আগরতলা ষড়যন্ত্র

ফন্ট সাইজ:

     এমনিহতবুদ্ধিকর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ১৯৬৭ সালের মধ্য ডিসেম্বর ঢাকা নগরে জোরগুজব ছড়াইয়া পড়ে যে, পূর্ব পাকিস্তানকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো হইতে বিচ্ছিন্নকরিবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকিবার অপরাধে লেঃকমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন ওতাহার কতিপয় সহচরকে গ্রেফতার করা হইয়াছে। সকল জল্পনা-কল্পনা ও গুজবের অবসানঘটাইয়া সরকার ৬ই জানুয়ারী (১৯৬৮) এক প্রেসনোটে ঢাকাস্থ ভারতীয় ডেপুটিহাইকমিশনের প্রথম সচিবের (ফার্স্ট সেক্রেটারী) যোগসাজশে রাষ্ট্রবিরোধীষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকিবার অপরাধে ১৮ জন সামরিক, বেসামরিক ব্যক্তিকেগ্রেফতারের সংবাদ জনসমক্ষে প্রকাশ করেন। পুনঃ ১৮ই জানুয়ারী (১৯৬৮) একসরকারী প্রেসনোটে ঘোষণা করা হয় যে, রাষ্ট্রদ্রোহী ষড়যন্ত্রে জড়িত শেখমুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হইয়াছে। আগেই বলিয়াছি, শেখ সাহেব ১৯৬৬ সালের৮ই মে হইতে ঢাকা কেন্দ্রীয়  কারাগারে বিনা বিচারে আটক ছিলেন। ১৭ই জানুয়ারী (১৯৬৮) দিবাগত গভীর রাত্রে (আনুমানিক রাত১টায়) শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকাকেন্দ্রীয় কারাগার হইতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে স্থানান্তরিত করা হয়।

     ২১শে এপ্রিল (১৯৬৮) প্রেসিডেন্ট এক অর্ডিন্যান্স জারি করিয়া পাকিস্তান পেনালকোডের ১২১ ক ও ১৩১ ধারায় দোষীদের বিচার করিবার নিমিত্ত বিশেষ আদালত গঠনেরব্যবস্থা করেন। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার এক আদেশ বলে সুপ্রীম কোর্টেরপ্রধান বিচারপতি এস, এ, রহমান, ইস্ট পাকিস্তান হাইকোর্টের বিচারপতি মুজিবররহমান ও বিচারপতি মকসুমুল হাকিমের সমন্বয়ে বিশেষ আদালত গঠন করেন এবং অন্যএক আদেশ বলে কেন্দ্রীয় সরকার ঢাকা ক্যান্টনমেন্টকেই বিচারস্থল হিসাবে ঘোষণাকরে।  ৬ই জুন (১৯৬৮) গেজেটে ঘোষণা করা হয় যে, ১৯শে জুন ঢাকা ক্যান্টমেন্টসিগন্যাল মেস প্রাঙ্গণে বিশেষ আদলতে বিচার আরম্ভ হইবে। মামলা ‘আগরতলাষড়যন্ত্র মামলা’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ১৯শে জুনহইতে নিম্নলিখিত ৩৫ জন অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা আরম্ভ হয়ঃ

১।শেখ মুজিবুর রহমান, ২। লেঃকমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, ৩। স্টুয়ার্ড মুজিবররহমান ৪। এল, এস, সুলতানুদ্দিন আহমদ, ৫। এস, এস, সি, ডি, আই, নুর মোহাম্মদ।৬। আহমদ ফজলুল রহমান ,সি,এস,পি, ৭। ফ্লাইট সার্জেন্ট মফিজুল্লঅহ, ৮।প্রাক্তন করপোরাল আবুল বশার মোহাম্মদ আবদুস সামাদ, ৯। প্রাক্তন হাবিলদারদলিল উদ্দিন, ১০। ফ্লাইট সার্জেন্ট মোহাম্মদ ফজলুল হক, ১১। খন্দাকর রুহুলকুদ্দুস, সি, এস, পি, ১২। ভূপতি ভূষন চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী, ১৩। বিধানকৃষণ সেন, ১৪। সুবেদার আবদুর রাজ্জাক, ১৫। প্রাক্তন হাবিলদার ক্লার্কমুজিবর রহমান, ১৬। প্রাক্তন ফ্লাইট সার্জেন্ট মোহম্মদ আবদুর রাজ্জাক, ১৭।সার্জেন্ট জহুরুল হক, ১৮। প্রাক্তন, এ,টি, মোহাম্মদ খুরশীদ ১৯। খান এম, শামসুর রহমান সি, এস, পি, ২০। হাবিলদার এ, কে, এম, শামসুল হক, ২১। হাবিলদারআজিজুল হক, ২২। এস, এ, সি, মাহফুজুল বারী, ২৩। সার্জেন্ট শামসূল হক, ২৪।মেজর শামসুল আলম, ২৫। ক্যাপ্টেন মোঃ আবদুল মোত্তালেব, ২৬। ক্যাপেন্টন, এম, শওকত আলী, ২৭। ক্যাপ্টেন খন্দকার নাজমুল হুদা, ২৮। ক্যাপ্টেন এ, এন, এম, নূরুজ্জামান, ২৯। সার্জেন্ট আবদুল জলিল ৩০। মোহাম্মদ মাহবুবুদ্দিন চৌধুরী, ৩১। ফার্স্ট লেঃ এম, এস, এম, রহমান, ৩২। প্রাক্তন সুবেদার এ,কে, এম, তাজুলইসলাম, ৩৩। মোহাম্মদ আলী রেজা, ৩৪। ক্যাপ্টেন খুরশীদ উদ্দিন আহমদ, ৩৫।ফার্স্ট লেঃ আবদুর রউফ।

     মামলার বিবরণ প্রকাশেআদালত সাংবাদপত্রগুলিকে পূর্ন স্বাধীনতা দান করে। শেখ মুজিবর রহমান আগরতলামামলার প্রধান আসামী ছিলেন। প্রখ্যাত আইনজীবী আবদুস সালাম খান শেখ সাহেবেরমামলা পরিচালনা করেন এবং সরকার পক্ষে পরিচালনা করেন প্রাক্তনবৈদেশিকমন্ত্রী ব্যারিস্টার মনজুর কাদের, এডভোকেট টি, এইচ, খান, গ্রুপক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আসলাম, এডভোকেট করাচী, এ, আলীম, এডভোকেট, ঢাকা ও খাকনবাবর, এডভোকেট, লাহোর।

     আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগওছাত্রলীগ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে মিথ্যা মামলা বলিয়া গোড়া হইতেইকানাঘুষার আন্দোলন শুরু করেন। সাংগঠনিক শক্তির বলে এই প্রচার মোটামুটিকার্যকর বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছিল। তাই, ঢাকা নগরে বিভিন্ন সভায় মিছিলে, ‘জাগো জাগো বাঙ্গালী জাগো’ আওয়াজ উঠে। জাতীয়তাবাদী চেতানার উম্মেষ হইতেথাকে। যুব সম্প্রদায় যখন এইভাবে মাঠে এক ব্যক্তির শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামেলিপ্ত , তখন হুক্কাসেবী বৈঠকী রাজনীতির আড্ডা পাকিস্তান ডেমোক্রেটিকমুভমেন্ট (পি, ডি, এম) আসন্ন নির্বাচনে অংশ গ্রহণ না করিবার সিদ্ধান্তঘোষণা করে, অথচ একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে কোন প্রকার সক্রিয় আন্দোলন বাকর্মসূচী গ্রহণে বিরত থাকে।

নিম্নলিখিত দলিল আগরতলা মামলার বাস্তবতা প্রমাণ করে

     জনাবফয়েজ আহমদ একটি বই লিখেছেন। নাম ‘আগরতলা মামলা, শেখ মুজিব ও বাংলারবিদ্রোহ’। প্রকাশক মফিজুল হক। এই বইটির শেষ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত ‘পরিশিষ্ট-৭’ নীচে হুবহু উদ্ধৃত করা হলো।

আগরতলায় শেখ মুজিব সম্পর্কে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী

     ১৯৬৩ইং আমার ভাই এম এল এ শ্রী উমেশলাল সিং সমভিব্যাহারে শেখ মুজিবর রহমানেরসাথে ১০ জন ত্রিপুরার পালম জিলার খোযাই মহকুমা দিয়া আগরতলায় আমার আগরতলারবাংলোয় রাত্র ১২ ঘটিকায় আগমন করেন। প্রাথমিক আলাপ-আলোচনার পর আমার বাংলোবাড়ি হইতে মাইল দেড়েক দূরে ভগ্নী হেমাঙ্গিনী দেবীর বাড়িতে শেখ সাহেব আসেন।সেখানেই থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তারপরমুজিবুর ভাইয়ের প্রস্তাবঅনুযায়ী আমি আমাদের প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওয়াহের লাল নেহেরুর সাথে দেখাকরি। আমার সাথে ছিলেন শ্রী শ্রীরমণ, চীফ সেক্রেটারী। তাকে (শ্রীরমণকে) শ্রীভান্ডারিয়ার বিদেম সচিবের রুমে রাখিয়া প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করি। তিনিমুজিবুর হরমানকে ত্রিপুরায় থাকিয়া প্রচার করিতে সম্মত হন নাই। কারণ চীনেরসাথে লড়াইয়ের পর এতো বড় ঝুঁকি নিতে রাজি হন নাই। তাই ১৫ দিন থাকার পর তিনি (শেখ মুজিব) ত্রিপুরা ত্যাগ করেন। সোনামুড়া পশ্চিম ত্রিপুরারই এক মহকুমাকুমিল্লার সাথে সংলগ্ন। শেখ মুজিবুর রহমানকে সর্বপ্রকার সাহায্যেরপ্রতিশ্রুতি দেয়া হয়।

শ্রী শচীন্দ্রলাল সিংহ

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী

ত্রিপুরা

 

নেতৃবৃন্দের সহিত আলোচনা

     এইপরিস্থিতিতে ৮ই অক্টোবর (১৯৬৮) জনাব আতাউর রহমান খানের বাসভবনে আমরা পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী লীগ (৬ দফা) এর সৈয়দ নজরুল ইসলাম-ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, মিজানুর রহমান চৌধুরী-ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, মিসেস আমেনা বেগম-মহিলাসম্পাদিকা, আবদুল মান্নান ও আবুল কালাম, পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মস্কো)- কোষাধ্যক্ষ, মহিউদ্দিন আহমদ ও জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের আতাউররহমান খান, নুরুল রহমান ও আমিআগামী দিনের  আন্দোলনের নীল-নকশা প্রণয়নকল্পেএক বৈঠকে মিলিত হই। আমরা পি,ডি, এম-এর সিদ্ধান্ত পুংখানুপুংখভাবে আলোচনাকরি। আমি স্পষ্ট ভাষায় পি, ডি এম এর সিদ্ধান্তের সহিত দ্বিমত প্রকাশ করি।

     ৯ইঅক্টোবর (১৯৬৮) প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আবুল মনসুর আহমদের বাড়িতেআলোচনার সিদ্ধান্ত অনুসারে আমি ও জনাব নুরুর রহমান ১০ই অক্টোবর টাঙ্গাইলেপাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (পিকিং) সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খানভাসানির সহিত সাক্ষৎ করি। দীর্ঘ কয়েক ঘন্টা রাজনৈতিক আলোচনায় আমরা ঐকমত্যেপৌছি যে, জনগণের সার্বভৌমত্ব ও প্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠাকল্পেঅবিল¤ে¦ সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া অপিরিহার্য। দল মত নির্বিশেষে ঐক্যই সকলসংগ্রামের পূর্বশর্ত। সাধরণ নির্বাচন ঘোষণার পূর্বেই বন্যা নিয়ন্ত্রণপ্রশ্নে গণ আন্দোলন আরম্ভ করিবার  এবং আন্দোলনের কর্মসূচী গ্রহণের প্রস্তাবকরেন মওলানা ভাসানী। খাজনা বন্ধের মত উগ্র কর্মসূচীকে সাফল্যমন্ডিত করিতেযে সাংগঠনিক শক্তির প্রয়োজন তাহা বর্তমানে  নাই বিধায় সরকারী দমননীতিঅংকুরেই আন্দোলনকে বানচাল করিয়া দিবে বলাতে মওলানা বলেন যে, সামরিকবাহিনীতে আইউব খানের পূর্ব প্রতিপত্তি নাই, এমন কি জেনারেল হামিদ ও জেনারেলইয়াহিয়া খান আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী ব্যবহারে সম্মত হইবেন না।মওলানা আরো বলেন যে, এইসব বিষয়ে তাহার যোগাযোগ আছে; সুতরাং তিনি মনে করেন, গণ আন্দোলনের পর ইউনিয়ন কাউন্সিলনির্বাচনে বিরোধী শিবির জয়লাভ করিবে এবংপ্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আমাদের জয় অবধারিত।

     দিবালোকের ন্যায়স্পষ্ট হইয়া গেল যে, সশস্ত্র বাহিনীর এক অংশের আইউব বিরোধী মনোভাবের উপরনির্ভর করিয়া মওলানা ভাসানী এখন স্বচ্ছন্দে গণ-আন্দোলনে যোগ দিতে পারেন, কেননা তাহাতে বিপদ কম। উপসংহারে ন্যাপ (মস্কো) এর সহিত আলোচনায় বসিতে রাজীকিনা জানিতে চাইলে মওলানা বলেন যে, ঐক্যের খাতিরে সহযেগিতা করিতে তিনিপ্রস্তুত আছেন।

    যাহা হউক, আমাদের নিকট দেয় প্রতিশ্রুতি মোতাবেকমওলানা ভাসানী ঢাকা আসিলেন বটে, কিন্তু ১৩ই অক্টোবর (১৯৬৮) জনাব সাঈদুলহাসানের বাসভবনে জনাব নূরুর রহমান, দেলদার আহমদ ও আমার সহিত আলোচনাকালেন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিকে (মস্কো) প্রস্তাবিত সংগ্রাম পরিষদে গ্রহণ করিতেঅস্বীকৃতি জানইলেন। রাত ৯টায় জনাব আবুল মনসুর আহমদের বাসভবনে আতাউর রহমানখান আবুল মনসুর আহমদ, আবদুস সালাম খান, নুরুর রহমান, দেলদার আহমদ,জমিরউদ্দিন আহমদ ও আমি পুনরায় মওলানা ভাসানীর সহিত বৈঠকে মিলিত হই। আলোচনায়নিম্নবিষয়ে আমরা ঐকমত্যে উপনীত হইঃ

     ‘নির্বাচনী কলেজ’ নির্বাচনকেসরকার গঠন পদ্ধতির উপর গণভোট হিসাবে গণ্য করা হইবে। আমরা তাই আসন্ননির্বাচনী কলেজ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিব। ইহার পর প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় সংসদনির্বাচনে নির্বাচিত ইলেকটরেল কলেজ অংশগ্রহণ করিবে না। আওয়ামী লীগ (৬ দফা)এর সহিত ঐক্যফ্রন্ট গঠনে মওলানা ভাসানী সবিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন। এমনকিআওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মিজানুর রহমান চৌধুরী, মিসেস আমেনাবেগম ও মোল্লা জালালউদ্দিন আহমদের সহিত এতদমর্মে বৈঠকে বসিবার জন্যতাহাদের ঠিকানা পর্যন্ত চাহিলেন। কিন্তু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানাইয়া দিলেনযে, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মস্কো) সহিত ঐক্যফ্রন্ট গঠনের চূড়ান্তমুহূর্তে আমাদিগকে কিছুই জানিতে না দিয়া মওলানা ভাসানী ঢাকা ত্যাগ করিলেন।মনে হয়, পিকিং লবী আইউব বিরোধী আন্দোলন অর্থাৎ প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠনেরসংগ্রামের সায় দিতে পারে নাই। তাই, চূড়ান্ত মূহূর্তে আমাদের সকল প্রয়াসেব্যর্থতায় পর্যবসিত হইল।

কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিধাবিভক্ত

     ১৯৫৬সাল হইতে চীন-সোভিয়েট মত বিরোধ চলিয়া আসিতেছিল। ১৯৬৪ সালের ডিসে¤¦রে আহূতবিশ্ব কমিউনিস্ট পার্টি সম্মেলন খসড়া কামিটির বৈঠকের দিনই আন্তর্জাতিককমিউনিষ্ট আন্দোলনের ভাঙ্গনের দিন বলিয়া কমিউনিস্ট চীন ৩০শে জুলাই লিখিত একচিঠিতে সোভিয়েট ইউনিয়নকে জানায়। ইহার অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে বিভিন্ন দেশেকমিউনিস্ট পার্টি পিকিং গ্রুপ ও মস্কো গ্রুপে বিভক্ত হইয়া পড়ে। কমিউনিস্টচিন্তাধারার প্রভাবান্বিত ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ১৯৬৫সালের ফেব্রুয়ারীতে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনষ্টিটিউটে আহূত বার্ষিক সম্মেলনেজনাব রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (পিকিং) ওঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস ইকবাল হলের ছাদে অনুষ্ঠিত পুর্ব পাকিস্তানছাত্র ইউনিয়ন সম্মেলনে বেগম মতিয়া চৌধুরীর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রইউনিয়ন (মস্কো) গঠিত হয়। মস্কো-পিকিং মতদ্বৈততার এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিও দ্বিখণ্ডিত হয়; মস্কোপন্থী ন্যাপনেতৃবৃন্দ কাউন্সিল অধিবেশন আহবান করিবার দাবীতে সংগঠনের সভাপতি ভাসানীকেরিকুইজিশন পত্র বা অধিযাচন পত্র দেয়। সভাপতি মওলানা ভাসানী রিকুইজিশনপত্রের কোন উত্তর না দিয়া রংপুরে কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠান করেন ও শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে মস্কো সমর্থক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আলতাফ হোসেনসহ অন্যান্যনেতাকে সংগঠন হইতে বহিস্কার করেন। মস্কোপন্থী ন্যাপ নেতৃবৃন্দ ১৯৬৮ সালের১১ই ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত কাউন্সিল সভায় মোজাফফর আহমদকে সভাপতিনির্বাচিত করেন। ১১ই ডিসেম্বর কাউন্সিল অধিবেশনের পূর্বে ৮ই ডিসেম্বরপাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক ওসমানী ওখন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস আমার বাসভবস ৭ নং কলেজ স্ট্রীটে আমার সহিত দেখাকরেন এবং ন্যাপে যোগ দিতে অনুরোধ জানান। আমি উত্তরে তাঁহাদিগকে বলিয়াছিলাম, কমিউনিষ্ট প্রভাবান্বিত সংগঠনে জাতীয়তাবাদী ও গণতন্ত্রীদের যোগ দিবার কোনভিত্তি নাই। ইতিপূর্বে জনাব আতাউর রহমান খান ও নুন রহমান সাহেবকে স্পষ্টভাষায় জানাইয়া দিয়াছিলাম যে, ন্যাপ নেতৃবৃন্দের সহিত আমার আদর্শগত মৌলিকমতভেদ আছে, অতএব কোন ন্যাপগ্রুপের সহিত আমার যোগ দিবার প্রশ্নই উঠে না।ভলগা-ইয়াংসি নদীতে বৃষ্টি হইলে ঢাকার বুড়িগঙ্গার পাড়ে দাঁড়াইয়া আমার ছাতাখুলিবার সবিশেষ কারণ নাই। ন্যাপের সহিত আলোচনা সুতরাং তখনকার মত আর অগ্রসরহয় নাই।

ছাত্র শক্তির বিভক্তি

     ১৯৬৮সালের ফেব্রুয়ারী মাসে পাকিস্তান ছাত্র শক্তি ঘোষণাপত্র ও আন্দোলনেরকর্মসূচী সংশোধনের প্রশ্নে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সম্মেলনে দ্বিধাবিভক্ত হয়।আনিসুর রহমানকে সভাপতি এবং মোজাফফর হোসেন পল্টুকে সাধারণ সম্পাদক করিয়াএকটি কমিটি এবং ফজলুল হককে সভাপতি ও মোহাম্মদ হোসেন খানকে সম্পাদক করিয়াঅপর একটি কমিটি গঠিত হয়।

পশ্চিম পাকিস্তানের পরিস্থিতি

      পশ্চিমপাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সাধারণভাবে শান্ত ছিল। তবে আকস্মিক দমকাহাওয়া ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হইয়া প্রেসিডেন্ট আইউব খানের ক্ষমতার সমনদকেলণ্ডভণ্ড করিয়া তাঁহাকে রাজনৈতিক অঙ্গন হইতে চিরতরে বিদায় দেয়। এক ব্যাক্তিশাসন প্রতিষ্ঠায় প্রয়াসী ক্ষমতালোভীদের জন্য ইহা এক জ্বলন্ত সতর্কদৃষ্টান্ত।

     উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে অবস্থিত লাণ্ডিকোটালেছিল বিদেশ হইতে পাচারকৃত মালের বাজার। রাওয়ালপিন্ডি গর্ডন কলেজের ৭০ জনছাত্র কতৃক লান্ডিকোটাল হইতে বিদেশী মাল ক্রয় সংক্রান্ত অতি তুচ্ছ ঘটনাকেকেন্দ্র করিয়া ছাত্র ও প্রশাসন কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিরোধ বাঁধে। উল্লেখ্য, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের ক্রয়কৃত বিদেশী মাল বাজেয়াপ্ত করিয়াছিল। এইবিরোধের অল্প কয়েদিনের মধ্যেই ছাত্র-প্রতিবাদ আন্দোলন হইতে অপ্রিতিরোধ্যগণ-আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে। পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যানজুলফিকার আলী ভূট্টো সূচনা হইতে পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণের নিমিত্ত ছাত্রদেরপক্ষাবলম্বন করেন। ৭ই নভেম্বর ছাত্র-জনতা ও পুলিশের সংঘর্ষে পুলিশছাত্রদের উপর গুলিবর্ষণ করে এবং পুলিশের গুলীতে রাওয়ালপিন্ডিতে আবদুল হামিদনিহত হন। ফলে সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তানে গণ-আন্দোলনের বিস্ফোরণ ঘটে। এমনিঅবস্থায় ১০ নভেম্বর (১৯৬৮) পেশোয়ার জনসভায় ভাষণদানকালে প্রেসিডেন্ট আইউবখানের জীবন নাশের ব্যর্থ প্রচেষ্টা হয়। ইহার জওয়াবে আইউব খান ১৩ই নভেম্বর (১৯৬৮) জুলফিকার আলী ভুট্টোকে গ্রেফতার করেন।

আন্দোলনের নূতন দিক

     এইসময়ে সরকারের বিরুদ্ধে ছয় দফা ভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনে পূর্বপাকিস্তান এমনিতেই বিক্ষুব্ধ। পশ্চিম পাকিস্তানের এই ছাত্র-আন্দোলনের সহিতএকাত্মতা প্রকাশ করা হইবে কি হইবে না, এই প্রশ্নে সবাই দ্বিধান্বিত। এমনিঅস্বস্তিকর সন্ধিক্ষণে মওলানা ভাসানী মঞ্চে উপস্থিত হইলেন। জনাব আবদুসসেলিমের নেতৃত্বে পরিচালিত ঢাকা বেবী ট্রাক্সি ইউনিয়ন কর্তৃক ৬ই ডিসেম্বরহরতাল দিবসের অপরাহ্নে আহূদ পল্টন ময়দারে জনসভায় মওলানা ভাষানী প্রধানঅতিথির আসন গ্রহণ করেন এবং জনসভার পর মওলানা ভাষানীর পরিচালনায় এক বিক্ষোভমিছিল গভর্নর হাউসে গমন করে। বিক্ষোভ প্রদর্শনকালে পুলিশ লাঠিচার্জ করিয়াজনতাকে ছত্রভঙ্গ করিয়া দেয়। পুলিশী হামলার প্রতিবাদে ৭ই ডিসেম্বর হরতালপালনের আহবান জানানো হয়। ৮ই ডিসেম্বর হরতাল পালনকালে পুলিশের গুলীতে সিলেটেজনাব আবদুল হামিদ শাহাদাতবরণ করেন।

মওলানা ভাষানী কর্তৃক সৃষ্টঅশান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ৩০শে ডিসেম্বর (১৯৬৮) হাতিয়াদিয়ার পুলিশেরগুলীতে ৩জন নিহত হন ও নড়াইলেও পুলিশ গুলি চালনা করে। এইভাবেই ক্রমে ক্রমেপূর্ব পাকিস্তানে এক অসহনীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মস্কো), ছাত্র ইউনিয়ন (পিকিং) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ এগারদফাগ্রণয়ন করে এবং আন্দোলনের ডাক দেয়। আইউব-মোনায়েম সরকার সমর্থক জাতীয়ছাত্র ফেডারেশন (এনএসএফ) ১৯৬৮-৬৯ সালের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রসংসদের নির্বাচনে তৎকালীন মোহসীন হল, জিন্নাহ হল ও ঢাকা হল সংসদের শতকরাপ্রায় ১০০ ভাগ এবং ফজলুল হক হল সংসদের সাধারণ সম্পাদকের আসনসহ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন দখল করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র-সংসদ (ঢাকাইউনিভার্সিটি সেন্ট্রাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বা ডাকসুর (উটঈঝট) সাধারনসম্পাদক নাজিম কামরান (এন, এস, এফ) এগার দফা কর্মসূচীর অন্যতম প্রণেতাছিলেন। ফলে, এগার দফা কর্মসূচীকে সমর্থন জানাইয়া তাহার মুল ছাত্র সংগঠনজাতীয় ছাত্র ফেডারেশন দলীয় বিভিন্ন হল সংসদের সহ-সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকএবং ঢাকা নগরের বিভিন্ন কলেজের ছাত্র কর্মকর্তাগণ এক যুক্তি বিবৃতি প্রচারকরেন। এগার দফা ভিত্তিক দেশব্যাপী আন্দোলন পরিচালনার উদ্দেশ্যে ৫ই জানুয়ারী (১৯৬৯) নিম্নলিখিতদের সমবায়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়ঃ

 

আবদুর রউফ-                      সভাপতি, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ

সাইফুদ্দিন আহমদ মানিক-    সভাপতি, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মস্কো)

মোস্তফা জামাল হায়দার-       সভাপতি (পিকং)

মাহবুবু-উল-হক দুলন-         সভাপতি, জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন

খালেদ মোহাম্মদ আলী-        সাধারন সম্পাদক, ছাত্রলীগ

শামছুজ্জোহা-                          সাধারন সম্পাদক, ছাত্রলীগ ছাত্র ইউনিয়ন (মস্কো)

মাহবুব উল্লাহ-                     সাধারন সম্পাদক, ছাত্রলীগ ছাত্র ইউনিয়ন (পিকং)

ইব্রাহীম খলিল-                     সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন

তোফায়েল আহমেদ-              সহ-সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ

নাজিম কামরান-                  সাধারন সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ

 

১৪ই জানুয়ারী (১৯৬৯) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক আহূত সাধারণ ছাত্রসভায় এগার দফা কর্মসূচী আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়।

এগার দফা কর্মসূচী নিম্নরূপঃ

 

এগার দফা

১। ক। স্বচ্ছল কলেজসমূহকে প্রাদেশিকীকরণের নীতি পরিত্যাগ করিতে হইবে এবং জগন্নাথ কলেজসহ প্রাদেশিকীকরণকৃত কলেজসমূহকে পূর্বাবস্থায় ফিরাইয়া দিতে হইবে।

     খ। শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের জন্য প্রদেশের সর্বত্র বিশেষ করিয়া গ্রামাঞ্চলে স্কুল-কলেজ স্থাপন করিতে

হইবেএবং বেসরকারী উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত স্কুল-কলেজসমূহকে সত্বর অনুমোদন দিতেহইবে। কারিগরি শিক্ষা প্রসারের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, পলিটেকনিক, টেকনিকেল ও কমার্শিয়াল ইনষ্টিটিউট স্থাপন করিতে হইবে।

     গ। প্রদেশের কলেজসমূহকে দ্বিতীয় ‘শিফট’ নৈশ আই,এ, আই,এস,সি, আই,কম ও বি,এ, বি,এস,সি; বি, কম এবং প্রতিষ্ঠিত কলেজসমূহে নৈশ এম, এ ও এম, কম ক্লাশ চালু করিতে হইবে।

     ঘ। ছাত্র বেতন শতকরা ৫০ ভাগ হ্রাস করিতে হইবে। স্কলারশীপ ও ষ্টাইপেন্ড কাড়িয়া লওয়া চলিবে না।

     ঙ। হল ও হোষ্টেলের ডাইনিং হল ও কেন্টিন খরচার শতকরা ৫০ ভাগ সরকার কর্তৃক ‘সাবসিডি’ হিসেবে প্রদান করিতে হইকে।

     চ। হল ও হোষ্টেল সমস্যার সমাধান করিতে হইবে।

     ছ। মাতৃভাষার মাধ্যমে সর্বস্তরে শিক্ষার ব্যবস্থা করিতে হইবে। অফিস আদালতে বাংলা ভাষা চালু করিতে হইবে।

     জ। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সংখ্যক অভিজ্ঞ শিক্ষকের ব্যবস্থা করিতে হইবে। শিক্ষকের বেতমবৃদ্ধি করিতে হইবে এবং স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার দিতে হইবে।

     ঝ। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করিতে েিব। নারী শিক্ষার ব্যাপক প্রসার করিতে হইবে।

     ঞ। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করিতে হইবে এবং অটোমেশন প্রথা বিলোপ, নমিনেশন ভর্তি প্রথা

বন্ধ, মেডিকেল কাউন্সিল বাতিল, ডেন্টাল কলেজকে পূর্ণাঙ্গ কলেজে পরিণত করা প্রভৃতি মেডিকেল ছাত্রদের দাবী মানিয়া লইতে হইবে। নার্স ছাত্রদের সকল দাবী মানিয়া লইতে হইবে।

     ট। প্রকৌশল শিক্ষার অটোমেশন প্রথা বিলোপ, ১০% ও ৭৫ % রুল বাতিল, রেন্টাল লাইব্রেরীর সুব্যবস্থা, প্রকৌশল ছাত্রদের শেষবর্ষেও ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থাসহ সকল দাবী মানিয়া লইতে হইবে।

     ঠ। পলিটেকনিক ছাত্রদের কনডেন্স কোর্সের সুযোগ দিতে হইবে এবং বোর্ড ফাইনাল পরীক্ষা বাতিল করিয়া একমাত্র সেমিষ্টার পরীক্ষার ভিত্তিতে ডিপ্লোমা দিতে হইবে।

টেক্সটাইল, সিরামিক, লেদার, টেকনলজী এবং আর্ট কলেজ ছাত্রদের সকল দাবী অবিলম্বে মানিয়া লইতে হইবে।

     ড। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্রদের ন্যায্য দাবী মানিয়া লইতে হইবে। কৃষি ডিপ্লোমা ছাত্রদের ‘কনডেন্স কোর্সের’ দাবীসহ কৃষি ছাত্রদের সকল দাবী মানিয়া লইতে হইবে।

ঢ। ট্রেনে ছাত্রদের ‘আইডেনটিটি কার্ড’ দেখাইয়া শতকরা পঞ্চাশ ভাগ ‘কনসেসনে’ টিকিট দেওয়ার

ব্যবস্থাকরিতে হইবে। মাসিক টিকিটও এই ‘কনসেসনে’ দিতে হইবে। পশ্চিম পাকিস্তানের মতবাসে ১০ পয়সা ভাড়ায় শহরের যে কোন স্থানে যাতায়াতের ব্যবস্থা করিতে হইবে।দূরবর্তী অঞ্চলে বাস যাতায়াতেও শতকরা ৫০ ভাগ ‘কনসেসন’ দিতে হইবে। ছাত্রীদেরস্কুল-কলেজে যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত বাসের ব্যবস্থা করিতে হইবে। সরকারী ওআধা সরকারী উদ্যোগে আয়োজিত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছাত্রদেরশতকরা ৫০ ভাগ ‘কনসেসন’ দিতে হইবে।

     ণ। চাকুরীর নিশ্চয়তা বিধান করিতে হইবে।

     ত। কুখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স সম্পূর্ণ বাতিল করিতে হইবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করিতে হইবে।

     থ। শাসকগোষ্ঠীর শিক্ষা সংকোচন নীতির প্রামাণ্য দলিল জাতীয় শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট ও হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট সম্পূর্ণ বাতিল করিতে হইবে এবং ছাত্র সমাজ ও দেশবাসীর স্বার্থে গণমুখী ও

বৈজ্ঞানিক শিক্ষা ব্যবস্থা কায়েম করিতে হইবে।

২। প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটে প্রত্যক্ষ নির্বচনের মাধ্যমে পার্লামেন্টারী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। দৈনিক

ইত্তেফাক পত্রিকার উপর হইতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করিতে হইবে।

৩। নিম্নলিখিত দাবীসমূহ মানিয়া লইবার ভিত্তিতে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন দিতে হইবে।

ক) দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো হইবে ফেডারেল শাসনভিত্তিক রাষ্ট্রসংঘ এবং আইন পরিষদের

ক্ষমতা হইবে সার্বভৌম।

খ) ফেডারেল সরকারে ক্ষমতা দেশরক্ষা, বৈদেশিক নীতি ও মুদ্রা এই কয়টি বিষয়ে সীমাবদ্ধ

থাকিবে। অপরাপর সকল বিষয়ে অঙ্গ রাষ্ট্রগুলির ক্ষমতা হইবে নিরঙ্কুশ।

গ) দুই অঞ্চলের জন্য একই মুদ্রা থাকিবে। এই অবস্থায় মুদ্রা কেন্দ্রের হাতে থাকিবে; কিন্তু এই

অবস্থায়শাসনতন্ত্রে এমন সুনির্দিষ্ট বিধান থাকিতে হইবে যে, যাহাতে পূর্বপাকিস্তানের মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হইতে না পারে। এই বিধানেপাকিস্তানে একটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থাকিবে, দুই অঞ্চলে দুইটি পৃথকরিজার্ভ ব্যাঙ্ক থাকিবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক অর্থনীতি প্রবর্তনকরিতে হইবে।

ঘ) সকল প্রকার ট্যাক্স, খাজনা, কর ধার্য ও আদায়েরসকল ক্ষমতা থাকিবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। ফেডারেল সরকারের কোন কর ধার্যক্ষমতা থাকিবে না। আঞ্চলিক সরকারের আদায় রেভিনিউর নির্ধারিত অংশ আদায়েরসঙ্গে সঙ্গে ফেডারেল তহবিলে জমা হইবে। এই মর্মে রিজার্ভ ব্যাঙ্কসমূহের উপরবাধ্যতামূলক বিধান শাসনতন্ত্রে থাকিবে।

ঙ) ফেডারেশনের প্রতিটিরাষ্ট্র বহিঃবাণিজ্যের পৃথক হিসাব রক্ষা করিবে এবং বহিঃবাণিজ্যের মাধ্যমেঅর্জিত মুদ্রা অঙ্গ রাষ্ট্রগুলির এক্তিয়ারাধীন থাকিবে। ফেডারেল সরকারেরপ্রয়োজনীয় বিদেশী মুদ্রা অঙ্গ রাষ্ট্র সমানভাবে অথবা শাসনতন্ত্রেরনির্ধারিত হার অনুযায়ী প্রদান করিবে। দেশজাত দ্রব্যাদি বিনা শুল্কে অঙ্গরাষ্ট্রগুলির মদ্যে আমদানি রফতানি চলবে এবং ব্যবসা বাণিজ্য সম্পর্কে বিদেশীরাষ্ট্রগুলির সাথে চুক্তি সম্পাদনের, বিদেশে ট্রেড মিশন স্থাপনের এবংআমদানী-রফতানী করিবার অধিকার অঙ্গ রাষ্ট্রগুলির হাসে ন্যস্ত করিয়াশাসনতন্ত্রে বিধান করিতে হইবে।

চ) পূর্ব পাকিস্তানকে মিলিশিয়াবা প্যারা মিলিটারী রক্ষী বাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হইবে। পূর্ব পাকিস্তানেঅস্ত্র কারখানা নির্মাণ ও নৌ-বাহিনীর সদর দফতর স্থাপন করিতে হইবে।

৪। পশ্চিম পাকিস্তানের বেলুচিস্তান, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধুসহ সকল প্রদেশের স্বায়ত্বশাসন

প্রদান করতঃ সাব ফেডারেশন গঠন করিতে হইবে।

৫। ব্যাঙ্ক, বীমা ইনস্যুরেন্স ও বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণ করিতে হইবে।

৬। কৃষকেরউপর খাজনা ও ট্যাক্সের হার হ্রাস করিতে হইবে এবং বকেয়া খাজনা ও ঋণ মওকুফকরিতে হইবে; সার্টিফিকেট প্রথা বাতিল ও তহশিলদারদের অত্যাচার বন্ধ করিতেহইবে। পাটের সর্বনিম্ন মূল্য মণ প্রতি ৪০ টাকা নির্ধারণ এবং আখের ন্যায্যমূল্য দিতে হইবে।

৭। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরী ও বোনাস দিতে হইবে এবং শিক্ষা, বাসস্থান ও চিকিৎসা ইত্যাদির ব্যবস্থা

করিতে হইবে এবং ধর্মঘটের অধিকার ও ট্রেড ইউনিয়ন করিবার অধিকার প্রদান করিতে হইবে।

৮। পূর্ব পাকিস্তানের বন্যা নিয়ন্ত্রয় ও জল সম্পদের সার্বিক ব্যবহারের ব্যবস্থা করিতে হইবে।

৯। জরুরী আইন প্রত্যাহার, নিরাপত্তা আইন ও অন্যান্য নির্যাতনমূলক আইন প্রত্যাহার করিতে হইবে।

১০। সিয়াটো, সেন্টো পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিল করিয়া জোট বহির্ভূত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র

নীতি কায়েম করিতে হইবে।

১১। দেশেরবিভিন্ন কারাগারে আটক সকল ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, রাজনৈতিক কর্মী ওনেতৃবৃন্দের অবিলম্বে মুক্তি, গ্রেফতারী পরোয়ানা ও হুলিয়া প্রত্যাহার এবংআগরতলা যড়যন্ত্র মামলাসহ সকল রাজনৈতিক কারণে জারিকৃত মামলা প্রত্যাহারকরিতে হইবে।

আন্দোলনের নূতন পটভূমি

      পূর্বও পশ্চিম পাকিস্তানে ছাত্র আন্দোলন, জুলফিকার আলী ভুট্টোর গ্রেফতারওপাকিস্তান বিমানবাহিনী প্রাক্তন এয়ার মার্শাল আসগর খানের এক ব্যক্তির শাসনঅবসানের দাবিতে গণ-আন্দোলনে যেগদান, সমগ্র পাকিস্তানে প্রতিনিধিত্বশীলসরকার প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের নূতন পটভূমি রচনা করে। তাই সমগ্র দেশবাসীগণআন্দোলন পরিচালনার তাগিদে ৭ই ও ৮ই জানুয়ারী ঢাকায় অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপীবৈঠকে পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আমীর হোসেনশাহ, পাকিস্তান নেজাম-ই-ইসলাম পার্টির সভাপতি চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, পাকিস্তান জমিতে-উল উলামা-ই-ইসলামের সেক্রেটারী জেনারেল মুফতি মাহমুদ, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ-এর (৬ দফা) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ সজরুলইসলাম, নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের সভাপতি মমতাজ মোহাম্মদ খান দৌলতানা, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের সভাপতি জনাব নূরুল আমিন, জামায়াতে ইসলামীপাকিস্তান ভারপ্রাপ্ত আমীর তোফায়েল আহমদ, সভাপতি পাকিস্তান আওয়ামী লীগনওয়াবজাদা সানরুল্লাহ খান-এর স্বাক্ষরে নিম্নলিখিত ৮ দফা দাবী আদায়েরউদ্দেশ্যে ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটি গঠন করা হয়ঃ

১। ফেডারেল পার্লামেন্টারী সরকার

২। প্রাপ্ত বয়স্ক ভোটাধিকার ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ্য নির্বাচন

৩। অবিলম্বে জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার

৪। সাগরিক স্বাধীনতা পূনর্বহাল ও সকল কালাকানুন বাতিল বিশেষতঃ বিনাবিচারে আটক

আইনসমূহ ও বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স বাতিল।

৫।শেখ মুজিবর রহমান, খান আবদুল ওয়ালী খান, জুলফিকার আলী ভুট্টোসহ সকলরাজনৈতিক বন্দী ও ছাত্র-শ্রমিক-সাংবাদিক বন্দীদের মুক্তি এবং কোর্ট ওট্রাইবুনাল সমীপে দায়েরকৃত সকল রাজনৈতিক মামলা সংক্রান্ত সকল গ্রেফতারীপরোয়ানা প্রত্যাহার।

৬। ১৪৪ ধারা মোতাবেক সর্বপ্রকার আদেশ প্রত্যাহার।

৭। শ্রমিকদের ধর্মঘট করার অধিকার বহাল।

৮।নূতন ডিক্লারেশনসহ সংবাদপত্রের উপর আরোপিত সকল বিধিনিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারএবং বাজেয়াপ্ত সকল প্রেস, পত্রিকা ও সাময়িকী পুনঃবহাল অথবা ‘ইত্তেফাক’ ও ‘চাত্তান’সহ বাতিলকৃত ডিক্লারেশন পুনঃবহাল এবং আদত মালিকের নিকট প্রগ্রেসিভপেপারস লিমিটেডকে পুনঃফেরত দান।

     ডেমোক্রেটিককমিটি অব এ্যাকশন (সংক্ষেপে ডাক) ১৭ই জানুয়ারী দেশব্যাপী দাবী দিবস পালকরিবার আহবান জানায়। ৭ই ডিসেম্বর, ১৯৬৮ ইং হইতে ঢাকা শহরে বলবৎ ১৪৪ :ারানিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ না করিয়া বায়তুল মোকাররম মসজিদ হইতে জুম্মা নামাজের পর ৩জন ৩ জন করিয়া মৌন মিছিল ঢাকা বার লাইব্রেরীতে আহূত সভায় যোগদানের কর্মসূচী ‘ডাক’-এর নেতৃবৃন্দ ঘোষণা করেন। কিন্তু মোনায়েম খানের সরকার ইহার বিরুদ্ধেপাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণে কার্পণ্য করিল না। ১৬ই জানুয়ারীতেই (১৯৬৯) যে কোনশোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সরকারী আদেশকে তোয়াক্কা না করিয়া পুলিশবাহিনীর বাধা সত্ত্বেও নেতৃবৃন্দ খণ্ড খণ্ড মিছিল, শোভাযাত্রাসহ গন্তব্যস্থল ঢাকা জিলা বার লাইব্রেরী হলে গমন করেন এবং সেখানে জনাব নুরুল আমিনেরসভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত

     সর্বদলীয়ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে অবস্থি বটতলায় ছাত্রসভাঅনুষ্ঠানের পর ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এইভাবেই সংগ্রামীছাত্র সমাজ বিধি-নিষেধের প্রাচীর ধূলিস্যাৎ করিয়া স্বৈরাচারী শাসন ও শোষণেরবিরুদ্ধে সংগ্রামী কাফেলার অগ্রাভিযানের সূচনা ঘটায় জালেম শাহীর রক্ষকপুলিশ বাহিনী লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে। লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস ব্যবহারের প্রতিবাদে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১৮ই জানুয়ারী (১৯৬১) ঢাকাশহরে ছাত্র ধর্মঘট ঘোষণা করে। ঐ দিন সভা অনুষ্ঠানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়চত্বর হইতে মিছিল সহকারে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় গেট ত্যাগ করিতে উদ্যতহইলেই পুলিশ বাহিনী লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করিয়া ছাত্র মিছি কেছত্রভঙ্গ করে। অপরাহ্নে পুলিশ ও ই,পি, আর বাহিনী আবাসিক হল ইেড করে এবংছাত্রদের সির্দভাবে মারধর করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি পর্যন্ত ১৭ও ১৮ই জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পুলিশের এই জুলুমের বিরুদ্ধেপ্রতিবাদ করিতে বাধ্য হয়।

      ১৮ই জানুয়ারী ইকবাল হল প্রাঙ্গণেইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির ২ জন ছাত্রকে গ্রেফতারেরপ্রতিবাদে ১৯ শে জানুয়ারী রবিবার ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিরছাত্রদের স্বতস্ফূর্ত ও তাৎক্ষণিক ধর্মঘট, ছাত্রসভা ও শোভাযাত্রা হয়। পুলিশবাহিনী ছাত্র মিছিলে লাঠিচার্জ করে, টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে ও ৮ জনছাত্রকে গ্রেফতার করে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রাবাস ও সলিমুল্লাহ হল হইতেকারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মঘটী ছাত্রদের সমর্থনে পৃথক পৃথক মিছিল বাহির হয়।।