‘৭ই জুন ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব’

ফন্ট সাইজ:

     নারায়নগঞ্জ শহরে ৭ই জুন হরতাল উপলক্ষে কয়েক স্থলে পুলিশ-জনতা সংঘর্ষঘটে। সর্বশেষ বোস কেবিনের নিকট জনতা রেলওয়ে ওয়াগন লুট করিবার চেষ্টা নিলেপুলিশের গুলীতে ৬ জন মৃত্যুবরণ করে।ক্রুদ্ধ জনতা নারায়নগঞ্জ থানা আক্রমণকরে। তেজগাঁও, ঢাকা ও নারাণয়গঞ্জ শহরে পুলিশ-জনতা সংঘর্ষ ও পুলিশের গুলীতেনিহত হইবার সংবাদে উত্তেজিত লক্ষাধিক শ্রমিক-জনতা পোস্তগোলা, ডেমরা, নারায়ণগঞ্জ হইতে যাত্রাবাড়ী পৌঁছিলে সশস্ত্র পুলিশ ও ই,পি, আর বাহিনী বাধাদান করে।কর্তৃপক্ষ জনতাকে জানায় যে, ঢাকার পল্টন ময়দানে কোন জনসভা হইতেছেনা। সত্যতা যাচাইয়ের জন্য শ্রমিক নেতা সায়েদুল হক, নূর মোহাম্মদ ও শফি সহ ৫জনকে ঢাকার পল্টন ময়দানে পাঠানো হয়। শ্রমিক নেতৃবৃন্দ যাত্রাবাড়িপ্রত্যাবর্তন করিয়া জনশূণ্য পল্টন ময়দানের রিপোর্ট দিরে শোভাযাত্রীগণ ঢাকাগমন কর্মসূচী বাতিল করেন।এই ভাবে ই,পি, আর ও পুলিশ কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকনেতৃবৃন্দের সময়োপযোগী পদক্ষেপ আসন্ন প্রলয়কান্ড হইতে পরিস্থিতিকে রক্ষাকরে। উল্লেখ্য যে, ৭ই জুন দুপুর নাগাদ ঢাকা শহরের হরতাল ও জনসভা সম্পর্কেআলোচনা করিতে আমি স্ব উদ্যোগে পুরানা পল্টন আওয়ামী লীগ অফিসে গমনকরিয়াছিলাম। তথায় মিজানুর রহমান চৌধুরী, মিসেস আমেনা বেগম, এ,কে, রফিকুলহোসেন, গাজী গোলাম মোস্তফা ও সিরাজুল আলম খানের সহিত আমার আলোচনাও হইয়াছিল।৭ই জুন তেজগাঁও এবং নারায়নগঞ্জে পুলিশেষর গুলিবর্ষণের সংবাদে ঢাকা শহরস্তম্ভিত হইয়া পড়ে। হরতাল স্বতঃস্ফুর্তভাবে পালিত হয়। উৎসুক জনতা পল্টনময়দানে আওয়ামী লীগ নেতৃবর্গকে দেখিতে চায়। আমি বার বার যোগাযোগ করিয়াওতাহাদিগকে পল্টন ময়দানে লইয়া যাইতে সমর্থ হই নাই। বোধ হয় গভর্ণর মোনায়েমখানের ভয়াল মুর্তি কল্পনানেত্রে তাহাদিগকে আর্দশ স্থল হইতে শাসাইতেছিল। তাই৭ই জুন সরকারী হিসাবে ১০ জন নিহত হওয়া সত্ত্বেও নেতৃবৃন্দ কোন প্রতিবাদকর্মসূচী ঘোষণা করেন নাই। ৬দফা দাবী প্রতিষ্ঠার প্রথম পর্যায় এই অভিযানের (৭ই জুনের কর্মসূচীর) সাফল্য ও গৌরব তেজগাঁও, পোস্তগোলা, নারায়নগঞ্জ, ডেমরাও আদমজী নগর শিল্পাঞ্চলের সংগ্রামী, নির্ভীক ও সরল শ্রমিক শ্রেনীর অবশ্যপ্রাপ্য। ইতিপূর্বে আর কখনও এত ব্যাপক ও সংঘবদ্ধভাবে শ্রমিক শ্রেণীরাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে নাই।

     পাকিস্তান জন্মলগ্ন হইতেকেন্দ্রীয় সরকারের গণতন্ত্র বিরোধী, প্রভূত্বব্যঞ্জক ও বাঙ্গালী বিদ্বেষীরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পদক্ষেপগুলির বিরুদ্ধে বাংলাভাষাভাষী পূর্ব পাকিস্তানীদের মনের দিগন্তে পুঞ্জীভূত রোষ ধীরে ধীরেশাসকচক্রের অজান্তে ও অগোচরে প্রলয়ংকারী রূপধারণ করিতেছিল। ইহারই অসংগঠিত ওস্বতঃস্ফুর্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ৭ই জুন। ঐতিহাসিক যুগ সন্ধিক্ষণের যুগপরিবর্তনকারী অবশ্যম্ভাবী সংগ্রামের নির্ভীক অজেয় অগ্রণী সেনা মেহনতিশ্রমিক শ্রেণী শক্রকে চিহ্নিত করিতে সমর্থ হইয়াছিল। অদূর ভবিষ্যতে শাসকশ্রেণীর বিস্তর হাঁকডাক ও দম্ভের শোচনীয় পরাজয়ের সংকেতধ্বনি ছিল ৭ই জুনেরআন্দোলন। ১৩ই মে (১৯৬৬) পল্টন ময়দানের জনসভায় আওয়ামী লীগ নেতা জনাবজহিরুদ্দিন আহমদ তাহার ভাষণে সতর্কবাণী উচ্চারন করিয়া বলিয়াছিলৈন, ‘‘মহাত্মগান্ধী ও কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ হিন্দু-মুসলিম সমস্যা সমাধানকল্পে কায়েদে আযমমোহাম্মদ আলী জিন্নাহর চৌদ্দ দফা প্রত্যাখ্যান করায় ভারত দ্বিখন্ডিত হয়, তদ্রুপ ৬ দফা দাবী গ্রহণে পাকিস্তানী শাসকবর্গ ব্যর্থ হইলে পূর্ব পাকিস্তানএক দফা দাবী করিবে।’’ ইত্তেফাক বন্ধ

     ৬ দফা আন্দোলনপ্রচারে নিয়াজিত দৈনিক ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেনকে ১৫ই জুন গ্রেফতারকরা হয়। ১৬ই জুন দৈনিক ইত্তেফাকের মুদ্রাযন্ত্রদি নিউ নেশন প্রিন্টিংপ্রেসকে বাজেয়াপ্ত এবং দৈনিক ইত্তেফাক প্রকাশনার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করাহয়। দৈনিক ইত্তেফাক বাজেয়াপ্তকরণ আদেশের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় ঢাকাহাইকোর্ট সরকারী আদেশের বিরুদ্ধে রায় দিলে সরকার অর্ডিন্যান্সে প্রয়োজনীয়সংশোধন করিয়া পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনে দৈনিক ইত্তেফাকের মুদ্রাযন্ত্র দিনিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেসকে পুনরায় বাজেয়াপ্ত করে।  উল্লেখ্য যে, এই ৭ইজুনের ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে বেশির ভাগ আওয়ামী লীগ নেতাই গ্রেফতার হন।নেতৃবৃন্দ কারারুদ্ধ হইবার পর মহিলা সম্পাদিকা মিসেস আমেনা বেগম সংগঠনেরভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদিকা নিযুক্ত হয়। তাহার কঠোর পরিশ্রম ৬ দফাকেগণভিত্তি দিতে সমর্থ হয় এবং প্রতিকুল অবস্থার মধ্যে আওয়ামী লীগের পতাকাসমুন্নত থাকে।

এইদিকে এক ব্যক্তি শাসনের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিহইতে সমগ্র দেশকে মুক্ত করিবার উদ্দেশ্যে ও জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠারঐকান্তিক বাসনায় পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কাউন্সিল), পাকিস্তান নেজামে ইসলাম পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় গণতান্ত্রিকফ্রন্ট ঐক্য সংস্থা গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। জনাব আতাউর রহমান খানেরবাসভবনে অনুষ্ঠিত ৩০শে এপ্রিলের (১৯৬৭) সভায় নিম্নলিখিত ব্যক্তিবর্গেরসমন্বয়ে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট গঠিত হয়ঃ

জনাব নুরুল আমিন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট

জনাব হামিদুল হক চৌধুরী ’’          ’’      ’’

জনাব আতাউর রহমান খান ’’          ’’      ’’

জনাব মমতাজ দৌলতানা পাকিস্তান মুসলিম লীগ

জনাব তোফাজ্জল আলী ’’       ’’      ’’

সৈয়দ খাজা খায়ের উদ্দিন ’’       ’’      ’’

মাওলানা আবদুর রহিম ’’       ’’      ’’

অধ্যাপক গোলাম আযম ’’      ’’      ’’

নওয়াবজাদা নাসুরুল্লাহ খান পাকিস্তান আওয়ামী লীগ

আবদুস সালাম খান ’’        ’’      ’’

গোলাম মোহাম্মদ খান লুন্দখোর ’’        ’’      ’’

চৌধুরী মোহাম্মদ আলী পাকিস্তান নেজামে ইসলাম পার্টি

মৌলভী ফরিদ আহমদ ’’           ’’      ’’

এম, আর, খান ’’          ’’      ’’

পাকিস্তানডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট গঠন প্রশ্নে পূর্ব পাক আওয়ামী লীগ দুই ভাগে বিভক্তহইয়া যায়। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও আমেনা বেগমের (যথাক্রমে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি  ওভারপ্রাপ্ত সম্পাদিকা) নেতৃত্বে পরিচালিত আওয়ামী লীগ ও মাওলানা আবদুর রশীদতর্কবাগীশ (সভাপতি) ও রাজশাহীর মুজিবুর রহমান (সাধারন সম্পাদক)পরিচালিতআওয়ামী লীগ যথাক্রমে ৬ দফা আওয়ামী লীগ ও আট দফা আওয়ামী লীগ নামে পরিচিতিলাভ করে। ৬ দফা পূর্বেই দেওয়া আছে। পাঠকদের সুবিধার্থে ৮ দফা নিম্নে প্রদত্তহইলঃ

৮ দফা কর্মসূচী

১। শাসনতন্ত্রে নিম্নবিধানসমূহের ব্যবস্থা থাকিবেঃ

ক) পার্লামেন্টারী পদ্ধতির ফেডারেল সরকার

খ) ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র মোতাবেক প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত

আইন পরিষদের প্রাধান্য

গ) পূর্ণাঙ্গ মৌলিক অধিকার

ঘ) সংবাদপত্রের অবাধ আযাদী ও

ঙ) বিচার বিভাগের নিশ্চিত স্বাধীনতা

২। ফেডারেল সরকার নিম্নবিষয়সমূহের উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করিবেনঃ

ক) প্রতিরক্ষা (ডিফেন্স)

খ) বৈদেশিক বিষয়

গ) মুদ্রা ও কেন্দ্রীয় অর্থ ব্যবস্থা

ঘ) আন্তঃপ্রাদেশিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য এবং ঐকমত্যে নির্ধারিত অন্য যে

কোন বিষয়।

৩। পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন কায়েম করা হইবে এবং কেন্দ্রীয় বিষয় ছাড়াসরকারের অবশিষ্ট যাবতীয় ক্ষমতা শাসনতন্ত্র মোতাবেক স্থাপিত উভয় আঞ্চলিকসরকারের নিকটই ন্যস্ত থাকিবে।

৪। উভয় প্রদেশের মধ্যে বিরাজমান অর্থনৈতিক বৈষম্য ১০ বছরের মধ্যে দূর করা পাকিস্তান সরকারের শাসনতান্ত্রিক দায়িত্ব হইবেঃ

ক)এই সময়ে মধ্যে দেশরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয় ব্যয় এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎবৈদেশিক ঋণসহ কেন্দ্রীয় সরকারের দেনায় পূর্ব পাকিস্তানে ব্যয়িত অর্থেরআনুপাতিক অংশ আদায়ের পর পূর্ব পাকিস্তানে অর্জিত সম্পূর্ণ মুদ্রানিরংকুশভাবে এই প্রদেশেই ব্যয় করা হইবে।

খ) দুই অঞ্চলে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা প্রাদেশিক সরকারদ্বয়ের নিরংকুশ কতৃত্বাধীনেই থাকিবে।

গ)অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর না হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার বৈদেশিক সাহায্য ওঋণের ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানকে অগ্রাধিকার প্রদান করিবেন এবং এমন আর্থিকনীতি গ্রহণ করিবেন যাহাতে পূর্ব পাকিস্তান হইতে মূলধন পাচার সম্পূর্ণ বন্ধহইয়া যায়। এই উদ্দেশ্যে ব্যাংকের মওজুদ অর্থ ও মুনাফা, বীমার প্রিমিয়াম এবংশিল্পেরমুনাফা সম্পর্কে যথা সময়ে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করা হইবে।

৫। ক) মুদ্রা, বৈদেশিক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং

খ) আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য

গ) আন্তঃআঞ্চলিক যোগাযোগ

ঘ) বৈদেশিক বাণিজ্য

উপরোক্তবিষয়সমূহের প্রত্যেকটি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সমসংখ্যক সদস্য লইয়াগঠিত এক একটি বোর্ড দ্বারা পলিচালিত হইবে। জাতীয় পরিষদের প্রত্যেক প্রদেশেরসদস্যগণ নিজ প্রদেশের জন্য উক্ত বোর্ডসমূহের সদস্যগণকের নির্বাচন করিবেন।

৬।সুপ্রীম কোর্ট এবং কূটনৈতিক বিভাগসহ কেন্দ্রীয় সরকারের সকল বিভাগ ওস্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান পূবং ও পশ্চিম পাকিস্তানের সমসংখ্যক ব্যক্তিদ্বারা গঠিত হইবে। এই সংখ্যা সাম্য অর্জনের জন্য ভবিষ্যতে এমনভাবে কর্মচারীনিয়োগ করিতে হইবে যাহাতে ১০ বছরের মধ্যে তাহাদের সংখ্যা উভয় প্রদেশে সমানহইতে পারে।

৭। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে কার্যকরীসামরিক শক্তি ও সমর-সজ্জার ব্যাপারে উভয় অঞ্চলের মধ্যে সমতা বিধান করাপাকিস্তান সরকারের শাসনতান্ত্রিক দায়িত্ব হইবে। এই উদ্দেশ্যে -

ক) পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক একাডেমী, অস্ত্র নির্মাণ কারখানা, ক্যাডেট কলেজ ও স্কুল স্থাপন করিতে হইবে

খ) দেশরক্ষা বাহিনীর তিনটি বিভাগেই পূর্ব পাকিস্তান হইতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোক নিয়োগ করিতে হইবে।

গ) নৌ-বাহিনীর সদর দফতর পূর্ব পাকিস্তানে স্থানান্তরিত করিতে হইবে।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সমসংখ্যক সদসদ্য স¤¦লিত একটি ডিফে›স কাউন্সিলগঠন করা হইবে।

৮।এই ঘোষণায় ‘শাসনতন্ত্র’ শব্দ দ্বারা ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র বুঝায় যাহাঅবিল¤ে¦ জারি করা হইবে। এই শাসনতন্ত্র চালু করিবার ৬ মাসের মধ্যে কেন্দ্রীয়ও প্রাদেশিক আইন পরিসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। জাতীয় পরিষদের প্রথম  অধিবেশনেই এই কর্মসূচী ২ হইতে ৭ ন¤¦র দফাসমূহকে শাসনতন্ত্রে সন্নিবেশিতকরা হইবে।

উপরোক্ত লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নের জন্যপাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্তর্ভূক্ত সকল রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানঐক্যবদ্ধ এবং পৃথক পৃথকভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্যযে, পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্র্কিং কামিটি ২৩ শে আগষ্টের (১৯৬৭) বৈঠকেনি¤েœাক্তদের দ্বারা ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এডহক কমিটি’ গঠন করেঃ

১। মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ (পাবনা)    সভাপতি

২। মশিউর রহমান (যশোহর)সহ-সভাপতি

৩। মুজিবুর রহমান (রাজশাহী)সাধারণ সম্পাদক

৪। নুরুল ইসলাম চৌধুরী (ঢাকা)কোষাধ্যক্ষ

৫। আবদুস সালাম খান (ফরিদপুর)সদস্য

৬। মিয়া আবদুর রশিদ (যশোহর) ’’

৭। আবদুর রহমান খান (কুমিল্লা) ’’

৮। মতিউর রহমান (রংপুর) ’’

৯। রওশন আলী (যশোহর) ’’

১০। রহিমুদ্দি আহমদ (দিনাজপুর)  ’’

১১। সা’দ আহমদ (কুষ্টিয়া)  ’’

১২। আবদুর রউফ (কুষ্টিয়া)  ’’

১৩। এ, ডব্লিও, লকিউতল্লাহ (বরিশাল)  ’’

১৪। মোমেন উদ্দিন আহমদ (খুলনা)  ’’

১৫। আবদুর হাই (সিলেট)সদস্য

১৬। জালাল উদ্দিন আহমদ (সিলেট)  ’’

১৭। নুরুল হক (রংপুর)  ’’

১৮। আহমদ আলী (কুমিল্লা)  ’’

১৯। ডাঃসুলতান আহমদ (কুমিল্লা)  ’’

২০। দেওয়ান শফিউল আলম (ঢাকা)  ’’

২১। আবদুর রহমান চৌধুরী (দিনাজপুর)  ’’

২২। মনসুর আলী (পাবনা)  ’’

২৩। বি,এম, ইলিয়াস (বগুড়া)  ’’

২৪। জুলমত আলী (ময়মনসিংহ)  ’’

ইহার জবাবে ২৭শে আগষ্ট নিম্নোক্তদের লইয়া নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক কমিটি (৬ দফা) গঠন করা হয়ঃ

১। শেখ মুজিবুর রহমান (ফরিদপুর) সভাপতি

২। কামারুজ্জামান  (রাজশাহী)সাধারণ সম্পাদক

৩। নজরুল ইসলাম (ময়মনসিংহ) সদস্য

৪। মিজানুর রহমান চৌধুরী (কুমিল্লা)  ’’

৫। খন্দকার মোশতাক আহমদ (কুমিল্লা)  ’’

৬। মিসেস আমেনা বেগম (কুমিল্লা)  ’’

৭। আমজাদ হোসেন (পাবনা)  ’’

৮। সোহরাব হোসেন (যশোহর)  ’’

৯। হোসেন মনসুর (পাবনা)  ’’

১০। শাহ আজিজুর রহমান (কুষ্টিয়া)  ’’

১১। এ,বি,এম, নুরুল ইসলাম (ফরিদপুর)  ’’

১২। অধ্যাপক ইউসুফ আলী (দিনাজপুর)  ’’

১৩। আবদুল মালেক উকিল (নোয়াখালী)  ’’

১৪। নুরুল হক (নোয়াখালী)  ’’

১৫। বাহাউদ্দিন চৌধুরী (বরিশাল)  ’’

১৬। শামসুল হক (ঢাকা)  ’’

১৭। হাফেজ মুসা(ঢাকা) ’’

১৮। শেখ আবদুর আজিজ (খুলনা)  ’’

১৯। তাজউদ্দিন আহমদ (ঢাকা)  ’’

২০। আফজাল হোসেন (যশোহর)  ’’

২১। জাকিরুল হক (চট্টগ্রাম)  ’’

২২। মহিবুস সামাদ  (সিলেট)  ’’

২৩। মোহাম্মদুলাহ (নোয়াখালী)  ’’

ভুট্টোর অপসারণ

     ইত্যবসরেবিনাশর্তে পাক-ভারত যুদ্ধ অবসান বিরোধী পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলীভুট্টোকে প্রেসিডেন্ট আইউব খানের নির্দেশে ১৯৬৬ সালের ১৮ই জুন চিকিৎসারঅজুহাতে পদত্যাগ করিতে হয়। ইতিপূর্বে তাঁহাকে পাকিস্তান মুসলিম লীগের (কনভেনশন) সাধারণ সম্পাদক পদ হইতে অপসারণ করা হইয়াছিল। গণভোট অনুষ্ঠানমারফত কাশ্মীর সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত পাক-ভারত যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা ওতাসখন্দ শান্তিচুক্তি সম্পাদনের খেলাফে স্থির সংকল্প আপোষহীন বিরোধিতারদরুন জনাব ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানী জনসাধারণের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় হইয়াউঠেন। সোভিয়েট রাশিয়া ও কমিউনিস্ট চীনের সহিত সম্পর্কোন্নয়নের জন্য জনাবভুট্টোর বলিষ্ট ভূমিকা প্রগতিশীল ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী উদীয়মান ও  ক্রমবর্ধিষ্ণু বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করে।পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদ হইতে অপসারিত হইবার পর ১৯৬৭ সালের নভে¤¦রে জনাব ভুট্টোপাকিস্তান পিপলস পার্টি নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ১৯৬৫ সালেরপাক-ভারত যুদ্ধ শেষে পশ্চিম পাকিস্তানীদের ধূমায়িত বিক্ষোভ আইউব বিরোধীখাতে প্রবাহিত হয়এবং ইহাই রূপান্তরিত হয় ভুট্টোর রাজনৈতিক মূলধনে।

এন,ডি, এফ-এর নিস্ত্রিয়তা

     ইতিমধ্যেজাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট, পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কাউন্সিল), নেজামে ইসলামপার্টি নিস্কর্মা ক্ষমতালোভী নেতৃত্বসর্বস্ব দলে পরিণত হয়।যুব-ছাত্র-শিক্ষক সাধারণের বিশেষ কোন সমর্থন উক্ত দলগুলির পিছনে ছিল না।তদুপরি এই দলগুলি নিজেরাও প্রেসিডেন্ট আইউব খানের ডান্ডার ভয়ে নিস্ক্রিয়হইয়া বৈঠকী রাজনীতিতে মশগুল ছিল। অন্যদিকে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বেপরিচালিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি আইউবের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন সংগঠিত করিবারছিল বিরোধী। মোজাফফর আহমদ পরিচালিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির একাংশ জনগণহইতে বিচ্ছিন্ন একটি কর্মীসর্বস্ব মার্কসবাদীদল হিসাবে বিরাজ করিতেছিল।পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী অন্ধ ও গোড়া ভাবধারা ধারক ও বাহক। এই সময়ে শেখমুজিবর রহমানেরনেতৃত্বে পরিচালিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ জন সমর্থিত, যুব ছাত্র সম্প্রদায় সমর্থিত ও সাধারণ শ্রমিক শ্রেণী সমর্থিত সংগ্রামীসংগঠনে পরিনত হয়। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তান কোটায় ওপ্রাদেশিক পরিষদে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা প্রায় সবকয়টি আসনে নির্বাচিত হন। ফলে পরিষদের অভ্যন্তরে ও বাহিরেও আওয়ামী লীগএকমাত্র সংগঠিত দল হিসাবেই রাজনৈতিক মঞ্চে আবির্ভূত হয়। এইদিকে আওয়ামীলীগের ৬ দফা কর্মসূচী বিচ্ছিন্নতাবাদী, পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংহতি পরিপন্থীবলিয়া ঊর্ধ্বতন মহল উচ্চস্বরে চিৎকার করিতেছিল। তাই, সরকার আওয়ামী লীগকেনেক নজরে বরং বিষ নজরে দেখিত।

     জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টেরনিষ্ক্রিয় ভীরু ভূমিকা আমাদিগকে (আতাউর রহমান খান, নূরুল রহমান, আবদুর রবসেরনিয়াবাত, মফিজুল ইসলাম, দেওয়ান সিরাজুল হক, আবুল মনসুর আহমদ এবং আমি)অত্যন্ত চিন্তিত করিয়া তোলে। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত।এই কারণে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্তসাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী ও আবদুল মোমেন, রফিকউদ্দিন ভুইয়া, কে, এম, ওবায়দুর রহমান, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ সভাপতি ফেরদৌস আহমদ কোরেশী, সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক, মাজহারুল হক বাকী, সিরাজুল আলম খান বিভিন্নসময়ে বিভিন্ন গ্রুপে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করিতেন। তাহাদের মতে ৭দফা অর্থাৎদুই অর্থনীতির প্রবক্তাদের সহিত সকলের কাজ করা শ্রেয় ও বিধেয়। আমাদেরপ্রস্তাব ছিল, প্রথমে পি,ডি,এম ভুক্ত আওয়ামী লীগ, ইহার পর অপুনরুজ্জীবিতআওয়ামী লীগ ও তাহার পর জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মীদেরপর্যায়ক্রমে আওয়ামী লীগ ও তাহার পর জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিককর্মীদের পর্যায়ক্রমে আওয়ামী লীগভুক্ত করা। আওয়ামী লীগের (৬ দফা) প্রস্তাবছিল ১৯৬৪ সাল পূর্বেকার সাংগঠনিকরূপে ফিরিয়া যাওয়া। উভয় প্রস্তাব তেমন কোনতফাৎ ছিল না, কিন্তু ব্যক্তি নেতৃত্ব নিশ্চয়তা না পাওয়ায় এবং কারান্তরালেযাওয়ার ভয়ে নেতা আতাউর রহমান খান সম্মত হন নাই। জাতীয়তাবাদী সংগ্রামীনেতৃত্ব দ্বিধাবিভক্ত রহিয়া গেল।

ইতিমধ্যে পশ্চিম পাকিস্তান হইতেনেতৃবৃন্দ পূর্ব পাকিস্তানে নেতৃবৃন্দের সহিত কয়েক দফা বৈঠকে মিলিত হন; কিন্তু আইউব খানের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক বা আইন অমান্য কোনপ্রকার আন্দোলনকরিবার মত মানসিকতা তাহাদের ছিল না। আইউব খান তাহা জানিতেন, তাই তিনিতাহাদের বিশেষ গুরুত্ব দিতেন না। এইদিকে সরকার হইতে বিতাড়িত ফজলুল কাদেরচৌধুরী আমাদের সহিত রাজনৈতিক আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করেন; কিন্তু কোন প্রকারকার্যকর অংশগ্রহন হইতে বিরত থাকেন-কারণ জেল-ভীতি।