইউব খানের গদি রক্ষায় সহায়ক শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে

     প্রেসিডেন্টআইউব খানের বিচক্ষণ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর সিদ্ধান্তেপরিচালিত পররাষ্ট্রনীতি একই সঙ্গে দুই কমিউনিষ্ট দৈত্য মহাচীন ও সোভিয়েটরাশিয়ার বন্ধুত্ব অর্জনে সমর্থ হয়। সাম্রাজ্যবাদী সামরিক চুক্তি ও জোট বদ্ধহওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান কাশ্মীর সমস্যা সমাধান প্রশ্নে কমিউনিষ্টমহাচীনের প্রকাশ্য সমর্থন পায় এবং ভারতের অন্ধ বন্ধু সোভিয়েট রাশিয়াওকাশ্মীর সমস্যা প্রশ্নে পূর্বেকার কঠিন মনোভাব পরিহারকরিয়া নমনীয় মনোভাবপ্রহণ করে। পররাষ্ট্রীয় নীতির আকস্মিকগতিশীলতা ও সার্বজনীনতা মার্কিনযুক্তরাষ্ট্র সরকারকে ক্ষুব্ধ করিয়া তোলে। ১৯৬৭ সালের ৮ই মে মস্কো রেডিওইংরেজী টিকা ভাষ্যে ঘোষণা করে, ‘পাকিস্তান কর্তৃক মার্কিনী ফরমাবরদারী হইতেমুক্ত স্বাধীন ও বাস্তবধর্মী বৈদেশিক নীতি গ্রহণের দরুন মার্কিন সরকারনানাপ্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করিতেছিল। ইতমধ্যে অকুটনীতি সুলভকার্যকলাপের দরুন পাকিস্তান সরকার মার্কিন সরকারের নিযুক্ত মাসত খুই, ম্যাকডোনাল্ড, কিং ও জেলবার্টকে পাকিস্তান হইতে বহিষ্কার করিয়া দেন।মার্কিন সরকারের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (C.I.A)  পূর্ব পাকিস্তানের শেখমুজিবকে লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়নের স্বপক্ষে সাহায্য করিতেছে এবং কোনএকটি রাজনৈতিক দলের সহিত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করিতেছে। শুধু তাহাই নয়, ইহার ঘোষণাপত্র প্রকাশ করিবার জন্য ষাট লক্ষ টাকা সাহায্য দিয়াছে।’

     উল্লেখ্যযে, ১৯৬৭ সালের ১৬ই মার্চ রেডিও পিস এন্ড প্রগ্রেস, মস্কোর ঘোষণা পত্রেওঅনুরূপ বক্তব্য শোনা গিয়াছিল। বলাই বাহুল্য যে, মস্কো রেডিও কথিত এইরাজনৈতিক দল ও ঘোষণাপত্র হইতেছে ছয় দফা ও শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বেপরিচালিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক পেশোয়ারসামরিক ঘাঁটি গুটাইয়া দেওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সরকার স্ব-স্বদৃষ্টিভঙ্গী হইতে পূর্ব পাক আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে নানাভাবে বিশেষ করিয়াআর্থিক সাহায্য মারফত শক্তিশালী করিবার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়। পরিস্থিতির এইক্রন্তিলগ্নে আওয়ামী  লীগকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা (সি,আই,এ) এরফরমাবরদার আখ্যা দান করিয়া সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী কোন কোন মহল স্বীয় কর্তব্যসমাধা হইয়াছে মনে করিয়া আত্মতৃপ্তি  লাভ করে এবং প্রেসিডেন্ট আইউব খানেরপররাষ্ট্রনীতি অভিনন্দন যোগ্য পরিবর্তনের জয়ধ্বনিতে মশগুল হইয়া পড়ে। তারপরজনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন প্রকট সমস্যা সমাধানেগণআন্দোলনে নেতৃত্ব না দিয়া মার্কস, লেনিন ও মাও সেতুং-এর বক্তব্যকেন্দ্রিক তর্ক-বির্তকে অনাহূত কালক্ষেপণ করিতে থাকে এবং প্রগতির লেবাসপরিধান করিয়া গণশক্তি হইতে শত ক্রোশ দূরে থাকিয়া সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীসংগ্রামী শক্তি আত্মপ্রসাদ লাভ করিতেছি। বলাই বাহুল্য যে, তাঁহার মূলতঃজনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার ও বহুদলীয় রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। তাহারা একদলীয়একনায়কত্বে বিশ্বাসী। তাই চীন-রাশিয়া বন্ধুত্বের ক্ষীণ-রশ্মি অবলোকনেইতাহারা জনতার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা আন্দোলন ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারঅর্জন আন্দোলনকে ছুরিকাঘাত করিয়া স্বীয় দলীয় মোঃ তোয়াহা, মোজাফফর আহমদ, আসহাবউদ্দিন প্রমুখের উপর হইতে গ্রেফতারী পরোয়ানা প্রত্যাহার হাসিলেআত্মনিয়াগ করে। আদর্শ সংক্রান্ত সংঘাতের ইহাই স্বাভাবিক পরিণতি, বাদবাকীব্যতিক্রম মাত্র। এই কারণেই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির খাদ্য ও দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধ আন্দোলনে যোগদানে বিরত থাকাটা বিস¥য়কর কিছু ছিল না।উল্লেখ্য যে, এই সময়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সর্বদলীয় কোন আন্দোলনেঅংশ গ্রহণ না করিয়া একলা চল নীতি গ্রহণ করে।

খাদ্য দাবী দিবস

     এইদিকেসর্বদলীয় খাদ্য ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধে অংশগ্রহণ কমিটি ২২শে মে (১৯৯৬) ‘‘খাদ্য দাবী দবিস’’ পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।তদানুযায়ী ঢাকারপল্টন ময়দানে জনসভা আহবান করা হয়। পূর্বেই ঘোষণা করা হয় যে, জনাব আতাউররহমান খান এই সভায় সভাপতিত্ব করিবেন। ইতিমধ্যে ২০শে মে (১৯৯৬) পাকিস্তানসরকারের স্বরাষ্ট্র বিভাগীয় ডেপুটি সেক্রেটারী রিওয়ালপিন্ডি হইতে এক আদেশবলে জনাব আতাউর খানকে রাজনৈতিক দল বিধির ৮-ক ধারার ১ উপধারা (Subsection of Section 8A of the political parties Act) মোতাবেক আদেশ প্রাপ্তির তারিখহইতে ছয় মাস অবধি কোন জনসভা, সাংবাদিক সম্মেলনে ভাষদান ও বিবৃতি দান হইতেবিরত থাকিতে বলেন। আতাউর রহমান খান ২১শে মে উক্ত  আদেশপত্রের  এক কপিরাখেন। তড়িঘড়ি কমিটির সভা আহবান করা হয়। আদেশ লংঘন প্রশ্নে তীব্র মতবিরোধদেখা দেয়। অবশেষে সিদ্ধান্তের ভার আতাউর রহমান খানের উপরেই ন্যস্ত হয়।

     ২২শেঅপরাহ্নে পল্টন ময়দানে আহূত জনসভায় বিপুল জন সমাগম হয়। আইউব-মোনায়েমেরঅন্যায় আদেশকে উপেক্ষা করিয়া সভায় সভাপতির ভাষণ দিতে আমি অনুরোধ করিলেপ্রবল ঝড়বৃষ্টির মধ্যে তিনি ভাষণ দান করেন। পরিতাপের বিষয়, ২২শে মেসন্ধ্যার পর বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার সংবাদদাতা ও সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধিকেটেলিফোনযোগে তিনি ভাষণদান খবরটি বেমালুম অস্বীকার করেন। নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গেরখবরটি তিনি যখন আমতা আমতা করিয়া অস্বীকার করিতেছিলেন; আমি তখন স্বয়ং তাহারসম্মুখস্থ সেক্রেটারিয়েট টেবিলটির পার্শ্বে বসা। দুর্ভাগ্য, স্বকর্ণেইতাহার ভুল তথ্য পরিবেশন শুনিতে হইল। আমি মর্মাহত ও বিস্মিত হইলাম। ঘটনাবলীবিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, তাহার গণমুখী হইবার প্রবল আকাঙ্খা আছে কিন্তু চরমমুহূর্ত মোকাবিলাকরিবার সৎ সাহস নাই। (ক) ১৯৪৯ সালে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকতআলী খান ঢাকা অবস্থানকালে খাদ্য মিছিল পরিচালনার অপরাধে আওয়ামী মুসলিম লীগনেতৃবর্গ গ্রেফতার হইলে, তিনি শিলং অধ্যয়নরত সন্তানদের সঙ্গ দিতে ঢাকাত্যাগ করেন, (খ) ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী ভয়াল রূপ দেখিবার পূর্বেইমামলা সংক্রান্ত কাজে ঢাকা ত্যাগ করিয়া ময়মনসিংহ গমন করেন, (গ) ১৯৭০ সালেস্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া ১৯৭১ সালে অনুরূপ ভূমিকা গ্রহণ করেন এবং (ঘ) মুজিবআমলে ১৯৭৪ সালের ৩০শে জুন সরকার বিরোধী কমিটি অব এযাকনশনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গেরঅপরাধে আমাদের গ্রেফতার করা হইলে-তিনি কোনরূপ উচ্চবাচ্য করেন নাই। এমন কিস্বীয় প্রেস কনফারেন্সেআমাদের নামোল্লেখ করিতেও সাহস পান নাই, (ঙ) ১৯৭৫সালে মুজিব এক দলীয় শাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে বাকশাল গঠন করিলে তিনি বাকশালে যোগদিতেও দ্বিধাবোধ করেন নাই।

যাহা হউক, পরবর্তী কর্মসূচীগ্রহণকল্পে কমিটির বৈঠক আহবান করা হইল। জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানাআবদুর রহিম বলিলেন ‘‘মন্দ আইনকে মন্দ বলিব কিন্তু আইন ভঙ্গ করিব না।’’ অন্যান্য দক্ষিণপন্থী দলীয় প্রতিনিধিবৃন্দও একই বক্তব্যের প্রতিধ্বনিকরেন।ফলে সভার সামগ্রিক আবহাওয়ার মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। সক্রিয় গণআন্দোলনেরকোন কর্মসূচী গ্রহণের সম্ভাবনা তিরোহিত হয়। বস্তুতঃ আলাপ-আলোচনার আসরজমাইয়া গণআন্দোলন হয় না। সরকারী ভ্রান্ত নীতির প্রতিবাদে সরকারের সহিতসংঘাত-সংঘর্ষের মাধ্যমেই ধীরে ধীরে আন্দোলন গণআন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে।গণআন্দোলন গণ ঐক্য, গণ প্রতিবাদই জালেম সরকারের সমুচিত জওয়াব দিতে পারে, অন্যথায় জালেম শাহী জগদ্দল পাথরের ন্যায় অনড় হইয়া স্থায়িত্ব পায়।

আমাদের শ্রমিক সমাজ

     পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী লীগ ছয় দফা আদায় উদ্দেশ্যে ৭ই জুন হরতাল ঘোষণা করে। এইহরতালে শ্রমিক শ্রেণী সক্রিয় অংশগ্রহণ করায় গণআন্দোলনে এক নূতন ডাইমেনশনযুক্ত হয়। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন হইতে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সরকার বিরোধীআন্দোলনে সাধারণতঃ ছাত্র সমাজ ও সমস্যা জর্জরিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীই সক্রিয়অংশগ্রহণ করিয়াছে। স্বীয় মুজুরী বৃদ্ধি, বোনাস বা ভাতা আদায় ইত্যাদিঅর্থনৈতিক দাবী আদায়ের মধ্যে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল; কোনব্যাপক রাজনৈতিক আন্দোলনে তাহাদের উল্লেখযোগ্য কোন ভূমিকা ছিল না।

     প্রসঙ্গক্রমেগোটা শ্রমিক আন্দোলনের পূর্বাপর একটি সাংগঠনিক আলোকচিত্র আমার সীমাবদ্ধজ্ঞানমতে তুলিয়া ধরা প্রয়োজন বোধ করিতেছি। কমিউনিস্ট পার্টি সদস্য কমরেডঅনিল মুখার্জী ও কমরেড নেপাল নাগের সক্রিয় সহায়তায় আন্তর্জাতিকখ্যাতিসম্পন্ন ডক শ্রমিক নেতা আফতাব আলী ও কলিকাতার খিদিরপুর শ্রমিক নেতাএডভোকেট ফয়েজ আহমদ ১৯৪৮ সালে ‘পূর্ব পাকিস্তান ফেডারেশন অব লেবার’ গঠনকরেন। জনাব আফতাব আলী ও জনাব ফয়েজ আহমদ যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকনির্বাচিত হন।

১৯৫৬ সালে মজদুর ফেডারেশন গঠিত হয় এবং ১৯৫৮ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারী নিম্নলিখিত ব্যক্তিবর্গ ইহার কর্মকর্তা নির্বাচিত হনঃ

মোহাম্মদ তোয়াহ সভাপতি

এডভোকেট এম, এ জব্বার (খুলনা)সহ-সভাপতি

এ, আর, সুন্নামাত (ঢাকা) ’’        ’’

হারুনুর রশিদ চৌধুরী (চট্টগ্রাম) ’’        ’’

কাজী মহিউদ্দিন আহমদ সম্পাদক

হাবিবুর রহমান সাংগঠনিক সম্পাদক

১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তান মজদুর ফেডারেশন পাকিস্তান মজদুর ফেডারেশন (ইস্ট জোন) নামে নিম্নোক্ত কর্মকর্তাসহ পুনর্গঠিত হয়ঃ

এ, আর সুন্নামাত সভাপতি

কাজী মহিউদ্দিন সহ-সভাপতি

দেওয়ান সিরাজুল হক ’’        ’’

এম, এ , হাই ’’        ’’

খোন্দকার আবদুর হাই সম্পাদক

আশরাফ হোসেন সহ-সম্পাদক

শাহ আবদুল হালিম ’’        ’’

১৯৬৪সালে পাকিস্তান মজদুর ফেডারেশন (ইস্ট জোন) দুই ভাগে বিভক্ত হয। ইহারএকভাগে এ, আর, সুন্নামাত ও দেওয়ান সিরাজুল হক যথাক্রমে সভাপতি ও সম্পাদকএবং আশরাফ হোসেন, রুহুল আমীন ভূঁইয়া ও মোহাম্মদ এজাজ সহ-সম্পাদক ও আনিসুররহমান সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এইঅংশ ‘বাংলা মজদুর ফেডারেশন’ নাম গ্রহণ করে। পাকিস্তান মজদুর ফেডারেশনের (ইস্ট জোন) অন্য অংশের সভাপতি ও সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে খন্দকার আবদুল হাই ওশাহ আবদুল হালিম। তাঁহারা ১৯৭১ এর মুক্তি আন্দোলন বিরোধী ছিরেন; কিন্তুবাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পর সংগঠনের নাম রাখেন ‘বাংলাদেশ মজদুর ফেডারেশন’’।

১৯৬৬সালে মার্কসীয় দর্শন ভাবাপন্ন শ্রমিক নেতৃবৃন্দ পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিকফেডারেশন গঠন করেন। জনাব মোহাম্মদ তোয়াহা ও সিরাজুল হোসেন খান যথাক্রমেসভাপতি ও সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে সভাপতি মোহাম্মদ তোয়াহা ও যুগ্মসম্পাদক হাবিবুর রহমান শ্রমিক ফেডারেশন হইতে পদত্যাগ করেন। ১৯৭০ সালে পূর্বপাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশন কমরেড কাজী জাফর আহমদ ও চট্টগ্রামের শ্রমিকনেতা কমরেড আবুল বাশারের নেতৃত্বে দ্বিধাবিভক্ত হয়। উক্ত বিভক্তির পিছনেব্যক্তিনেতৃত্বের অভিলাষ ও মার্কসীয় দর্শনে বিশ্বাসী কমিউনিষ্টদের তত্ত্বগতমতভেদ সমভাবেই কাজ করিয়াছে।

শ্রমিক আন্দোলন বহুধা পথে সংগঠিতহয় বটে তবে অবস্থার বিপাকে শ্রমিক শ্রেণী ক্রমশঃ রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িতহইয়া পড়ে । বাংলা ভাষভাষীশ্রমিক সম্প্রদায়

আওয়ামী লীগ পরিচালিত ছয় দফা তথা বাংলার স্বাধীকার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করিয়া অশেষ ত্যাগ স্বীকার করে।

৭ই জুন প্রস্তুতি

     দেশেরআনাচে কানাচে ছয় দফার বাণী পৌঁছাইয়া দেওয়ার প্রয়াসে শেখ মুজিবর রহমানবিভিন্ন জেলা সদরে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দিতে লাগিলেন। ক্ষিপ্ত গভর্ণরমোনায়েম খান বক্তৃতার কোন কোন অংশকে আপত্তিকর নির্ধারিত করিয়া পেনাল কোডেরবিভিন্ন ধারায় বিচারের জন্য তাহাকে গ্রেফতারের আদেশ দেন। ১৯৬৬ সালের ২০শেমার্চ ঢাকার পল্টন ময়দানে বক্তৃতার জন্য খুলনা হইতে ঢাকা আগমন পথে ২১শেএপ্রিল যশোর জেলা শহরে গ্রেফতার, যশোর দায়রা জজ কর্তৃক জামিনমঞ্জুর;ময়মনসিংহে বক্তৃতার অপরাধে পুনঃ সিলেট জেল গেটে গ্রেফতার এবংময়মনসিংহ দায়রা জজ কর্তৃক জামিন মঞ্জুর প্রাপ্ত হন। এইভাবেই শেখ মুজিবররহমানের পুনঃ পুনঃ গ্রেফতার এবং দৈনিক ইত্তেফাককে নিরবচ্ছিন্নপ্রচার-অভিযান পূর্ব পাকিস্তানে সর্বশ্রেণীর শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবী, চাকুরীজীবী, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি মহলে তীব্র আলোড়ন ওযুগান্তকারী আবেদন সৃষ্টি করে। ১৯৬৬ সালের ৮ই মে নারায়নগঞ্জে আয়োজিত জনসভায়পার্শ্ববর্তী শিল্প এলাকা হইতে সহস্য সহস্র মেহনতি শ্রমিক যোগদান করে এবংছয় দফার প্রবক্তা শেখ মুজিবর রহমানকে পাটের মালায় ভূষিত করে। পাটকল শ্রমিকশ্রেণী হইতে আওয়াজ শুনা যায় আপোষহীন সংগ্রামের। নারায়ণগঞ্জ জনসভা হইতেপ্রত্যাবর্তনের পরই ১৯৬৫ সালে দেশরক্ষা আইনের ৩৪ ধারায় ঢাকায় স্বীয় বাসভবনহইতে ৮ই মে রাত্রিতে শেখ মুজিবর রহমান গ্রেফতার হন এবং ১৯৬৮ সালের ১৭ইজানুয়ারী মুক্তির আদেশ পান বটে তবে কারাগার ফটকে তাহাকে আগরতলা ষড়যন্ত্রমামলার প্রথম ও প্রধান আসামী হিসাবে পুনরায় গ্রেফতার করা হয় এবং ঢাকাক্যান্টনমেন্টে স্থানান্তরিত করা হয়। শেখ মুজিবর রহমানকে গ্রেফতারেরপ্রতিবাদে ১৩ই মে (১৯৬৬) ঢাকার পল্টন ময়দানে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।

     এইদিকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ সভাপতি মাজহারুল হক বাকী; ময়মনসিংহ জিলাআওয়ামী লীগ সম্পাদক রফিকউদ্দিন ভূইয়া ও শ্রমিক নেতা আবদুল মান্নান সক্রিয়কর্মসূচী নিতে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে চাপ দিতে থাকেন। ফলে আওয়ামী লীগ ৭ইজুন (মঙ্গলবার) সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে সাধারন হরতাল পালনের ডাক দেয়। এইসময়ে চটকল শ্রমিক ফেডারেশন, মোঃ তোয়াহার নেতৃত্বে পরিচালিত পূর্ব পাকিস্তানশ্রমিক ফেডারেশন; আফতাব আলী, ফয়েজ আহমদ পরিচালিত পূর্ব পাকিস্তান ফেডারেশনঅব লেবার বিভিন্ন শিল্প এলাকায় হরতাল বিরোধী সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।ব্যতিক্রম ছিল পাকিস্তান মজদুর ফেডারেশন (ইস্ট জোন)। এই সংগঠন ৪ঠা জুনেরকেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে কোনপ্রকার সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করিয়া ‘‘অবস্থাভেদে ব্যবস্থা গ্রহণ নীতি’’ অবল¤¦নে শাখা কমিটিগুলি নির্দেশ দানকরে। আমার ধারণা, ইহার দ্বারা ৬ দফা দাবীতে আহুত হরতাল কর্মসূচী বহুলভাবেউপকৃত হয়। মজদুর ফেডারেশনের অন্তর্ভূক্ত আঞ্চলিক তেজগাঁও ট্রেড ইউনিয়নএসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমীন ভুইয়া ৫ই জুন কার্যকরী কমিটির সভাআহবান করেন। শাখা সংগঠন সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান হরতাল পালনের বিরুদ্ধে রায়দিলেন। কিন্তু সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমীন ভুইয়া ৬ই জুন তেজগাও আঞ্চলিকশাখাভুক্ত প্রত্যেক ইউনিয়ন হইতে দুইজন প্রতিনিধি স¤¦লিত এক সম্প্রসারিতশ্রমিক বৈঠক আহবান করেন। সভায় বিভিন্ন বক্তা আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবর রহমানবিরোধী বক্তব্য রাখিলেও অবশেষে রাত্রি দেড় ঘটিকায় আইউব-মানায়েম সরকারেরজুলুম এবং কলকারখানার মালিক শ্রেণীর অত্যাচারের প্রতিবাদে ৭ইজুন রোজমঙ্গলবার হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। শ্রমিকদের মুজিব বিরোধীমনোভারের কারণ অবশ্য ছিল। ১৯৫৬-৫৭ সালে শ্রমমন্ত্রী থাকাকালে শেখ মুজিবররহমান শ্রমিকদের দাবীনামা গ্রহণের পরিবর্তে হাবিব ম্যাচ ফ্যাক্টরীর শ্রমিকপ্রতিনিধিসহ শ্রমিকদিগকে পুলিশ মরাফত ট্রাকে করিয়া জয়দেবপুর জঙ্গলে ছাড়িয়াদিবার ব্যবস্থা করেন।

৭ই জুনের ঘটনাবলী 

     ৭ইজুন ঢাকা শহরে হরতালের প্রথম বেলায় বিশেষ কোন সক্রিয় সাড়া জাগাইতে পারেনাই।কিন্তু সমগ্র পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়া যায় তেজগাও শিল্প এলাকারমর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া। সকাল ৮ ঘটিকার দিকে তেজগাঁয়ে অবস্থিতকোহিনূর কেমিক্যাল কোঃ (তিব্বত) ও হক ব্রাদার্স কোঃ সম্মুখস্থ রাজপথেরপূর্ব পার্শ্বে অবস্থিত একটি চায়ের দোকানে ধর্মঘটী শ্রমিক দল চা-নাস্তাগ্রহণকালে একজন শ্রমিক সাইকেলে তথায় আসিলে দোকানে উপবিষ্ট শ্রমিকদের একজনসাইকেলের হাওয়া ছাড়িয়া দেয়। এমনি আপোষী দৃশ্যে হাসি-কৌতুকের হিল্লোড় বহিয়াযায়। হঠাৎ হরিষে বিষাদ সৃষ্টি করে একটি পুলিশ জীপের আগমন। পুলিশ জীপে আগতপুলিশ শ্রমিকদিগকে লাঠিপেটা আরশভ করে, শুরু হয় পাল্টা শ্রমিক প্রতিরোধ।অসহিষ্ণু পুলিশের রিভলবারের গুলীতে তিনজন শ্রমিক গুলীবিদ্ধ হয়। উক্তগুলীবিদ্ধ তিন জনের মধ্যে সিলেট জেলা নিবাসী বেঙ্গল বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজেরশ্রমিক মনু মিয়া ঘটনাস্থলে শাহাদৎবরণ করেন।

উক্ত হৃদয় বিদারকঘটনার পর তেজগাও শিল্পাঞ্চলের সহস্র সহস্র শ্রমিক লাঠি হাতে মিছিল সহকারেপথে বাহির হইয়া পড়ে। মিছিল তেজগাও রেলওয়ে ক্রসিং অতিক্রমকারে উত্তর দিকহইতে আগাম ট্রেনকে পথিমধ্যে থামাইয়া দেয়।ট্রেনটি পুনঃ চালাইবার চেষ্টাকরিলে উহা আইনচ্যুত হইয়া যায়। ঘটনার অব্যবহিত পরই পুলিশ ও ইস্ট পাকিস্তানরাইফেলস (ইপিআর) এর সশস্ত্র বাহিনী রেল লাইনের পশ্চিম দিক হইতে রেল লাইনেরপূর্ব দিকে অবস্থানরত শ্রমিক মিছিল ছত্রভঙ্গ করিবার প্রয়াসের কয়েক রাউন্ডফাকা গুলী ছোড়ে। এমতাবস্থায় আকিস্মিকভাবে নোয়াখালী জেলা নিবাসী আজাদ এনামেলএন্ড এলোমিনিয়াম কারখানার ছাটাইকৃত শ্রমিক আবুল হোসেন পায়ে গুলীবিদ্ধ হয়।ইহাতে উত্তেজিত হইয়া আহত আবুল হোসেন বীরদর্পে দাঁড়াইয়া সশস্ত্র বাহিনীকেতাহার বক্ষে গুলি করিতে আহবান জানায়।পুলিশের উদ্যত রাইফেলের নিমর্ম গুলিতাহার বক্ষকে বিদির্ণ করে। এইভাবেই ধরাশায়ী শহীদ আবুল হোসেন স্বীয় তপ্তশোনিতে মুক্তি সংগ্রামের মৃত্যূঞ্জয়ী ডাক লিখিয়া গেলেন। এই স্থানেই পুলিশেরপরবর্তী গুলিতে আরও ৫ জন শ্রমিক আহত হয়। প্রায় দুপুর ১২-৩০মিঃ এই নগ্নদমননীতি ও পাইকারী শ্রমিক-হত্যার প্রতিবাদে জারিকৃত ১৪৪ ধারা নিষেধাজ্ঞাঅমান্য করিয়া লাঠি হস্তে অকুতোভয় শ্রমিক জনতার মিছিল ধীর গম্ভীর পদক্ষেপেতেজগাঁও হইতে পাক মোটর এলাকা, হোটেল শাহবাগ, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনষ্টিটিউট, কমিশনার্স অফিস (বর্তমান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) অর্থাৎ সেগুন বাগিচার মোড়েউপস্থিত হয়। মিছিল পল্টন ময়দান মুখে অগ্রসর হইতে চেষ্টা করিলে সশস্ত্রপুলিশ ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস বাহিনী বাধাদান করে। বাধাপ্রাপ্ত জঙ্গীমিছিলটি হাইকোর্ট অভিমুখে রওয়ানা হয়।সময় তখন অপরাহ্ন দুই কি আড়াইটা।মিছিলের পূর্ব ও পশ্চিম দিকে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর বেস্টনি লক্ষ্য করিয়াবিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবৃন্দ মিছিলকারীগণকে কার্জন হল প্রাঙ্গনে সমবেত হইবারআহবান জানায়। অপরাহ্ন চার ঘটিকায় পল্টনে আহূত জনসভায় আওয়ামী লীগনেতৃবৃন্দের কাহাকেও না দেখিয়া বিহবল, হতাশ ও উদ্বিগ্ন মনে শ্রমিকগণছত্রভঙ্গ হইয়া স্ব-স্ব পথে তেজগাঁও অভিমুখেযাত্রা করে। প্রত্যাবর্তনকারীশ্রমিকদের ১শত ৫০জনকে পুলিশ রমনা, পাক মোটর, হোটেল শাহবাগ ও অন্যান্য স্থানহইতে গ্রেফতার করে। পরে ৯ই জুন রাত্রে সান্ধ্য আইন জারি কারিয়া তেজগাঁওয়েরনাখালপাড়া হইতে ৬০ জন শ্রমিককে গ্রেফতার করা হয়।