আসাদের মৃত্যু

ফন্ট সাইজ:

     এইভাবে ব্যক্তি স্বাধীনতা গরণকারী ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন বিরোধী এক ব্যক্তি শাসনের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ ক্রমশঃ পূর্ব পাকিস্তানের রাজপথকে প্রকম্পিত করিয়া তোলে। ২০শে জানুয়ারী (১৯৬৯) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আহূত ছাত্রসভায় শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হইতে হাজার হাজার ছাত্র যোগদান করে। পুলিশ ই,পি,আর বাহিনীর লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহারকে অগ্রাহ্য করিয়া মূল ছাত্র মিছিল ছত্রভঙ্গ ও খষ্ড-বিখণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন রাজপথ অবলম্বন করিয়া সমগ্র ঢাকা নগরকে বিক্ষোভের নগরীতে পরিণত করে। এমনি একটি খণ্ড মিছিল মেডিকেল কলেজের সম্মুখস্থ রাজপথ ধরিয়া অগ্রসর হওয়ার পথে সশস্ত্র পুলিশ ই,পি,আর বাহিীর সহিত ছাত্রদের ইট-পাটকেল লাঠি ও টিয়ার গ্যাসের খণ্ড যুদ্ধ আরম্ভ হয়। চরম উত্তেজনার মুহুর্তে চতুর্দিক হইতে ছাত্র জনতা কর্তৃক আক্রান্ত ও পরিবেষ্টিত সশস্ত্র আইন শুংখলা রক্ষা বাহিনীর গুলী ১টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা সেন্ট্রাল ল’ কলেজের ছাত্র এ,এম, আসাদুজ্জামানের বক্ষ বিদীর্ণ করে। সমগ্র ঢাকা নগর ক্ষণিকের তরে মূহ্যমান হইয়া পড়ে। ইহার পর সম্বিত ফিরিয়া যাওয়া ঢাকা নগরবাসী সমগ্র দেশকে নতুন দিশার সন্ধান দেয়। শহীদ আসাদের তপ্ত শোণিতকণা সংগ্রামী ছাত্র আন্দোলনকে আপোষহীন গণ অভ্যুত্থানে রূপান্তরিত করে। এইদিন পুলিমের সহিত সংঘর্ষে আরো ৩ জন আহত হয়।
    শহীদ আসাদুজ্জামানের মৃতদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হইতে ছিনাইয়া নিতে ব্যর্থ হইয়া ছাত্র-জনতা ঢাকা মেডিকেল কলেজ বিল্ডিং সম্মুখে শোকসভা করে, কালো পতাকা উত্তোলন করে, এক মিনিট নীরবে দন্ডায়মান হইয়া শোক প্রকাশ করে এবং ঢাকা নগরে প্রভাত হইতে সন্ধা পর্যন্ত সাধারণ হরতাল ঘোষনা করে। ২১ শে জানুয়ারী অপরাহ্ন এক ঘটিকায় পল্টন ময়দানে এ,এম, আসাদুজ্জামানের গায়েবানা নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। ইহার পর নগ্নপদে মৌন মিছিল ঢাকার রাজপথ প্রদক্ষি করিয়া শহীদ মিনারে উপস্থিত হয় এবং শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত শোকসভায় পুনরায় ঢাকা শহরে সাধারণ হরতাল পালনের আহবান জানায়। উল্লেখ্য যে, ২১শে জানুয়ারী সাধারন হরতাল পালনকালে ঢাকা ইডেন গার্লস কলেজের সম্মুখে ও ঢাকা নিউ মার্কেট এলাকায় জনতার উপর পুলিশ গুলী চালায়। ২৯ জন আহত হয় এবং ৫৯ জন গ্রেফতার হয়। প্রসঙ্গতঃ ইহাও উল্লেখ্য যে, অপরাহ্ন ১ ঘটিকায় পল্পন ময়দানে শহীদ আসাদের গায়েবানা নামাজে লক্ষাধিক লোকের সমাগম হইয়াছিল। নামাজ আদায়ের পূর্বে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আসাদুজ্জামানের মৃত্যু উপলক্ষ্যে ২২শে, ২৩শে ও ২৪শে জানুয়ারী ‘শোককাল’ (Mourning Period) হিসেবে ঘোষণা করে এবং এই শোককালে নিন্মোক্ত প্রোগ্রাম ঘোষণা করেঃ
    ২২শে জানুয়ারী-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ও কাল পতাকা উত্তোলন, কালব্যাজ ধারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলা ভবনে অপরাহ্ন ১২-৩০ মিনিটে গায়েবানা নামাজে জানাযা।
    ২৩শে জানুয়ারী-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ও কালো পতাকা উত্তোলন এবং কালব্যাজ ধারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলা ভবন বটতলা হইতে মশাল মিছিল।
    ২৪শে জানুয়ারী-প্রদেশব্যাপী হরতাল।

পূর্ব পাকিস্তান বন্ধ
    গায়েবানা নামাজে জানাযার পর ১৪৪ ধারাকে উপক্ষো করিয়া জনসমুদ্রের শোক মিছিল শহরের রাজপথ প্রদক্ষিণে নির্গত হয়। শোক মিছিলে শেখ মুজিবুর রহমান, জুলফিকার আলী ভুট্টো, খান মোহাম্মদ আলী ওয়ালী খান ও মনি সিং সহ রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দাবী ও আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের গগনবিদারী ধ্বনিতে ঢাকার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হইয়া উঠে। দাবী ধ্বনিত হয় এগার দফা মানার।
    ২২শে জানুয়ারী ঢাকার পুলিশের গুলীর প্রতিবাদে করাচী, রাওয়ালপিন্ডি, লাহোর, হায়দরাবাদ, পেশোয়ার, মুলতান, শিয়ালকোট ও লায়ালপুরে ধর্মঘট, মিছিল, সভা ও গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটি ২১শে জানুয়ারী লাহোরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ৮ দফার সমর্থনে ১২ই ফেব্রুয়ারী (১৯৬৯) সমগ্র পাকিস্তান ব্যাপী হরতাল পালনের আহবান জানায়।
    সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক ঘোষিত সাধারন হরতাল ২৪শে জানুয়ারী এক অন্যন্য ইতিহাস সুষ্টি করে। মিছিলের পর মিছিল চলিতে থাকে। রাজধানী ঢাকার রাজপথ ছাত্র, শ্রমিক-মধ্যবিত্ত জনতার পদভারে প্রকম্পিত হইয়া উঠে। এমন এতটি দুর্জয় মিছিল সেক্রেটারিয়েটের পার্শ্ববর্তী রাজপথে অগ্রসর হওয়াকালে সংঘর্ষ বাঁধে আইউব-মোনায়েম খাঁর গদী রক্ষায় নিয়োজিত সশস্ত্র বাহিনীর সহিত। তাহাদের নিষ্ঠুর বুলেটে নিহত হয় নবকুমার ইনষ্টিটিউটের দশম শ্রেণীর ছাত্র কিশোর মতিউর রহমান মল্লিক, মকবুল, রুস্তম আলী ও অসনাক্ত একজন এবং আহত হয় ১৫ জন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ইমারজেন্সী ওয়ার্ড হইতে শহীদ মকবুল ও রুস্তম আলীর মৃতদেহ বলপূর্বক ছিনাইয়া আনা হয় এবং ১৪৪ ধারার নিষেধাজ্ঞা উপক্ষো করিয়া লক্ষ জনতার শোক মিছিল পল্টন ময়দানে যথারীতি নামাজে জানাযা আদায়ের পর শহীদানের লাশসহ জঙ্গী মিছিলটি ইকবাল হলে গমন করে। মারমুখী বিদ্রোহী জনতা সরকারী ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত পাকিস্তান ট্রাষ্ট সংবাদপত্র ‘দৈনিক পাকিস্তান’ ও ইয়রেজী দৈনিক ‘মর্নিং নিউজ’ ভবনে অগ্নি সংযোগ করে। জনতার এই আপোষহীন সংগ্রামকে দমন করিবার জন্য শেষ অবলম্বন স্বরূপ সেনাবাহিনী তলব করা হয়। রাত ৮টা হইতে ২৪ ঘন্টার জন্য জারি করা হয় কারফিউ। ঢাকা হইতে বহির্গামী ট্রেন সার্ভিস, আভ্যন্তরীণ বিমান সার্ভিস ও ঢাকা-করাচী টেলি কমিউনিকেশন বাতিল হইয়া যায়। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে সৃষ্ট হয় অচল অবস্থা।
    এইভাবেই জালেমশাহী খতমে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অগ্নিশপথে উজ্জীবিত বিদ্রোহী বংগসন্তান গুলী-গোলা ও সান্ধ্য আইনের প্রাচীরকে চুরমার করিয়া আইউবের নতমুখে বিদায় গ্রহণ অবধি দুঃশাসনের প্রতিরোধ আবেষ্টনিকে আঘাতে আঘাতে বিধ্বস্ত করিয়া চলে। অজেয় জনসমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গমালার অবিরাম আঘাতে পর্যুদস্ত আইউব সরকার সান্ধ্য আইন জারি করে করাচী, খুলনা, নারায়নগঞ্জে; সান্ধ্য আইন বর্ধিত করে ঢাকা নগরীতে। সান্ধ্য আইন অমান্য করিয়া তেজগাঁও এলাকাধীন নাখালপাড়ার বিক্ষুব্ধ শ্রমিক শ্রেণী সরকারী নরহত্যা অভিযানরে বিরুদ্ধে ২৫শে জানুয়ারী জংগী মিছিল বাহির করিলে সেনা বাহিনীর নির্মম গুলীতে বরিশাল নিবাসী তেজগাঁও চৌধুরী কেমিক্যালস ওয়ার্কস-এর কর্মচারী জনাব ইসহাকের সহধর্মিনী আনোয়ারা বেগম কন্যাকে স্তন্যদানকালে শাহাদাৎবরণ করেন। তেজগাঁও পলিটেকনিক ইসষ্টিটিউটের ছাত্র আবদুল লতিফ প্রাণ দেন সেনাবাহিনীর বুলেটে; আহত হয় ১২ জন। 

শোককালের কর্মসূচী
    ছাত্রদের সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ রবিবার (২৬-০১-১৯৬৯) হইতে তিন দিনব্যাপী ‘শোককাল’ পালনের আহবান জানায়। শোককালে কালো পতাকা উত্তোলন ও কালো ব্যাজ ধারণ-এর প্রোগ্রাম করা হয় এবং ছাত্র সমাজ ও জনগণের ঐক্যবদ্ধ বৃহত্তর আন্দোলন পরিচালনার নিমিত্ত ঘোষণা করা হয় নিম্ন নির্দেশাবলীঃ
    (১) প্রত্যেক জিলা, মহকুমা, থানা, গ্রাম, মহল্লা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক এলাকায় ছাত্র সমাজের উদ্যোগে সংগ্রাম পরিষদগুলির মাধ্যমে আন্দোলন পরিচালনা করা ও নিম্ন কমিটি উচ্চতর কমিটির সহিত সংযোগ রক্ষা করিয়া চলা, (২) জনগণকে সংগঠিত করা, (৩) গণ-অভ্যুত্থান গ্রামে গ্রামে ছড়াইয়া দেয়া, (৪) সর্বত্র সুশৃংখল সেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করা, (৫) শৃংখলা রক্ষা করা, সর্বপ্রকার সরকারী উস্কানির বিরুদ্ধে সতর্ক থাকা, (৬) বিভিন্ন সম্প্রদায় ও গোত্রের মধ্যে সৌহার্দ্য ও শান্তি বজায় রাখা এবং এইভাবে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ায় সহায়তা করা, (৭) স্থানীয় সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক বিজ্ঞাপন, পোষ্টার, পতসভা, মাইক প্রচার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে বহুল প্রচারিভিযান চালানো, (৮) কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশাবলী বিনা বাক্যব্যয়ে সর্বদাই পালন করা।
    উপরে বর্ণিত নির্দেশাবলী দ্বারা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সরকার বিরোধী গণ-আন্দোলনকে পুরাপুরিভাবে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আনয়ন করে। ইহা দ্বারা পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক কমিটি অব এ্যাকশান অন্ততঃ পূর্ব পাকিস্তানের আন্দোলন হইতে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে। তরুণের ডাক ছিল এগার দফা বাস্তবায়ন আর বয়োবৃদ্ধ নেতৃত্বের আহবান ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। ইহাতে বায়োবৃদ্ধ নেতৃত্বের প্রতি তরুণ ছাত্র সমাজের পূর্ণ অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ ষ্পষ্ট হইয়া উঠে। ইহার পিছনে অপরিপক্ষ তরুণ ছাত্রনেতৃবৃন্দের নেতৃত্বাভিলাষও কাজ করিয়াছে। ইহার ফলে, ইতিহাসই রায় দিয়াছে, জনগণের মঙ্গল হইয়াছে, না সর্বনাশ হইয়াছে। অনুন্নত দেশগুলিতে আদর্শহীন, দুর্নীতিপরায়ণ ও গণ-বিরোধী নেতৃত্বই এইরূপ অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য দায়ী। দেশপ্রেমিক, ত্যাগী ও পরিপক্ষ ভারতীয় নেতৃত্ব ১৯৭৫ সালে ইন্দরা সরকারের বিরোধী আন্দোলনকে কিভাবে অহিংস শান্তিপূর্ণ খাতে প্রবাহিত করিয়া গণসচেতনতা সৃষ্টি করিয়াছিল তাহা সরকার পরিবর্তনের আন্দোলনে এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাহা ছাড়া ভারতের এই একই নেতৃত্ব ১৯৭৭ সালের মার্চ-এর নির্বাচনে প্রমাণ করিয়াছে, বাঞ্ছিত শান্তিপূর্ণ পথে কিভাবে রাষ্ট্রীয় নতৃত্ব পরিবর্তন করিতে হয়।
    যাহা হউক, ঐদিকে পিণ্ডি, লাহোর, পেশোয়ার, হায়দরাবাদ ও করাচীর বিদ্রোহনল সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তানে দাবানলের ন্যায় ছড়াইয়া পড়ে। গণতন্ত্রের দাবীতে একনায়কত্বের প্রতিবাদে, জুলুমের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন ক্রমশঃ পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন মফঃস্বল শহরে ব্যাপ্তি লাভ করে। এইদিকে শোককালের কর্মসূচী পালনকালে ২৬শে জানুয়ারী (১৯৬৯) রবিবার ঢাকা, ডেমরা ও নারায়নগঞ্জে ৪ জন নিহত হয় ও ১৬ জন আহত হয়। আন্দোলনের প্রচণ্ডতায় বিব্রত সরকার ঢাকা, খুলনা, নারায়নগঞ্জ ও করাচীতে পুনরায় সান্ধ্য আইনের মেয়াদ বৃদ্ধি করে। কিন্তু ২৭শে জানুয়ারী (সোমবার) করাচী ও লাহোর শহরে গণআন্দোলনের বৈল্পবিক ভূমিকায় ভীত-সন্ত্রস্ত সরকার বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় সেনাবাহিনী তলব করিয়া বসে।

গণবিদ্রোহের জোয়ার
    করাচীর সশস্ত্র বাহিনীর বুলেটের আঘাতে ৬ জন শাহাদাৎবরণ করে। ২৭শে জানুয়ারী (১৯৬৯) জাতীয় পরিষদের ঢকা অধিবেশনে ঢাকায় সান্ধ্য আইন ও হত্যাকাণ্ডের উপরে পরিষদ সদস্য মোখলেসুজ্জামানের উত্থাপিত মুলতবী প্রস্তাব পরিষদ স্পীকার নাকচ করিয়া দেন। এইদিন ঢাকা, খুলনা ও নারায়নগঞ্জে এবং ২৮মে জানুয়ারী (১৯৬৯) করাচী ও লাহোরে পুনরায় সান্ধ্য আইনের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। লাহোরে পুলিমের গুলীতে ২ জন শাহাদাৎবরণ করে এবং করাচীতে ১ হাজার লোককে গ্রেফতার করা হয়। পেশোয়ার ও বরিশালে আন্দোলনের ঢেউ জনতা ও সশস্ত্র বাহিনীর সংঘর্ষের রূপ পরিগ্রহ করে। আন্দোলনের চতুর্থ দিনে পেশোয়ারের জনতাকে দমন করিতে ব্যর্থ হইয়া কতৃপক্ষ সেখানে ২৮শে জানুয়ারী (১৯৬৯) সেনাবাহিনী তলব করে এবং বরিশালের বুকে বিপ্লবী জনতার ৯ জন পুলিশ, ই, পি, আর ও সশস্ত্র বাহিনীর বুলেটের আঘাতে আহত হয়।
    ২৯ শে জানুয়ারী (১৯৬৯) গুজরানওয়ালা শহরে পুলিশেরগুলীতে ৩ জন নিহত ও ১০ জন মারাত্মকভাবে আহত হয়। অবস্থা আয়ত্তে আনার প্রয়াসে কর্তৃপক্ষ সেনাবাহিনী তলব করে এবং সান্ধ্য আইন জারি করে। ডেরা ইসমাইল খাঁ শহরে পুলিশের লাঠিচার্জের ফলে আহত হয় ৬ জন। এইদিকে পূর্ব পাকিস্তানের ঝালকাঠি বন্দর-শহরে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করিয়া মিছিল বাহির হয়। মিছিল ছত্রভঙ্গ করিবার চেষ্ঠায় পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ অতঃপর ফাঁকা গুলীবর্ষণ করে। ৩০শে জানুয়ারী (১৯৬৯) ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত জাজিরা থানা সদরে পুলিশ মিছিলকারীদের উপরে গুলীবর্ষণ করে এবং সেই গুলীতে ১ জন নিহত ও ৪ জন আহত হয়।
    ঢাকা শহরের অবস্থার উন্নতির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ৩১শে জানুয়ারী (১৯৬৯) হইতে সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করে। প্রচণ্ড দমননীতির মোকাবেলায় আন্দোলন সাময়িকভাবে স্তিমিত হইয়া উঠিলে সমগ্র দেশে শুরু হয় গ্রেফতারের হিড়িক। ৩১মে জানুয়ারী (১৯৬৯) শুক্রবার আমাকে আমার ৭ নং কলেজ ষ্ট্রীট, ধানমণ্ডি বাসভবন হইতে গ্রেফতার করা করা হয় ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাকিস্তান দেশরক্ষা বিধি বলে বিনাবিচারে আটক করা হয়।
    করাচী, লাহোর, পিন্ডি, পেশোয়ার, হায়দরাবাদ, কোয়েটা, ঢাকা, খুলনা, নারায়নগঞ্জ, চট্টগ্রাম অর্থাৎ এক কথায় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিটি জনপদ যখন গণবিদ্রোহের জোয়ারে উত্তাল, প্রতিটি রাজপথ যখন লক্ষ জনতার মিছিলের পদভারে প্রকম্পিত, আত্মাধিকার আদায়ে দৃঢ় সংকল্প জনতার সুপ্ত আগ্নেয়গিরি ভিসুবিয়াসের আকস্মিক বিস্ফোরণে এক ব্যক্তির শাসন রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনীর লাঠিচার্জ, কাঁদানেগ্যাস, গুলীগোলা ও গ্রেফতার ইত্যাদি যখন অকেজো প্রায়, অর্থাৎ আইউব শাহীর মসনদ যখন টলটলায়মান সেই অবস্থায় ৫ই ফেব্রুয়ারী (১৯৬৯) প্রেসিডেন্ট আইউব খান রাওয়ালপিণ্ডি হইতে লাহোর বিমান বন্দরে অবতরণ করিয়া সাংবাদিকদের নিকট প্রকাশ করিলেন যে, বর্তমান সমস্যাবলী সমাধানের উদ্দেশ্যে তিনি ১৭ই ফেব্রুয়ারী (১৯৬৯) বিরোধী দলীয় নেতৃবৃন্দের সহিত রাওয়ালপিণ্ডিতে এক বৈঠকে মিলিত হইবেন। সাংবাদিকদের তিনি আরো জানাইলেন যে, ইতিমধ্যে বিভিন্ন নেতাকে অনুরোধ জানাবার জন্য তিনি বিরোধী দলীয় নেতা নওয়অবজাদা নাসরুল্লাহ খানকে অনুরোধ জানাইয়াছেন। নওয়াবজাদার নিকট প্রেরিত প্রেসিডেন্ট আইউবের সেই অনুরোধ পত্রটি ছিল নিন্মরূপঃ

Nawabzada Shahib,

          In the course of my broadcast on the 1st of January 1969, I said that I along with my colleagues would like to have the girst opportunity to meet the repersentives of the opposition parties to mutually discuss the political problems which are agitating the people’s mind & to seek their assistance in finding solutions thereto, I am therefore, requesting you convenor of Democratic Action Committee to invite on my behalf whomsoever you like to attend a conference in Rawalpindi on the 17th of February, 1969 at 10. am. if this suitable & convenient to you. I am suggesting this date because before that I expect to be in East Pakistan but I shall be available to discuss any preliminaries in Dhaka should that be considered necessary by you.

          I shall be very happy indeed if you & such representatives of the opposition parties as you may nominate would accept the invitation. I shall also be happy if you and your colleagues would stay in Rawalpindi as my guests during the conference.

          In view of the public interest in the matter I feel that communication should be made available to the press for publication at the earliest possible opportunity.

          I am sure you will have no objection to this.

          With kind resards.

Yours sincerely

Singned,

Field Marshall Mohammad Ayub Khan

নওয়াবজাদা সাহেব,
১৯৬৯ সালের ১লা জানুয়ারী জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে আমি বলিয়াছিলাম যে, আমি ও আমার সহকর্মীবৃন্দ বিরোধী দলসমূহের প্রতিনিধিবৃন্দের সহিত প্রথম সুযোগেই জনগণের মনে বিরাজমান সমস্যাবলী সম্পর্কে আলোচনাপূর্বক এইগুলি সমাধানে উপনীত হওয়ার জন্য মিলিত হইতে চাই। ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটির আহবায়ক হিসেবে আমি আপনাকে এই মর্মে অনুরোধ জানাইতেছি যে, যদি আপনার নিকট উপযোগী বিবেচিত হয়, তাহলে আগামী ১৭ই ফেব্রুয়ারী (১৯৬৯) সকাল ১০টায় রাওয়ালপিন্ডিতে এক সম্মেলনে যোগদান করিবার জন্য আপনার পচন্দমাফিক ব্যক্তিবর্গকে আমার পক্ষ হইতে দাওয়াত করিবেন। আমি উক্ত তারিখের কথা বলিতেছি এই কারণে যে, সম্ভবতঃ ইহার পূর্ব পর্যন্ত আমার পূর্ব পাকিস্তানে থাকার কথা। কিন্তু যদি আপনার নিকট প্রয়োজন অনুভূত হয়, তাহা হইলে আমি যে কোন প্রাথমিক আলোচনা করিবার জন্য ঢাকায় প্রস্তুত থাকিব।
    যদি আপনি ও আপনার মনোনীত বিরোধীদলীয় প্রতিনিধিবৃন্দ এই দাওয়াত গ্রহণ করেন, তাহা হইলে আমি অত্যান্ত সুখী হইব যদি আপনি ও আপনার সহকর্মীরা সম্মেলন চলাকালে আমার মেহমান হিসাবে রাওয়ালপিন্ডিতে অবস্থান করেন।
    জনস্বার্থের খাতিরে আমি মনে করি এই পত্রখানি, যত শীঘ্র সম্ভব সংবাদপত্রে প্রেরণ করা প্রয়োজন।
    আমি নিশ্চিত যে, এই প্রস্তাবে আপনার কোন আপত্তি নাই।
শ্রদ্ধান্তে-
আপনার বিশ্বস্ত
স্বাঃ ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইউব খান

আলোচনার পরিবেশ
    আলোজনা অনুকূল আবহাওয়া সৃষ্টিরমানসে ৬ই ফেব্রুয়ারী মধ্যরাত্রি ঢাকা, নারায়নগঞ্জ হইতে সৈন্য বাহিনী ও ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু ছাত্র-পুলিশ হাংগামা রোধকল্পে লাহোর শগরে সৈন্য বাহিনী তলব করা হয়। ঢাকায় ৬ই ফেব্রুয়ারী ‘কালো দিবস’ (ব্ল্যাক ডে) পালন করা হয়। গাড়িতে, বাড়িতে, দোকানে, অফিসে, শরীরে কালো পতাকা আর কালো ব্যাজ সরকারী জুলুমের প্রতিবাদ জানাইতেছিল। ঢাকা যেন কালো পতাকা আর কালো ব্যাজের নগরীতে পরিণত হয়। ঢাকা এবং লাহোরের ছাত্রদের বিভিন্ন দাবীতে সভা, শোভাযাত্রা নগর জীবনকে যেমনি উত্তেজনাময় করিয়া রাখে ঠিক তেমনি আবার ১৭ই ফেব্রুয়ারী গোলটেবিল বৈঠককে কেন্দ্র করিয়া নওয়াবজাদা নাসরুল্লাহ খান, শেখ মুজিবর রহমান, মওলানা ভাষানী ও ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটির নেতৃবৃন্দের ঢাকায় আলোচনা রাজনৈতিক মহলে স্বস্তির আবহাওয়া সৃষ্টি করে। এমনি দ্বিধাদ্বন্ধজনিত পরিস্থিতিতে ৮ই ফেব্রুয়ারী (১৯৬৯) দৈনিক ইত্তেফাকের ছাপাখানা নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেসের বাজেয়াপ্তকরণ আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। রাজনৈতিক নমঝোতার পাথে ইহা ছিল নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সঠিক পদক্ষেপ।
    রাজণৈতিক নেতা ও কর্মী গ্রেফতারের প্রতিবাদে, রাজবন্দীদের মুক্তির দাবীতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের ও ১১ দফা বাস্তবায়নের দাবীতে ঢাকার রাজপথ প্রকম্পিত করিয়া লক্ষ জনতার মিছিল প্রত্যহ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার প্রদক্ষিণ করিত। এমনি একটি দিন ৯ই ফেব্রুয়ারী। অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত মরণজয়ী সংগ্রামে লিপ্ত লক্ষ ইনসানের মিছিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সদর ফটক ও বিভিন্ন পার্শ্বস্থ দেওয়াল ভাঙ্গায় উদ্যত হইলে চিরাচারিত প্রথানুযায়ী আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশ্রয় গ্রহণ না করিয়া বিচক্ষন জেলার নির্মল বাবু কম্পিত পদে ১০ নং সেলে উপস্থিত হন ও ভীত-শঙ্কিতকণ্ঠে সংক্ষেপে মারাত্মক পরিস্থিতি উদ্ভবের আশংকা প্রকাশ করেন এবং আমাকে জেলগেটে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করিতে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানান। আমার সেল-মেট বন্ধুবর জনাব তাজউদ্দিন আহমদ শোনামাত্র আমাকে কালক্ষেপ না করিয়া আমাকে জেলগেটে যাইতে বাধ্য করে। জেলগেটের লোহার শিকের অবলম্বণে কিছুদূর আরোহণ করিয়া আমি প্রায় এক ঘন্টাব্যাপী অনর্গল বক্তৃতা দানের ফলে সমগ্র পরিস্থিতি আয়ত্বের মধ্যে আসে এবং কারাগার প্রাচীরে যাহারা আরোগণ করিয়াছিল তাহারাও নামিয়া পড়ে। প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব জেলার নির্মল বাবু যদি আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা প্রার্থনা করিতেন, তাহা হইলে হাজার হাজার মিছিলকারীর রক্তে কালো পীচের রাজপথ শাব্দিক অর্থেই রক্ত গঙ্গায় পরিণত হইত; জেলগেট ও জেলের ওেয়াল চুরমার হইয়া যাইত। এবং পরিণতিতে চোর-ডাকাত সবাই জেলমুক্ত হইয়া সমাজ জীবনকে বিষাক্ত করিয়অ তুলিত, গোল টেবিল বৈঠকের কোন প্রশ্নই উঠিত না। নির্মল বাবুর মত এই ধরনের কর্মকর্তা বড় একটা দেভা যায় না। প্রশাসন তাঁহাকে যথাযত পারিতোষিক দ্বারা যথোপযুক্ত মর্যাদা দিয়াছে কিনা জানি না। হয়ত দেয় নাই। কারণ ক্ষুদ্রমনা, পরম্রীকাতর মাথা ভারী প্রশাসনের পক্ষে না দেওয়াই স্বাভাবিক।
    রাতে আমার কারামুক্তির আদেশ আসে। আমি মুক্তি আদেশ প্রত্যাখান করি এবং সঙ্গে অন্য দুইজন সদ্য কারামুক্তি আদেশপ্রাপ্ত জনাব সিরাজুল ইসলাম খান এবং এডভোকেট মুজিবর রহমান আমার বক্তব্যের সহিত একাত্মতা প্রকাশ করেন। আমাদের দাবী ছিল, দেশরক্ষা বিধি বলে বা নিরাপত্তা আইনে আটক সকল রানন্দীকে মুক্তি দিলেই আমরা কারামুক্তি মানিব; নতুবা নয়। আমাদের অভিনব আন্দোলন পদ্ধতিতে কারাগারের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল মওলানা ওবায়দুল্লাহ বড় বেকায়দায় পড়েন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে স্বরাষ্ট্র সচিবের সাথে যোগাযোগ করেন। ইুতমধ্যেই জাতীয় পরিষদের সদস্য আফাজউদ্দিন ফকীর জেলগেটে আমার সহিত সাক্ষাৎ করেন এবং স্বরাষ্ট্র সচিবের তরঠ হইতে সকল রাজবন্দীদরে মুক্তির নিশ্চয়তা দান করেন। পরিশেষে জেলার নির্মল বাবুর কাকুতি-মিনতিতে সন্ধুবর তাজউদ্দিন আহমদ, ওবায়দুর রহমান, ছত্রনেতা...

(মেজর খুরশীদ, তোফায়েল আহমেদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমান, সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান জিয়াউর রগমান ও সেনাবাহিনীর প্রধা এ.কে.এম শফিউল্লাহ

মুক্তি পাগল বাংলার দামাল মুক্তিযোদ্ধা দেশমাতৃকার স্বাধীনতাই যাদের শেষ কথা-)

...আনিসুর রহমান ও জিয়াউদ্দিন খান আমাকে ১০ নং সেলে ডাকাইয়া নেয় এবং মুক্তিপত্র সই করিতে বলেন। তাহাদের অনুরোধে মুক্তিপত্র সই করি এবং রাত দুইটার পর আমরা কারাগার ত্যাগ করি।
    ১৬ই ফেব্রুয়ারী রাত ১২টায় দেশরক্ষা আইন তুলিয়া লওয়অর কারণে ১৭ই ফেব্রুয়ারী দেশরক্ষা আইনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক সকল রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হইলেও হনাব আনিসুর রহমানকে ১৭ই ফেব্রুয়ারী সকাল ৮টায় দেশনক্ষা আইনে আটকাদেশ হইতে মুক্তি দিয়া জেলগেটে পুনরায় নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হয়।
    পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোর, করাচী, পিণ্ডি ও পেশোয়ারে ছাত্র জনতার আন্দোলন সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী ও নিরস্ত্র মিছিলকারীদের মধ্যে অহরহ সংঘর্ষের কারণে পরিণত হয়। রাজবন্দী জনাব জুলফিকার আলী ভূট্টোর রীট পিটিশন শুনানীর উদ্দেশ্যে পশ্চিম পাকিস্তান হাইকোর্ট কর্তৃক বিচারপতি মুশতাক আহমদ ও বিচারপতি মোহাম্মদ হুল দ্বারা গঠিত স্পেশাল বেঞ্চ ১০ই ফেব্রুয়ারী (১৯৬৯) তারিখের রায়ে জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার অবধি লারকানায় স্বীয় বাসবভনে তাঁহাকে আটক রাখিবার নির্দেশ দান করেন। ২৪শে জানুয়ারী (১৯৬৯) ঢাকায় জাতীয় পরিষদের যে অধিবেশস শুরু হইয়াছিল তাহা ১২ই ফেব্রুয়ারী (১৯৬৯) তারিখ মুলতবী ঘোষণা করা হয়। মূলতবী দিবসে দলীয় প্রধান মওলানা ভাসানীর নির্দেশে সর্বজনাব মশিউর রহমান, আরিফ ইফতেখার (লাহোর), মুজিবুর রহমান চৌধুরী (রাজশাহী) জাতীয় পরিষদের বিদায়ী অধিবেশনে সদস্য পদ হইতে ইস্তফাদানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন এবং সর্বজনাব এ,এইচ,এম, কামরুজ্জামান, ইউসুফ আলী, এ,বি,এম নূরুল ইসলাম ও মিজানুর রহমান চৌধুরী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ (৬ দফা) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের নিকট ইস্তফাপত্র দাখিল করেন। উদ্দেশ্য, ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটিভুক্ত অঙ্গদলীয় জাতীয় পরিষদ সদস্যগণকেও একত্রে সদস্যপদ হইতে উস্তফা দানে উদ্বুদ্ধ করা। যাহা হউক, ২৫শে মার্চ (১৯৬৯) সামরিক আইন জারি করিয়া জাতীয় পরিষদের বিলুপ্তি ঘোষণার কারণে উস্তফাদান প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব পায় নাই।
    ১২ই ফেব্রুয়ারী (১৯৬৯) তারিখে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ (৬ দফা) ওয়ার্কিং কমিটি ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটিতে প্রেরিত স্বীয় প্রতিনিধিবর্গকে এই মর্মে নির্দেশ দেয় যে, ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটি ঘোষিত ৮ দফা কর্মসূচী ৩ হইতে ৮ (অর্থাৎ ৬টি) কর্মসূচীগুলি (আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার যাহার অন্তর্ভুক্ত) বাস্তবায়িত করিয়া সরকার স্বীয় আন্তরিকতা প্রমাণ করিলেই যেন ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটি প্রেসিডেন্ট আইউব খান কর্তৃক আহূত গোল টেবিল বৈঠকে যোগ দেয়, নতুবা নয়।
    আন্দোলনের প্রচণ্ডতায় বিহ্বল ও দিশেহারা আইউব সরকার লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলসমূহ বৃহস্পতিবার, শুক্রবারম শনিবার (১৩ই ফেব্রুয়ারী হইতে ১৫ ফেব্রুয়ারী) বন্ধ ঘোষণা করে। এইদিকে বন্দী জুলফিকার আলী ভূট্টো জরুরী অবস্থা...

(অন্তরঙ্গ মুহুর্তে মুজিব ও কবি জসিম উদ্দিন)

পল্লী কবি জসিম উদ্দিন শেখ মুজিবর রহমানকে নিয়ে একটি দীর্ঘ কবিতা লিখেছিলেন যার কয়েকটি লাইন “....... মুজিবর রহমান ওই নাম যেনো বিসুভিয়াসের অগ্নি-উগারী বান...... শুনেছি আমরা গান্ধীর বাণী জীব করিয়া দান, মিলাতে পারেনি প্রেম বন্ধনে হিন্দু-মুসলমান। তারা যা পারেনি তুমি তা করেছ, ধর্মে ধর্মে আর জাতিতে তুলিয়াছ ভেদ সন্তান বাংলার।”

(১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন স্বদেশে। ডানে তাজউদ্দিন আহমদ বামে খন্দকার মোশতাক আহমদ।)

(১৯৭৪) সালের ৬ই মার্চ বাংলা জাতীয় লীগের সাধারন সম্পাদক জনাব অলি আহাদ পল্টন ময়দানের জনসভায় বক্তৃতারত।)

(১৯৭১ সালে অথৈ পানির উপর মুক্তি যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ হার্ডিঞ্জ ব্রীজ)

(ফারাক্কার অভিশাপগ্রস্থ বর্তমানের হার্ডিঞ্জ ব্রীগ। ব্রীজের নীচ দিয়ে চলারলরত পণ্য বোঝাই ট্রাক বহর। ছবি সৌজন্যে মোঃ সালাউদ্দিন।)

...প্রত্যাহারের দাবীতে ১৪ই ফেব্রুয়ারী (১৯৬৯) হইতে অনশন ধর্মঘট করিবার হুমকি দেন। ১৪ই ফেব্রুয়ারী জনাব ভুট্টোকে বন্দীদশা হইতে মুব্তি দেয়া হয় এবং ১৭ই ফেব্রুয়ারী হইতে জরুরী অবস্থা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।

১৪ই ফেব্রুয়ারী পল্টনে সভা
    ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটি ৮ দফা দাবীর সমর্থনে ও জুলুমের প্রতিবাদে ১৪ই ফেব্রুয়ারী সমগ্র দেশব্যাপী সাধারণ হরতাল ঘোষণা করে এবং একই দিবসে ছাত্রদের সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ ও ১১ দফা দাবীর সমর্থনে ও জুলুমের প্রতিবাদে সাধারন হরতাল ঘোষণা করে। সভায় সংগ্রাম পরিষদের একই হরতাল দিবসের একই কর্মসূচী ঘোষিত হয় এবং পল্টন ময়দানে হরতাল দিবসে উভয় গ্র“পের জনসভা আহবান করা হয়।
    ১১ দফা বনাম ৮ দফা আন্দোলনের ছদ্মবরনে জননেতাদের প্রতি সাধারণ যুবসমাজ ও ছাত্র সমাজের অবিশ্বাস, অবজ্ঞা ও অনীহার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৪ই ফেব্রুয়ারীতে পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসভায়। অপরাহ্ন তিন ঘটিকায় বিশাল জনসমুদ্রে সভাপতিত্ব করিবার জন্য বৃদ্ধ সেতা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জনাব নূরুল আমিনের রাম প্রস্তাব করিতেই সভার মঞ্চ ও সভা হইতে তরুণ শ্রেণী প্রতিবাদমুখর হইয়া উঠে। কোন সুস্থ ও রাজনৈতিক বক্তব্যই শ্রবণ করিতে তরুণ সমাজ প্রস্তুত ছিল না। ধীরে ধীরে, ক্রমে ক্রমে, ধাপে ধাপে, সমগ্র আন্দোলনের পূর্ণ কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব ছাত্রদের সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ কবলিত হয়। উল্লেখ্য যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ৬ দফাকে অঙ্গীভূত করিয়াই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা প্রণীত হইয়াছিল এবং ১১ দফা দাবীকে কেন্দ্র করিয়াই সমগ্র আন্দোলন ছাত্র নেতৃত্বে পরিচালিত হইতেছিল। সেই সাথে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামী শেখ মুজিবর রহমানের ভাবমূর্তিও দিন দিন গগনচুম্বি হইয়া উঠিতেছিল। এইভাবেই অবশেষে শেখ মুজিবর রহমানের মুক্তি প্রায় সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানীদের দাবীতে পরিণত হয়। যাহা হউক, পল্টনের ঐ সভায় ছাত্রলীগের অন্যতম নেতা তোফায়েল আহমদ, আওয়াী লীগের প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদিকা আমেনা বেগম, সদ্য কারামুক্ত (১২ই ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯) আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ, আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মোজাফফর আহমদ বক্তৃতা করেন। অর্থাৎ ৮ দলীয় ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটির অন্য ৬ দলীয় কোন নেতাকেই সেইদিন বক্তুতা করিতে দেওয়া হয় নাই। তবে আমার দৃঢ়মত ছাত্রনেতৃবৃন্দ ইচ্ছা করিলেই উক্ত সভাকে ছাত্র ও জননেতৃবৃন্দের যৌথ সভায় পরিণত করিতে পারিতেন্ পল্টন ময়দানে এই বিশাল বৈপ্লবিক জনসভায়টির অসহিষ্ণু, ভাবাবেগপ্রসূত কার্যধারা দেশ ও দেশবাসী কতটুকু মঙ্গল ও কল্যাণের কারণ হইয়াছে, ভবিষ্যৎ ইতিহাসই ইহার রায় দিবে। তবে এই ঘটনাপ্রবাহ আমার মত আন্দোলনমুখী মানুষকে পীড়া দিয়াছে নিঃসন্দেহে।
    ১৪ই ফেব্রুয়ারী সাধারণ হরতাল পালন উপলক্ষে সুষ্ট হাংগামায় করাচীতে ২ জন ও লাহোরে ২ জন নিহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনিবার প্রয়োজনে প্রশাসন হায়দরাবাদ, করাচী ও লাহোরে সেনা বাহিনী তলব করে। ৮টি দলের সমন্বয়ে ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটি সাধারণভাবে ভাসা ভাসা সমর্থনপুষ্ট ছিল কিন্তু জনসাধারণ জুলফিকার আলী ভূট্টোকেই প্রেসিডেন্ট আইউব বিরোধী রাজনীতি ও গণ-আন্দোলনের প্রধান ব্যক্তি হিনাবে জ্ঞান করিত অর্থাৎ সরল ভাষায় একমাত্র জনপ্রিয় সেতারূপে জনাব ভূট্টো রাজনৈতিক মঞ্চে আবির্ভূত হন।

সার্জেন্ট জহুরুল হকের মৃত্যু
    দেশবাসী যখন প্রাণ দিতেছে, জখম হইকেছেম নির্বচারে পুলিমের জুলুম মোকাবিলঅ করিতেছে, আগরতলঅ ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবর রহমানের মুক্তি দাবী করিতেছে এবং দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট উত্তোরণ মানসে প্রেসিডেন্ট আইউব যখন নেতৃবৃন্দের সহিত গোলটেবিল বৈঠকে বসিতে যাইতেছেন ঠিক এমনি মুহুর্তে ও অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে কুর্মিঠোলা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়। ১৫ই ফেব্রুয়ারী প্রত্যুষে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামীদ্বয় ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক ও সার্জেন্ট জহুরুল হক প্রাতঃকৃত করিতে যাইবার পথে প্রহরারত সৈন্য প্রহরীর গুলীতে গুরুতরভাবে আহত হন এবং সরকারী ঘোষণা মোতাবেক রাত ৯টা ৫ মিনিটে সার্জেন্ট জহুরুল হক কমবাইন্ড মিলিটারী হসপিটালে শাহাদাৎ বরণ করেন। ১৬ই ফেব্রুয়ারী (১৯৬৯) ভোরবেলা সার্জেন্ট জহুরুল হবের লাশ তাঁহার ভাইয়ের এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় লইয়া যাওয়া হয়। সহস্র সহস্র দর্শনার্থী অত্যন্ত শৃংখলার সহিত কাতারে দাঁড়াইয়া শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অপারাহ্ন ২-৩০ মিনিটে শহীদের লাশসহ শোক মিছিল শহরের বিভিন্ন রাজপথ প্রদক্ষিণের পর পল্টন ময়দানে নামাজে জানাযা আদায় করে এবং অপারাহ্ন ৩-৩০ মিনিটে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হককে আজিমপুর গোনস্থানে দাফন করা হয়।
    শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হকের মৃত্যু সংবাদে সমগ্র শহর অগিমূর্তি ধারণ করে। উত্তেজিত অথচ চরম মর্মাহত জনতা বিভিন্ন দিক হইতে শোক মিছিলসহ বিভিন্ন রাজপথ প্রদক্ষিন করিতে থাকে। এই অবস্থায় পুলিশের গুলি, লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের প্রতিবাদে ক্ষিপ্ত জনতা বাংলা একাডেমির পার্শ্ববর্তী গভর্ণমেন্ট গেষ্ট হাউস, আগা মাসীহ লেনে অবস্থিত প্রাদেশিক মুসলিম লীগের (কনভেনশন) সদর দফতর ভবন, নওয়াব হাসান বানকারী ও আইউব মন্ত্রিসভার ইনফরমেশন ও ব্রডকাষ্টিং মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দীনের বাসভবন, ওয়ার্কার্স মন্ত্রী (প্রাদেশিক) মং সু প্র“র সরকারী বাসভবন, প্রাদেশিক মন্ত্রী সুলতান আহমদের সরকারী বাসভবনে অবস্থিত মিনিয়েলস কোয়ার্টার ও একটি মোটর গাড়ীদে অগ্নিসংযোগ করে। এবম্বিধ পরিস্থিতিতে শহরে স্বাভাবিক জীবন যাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হয় এবং অবস্থা নিয়ন্ত্রনে আনিবার প্রচেষ্টায় শহরে সেনা বাহিনী তলব করা হয়। কর্তৃপক্ষ শগরে পুনরায় ১৪৪ ধারা জারি করে। অবশেষে পরিস্থিতি আয়ত্বে আনার জন্য সন্ধ্যা ৭টা হইতে সান্ধ্য আইন জারি করা হয়। ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটির অনুরোধে প্রেসিডেন্ট আইউব খান গোল টেবিল বৈঠক ১৭ই ফেব্রুয়ারী (১৯৬৯)-এর স্থলে ১৯শে ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন এবং গোল টেবিল বৈঠকে যোগদানের জন্য নিম্নলিখিতদের আমন্ত্রন জানান:
    মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী (ন্যাপ), জুলফিকার আলী ভূট্টো (পিপলস পার্টি), এয়ার মার্শাল আসগর খান, লেঃ জেঃ মোহাম্মদ আজম খান, সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ (প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি, ঢাকা হাইকোর্ট),। ইহা ছাড়াও ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটির অংগদলগুলির পক্ষে ব্যক্তিবর্গকে উক্ত বৈঠকে আমন্ত্রন জানানো হয়:

    মমতাজ মোহাম্মদ খান দৌলতানা            পাকিস্তান মুসলিম লীগ
    খাজা খায়ের উদ্দিন                পাকিস্তান মুসলিম লীগ
    মুফতি মাহমুদ                    পাকিস্তান জমিয়াতুল উলামায়ে ইসলাম
    পীর মোহসেন উদ্দিন আহমদ দুদু মিয়া        পাকিস্তান জমিয়াতুল উলামায়ে ইসলাম
    নওয়াবজাদা নাসরুল্লাহ খান            পাকিস্তান আওয়ামী লীগ (৮ দফা)
    আবদুস সালাম খান                পাকিস্তান আওয়ামী লীগ (৮ দফা)
    চৌধুরী মোহাম্মদ আলী                পাকিস্তান নেজাম-ই-ইসলাম পার্টি
    মৌলভী ফরিদ আহমদ                পাকিস্তান নেজাম-ই-ইসলাম পার্টি
    আবদুল ওয়ালী খান                পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি
    মোজাফফর আহমদ                পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পাটি
    নূরুল আমিন                    পাকিস্তান ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট
    হামিদুল হক চৌধুরী                পাকিস্তান ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট
    শেখ মুজিবুর রহমান                পাকিস্তান আওয়ামী লীগ (৬ দফা)
    সৈয়দ নজরুল ইসলাম                পাকিস্তান আওয়ামী লীগ (৬ দফা)
    মাওলানা আবুল আলা মওদুদী            পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী
    অধ্যাপক গোলাম আযম                পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী

    যাহা হউক, ইতিমধ্যে আন্দোলনের পরিব্যাপ্তি মফঃস্বলেও ছড়াইয়া পড়ে। সর্বত্রই প্রতিহিংসার প্রতিচ্ছবি। হিংসাত্মক প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে রাজশাহীদেও। সোমবার দিন (১৭ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৬৯) রাজশাহী মিছিলের শহরে পরিণত হয়। শোভাযাত্রীরা পূর্ব পাকিস্তান কাউন্সিল লাইব্রেরী, রাজশাহী গভর্নমেন্ট কলেজ প্রিন্সিপালের ব্যক্তিগত মোটর গাড়ী ও অকট্রয় পোষ্ট আক্রমণ করে অগ্নিসংযোগ করে। পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার ও লাঠিচার্জের ফলে ১৩ জন আহত হয় এবং ১৮ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। চট্টগ্রাম বন্দর নগরীতেও শাসক কনভেনশন মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের বাড়িঘর ও প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিক্ষুব্ধ জনতা বার বার অগ্নিসংযোগ করিতে প্রচেষ্টা চালায়। জেলা প্রশাসক পরিস্থিতি আয়ত্বে রাখিবার তাগিদে ১৪৪ ধারা জারি করে ই.পি.আর বাহিনীকে তলব করেন এবং ঈদুল আজহা ও শহীদ দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার ১৮ই ফেব্রুয়ারী হইতে চট্টগ্রাম শহরের সকল স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করেন। পশ্চিম পাকিস্তানের করাচী ও অন্যান্য শহরে জনতার আপোষহীন সংগ্রামের অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করিবার ব্যর্থ প্রয়াসে প্রশাসন কর্তৃপক্ষ আগ্নেয়াস্ত্রের যথেচ্ছা ব্যবহার করিয়া ২ জনকে হত্যা করেন। পরিশেষে অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আসিবার জন্য শহরে সেনাবাহিনীকে তলব করা হয়।

ডঃ জোহার মৃত্যু
    ১৭ই ফেব্রুয়ারী (১৯৬৯) পুলিশ ও মিছিলকারীদের সংঘর্ষে উদ্ভূত তিক্ত অবস্থার পুনরাবৃত্তি আশংকায় ১৮ই ফেব্রুয়ারী পূর্বাহ্নেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের রিডার প্রক্টর ডঃ শামসুজ্জোহা, কয়েকজুন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেট প্রহরা দিতে থাকেন। অপরাপর অধ্যাপক কাজলা গেটে প্রহরারত ছিলেন। উদ্দেশ্য, ছাত্রবৃন্দ যেন মিছিলসহ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের চেষ্টা করিতে না পারে। যাহা হউক, অধ্যাপকবৃন্দের এই আন্তরিক প্রয়াস স্বত্ত্বেও এবং সেনাবাহিনীর গাড়ী বা সেনা বাহিনী তলব না করিবার বিষয়ে পূর্বাহ্নেই ম্যাজিষ্ট্রেটের সহিত চুক্তি থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ সেনাবাহিনীপূর্ণ গাড়ী ছুটে আসে এবং কোনরূপ সতর্কবানী উচ্চারণ না করিয়াই গুলিবর্ষণ শুরু করে। দিশাহারা অবস্থায় ডঃ কসিমুদ্দিন মোল্লার সর্বাঙ্গ ক্ষত-বিক্ষত হয় এবং ডঃ শামসুজ্জোহা বেয়নেটের আঘাতে গুরুতরভাবে আহত অবস্থা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নীত হইবার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সরকারী প্রেসনোটের ভাষ্য অনুসারে লেফটেন্যান্টের গুলিতে ডঃ জোহার নিহত হওয়ার কথা বলা হইয়াছিল। তাহা সত্য নয় বরং বেয়নেট চার্জের ফলেই তাঁহার মৃত্যু ঘটে। এইরূপ নাজুক পরিস্থিতিতে প্রশাসন কর্তৃপক্ষ ডদি ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে বিচক্ষণতা ও ধৈর্যের সহিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করিতে ব্যর্থ হন, তাহা হইলে দেশ ও দশের চরম ক্ষতি হইয়া যায় এবং এই ধরনের ক্ষুদে গরম মাথাওয়ালা প্রশাসন কর্তৃপক্ষের কারনেই সমগ্র সরকার জনতার ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়।
    সিদ্ধান্ত ছিল, ৩ জন করিয়া মিছিল বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বাহির হইবে এবং বিভিন্ন রাজপথ প্রদক্ষিণ করিবে। গুলিবর্ষণ ও শিক্ষক হত্যার কারণে পরিস্থিতির গুণগত পরিবর্তন হয়। শুরু হয় মারমুখী জনতার মিছিলের উত্তাল তরঙ্গ, লংঘিত হয় ১৪৪ ধারার সমস্ত নিষেধাজ্ঞা। প্রশাসন কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি বেগতিক দেখিয়া ১৮ই ফেব্রুয়ারী অপরাহ্ন ২-৩০ মিনিটের মধ্যে রাজশাহী শহরে সান্ধ্য আইন জারি করেন। ডঃ জোহার মৃত্যুর খবরে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে এক অব্যক্ত শোকের ছায়া নামিয়া আসে। নোয়াখালী ও কুষ্টিয়ায় ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ আয়ত্বে আনিবার প্রচেষ্টায় পুলিশ গুলি চালায়। নোয়াখালীতে ৩ জন ও কুষ্টিয়ায় ১ জন নিহত হয়। কারফিউ না থাকিলে ঢাকার পরিস্থিতি সেনাবাহিনীও আয়ত্বে আনিতে পারিত কিনা, সন্দেহ। যে অমানুষিক ও বর্বরোচিত পন্থায় পাশবিক শক্তি ডঃ জোহাকে হত্যা করিয়াছে তাহা সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের অস্তিত্ব ও বিবেকের উপরে হানিয়াছে দারুণ কশাঘাত। কোন রক্তমাংসের দেহ এই ঘটনাকে কিছুতেই বিনা প্রতিবাদে শান্তভাবে গ্রহণ করিতে পারে না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় প্রত্যেকটি জেলা শহর, মহকুমা শহর এমন কি থানা সদর পর্যন্ত বিভিন্ন পতাকাতলে ডঃ জোহার মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রতিবাদে মুখর হইয়া উঠে। এমতাবস্থায় বাংগালীর দ্বারে আঘাত হানা ত্যাগের মূর্তপ্রতীক ২১শে ফেব্রুয়ারীর শহীদ দিবস। স্বৈরাচারী শক্তির সাথে জনতার সংঘর্ষ হয় খুলনা ও পাবনা জেলাতে। রংক্তরাংগা ২১শে ফেব্রুয়ারী আবার বাংগালী সন্তানের রক্তপ্রার্থী হয় এবং খুলনা ও পাবনায় যথাক্রমে ৮ জন ও ২ জন শহীদের বুকের শোণীতে পুনর্বার অবগাহন করে ২১শে ফেব্রুয়ারী। এই রক্তদান বৃথা যায় নাই। এক ব্যক্তির শাসন প্রবর্তক, জনতার নার্বভৌমত্ব ছিনতাইকারী, দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইন মোতাবেক দেয় ওয়াদা ভংগকারী প্রেসিডেন্ট আইউব খান এই ২১শে ফেব্রুয়ারী (১৯৬৯) ভবিষ্যত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী না হইবার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন এবং ২২শে ফেব্রুয়ারী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহৃত হয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্তবৃন্দ মুক্তি পান। ঢাকায় সংগ্রামী লক্ষ লক্ষ জনতা তাঁহাদের স্বতস্ফ’র্ত সম্বর্ধনা জানায় অপরাহ্নে অনুষ্ঠিত পল্টন জনসভায়। লক্ষণীয় যে, শেখ মুজিবুর রহমান এই জনসভায় উপস্থিত হন নাই, অধিকস্ত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-নভাপতি তোফায়েল আহমদ একক ও বিচ্ছিন্নভাবে ২৩শে ফেব্রুয়ারী অপরাহ্ন ২ ঘটিকায় ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত শেখ মুজিবুর রহমানকে গণ-সম্বর্ধনা দানে কর্মসূচী ঘোষণা করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত সদ্যমুক্ত অন্যদের সম্পর্কে কোন বক্তব্য নাই। এইভাবেই ষড়যন্ত্র মামলার সকল কৃতিত্ব ও ত্যাগ তিতিক্ষার নৈবদ্য ও জনপ্রিয়তা সুচতুর শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক মূলধনে পরিণত হয়। মামলার প্রকৃত ত্যাগী অভিযুক্ত লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের সকল ভূমিকা একপাশে পড়িয়া রহিল- আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার শিরোপা এককভাবে কুক্ষিগত করিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, জন কয়েক যুব নেতার বদৌলতে তিনি ভূষিত হইলেন বঙ্গবন্ধু উপাধিতে। কাহার প্রাপ্য কে আত্মসাৎ করে? রাজনীতির চানক্যচাল কি ইহাকেই বলে? আসলে, লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীন করিবার গোপন আন্দোলনের প্রকৃত নায়ক। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন উক্ত আন্দোলন লক্ষ্যের বন্ধু ও সমর্থক মাত্র।