ইয়াহিয়া-মুজিব আঁতাত

ফন্ট সাইজ:

     প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত আঁতাতের ফলে ৩০শে মার্চ ঘোষিত আইনগত কাঠামো আদেশের বিরুদ্ধে কোন প্রকার সক্রিয় আন্দোলন সম্ভব গয় নাই। পক্ষান্তরে এই আঁতাতের দরুন সরকারও ৬ দফাভিত্তিক নির্বাচনী প্রচারণায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোন প্রকার ব্যবস্থা অবলম্বন না করিয়া স্বীয় ঘোষিত আইনগত কাঠামো আদেশের পরিপন্থি কাজ করিতে দ্বিধা করেন নাই। বস্তুতঃ এই ব্যাপারে সরকার স্পষ্টতঃ দ্বিমুখী নীতিই অনুসরণ করিয়াছিলেন। হয়তো এইভাবেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান উক্ত ছককাটা রাজপথে শেখ সাহেবের সহিত ক্ষমতা ভাগাভাগি করিবার ও ভোগ করিবারই চিন্তা করিয়াছিলেন। কেনা ইহা বলিবার আপেক্ষা রাখে না যে, আওয়ামী লীগের ‘৬ দফা’ ও আইনগত কাঠামো আদেশ ছিল পরস্পর পরিপন্থি।

ন্যাশনাল প্রোগ্রেসিভ লীগ
    ন্যাশনাল প্রোগেসিভ লীগ নূতন সংগঠন। সর্বস্থরে পরিচিত নয় বিধায় এই সংগঠনের মাধ্যমে একক আন্দোলন করা সম্ভব ছিল না। তাই আমি পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি প্রধান মওলানা ভাসানীর সহিত ২০শে এপ্রিল (১৯৭০) ঢাকায় সাক্ষাৎ করি। আলোচনার পর তিনি কয়েকদিনের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাইবার অভিমত প্রকাশ করেন; কিন্তু সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাইবার প্রয়োজন বাকী জীবনে বোধ করেন নাই। আমাদের অনেক নেতারই মুখ ও পেটের মধ্যে এই ধরনের পরমিল বলিয়াই কি দেশ কি জাতি পুনঃপুনঃ জুুলুমের শিকার হইয়াছে; এবং দেশ ও জাতির অমানিশা বা দুঃখ রজনী কখনও কাটে নাই! এই সময়ে খুলনার খালিশপুর শিল্প এলাকার শ্রমিকদের জনপ্রিয় শ্রমিক নেতা জনাব আশরাফ হোসেন ও জনাব আবদুল বাতেনকে গ্রেফতার করিয়া খুলনা জেলা কারাগারে আটক করিলে মজদুর ফেডারেশনের খুলনা আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি আনিসুর রহমানের নেতৃত্বে হাজার হাজার শ্রমিক খুলনা জেলা কারাগার ঘেরাও করে। ঘেরাও ২৩ ঘন্টা অতিক্রম করিবার পর পরিস্থিতি হঠাৎ মোড় নেয় এবং ৩১শে মে ভোর রাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও শ্রমিকদের মধ্যে অপ্রীতিকর সংঘর্ষ হয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে বহু শ্রমিক আহত হয়। উদ্ভূত তিক্ত পরিস্থিতি সরেজমিনে তদন্তের জন্য আমি খুলনা গমন করি। যাহা হউক, আমার উপস্থিতি শান্তরূপ ধারণে সহায়ক হয়। বেসামরিক জেলা কর্তৃপক্ষ অনেকটা নমনীয় মনোভাব গ্রহণ করিলেও সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ ব্রিগেডিয়ার সাহেব জানান যে, একমাত্র সামরিক আইন প্রশাসকই সামরিক বিধি মামলা প্রত্যাহার করিতে পারেন। শ্রমিক এলাকায় শান্ত আবহাওয়া সুষ্টির প্রয়াসেই আমরা সামরিক, বেসামরিক কর্তৃপক্ষকে গ্রেফতারী পরোয়ানা প্রত্যাহার করিয়া নিউজপ্রিন্ট পেপার মিলস যথারীতি চালু করিতে অনুরোধ করি। 

In the name of Allah the merciful and Almighty. In the name of the brave martyrs and fighters who heralded our initial victory by laying down their lives and undergoing the utmost hardship and repression, in the name of the peasnts workers, students, toiling masses and the people of all classes of this country, we the newly elected members of the National and Provincial assemblies do hereby take oath that we shall dovote all our energy to honour the over whelming support and instinted confidence the people of this country have reposed in the programme and the leadership of Awami League in the National General election.

That we shall remain whole heartly faithful to the people's mandate on the Six point and Eleven point Programmes and that we shall strive to the best of our ability to reflect both in the constitution and in day·to-day praptice the principles of autonomy based on the Six point Formula & Eleven point Programme.

That we shall remain absolutely loyal to the aims, objects and programmes of the Awami League and that we undertake to eliminate permanently extreme political, economic and social differences that exist between region & region and between man and man and struggle relentlessly to lay the foundation of a society free from exploitation so that

injustices yield place to justice and fairplay.

That we shall build up a massive resistance movement against any quarter or evil force that may try tn thwart our line of action behind whclh the people have their support & we shall remain ever prepared for an uncompromising struggle for the establishment ot` rights of the common man.

May Allah help us in our endeavour.

l Joy Bangla -lov Pakistan.


    সামরিক শাসনের আওতায় সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পটভূমিকায় ১লা ও ২রা আগষ্ট (১৯৭০) ন্যাশনাল প্রোগেসিভ লীগের জাতীয় মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলন দলীয় ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র অনুমোদন করে। ন্যাশনাল প্রোগ্রেসিভ লীগের নাম পরিবর্তন করিয়া ন্যাশনাল লীগ রাখা হয়। জনাব আতাউর রহমান খান ও শাহ আজিজুর রহমান যথাক্রমে পাকিস্তান ন্যাশনাল লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং জনাব আতাউর রহমান ও আমি যথাক্রমে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল লীগের সভাপতি ও সম্পাদক নির্বাচিত হই। কিন্তু ২রা আগষ্ট বৈকালিক সম্পাপ্তি অধিবেশনে জনাব আতাউর রহমান খান কোন প্রকার ভূমিকা ছাড়াই দলীয় কর্মকর্তাদের নাম প্রস্তাব করিলে সাধারন কাউন্সিল অধিবেশনে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। প্রস্তাব সমর্থনের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করিয়াই জনাব আতাউর রহমান খান তাঁহার গঠিত কর্মকর্তা তালিকা গৃহীত ঘোষণা করিয়া মঞ্চ হইতে অবতরণ করেন ও প্রস্থান করেন। একটু ধৈর্য, একটু সহনশীলতা, একটু নমনীয়তা, একটু বিচক্ষণতা ও একটু প্রজ্ঞা প্রদর্শন করিলেই সমস্যার মীমাংসা তৎক্ষনাৎ হইয়া যাইত। উত্তরকালে সংগঠনটি ছিন্নভিন্ন হইত না, দ্বিধাবিভক্ত হইত না, সংগঠনে তিক্ততা ও কোন্দল দেখা দিত না এবং দেশ অতি প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্ন রাজনীতির নেতৃত্ব পাইতে পারিত। নেতারা তাহা করিবেন কেন? সবাই আপন আপন স্তরে এক একজন ক্ষুদে হিটলার যে! আমরা বাঙ্গালী, পরশ্রীকাতরতা আমাদের বাঙ্গালী চরিত্রের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ, আমরা সর্বদাই ব্যক্তি নেতৃত্ব, ব্যক্তি প্রাধান্য ও ব্যক্তি পূজার আকাঙ্খী, তাই ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে কোন্দলই আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তাই নীতি ও আদর্শপ্রসূত কার্যক্রমের অবস্থান বহুক্রোশ দূরে। নীতি-আদর্শের পার্থক্য মত ও পার্থক্য সৃষ্টি করে এবং ইহাই স্বাভাবিক। কেতাবে, বাক্যে, বুলিতে আমাদের মুখে নীতি আদর্শের খই ফোটে; কিন্তু ব্যক্তি জীবনে যেমন, গোষ্ঠী জীবনেও তেমনি ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ একমাত্র লক্ষ্য হইয়া থাকে। ইহা দুঃখজনক কিন্তু নির্মম সত্য।

বাংলা মজদুর ফেডারেশনের ভূমিকা
    ১৯৬৪ সালে জনাব এ. আর. সুন্যামত ও দেওয়ান সিরাজুল হককে যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক, জনাব আশরাফ হোসেন, রুহুল আমিন ভূঁইয়া ও এজাজ আহম্মদকে সহ-সম্পাদক এবং আনিসুর রহমানকে সংগঠনিক সম্পাদক করে পাকিস্তান মজদুর ফেডারেশন ইষ্ট জোন গঠন করা হয়। এই সংগঠনটি প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন ও স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এই সংগঠনের নেতা জনাব আশরাফ হোসেন ও আনিসুর রহমানের নেতৃত্বে খুলনায়, আবদুল বাতেন-এর নেতৃত্বে মংলা পোর্টে, আমিনুর রহমান (মল্লিক), গোলাম মোস্তফা (বাটুল), রেজাউল হক সরকার (রানার) নেতৃত্বে উত্তরবঙ্গে, জনাব রুহুল আমিন ভূঁইয়া, আনসার হোসেন (ভানু) নেতৃত্বে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে, আঃ জলিলের নেতৃত্বে ডেমরা শিল্পাঞ্চলে, দেওয়ান সিরাজুল হক, ফজলুর রহমান খাঁ, মোঃ সেলিম হোসেন, আলী আকবর, আজিজুল হক মুক্তর নেতৃত্বে সড়ক পরিবহন শিল্পে গভর্নর মোনায়েম খানের বাড়ী ঘেরাওসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় নেতৃবৃন্দের মুক্তি আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ৭ই জুনের আন্দোলন, ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন, জঙ্গী রূপ ধারণ করে। স্বাধীনতা আন্দোলনে এই সংগঠনটির নেতাকর্মীদের ত্যাগ অপরিসীম। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রশ্নে জাতীয় লীগ দ্বিধা-বিভক্ত হলে এই সংগঠনের নেতা ও কর্মীদের আগ্রহে কুমিল্লা টাউন হলে জাতীয় লীগের সম্মেলনে ‘বাংলা জাতীয় লীগ’ নামকরণ করা হয়। বাংলা জাতীয় লীগ, বাংলা মজদুর ফেডারেশন ও ফরোয়ার্ড ষ্টুডেন্ট ব্লক সমন্বয়ে বাংলা মুক্তি ফ্রন্ট গঠন করে। মুক্তি ফ্রন্টের অনেক ইপিআরটিসির অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনীর লোকেরা অস্ত্র সংগ্রহের জন্য সরকারের আহবানে সামরিক বাহিনীতে পুনরায় যোগদান করে। ২৫শে মার্চের রাত্রে ক্যান্টনমেন্টে অস্ত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে ১৮ জন জোয়ান প্রাণ হারায়। কুমিল্লা মুক্তি ফ্রন্টের কর্মী শিব নারায়ণ দাসের তৈরি পতাকা ২১শে ফেব্রুয়ারী প্রথম কুমিল্লা ইপিআরটিসির ডিপোর সামনে আবদুস সালাম, আবদুর রশিদ, আলী আসগর ও শিব নারায়ণ দাসের নেতৃত্বে উত্তোলন করে। যাহা পরবর্তীতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকার পল্টন ময়দানে আ.স.ম. আবদুর রব-এর নেতৃত্বে উত্তোলিত হয়। কুমিল্লা মুক্তি ফ্রন্টের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের জানুয়ারীর তৃতীয় সপ্তাহ থেকে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া ডিগ্রি কলেজের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে সামরিক বাহিনীর প্রাক্তন হাবিলদার জনাব আবদুস সালামের নেতৃত্বে ইউটিসির রাইফেল দ্বারা মুক্তি পাগল ছাত্র শ্রমিক যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যার ফলে ২৫শে মার্চ কাল রাত্রে ঢাকার সাথে একই সঙ্গে কুমিল্লা ইপিআরটিসি বর্তমান বিআরটিসি ডিপোতে ভিক্টোরিয়া কলেজ ডিগ্রি হোস্টেল, মচজদুর ফেডারেশন আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি আবদুর রশিদ-এর বাসায় পাক বাহিনী হামলা করে।
    এই আবদুস সালাম-এর নেতৃত্বে পলায়সরত কুমিল্লার রাজনৈতিক ছাত্র-শ্রমিক ও জনগণের সহায়তায় মুক্তিযুদ্ধের বক্স নগর ক্যাম্পের কার্যক্রম শুরু হয়। এর প্রাথমিক অর্থ যোগান দিয়াছিল কুমিল্লা ইপিআরটিসি’র শ্রমিকরা এবং ইপিআরটিসির ডিপোতে রক্ষিত শ্রমিকদের সব পোষাক ক্যাম্পে নেওয়া হয়। সেই পোষাকের অনুকরণে পরবর্তীতে মুক্তি যোদ্ধাদের জলপাই রংয়ের পোষাক তৈরী করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ভারতীয় সৈন্যদের লুটপাটে প্রথম বাধা দিয়াছিল খুলনার মজদুর ফেডারেশনের নেতা আশরাফ হোসেনসহ মুক্তি যুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল ও মেজর জয়নাল আবেদীনের নেতৃত্বে যাহা দেশবাসীর স্মরণ থাকা দরকার।
    দেশ স্বাধীন হবার পর অবাঙ্গালীর বাড়ী, গাড়ী ও কল-কারখানা দখলের হিড়িক পরে যায়। অন্যদিকে মজদুর ফেডারেশনের উদ্যোগে প্রথম ‘শহীদ স্মরণী ট্রাষ্ট’ গঠন করা হয়। যাহাতে মজদুর ফেডারেশনের নেতৃত্বে শ্রমিক সংগঠনগুলি অবাঙ্গালীর সম্পদ এনে জড় করে। পরবর্তীতে সরকার মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট গঠন করে বলেছিল, যে অবাঙ্গালীর সকল সম্পদ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্টে আনা হবে। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় শহীদ স্মরণী ট্রাষ্টের সম্পদ মুক্তিযোদ্ধা ট্রাষ্টে নেওয়া হলেও আওয়ামী নেতাদের দখলকৃত সম্পদ ব্যক্তি নামেই রয়ে গেল।
    অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার পর বুক ভরা আশা নিয়ে জাতি যাদরে ভাগ্য নিয়ন্ত্রনের দায়িত্ব দিয়াছিল। তাদের প্রণীত সংবিধানে এক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করণ, লাল বাহিনী গঠন, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার হরণসহ বাকশাল গঠনের প্রতিবাদ করেছিল মজদুর ফেডারেশন, যার ফলে শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের সন্ত্রসীরা ফেডারেশনের ১০৮ বিসিসি রোডের অফিস জোরপূর্বক দখল করে ও দেওয়ান সিরাজুল হক সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করে। রাষ্ট্রপতির ৯নং আদেশ বলে প্রায় ২ শতাধিক ইপিআরটিসির শ্রমিক-কর্মচারীকে চাকুরী চ্যুত করে। ধর্মঘট ও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবীতে শতাধিক চটকল ইউনিয়ন ধর্মঘট করে। উক্ত ধর্মঘটের সমর্থনে বাংলা মজদুর ফেডারেশন, বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলা শ্রমিক ফেডারেশন, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, জাতীয় শ্রমিক জোট ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনের কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং ইসষ্টিটিউটে সভা আহবান করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় মজদুর ফেডারেশন নেতা দেওয়ান সিরাজুল হকের গ্রেফতারের সংবাদে নেতৃবৃন্দগণ সভায় উপস্থিত না হয়ে বাকশালে যোগদানের প্রতিযোগীতায় নেমে পরে। দেওয়ান সিরাজুল হকসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দরা ৭৫-এর শেষ ভাগে মুক্তি লাভ করে।

নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড়
    যাহা হউক, আগষ্ট মানে বন্যা দেকা দেওয়ায় নির্বাচন তারিখ পিছাইয়অ দেওয়া হয়। জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন তারিখ ৫ই ও ২২শে অক্টোবরের স্থলে যথাক্রমে ৭ই ডিসেম্বর ও ১৭ই ডিসেম্বর পুনঃনির্ধারিত হয়। আমরা সর্বপ্রকার তিক্ততা ভুলিয়া গিয়া সংগঠন ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে জনাব আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অবথীর্ণ হই। ১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিবাত্যা ও জলোচ্ছাসে হাতিয়া, সন্ধীপ, ভোলা ইত্যাদি সমুদ্র উপক’লবর্তী এলাকায় ২০ লক্ষ অধিবাসীর প্রাণহানি ঘটে এবং অজস্র গবাদী পশু, ঘরবাড়ী, আসবাবপত্র, জমি-জিরাতের হানি হয়। ইতিপূর্বে ১৮৭৬-এর নভেম্বর মাসের মহাবিধ্বংসী ঘূর্ণিবাত্যা ও জলোচ্ছাসে সমুদ্র উপকূলবর্তী ২ লক্ষ লোকের প্রাণহানি ঘটিয়াছিল। মহাচীন প্রজাতন্ত্র সফরান্তে রাওয়ালপিন্ডির পথে ঢাকা আগমন করিলেও প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান বাত্যাবিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শন হইতে বিরত থাকেন। এবং গভর্নর এস.এম আহসানকে কতিপয় উপদেশ দিয়া রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে ঢাকা ত্যাগ করেন। ইহাতে বাঙ্গালী মন আরও তিক্ত ও বিষাক্ত হইয়া পড়ে। আওয়ামী লীগ সুচতুরভাবে ইহাকেও নির্বাচনী প্রচারণায় অত্যন্ত দক্ষতা ও কার্যকারিতার সহিত ব্যবহার করে। উল্লেখ্য যে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ব্যতীত সকল রাজনৈতিক দলই সমন্বরে নির্বাচন পিছাইবার আওয়াজ তুলিয়াছিল। কারণ, অবশ্যই বাত্যাবিধ্বস্ত হতভাগ্য মানব সন্তানদের প্রতি দরদ ছিল না। নির্বাচনী হালে পানি পাওয়ার ব্যাপারটাই ছিল প্রকৃত কিন্তু অব্যক্ত কারণ। প্রতিকূল আবহাওয়ায় ভীত সন্ত্রস্ত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কর্তৃক ২৩শে নভেম্বর ঢাকায় পল্টন ময়দানের আহূত জনসভায় মওলানা ভাসানী ‘স্বাধীন সার্বভৌম পূর্ব পাকিস্তানের’ আওয়অজ প্রকাশ্যে উত্থাপন করেন। বলাই বাহুণ্য যে, ১৯৬৮-৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও প্রেসিডেন্ট আইউব খান কর্তৃক আহূত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের গোল টেবিল বৈঠকের ব্যর্থতার পর পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর হৃদয়ে শেখ মুজিবের সার্বজনীন শ্রদ্ধা, আস্থঅ ও জনপ্রিয়তা অর্জন এবং একচ্ছত্র নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার দরুন অনেকটা বেকায়দায় পতিত হইয়াই ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা হাসিলের উদ্দেশ্যেই মওলানা ভাসাণী আকস্মিকভাবে এই স্বাধীন সার্বভৌম পূর্ব পাকিস্তানের দাবী তুলিয়াছিলেন অথচ এই মওলানা ভাসানীই ১৯৬২৩ সালের কারামুক্তির পর এক ব্যক্তির শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে অংশগ্রহণ না করিয়া পাক-চীন সম্পর্কোন্নয়নের একদিকে ঘেষা অন্ধ চিন্তায় প্রেসিডেন্ট আইউব খান সরকারের পিছনে প্রত্যক্ষ সমর্থন যোগাইয়া গিয়াছেন। আইউবের পতনের পর ইহা তাঁহার নয়া মূর্তি! এইদিকে তিনিই ১৯৭০ সালের আগষ্ট মাসে খুলনায় অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির কাউন্সিল অধিবেশনে ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত নির্বাচন না পিছাইলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়া রাখিয়াছিলেন। ১২ই নভেম্বর (১৯৭০) উপকূল এলাকায় ও দ্বীপাঞ্চলে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসে প্রাকৃতিক ধ্বংসলীলার অজুহাতে নির্বাচন বানচাল বা স্থগিত রাখিবার উদ্দেশ্যে যাহারা সোচ্চার ছিলেন সেইসব নেতা যথা পাকিস্তান ন্যাশনাল লীগের সভাপতি ও পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, পাকিস্তান ন্যাশনাল লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে বিরোধী দলের ডেপুটি লীডার শাহ আজিজুর রহমান, পূর্ব পাক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-এর সভাপতি পীর মোহসীন উদ্দিন আহমদ, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের প্রাক্তন সদস্য এ.এস.এম সোলায়মান, পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও ১৯৬২-৬৫ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে বিরোধী দলের ডেপুটি লীডার মশিউর রহমান ও আরো অনেকে সাধারণ ভোটদাতাদের নিকট যথার্থই হালে পানি পাইতেছিলেন না। তাহারা ৬ দফাভিত্তিক স্বায়ত্বশাসন আন্দোলনের নামে ভিরমীও ভাইতেন। মওলানা ভাসানীর স্বাধীন সার্বভৌম পূর্ব পাকিস্তান দাবীর ছত্রছায়ায় সস্তা বাজীমাত করিবার উন্মাদনায় মওলানা ভাসানী কর্তৃক আহূত ২৩শে নভেম্বর (১৯৭০), ৪ঠা ডিসেম্বর (১৯৭০) ও ১০ই জানুয়ারী পল্টন জনসভায় ও ৯ই জানুয়ারী (১৯৭১) সন্তোষ জাতীয় সম্মেলনের আসর জমাইয়াছিলেন। যখন মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়, তখন পূর্ব পাক ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি সাধারণ সাধারণ সম্পাদক জনাব মশিউর রহমান ভারত ভূমিতে গমন করিয়াছিলেন বটে তবে মুক্তিযুদ্ধ যখন মধ্যগগনে, বাঙ্গালীরা পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যখন মরণপণ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে লিপ্ত, জনাব মশিউর রহমান মুক্তিযুদ্ধকে পিছন হইতে ছুরিকাঘাত করিবার মানসে ভারত ভূমি হইতে চলিয়া আসে ও আগষ্ট মাসে (১৯৭১) পাক হানাদার বাহিনীর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করে ও রংপুর ডিষ্ট্রিক্ট কাউন্সিল সভায় পাকিস্তানের অখণ্ডত্বের পক্ষে রাজনৈতিক সমাধানের আওয়াজ তুলেন। পরবর্তীকালে ৪ঠা সেপ্টেম্বর (১৯৭১) ঢাকায় শান্তিনগর বাসবভনে সাংবাদিক সম্মেলন করে পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক সমঝোতার পক্ষে ওকালতি করে পাক হানাদার বাহিনীর মনোরঞ্জনে প্রয়াসী হয় আর জনাব আজিজুর রহমান জাতিসংঘে পাক সরকার ডেলিগেশনে ডেপুটি লীডার নিযুক্ত হইয়া পাক-রাষ্ট্রীয় অখণ্ডত্ব বজায় রাখিবার পক্ষে ও বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য রাখেন ইহাই হইল নেতৃচরিত্র। স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করিবার লক্ষ্যে সকাল-বিকাল মত পরিবর্তন করে-জাতি, রাষ্ট্র, জনগণ, আদর্শনীতি তাহাদের চিন্তা-চেতনায় কত গৌণ। ঘূর্ণিবাত্যা বিধ্বস্ত এলাকা সফরের পর শেখ মুজিব ২৬শে নভেম্বর ঢাকায় প্রেস কনফারেন্সে সাঙবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, “আমি আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের দাবী জানাইয়াছি, স্বাধীনতার নয়।” এইদিকে নির্বাচন বয়কটের প্রশ্নে দ্বিমত সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল লীগের সাধারন সম্পাদক হিসাবে আমি সভাপতি আতাউর রহমান খানের তাগিদে ৪ঠা ডিসেম্বর (১৯৭০) পল্টন জনসভায় যোগ দিয়াছিলাম।
    পাকিস্তান ন্যাশনাল লীগের সভাপতি আতাউর রহমান খান ২৮শে নভেম্বর জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা হইতে স্বীয় নাম প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন এবং ২৯শে নভেম্বর সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি ন্যাশনাল লীগ মনোনীত প্রার্থীদিগকেও জাতীয় পারিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা না করিতে অনুরোধ জানান। আমার নির্বাচনী এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়া-সরাইল-নাছিরনগর হইতে ২৯শে নভেম্বর ঢাকায় পৌঁছিয়া ইংরেজী দৈনিক পাকিস্তান অবজারবার পত্রিকায় দলীয় সভাপতি আতাউর রহমান খানের এই বিবৃতি পাঠে আমি হতভম্ব হইয়া পড়ি। তৎক্ষনাৎ তাঁহার ধানমন্ডিস্থ বাসভবনে দেখা করিয়া আমার ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া প্রকাশকালে তাঁহাকে বলি যে, তাঁহার ঘোষিত সিদ্ধান্ত সংগঠনের গঠনতন্ত্র পরিপন্থি, অনিয়মতান্ত্রিক ও অবিবেচনাপ্রসূত। প্রথমতঃ সংগঠনের পার্লামেন্টারী বোর্ড, ওয়ার্কিং কমিটির সুনিদিষ্ট সিদ্ধান্ত ব্যতীত নির্বাচনে অংশগ্রহণ হইতে বিরত থাকিবার অধিকার সংগঠনের সভাপতির একার নাই; দ্বিতীয়তঃ নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখের মাত্র সাতদিন বাকী। সুতরাং মনোনীত প্রার্থীদের মতামত গ্রহণ ব্যতীত এইরূপ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ অন্যায়। তৃতীয়তঃ আমি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। আমার সহিত আলোচনা করা অপরিহার্য ছিল। আমি তাঁহাকে ইহাও বলি যে, এ ধরনের ব্যক্তি-০রাজনীতির অভিশাপ সমগ্র সংগঠনকে পোহাইতে হইবে। ব্যক্তি পূজার রাজনীতি আমরা করিব না এবং একার সিদ্ধান্তই পার্টির সিদ্ধান্ত হইতে পারে না। যদিও আজ দলীয় ঐক্যের খাতিরে আমি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা হইতে আমার নাম প্রত্যাহার করিতেছি, তবে। ভবিষ্যতে সংগঠনিক ফোরামে ব্যক্তি-প্রধান রাজনীতির সুরাহা করিতে সচেষ্ট থাকিব।
    সবাই জানেন, গণত্রান্ত্রিক সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলীয় ভূমিকা দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৭ই ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন। আতাউর রহমান খানের বিবৃতিতে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন বর্জনের আহবান ছিল না। তাই ন্যাশনাল লীগ মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণার উদ্দেশ্যে আর কালবিলম্ব না করিয়া আমি ঢাকা ত্যাগ করি। পরিতাপের বিষয়, সংগঠনের সভাপতি আতাউর রহমান খান ইংরেজী দৈনিক পাকিস্তান অবজারবারের ১৬ই ডিসেম্বরের সংখ্যায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ঘোষণা করেন যে, প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে কোন ন্যাশনাল লীগ মনোনীত প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করিতেছেন না। বলা আবশ্যক যে, পূর্বের মতই এই ঘোষণাও ছিল সাংগঠনিক গণতন্ত্রের পরিপন্থি। ইহা ছিল বস্ততঃ সংগঠনকে দিখণিডত করিবার এক প্রকাশ্য উস্কানী।

বাংলা জাতীয় লীগ
    নীতিজ্ঞানবর্জিত নেতৃত্বের খপ্পর হইতে সংগঠনকে মুক্ত করিবার তাগিদে ১৯৭১ সালের ১০ই জানুয়ারী কুমিল্লায় বাংলা ন্যাশনাল লীগের বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশন আহবান করি। অধিবেশন বঙ্গবাসীদের নব জাগ্রত জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও বিকাশকে স্বাগত জানায় ও জনমানুষের নবচেতনার প্রতিধ্বনি করিয়া দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করে:
    
    “স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে
    কে বাঁচিতে চায়”
    এই দেশে জাতীয়তাবাদের চেতনার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটিতে থাকে ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর হইতেই। এবং এই জাতীয়তাবাদী চেতনার রেশ ধরিয়া পাক-ভারত সশস্ত্র সংঘাত, আশীর্বাদপুষ্ট বরপুত্রদ্বয় জনাব জুলফিকার আলী ভুট্টো ও শেখ মুজিবুর রহমান যথাক্রমে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান অঞ্চলে একচ্ছত্র জন-প্রিয় ব্যক্তিসত্ত্বারূপে আবির্ভূত হন। আগেই বলিয়াছি, ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধবিরতি ও তাসখন্দ শান্তিচুক্তি বিরোধী প্রচণ্ড গণ-অসন্তোষই পশ্চিম পাকিস্তানে জনাব ভুট্টোর একক ব্যক্তি জনপ্রিয়তার মূল ভিত্তি ছিল এবং ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধকালে ঢথোপযুক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবর্তমানে ও অভাবে পূর্ব পাকিস্তানীদের অসহায় জনিত ক্ষোভ ও লাহোর প্রস্তাবভিত্তিক স্বাধিকারের ক্রমবর্ধমান অপ্রতিরোধ্য গলদাবীই নিরবচ্ছিন্ন সরব কণ্ঠ শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তার দৃশ্যমান কারণ ছিল। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ আসনে যথাক্রমে শেখ মুজিব পরিচালিত আওয়ামী লীগ ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর পরিচালিত পিপল্স পার্টির একচেটিয়া বিজয় ছিল উপরোক্ত বিশেষ রাজনৈতিক অবস্থারই ফলশ্রুতি। লক্ষণীয় যে, আওয়ামী লীগ মনোনীত কোন প্রার্থী পশ্চিম পাকিস্তানে এবং পিপল্স পার্টি মনোনীত কোন প্রার্থী পূর্ব পাকিস্তানের কি জাতীয় পরিষদে কি প্রাদেশিক পরিষদের কোন আসনে জয়লাভ করিতে সমর্থ হয় নাই অর্থাৎ কোন দলই জাতীয় বা নিখিল পাকিস্তান পার্টির মর্যাদা অর্জন করিতে পারে নাই। ইহার দরুনই ক্ষমতালোভী জুলফিকার আলী ভুট্টোর মুখ হইতে এই মন্তব্য উচ্চারিত হইতে পারিয়াছিল যে, পূর্ব-পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের ও পশ্চিম পাকিস্তানে পিপল্স পার্টির নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করা হউক এবং কেন্দ্রের সরকার গঠনের ফর্মূলা বাহির করা হউক।

    আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে ১৬৭টি আসন লাভ করে। অপর দুইটি আসনে নির্বাচিত হন পি.ডি.পি প্রধান জনাব নূরুল আমিন এবং রাজা ত্রিবিদ রায়। প্রাদেশিক পরিসদে আওয়ামী লীগ ২৬৬টি আসন লাভ করে। অপর ১২টি আসনে পি.ডি.পি-২ নেজামে ইসলাম-১, জামায়াতে ইসলামী-১, ন্যাপ (মস্কো)-১, স্বতন্ত্র ৭টি আসনে জয়লাভ করে।
    আওয়ামী লীগ ৩রা জানুয়ারী (১৯৭১) বিজয় দিবস ঘোষণা করে। বিজয় দিবস উপলক্ষে ঢাকা রেসকোর্সে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগ টিকেটে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যবৃন্দের ৬ দফা বাস্তাবায়নের প্রকাশ্য শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। আওয়ামী লীগের সেই শপখনামাটি নিম্নে প্রদত্ত হইল:

In the name of Allah the merciful and Almighty. In the name of the brave martyrs and fighters who heralded our initial victory by laying down their lives and undergoing the utmost hardship and repression, in the name of the peasnts workers, students, toiling masses and the people of all classes of this country, we the newly elected members of the National and Provincial assemblies do hereby take oath that we shall dovote all our energy to honour the over whelming support and instinted confidence the people of this country have reposed in the programme and the leadership of Awami League in the National General election.

That we shall remain whole heartly faithful to the people's mandate on the Six point and Eleven point Programmes and that we shall strive to the best of our ability to reflect both in the constitution and in day·to-day praptice the principles of autonomy based on the Six point Formula & Eleven point Programme.

That we shall remain absolutely loyal to the aims, objects and programmes of the Awami League and that we undertake to eliminate permanently extreme political, economic and social differences that exist between region & region and between man and man and struggle relentlessly to lay the foundation of a society free from exploitation so that

injustices yield place to justice and fairplay.

That we shall build up a massive resistance movement against any quarter or evil force that may try tn thwart our line of action behind whclh the people have their support & we shall remain ever prepared for an uncompromising struggle for the establishment ot` rights of the common man.

May Allah help us in our endeavour.

নিম্নে উক্তশপথনামার বঙ্গানুবাদ দেয়া হইল:

      করুণাময় ও সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালার নামে, বীর শহীদান ও যোদ্ধাদের নামে যাহারা স্বীয় জীবন বিসর্জন করিয়া ও অশেষ দুঃখ ও নির্যাতন স্বীকার করিয়া আমাদের প্রাথমিক বিজয় নিশ্চিত করিয়াছে, কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-মেহনতি জনতা ও এই দেশের সকল শ্রেণীর মানুষের নামে আমরা নব-নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যরা এতদ্বারা শপথ গ্রহণ করিতেছি যে, জাতীয় সাধারণ নির্বাচনে দেশের জনগণ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ও কর্মসূচীর প্রতি যে ব্যাপক সমর্থন ও অবিচল আস্থা জ্ঞাপন করিয়াছেন তাহার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য আমাদের সকল শক্তি নিয়োজিত করিব।
    আমরা সর্বোতভাবে ৬ দফা ও ১১ দফা কর্মসূচীর প্রতি, জনগণের ম্যান্ডেটের প্রতি বিশ্বস্ত থাকিব এবং উভয় কর্মসূচীকে শাসনতন্ত্রে প্রতিফলিত করিতে এবং ৬ দফা ও ১১ দফা কর্মসূচীভিত্তিক স্বায়ত্বশাসনের নীতিমালঅকে দৈনন্দিন কর্মে প্রতিফলিত করিতে আমাদের সর্বক্ষমতা নিয়োগ করিব।
    আমরা আওয়ামী লীগের কর্মসূচীর প্রতি পরিপূর্ণভাবে অনুগত থাকিব এবং বর্তমানে অঞ্চলে অঞ্চলে ও মানুষে মানুষে যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বৈষম্য বিদ্যমান রহিয়াছে তাহা দূর করিব, এবং এমন একটি শোষণমুক্ত সমাজের ভিত্তি স্থাপনে সংগ্রাম করিব যেখানে অন্যায়ের পরিবর্তে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।
    আমাদের কর্মসূচী যাহার প্রতি জনগণের সমর্থন রহিয়াছে তাহাকে বানচাল করিবার জন্য যদি কোন মহল ও দৃষ্ট-শক্তি তৎপর হয়, তাহা হইলে আমরা তাহাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিক এবং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আপোষহীন সংগ্রামের জন্য আমরা সদা প্রস্তুত থাকিব।
    আল্লাহ আমাদের প্রচেষ্টায় সহায় হউন।
জয় বাংলা-জয় পাকিস্তান।

     উল্লেখ্য যে, এই অনুষ্ঠানে শেখ মুজিবুর রহমান স্বীয় ভাষণ সমাপনান্তে ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় পাকিস্তান’ ধ্বনি দ্বারা বাঙ্গালীর দাবী-দাওয়া আদায়ের অঙ্গীকার ঘোষণঅ করেন।

ইয়াহিয়ার কালক্ষেপণ
    নির্বাচনোত্তরকালে প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান সন্দেহজনক উদ্দেশ্যে পিন্ডি, ঢাকা, লারকানা পদচারণা করিয়া তাঁহার মূল কর্তব্য ও তাঁহার দেয়া আইনগত কাঠামোর আদেশ মোতাবেক ১২০ দিনের মধ্যে সংবিধান প্রণয়নের জন্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবানে অনর্থক কালক্ষেপণ করিতেছিলেন। ১৯৭১ সালের ১১ই জানুয়ারী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ঢাকা আগম এবং ১২ ও ১৩ই জানুয়ারী শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত সাক্ষাত এবং ১৪ই জানুয়ারী ঢাকা ত্যাগকালে শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী ঘোষনা ও ১৯৭০ সালের ২৮শে ডিসেম্বর করাচীতে, ১৯৭১ সালের ১৭ই জানুয়ারী লারকানায়, ১৯৭১ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারী রাওয়ালপিন্ডিতে, ২৬শে ফেব্রুয়ারী ইয়াহিয়া-ভুট্টো পুনঃপুনঃ সাক্ষাৎ ছিল পরবর্তীকালের ঘটনারাজীকে অনভিপ্রেত খাতে প্রবাহিত করিবার অপপ্রয়াসমাত্র। স্বীয় উদ্যোগে ইয়াহিয়া খানের এই ব্যক্তিগত কূটনীতির আশ্রয় গ্রহণ করিবার বিশেষ কারণ আর কিছুই ছিল না, ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট পদপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধান। ক্ষমতা লোভই তদানীন্তন সামরিক বাহিনীর অধিনায়কের কর্মকান্ডকে নিয়ন্ত্রয় করিত, দেশপ্রেমও নয়, কর্তব্যরোধ বা নৈতিকতাবোধও নয়।
    এই দিকে পাকিস্তান পিপল্স পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো ২৫ সদস্যবিশিষ্ট এক প্রতিনিধিদলসহ ১৯৭১ সালের ২৭শে জানুয়ারী সাংবিধানিক বিষয়ে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত আলোচনা করিবার নিমিত্ত ঢাকা আগম করেন এবং ৩০শে জানুয়ারী  ঢাকা ত্যাগ করেন। পরিতাপের বিষয়, উভয় নেতার ব্যক্তিগত খামখেয়ালীপনা ও অহমিকাবোধই তাঁহাদের ২৭, ২৮ ও ২৯শে জানুয়ারী তিন দিবসব্যাপী আলোচনাকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে।
    ইতিমধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কায়েমী স্বার্থবাদী মহল সংবিধান প্রণয়ন বানচালে অত্যন্ত তৎপর হইয়া উঠে। সংবিধান প্রণয়নে গণপরিষদের সহজাত সার্বভৌম অধিকার অস্বীকার করিয়া জনাব জুলফিকার আলী ভুট্টো অদ্ভূত ও ইতিপূর্বে অশ্র“ত এক থিওরী আকস্মিকভাবে ঘোষণা করেন এবং বলেন, Three bastions of Power Awami League, Peoples party and Army. অর্থাৎ ক্ষমতার তিনটি খুঁটি-আওয়ামী লীগ, পিপলস পার্টি এবং সৈন্য বাহিনী। ইহার সারমর্ম এই দাড়ায় যে, বেতনভুক্ত সরকারী কর্মচারী, সামরিক বাহিনী সংবিধান রচনায় ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বিন্যাসে সংশ্লিষ্ট। এইভাবেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কর্তৃক গণপরিষদ অধিবেশন আহবানে অহেতুক কালক্ষেপণ, স্বউদ্যোগে ব্যক্তিগত কূটনীতির আশ্রয় গ্রহণ, জনাব জুলফিকার আলী ভুট্টো কর্তৃক সংখ্যাধিক্য গণপরিষদ সদস্যদের সংবিধান গ্রহণে অস্বীকৃতি ও আকস্মিকভাবে সশস্ত্র বাহিনীকে ভবিষ্যত সংবিধানের রূপরেখা নির্ধারণে জড়িত করিবার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রস্তাব, প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক শাসনকর্তা জেনারেল ইয়াহিয়া খান কর্তৃক আইনগত কাঠামো আদেশের খেলাফে আওয়ামী লীগকে সাধারণ নির্বাচনে ৬ দফা দাবীর উপর রায় দানে নির্বাচকমন্ডলীকে আহবানের সুযোগ দান, রাজনৈতিক বিবর্তনের বিভিন্ন দিক কালের ঘটনা স্রোতেরই এক নীরব সাক্ষী।

বিমান ছিনতাই
    এক অনিশ্চিত ও সংকটজনক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশ যখন কিংকর্তক্যবিমূঢ়, তখনই ঘটনা প্রবাহের এক নূতন অথচ অশুভ ও সর্বনাশা দিক উন্মোচিত হইল। ১৯৭১ সালের ৩০শে জানুয়ারী ‘গঙ্গা’ নামীয় এক ভারতীয় ফকার ফ্রেন্ডশীপ বিমান জম্মু বন্দরে অবতরণকালে দুইজন কাশ্মীরী স্পাই মোঃ হাশেম কোরেশী ও মোঃ আশরাফ ছিনতাই করে। তাহারা নিজদের জম্মু ও কাশ্মীর ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের সদস্য বলিয়া দাবী করে এবং ছিনতাইকৃত বিমানটিকে লাহোর বিমান বন্দরে অবতরণ করিতে বাধ্য করে। ছিনতাইকারীগণ আরও দাবী করে যে, ভারত সরকার ৩৬ জন আটক কাশ্মীর মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তি দিলে ফকার বিমানটি ভারতকে ফেরত দেওয়া হইবে। ভারত দাবী মানিতে অস্বীকৃতি জানাইলে ছিনতাইকারীরা ২রা ফেব্রুয়ারী (১৯৭১) বিমানটি লাহোর বিমান বন্দরে ডিনামাইট দ্বারা ধ্বংস করে। প্রণিধানযোগ্য ঘোষণা আসে ভারতীয় কাশ্মীর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী গোলাম মোহাম্মদ সাদিকের নিকট হইতে। তিনি জানান, মোহাম্মদ হাশেম কোরেশী (ছিনতাইকারীর অন্যতম) একজন ডবল এজেন্ট এবং ভারতীয় কাশ্মীর সরকার কয়েক মাস পূর্বেই ছিনতাই পরিকল্পনা কোরেশীর নিকট হইতেই জ্ঞাত হইয়াছিলেন, কিন্তু ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকারের এক এজেন্সীর আশ্রয়ে থাকায় কাশ্মীর সরকারের পক্ষে ছিনতাইকারী কোরেশীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয় নাই।
    ৩১শে জানুয়ারী ঢাকা হইতে প্রত্যাবর্তকালে লাহোর বিমান বন্দরে অবতরণ করিয়া জনাব জুলফিকার আলী ভুট্টো ছিনতাইকারী মোহাম্মদ হাশেম কোরেশীর সহিত আলোচনা করেন। পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের মধ্যে নাজুক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সে সময়ে জনাব ভুট্টোর এই ধরনের বালসুলভ অভিনয় বিশেষ ক্ষতির কারণ হইয়া দাঁড়ায়।
    উল্লেখ্য যে, ভারত তার বিমান ধ্বংসের প্রতিবাদে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসাবে ২রা ফেব্রুয়ারী হইতে পাকিস্তানের সমস্ত বেসামরিক যাত্রীবাহী বিমান ভারতীয় আকাশ পথে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যাতায়াত বন্ধ করিয়া দিয়াছিল। তাই অনেকের ধারণা ছিল এই যে, ছিনতাই নাটক সুপরিকল্পিত এবং পাকিস্তান রাষ্ট্র ধ্বংসের জন্য সযত্নে রচিত ভারতীয় বৃহত্তর ষড়যন্ত্রমূলক নাটকের অন্যতম অংশমাত্র।
    ছিনতাইকারী মোহাম্মদ হাশেম কোরেশী যে একজন ডবল এজেন্ট ছিলেন, ভারতীয় কাশ্মীরের মন্ত্রী মোহাম্মদ সাদেকের সেই বক্তব্য আগেই উল্লেখ করিয়াছি। ছিনতাই নাটকটিই পাকিস্তানের নাজুক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দুই অঞ্চলের মধ্যে দ্রুত বিমান যোগাযোগ অবসানের অজুহাত সুষ্টি করে। ঐদিকে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানকল্পে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা গ্রহণের পাকিস্তানী প্রস্বাবও ভারত সরকার প্রত্যাখ্যান করে। ইহা আর যাহা হউক, দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সহায়ক ছিল না। ৩রা ফেব্রুয়ারী আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান ছিনতাইকৃত বিমান ধ্বংসের ঘটনাকে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলিয়া আখ্যা দেন। পক্ষান্তরে পিপলস পার্টি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ছিনতাইকৃত বিমান ধ্বংসকে সমর্থন করেন। উভয় নেতার ববিৃতিই ছিল যথেষ্ট রহস্যপূর্ণ। আরো রহস্যপূর্ণ ছিল ভুট্টোর ১৩ই ফেব্রুয়ারীর বিবৃতি। বিবৃতিতে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড হকি কাপ টুর্নামেন্টে ভারতীয় হকি টীমের অংশগ্রহণে বিরোধিতা করেন। তদুপরি ১৩ই ফেব্রুয়ারীর বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী কর্তৃক এই ঘটনায় স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান দাবীর যর্থার্থতা খুঁজিয়া বাহির করিবার প্রয়াস ভারত সরকারকে সুপরিকল্পিত সুদূর লক্ষ্যমুখে অতি সন্তর্পণে অগ্রসর হইতে উৎসাহিত করে।
    যাহা হউক, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া অনেক টালবাহানা ও গড়িমসির পর এবং জনাব জুলফিকার আলী ভুট্টোর সহিত ১২ই ফেব্রুয়ারী (১৯৭১) আলোচনাক্রমে এক ঘোষণায় ৩রা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ঢাকা আহবান করেন। সাড়ে সাত কোটি বঙ্গবাসীর মুখপাত্র হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান ইতিপূর্বেই প্রেসিডেন্টকে ১৫ই ফেব্রুয়ারীর মধ্যে ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবানের অনুরোধ জানাইয়াছিলেন।
    প্রেসিডেন্ট কর্তৃক জাতীয় পরিষদ অধিবেশন আহবানের পরপরই পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক আবহাওয়া ক্রমশঃ উত্তপ্ত হইতে থাকে। ১৫ই ফেব্রুয়ারী পেশোয়ারে এক সাংবাদিক সম্মেলনে জুলফিকার আলী ভুট্টো ঘোষণা করেন যে, জাতীয় পরিষদ অধিবেশনের পূর্বে কোন প্রকার সমঝোতা ও বোঝাপড়া না হইলে পিপলস পার্টি ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য উদ্ভোধনী অধিবেশনে যোগ দিবে না। তিনি একই সাংবাদিক সম্মেলনে আরোও ঘোষণা করেন যে, বিমান ছিনতাই প্রশ্নে পাক-ভারত যুদ্ধংদেহী অবস্থা ও ৬ দফা গ্রহণ না করিবার কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পিপলস পার্টির সদস্যবর্গ ঢাকায় গমন করিলে তাহারা ডবল হোষ্টেজে পরিণত হইবে। ১৭ই ফেব্রুয়ারী করাচীতে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে জনাব ভুট্টো জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগদানের পূর্বে সবার আগে আওয়ামী লীগের সহিত সমঝোতা প্রয়োজন বলিয়া পুনঃ মত প্রকাশ করেন।
    এইভাবেই ক্রমে ক্রমে জুলফিকার আলী ভুট্টোর রাজনৈতিক কর্মধারায় পশ্চিম পাকিস্তানের জনমত পিপলস পার্টির পিছনে সংহত হইতে থাকে। এমনি অবস্থায় ৮৮ সদস্যবিশিষ্ট পিপলস পার্টি জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। চতুর্দিকে যখন তুলকালাম কান্ড, তখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সহিত সাক্ষাৎকারের অব্যবহিত পরেই সাংবাদিকদিগকে জনাব ভুট্টো জানান যে, মুদ্রা, বৈদেশিক বাণিজ্য ও কর সম্পর্কে প্রকৃত বা মৌলিক মীমাংসা সম্ভব হইলেই সংবিধান রচনায় পিপলস পার্টি অংশগ্রহণ করিতে প্রস্তুত আছে। তিনি আরো দাবী করেন যে, পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তান অর্থাৎ সমগ্র দেশের এত-অর্ধাংশের প্রতিনিধি। তিনি এই মর্মে আরো দাবী করেন যে, ভারতীয় সৈন্য সমাবেশ পশ্চিম পাকিস্তান সীমান্তেই হইয়াছে, পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তে নয়।
    করাচীতে ওয়েষ্ট পাকিস্তান ইনষ্টিটিউট ম্যানেজমেন্ট প্রাঙ্গণে জনাব জুলফিকার আলী ভুট্টোর সভাপতিত্বে ২০শে ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত পাকিস্তান পিপলস পার্টি জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের দুই দিবসব্যাপী পার্লামেন্টারী কনফারেন্সের প্রথম দিবসের অধিবেশসেই ৬ দফা ভিত্তিক সংবিধান বনাম পিপলস পার্টির ভূমিকা সংক্রান্ত বক্তব্যের প্রশ্নে সদস্যবৃন্দ পার্টি চেয়ারম্যানের নিকট সানন্দে পদত্যাগপত্র জনা দিতে সম্মদ হন। পদত্যাগের এই হুমকির পটভুমিকায় বোধহয় ১৮ই ফেব্রুয়ারী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এক আদেশে আইনগত কাঠামো আদেশ (১৯৭০) কে সংশোধন করিয়া পরিষদের প্রথম অধিবেশন আরম্ভ হইবার পূর্বে জাতীয় বা প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের পদত্যাগের ধারা সংযোজিত করেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হইল, পিপলস পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ২২শে ফেব্রুয়ারী করাচীর সভায় পরিষদ সদস্যদের পদত্যাগের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

সংবিধান সম্পর্কে পিপলস পার্টির সুপারিশ
    করাচীতে অনুষ্ঠিত পিপলস পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় দেশের ভাবী সংবিধান নিম্নবর্ণিত নীতিমালার উপর প্রণীত হওয়ার সুপারিশ করা হয়।
(১) ফেডারেল সরকার এবং কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সংস্থা প্রত্যেকটি ফেডারেটিং ইউনিটের সমান প্রতিনিধিত্ব পাইবে।
(২) আন্তঃ ও আন্তঃআঞ্চলিক শোষণ বন্ধ করিবার নিমিত্ত সুষম ও কর ব্যবস্থার প্রবর্তন হইবে।
(৩) ভায়াবল কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনার প্রয়োজনে ফেডারেল সরকার কর আরোপ ও আদায় করিবে।
(৪) বৈদেশিক বাণিজ্য ও সাহায্য ফেডারেল সরকারাধীন থাকিবে।
(৫) প্রদেশগুলির মধ্যে পণ্যদ্রব্য ও চলাচলের অবাধ অধিকার থাকিবে।

ভুট্টো-ইয়াহিয়া আঁতাত
    ২২শে ফেব্রুয়ারী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সভাপতিত্বে প্রাদেশিক গভর্নর ও আঞ্চলিক সামরিক শাসনকর্তাদের বিশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির দরুন সামরিক জান্তার উগ্রপন্থী জেনারেল যথা- জেনারেল হামিদ, ওমর, গুল হাসান, পীরজাদা প্রমুখের দাবীতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৭ই ফেব্রুয়ারী মন্ত্রীসভা বিলুপ্তি ঘোষণা করেন।
    ২৬শে ফেব্রুয়ারী পিপলস পার্টি চেয়ারম্যান প্রেসিডেন্ট জেনালের ইয়াহিয়া খানের সহিত করাচীস্থ রাষ্ট্রপতি ভবনে চার ঘন্টাব্যাপী সাংবিধানিক বিষয়ে আলোচনা করেন। অনুমতি হয় যে, ভুট্টো-ইয়াহিয়া এই সাক্ষাৎকারেই জাতীয় পরিষদের ঢাকা অধিবেশন স্থগিত রাখিবার সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয়াছিণ নতুবা ২৮শে ফেব্রুয়ারী লাহোর জনসভায় জনাব জুলফিকার আলী ভুট্টো জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত রাখিবার দাবী এবং অন্যথায় ১২০ দিনের মধ্যে সংবিধান রচনার সময়সীমা প্রত্যাহারের দাবী উত্থাপন করিতে পারিতেন না। তিনি এই মর্মেও হুমকি প্রদান করেন যে, নারী সদস্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করিবার প্রচেষ্টা চালাইলে খাইবার হইতে করাচী পর্যন্ত সর্বাত্মক হরতাল পালন করা হইবে এবং পিপল্স পার্টির কোন সদস্য পরিষদ অধিবেশনে যোগ দিলে তাহাকে নিশ্চিহ্ন করা হইবে। উল্লেখ্য যে, জনাব জুলফিকার আলী ভুট্টো সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির নিয়ামক ও নিয়ন্ত্রিত শক্তিতে পরিণত হইলেও এবং ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য অধিবেশনকে পশ্চিম পাকিস্তানী সদস্যবৃন্দের জন্য ‘কসাইখানা’ আখ্যা দিলেও ৩রা মার্চ ঢাকা অধিবেশনে অংশগ্রহণ করিবার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত ৩৫ জন সদস্য ঢাকা আগমন করেন। স্মর্তব্য, নির্বাচন কমিশন ১৪ই ফেব্রুয়ারীর এক ঘোষণায় জাতীয় পরিষদে ১৩ জন নারী সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ ২রা মার্চ ধার্য করেন এবং ১লা মার্চ ঢাকায় রিটার্নিং অফিসার সমীপে নমিনেশন পেপার জমা দেওয়ার জন্য ইচ্ছুক প্রার্থীদিগকে আহবান জানান।

পরিষদ অধিবেশন স্থগিত : বাংলাদেশ বিক্ষুব্ধ
    ১৫ এবং ১৬ই ফেব্রুয়ারী ঢাকা ইঞ্জিনিয়ার্স ইসষ্টিটিউটে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ সদস্য, প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যবৃন্দের যুক্ত সভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে দলীয় লক্ষ্য অর্জনে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেওয়া হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমান ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে যথাক্রমে জাতীয় পরিষদ পার্লামেন্টারী পার্টির লীডার ও ডেপুটি লীডার নির্বাচিত করা হয়।
    ইতিমধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ৬ দফা কর্মসূচীর রদবদলের জন্য সরাসরিভাবে দাবী উত্থাপন করে। ইহার উত্তরেই বোধহয় আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান ২৪শে ফেব্রুয়ারী দলীয় সদর দফতরে সাততাড়া আহূত এক সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণঅ করেন যে, ৬ দফা প্রশ্নে কোন প্রকার রদবদল সম্ভব নয়। তিনি আরো বলেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের উপর ৬ দফা বাধ্যতঃ গ্রহণীয়ও নয় বরং পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশসমূহ পারস্পরিক প্রয়োজন ও স্বার্থে যে কোন প্রকার সাংবিধানিক ব্যবস্থা উদ্ভাবন করিতে পারে।
    শেখ মুজিবুর রহমানের উপরোক্ত ঘোষণা ইহাই প্রমাণ করে যে, শেখ সাহেব রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় ভিত্তিতে পাকিস্তানের সামগ্রিক সাংবিধানিক সমস্যা সমাধানে আগ্রাহান্বিত ছিলেন না। বলাই বাহুল্য যে, বিগত ২৩ বৎসরের ক্ষমতার লড়াই-এর ইহাই ছিল অবশ্যম্ভাবী বিষময় ফলশ্রুতি।
    বোধহয়, ২৮শে ফেব্রুয়ারী লাহোরে অনুষ্ঠিত ভুট্টোর জনসভার দাবীর প্রেক্ষিতেই ১লা মার্চ, অপরাহ্ন ১টা ৫ মিঃ-এর বেতার ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩রা মার্চ ঢাকায় আহূত জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবী ঘোষণা করেন। জাতীয় পরিষদ মূলতবী ঘোষণায় হতচকিত ঢাকাবাসী স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভে ফাটিয়া পড়ে। ঢাকা স্টেডিয়ামে ক্রিকেট টেষ্ট ম্যাচ দর্শক কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়; ঢাকা হাইকোর্ট বার এসোসিয়েশন ও ঢাকা জেলা এসোসিয়েশনের প্রতিবাদ মিছিল রাস্তায় নামে; ছাত্র সম্প্রদায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হইতে রাজপথে নামিয়া আসে; বিভিন্ন শিল্প এলাকা হইতে শ্রমিকরা দলে দলে মিছিল সহকারে রাজধানী ঢাকা মুখে যাত্রা করে; সকল সিনেমা হল বন্ধ হইয়া যায়। এইসব বিক্ষোভ মিছিলের স্রোত হোটেল পূর্বাণীর দিকে অগ্রসর হইতে থাকে। হোটেল পূর্বাণীতে তখন আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের পার্লামেন্টারী পার্টির সভা চলিতেছিল। মিছিলকারীরা সহস্র কণ্ঠে আওয়াজ উঠায়, “পাকিস্তানের সহিত সম্পর্কে ছিন্ন কর। বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা কর।” শেখ মুজিবুর রহমান বিদ্রোহী জনতার উদ্দেশ্যে তাহার ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ঘোষনার প্রতিবাদে ২রা মার্চ ঢাকায় এবং ৩রা মার্চ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে সর্বাত্মক সাধারণ হরতাল পালনের আহবান জানান। এইভাবে সেইদিন সারাদিন ধরিয়া মিছিলে মিছিলে ঢাকা নগরী প্রকম্পিত হইতে থাকে; অফিস-আদালত পরিত্যক্ত হয়; আইনজীবীরা পথে নামিয়া আসেন, দোকানপাট বন্ধ, সর্বত্র বিদ্রোহবহ্নি। পল্টন ময়দানে স্বতঃস্ফূর্ত বিরাট জনসমাগমে আগামীদিনের গণআন্দোলনের ডাক দেয় আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ। ২রা মার্চ ঢাকা নগরে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। এই ২রা মার্চেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত ছাত্রসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সয়সদের সহ-সভাপতি আ স ম আবদুর রব সর্বপ্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন। সবুজ জমিনে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত এই পতাকাটি উত্তরকালে মানচিত্র বাদ দিয়া রাষ্ট্রীয় পতাকার মর্যাদা পায়।
    পরিস্থিতিকে আয়ত্বে রাখিবার প্রয়োজনে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১লা মার্চ এক আদেশ বলে প্রদেশগুলিতে নিয়োজিত সামরিক শাসনকর্তাকেই বেসামরিক সভর্নর পদে নিয়োগ করেন অর্থাৎ দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটাইয়া সামরিক বাহিনীই দেশের সর্বময় ক্ষমতা গ্রহণ করে। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ভাইস এডমিরাল এস.এম আহসান অনতিবিলম্বে সামরিক শাসন কর্তা লেঃ জেঃ সাহেবজাদা এম. ইয়াকুব খানের নিকট দায়িত্বভার দিয়া পূর্ব পাকিস্তান হইতে বিদায় গ্রহণ করেন। ২রা মার্চ ঢাকায় প্রতিবাদ হরতাল পালনকালে বুলেটের আঘাতে ২ ব্যক্তি শাহাদাৎবরণ করে এবং অনেকেই আহত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ২রা মার্চ এক বিবৃতিতে সামরিক আইন প্রত্যাহারের দাবী করেন এবং নিম্ন কর্মসূচী ঘোষণা করেন। (ক) ৩রা মার্চ হইতে ৬ই মার্চ পর্যন্ত ভোর ৬টা হইতে ২ ঘটিকা পর্যন্ত প্রদেশব্যাপী ধর্মঘট, (খ) ৩রা মার্চ জাতীয় শোক দিবস পালন এবং (গ) ৩রা মার্চ ছাত্র জনসভা অনুষ্ঠানের পর অপরাহ্ন চার ঘটিকায় পল্টন ময়দান হইতে শেখ সাহেব কর্তৃক মিছিল পরিচালনা। শেখ সাহেব আরো ঘোষণা করেন যে, ‘রেডিও-টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে আমাদের বক্তব্য প্রকাশ না করিলে বাঙ্গালী কর্মচারীরা সহযোগীতা করিতে অস্বীকৃতি জানাইবে।’ ঘোষণায় ইহাও বলা হয় যে, ৭ই মার্চ ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবর রহমান জাতির উদ্দেশে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঘোষণা করিবেন।
    পরিস্থিতি মোকাবিলা করিবার প্রয়াসে সামরিক কর্তৃপক্ষ পৌরসভা এলাকায় রাত্রি ৮টা হইতে ভোর ৭টা পর্যন্ত এবং ৩রা মার্চ সন্ধা ৭টা হইতে ভোর ৭টা পর্যন্ত সান্ধ্য আইন জারি করেন। কিন্তু তথাপি সান্ধ্য আইন অমান্য করিয়াই মিছিল ব্যারিকেড পূর্ণোদ্যমে চলিতে থাকে; বিদ্রোহী জনতা অকাতরে প্রাণ দিতে থাকে। সান্ধ্য আইন জারির এই বিষময় ফল প্রত্যক্ষ করিয়াই কর্তৃপক্ষ ৪ঠা মার্চ হইতে সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করেন।

বাংলা জাতীয় লীগের প্রচেষ্ঠা
    এইদিকে লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য যৌথ সংগ্রাম পরিষদের দাবীতে বাংলা জাতীয় লীগ, বাংলা মজদুর ফেডারেশন ও ফরওয়ার্ড ষ্টুডেন্টস ব্লকের এক বিরাট জঙ্গী মিছিল ঢাকা নগরের বিভিন্ন রাজপথ প্রদক্ষিণ করে। অবশ্য আওয়ামী লীগ কর্মীরা উক্ত য়ৌথ সংগ্রাম পরিষদ গঠনের দাবীকে সুনজরে দেখে নাই। ৩রা মার্চ সকাল দশ ঘটিকায় দেওয়ান সিরাজুল হক ও এম.এম. আনোয়ার ও আমার সমবায়ে গঠিত এক প্রতিনিধি দল বাংলা জাতীয় লীগের পক্ষ হইতে শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত তাঁহার ধানমন্ডিস্থ বাসভবনে এক আলোচনা বৈঠকে মিলিত হই। আলোচনায় জনাব তাজউদ্দিন আহমদ ও মনসুর আলী অংশগ্রহণ করেন। আমরা বাংলা জাতীয় লীগের পক্ষ হইতে শেখ সাহেবের সশীপে নিন্ম প্রস্তাবাবলী পেশ করি:
    (১) জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত সংক্রান্ত প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ঘোষণাকে উপেক্ষা করিয়াই আওয়ামী লীগ দলীয় ১৬৭ জন জাতীয় পরিষদ সদস্য ও পশ্চিম পাকিস্তান হইতে আগত সদস্যবর্গের আজই ঢাকায় সংবিধান প্রণয়নকল্পে যথারীতি অধিবেশনে মিলিত হওয়া উচিত এবং যথাশীঘ্র সংবিধান প্রণয়ন করিয়া উহা মোতাবেক জনপ্রতিনিধিগণের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য সামরিক আইন শাসনকর্তা প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে আনুষ্ঠানিকভাবে আহবান জানান উচিত।
    (২) প্রেসিডেন্ট এই আহবান অস্বীকার করিলে অস্থায়ী সরকার ঘোষণা করা ও জাতিসংঘের সাহায্য প্রার্থনা করা প্রয়োজন।
    (৩) পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান সমবায়ে কনফেডারেশন গঠন।
    (৪) উপরে বর্ণিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনতার ঐক্য সুদৃঢ় করিবার মানসে সংগ্রামী জনতার মোর্চা গঠন।

জনাব তাজউদ্দিন আহমদ ও জনাব সনমুর আলী পরিকল্পনাটি বাস্তক নহে বলিয়া মন্তব্য করেন। শেখ সাহেব বলেন, এই প্রস্তাব অনুসারে কাজ করিলে সরকার সেনাবাহিনীর দ্বারা আন্দোলন দমাইয়া ফেলিবে। যাহা হউক, পরবর্তী ঘটনাবলীই প্রমাণ করিয়াছে যে, আমাদের প্রস্তাবসমূহ সঠিক ছিল কি-না এবং আমাদের প্রস্তাব অগ্রাহ্য করিবার পরেও সেনাবাহিনীর দমন চলিয়াছিল কি-না।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, আলোচনার ফাঁকে এক পর্যায়ে ২রা মার্চ তাঁর বাসভবনে নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মি. ফারল্যান্ডের সাথে তাঁর যে বৈঠক হয় সেই বৈঠকের প্রসঙ্গে মুজিব ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম আমাদের স্বাধীনতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য-সহযোগীতা পাওয়া যাকে কিনা? এ ব্যাপারে কোন আলোচনা হয়েছে কিনা? মুজিব ভাই উত্তরে বললেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন সমর্থন করবে না। তবে নভেম্বরে মার্কিন সিনেটে হয়তো প্রসঙ্গটি আলোচনা হতে পারে সে ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির জন্য পটুয়াখালী অথবা সেন্ট মার্টিন যে কোন একটি দ্বীপ তারা চায়- আমি তাদের সরাসরি না বলে দিয়েছি।” এরকম বলা একমাত্র মুজিব ভাইয়ের মতো সাহসী লোকের পক্ষেই সম্ভব।
মুজিব ভাই কিন্তু আত্মসমর্পণও করেছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইংগিতেই । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তার সম্পূর্ণ গ্যারান্টি দেয়ার ফলেই তিনি নির্দ্বিধায় ২৫শে মার্চ পাক বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করেন।

আবার গোল টেবিল বৈঠকের প্রস্তাব
     ৩রা মার্চ অপরাহ্নে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পল্টনের বিরাট জনসমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমান অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন এবং সরকারের নিকট (১) অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার, (২) সশস্ত্র বাহিনীর ব্যারাকে প্রত্যাবর্তন ও (৩) জনপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর দাবী করেন। এবং ৪ঠা মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান নিম্নলিখিত নির্দেশ জারি করেন:
     কর্মচারীদের বেতন পরিশোদের নিমিত্ত সরকারী, বেসরকারী অফিস অপরাহ্ন ২-৩০ হইতে ৪-৩০ মিঃ পর্যন্ত খোলা থাকিবে, ১৬ শত টাকার অনূর্ধ্বের চেক পরিশোধের জন্য ব্যাংকসমূহ অপরাহ্ন ২-৩০ মিঃ হইতে ৫-৩০ মিঃ পর্যন্ত কাজ করিবে; ষ্টেট ব্যাংক কর্তৃক অথবা অন্য কোন প্রকারে বাংলাদেশের বাহিরে টাকা প্রেরণ করা যাইবে না। ইহার আগের দিন অর্থাৎ ৩রা মার্চেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সংকট উত্তরণ প্রচেষ্টায় নিম্নলিখিত পার্লামেন্টারী পার্টি নেতৃবর্গকে ঢাকায় এক গোল টেবিল বৈঠকের আহবান জানান:
(১) শেখ মুজিবুর রহমান, আওয়ামী লীগ; (২) জুলফিকার আলী ভুট্টো, পাকিস্তান পিপলস পার্টি; (৩) খান আবদুল কাইউম খান, পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কাইউম); (৪) মিঞা মোহাম্মদ মমতাজ দৌলতানা, কাউন্সিল মুসলিম লীগ; (৫) মাওলানা মুফতি মাহমুদ জমিয়তুল ইলেমায়ে ইসলাম (হাজারভী); (৬) খান আবদুল ওয়ালী খান, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ওয়ালী); (৭) মাওলানা শাহ আহমদ নূরানী, জমিয়াতুল উলেমায়ে পাকিস্তান; (৮) জনাব আবদুল গফুর আহমদ, জামায়াতে ইসলামী; (৯) মিঃ মোহাম্মদ জামাল কুরেকা, পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কনভেনশন); (১০) জনাব নূরুল আমিন, পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি; (১১) মেজর জেনারেল জামালদার, উপজাতীয় এলাকা হইতে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্যদের প্রতিনিধি; (১২) মালিক জাহাঙ্গীর খান, উপজাতীয় এলাকা হইতে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্যদের প্রতিনিধি।
    শেখ মুজিবুর রহমান গোল টেবিল বৈঠকের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। জনাব নূরুল আমিনও গোল টেবিল বৈঠকে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। পক্ষান্তরে পশ্চিম পাকিস্তানী সংখ্যাগুু জনতার আস্থাভাজন নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো গোল টেবিল বৈঠকের প্রস্তাবকে স্বাগত জানান।

পল্টনে বাংলা জাতীয় লীগের জনসভা
    ৩রা মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত আলোচনাকালে আমরা সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ ও মুক্তি ফৌজ গঠনেরও প্রস্তাব রাখিয়াছিলাম। আমাদের প্রস্তাবের প্রতি শেখ মুজিবুর রহমানের অনীহা লক্ষ্য করিয়অ, সমগ্র পরিস্থিতির আলোকে বাংলা জাতীয় লীগের দৃষ্টিভঙ্গিতে করণীয় আশু কর্তব্য নির্দেশ করিবার উদ্দেশ্যে আমরা ১৯৭১ সালের ৬ই মার্চ অপরাহ্নে ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে এক জনসভা আহবান করি। পল্টন ময়দানে আমাদের সংগঠনের নামরকণ করি ‘বাংলা জাতীয় লীগ’। এই জনসভাতে সভাপতির ভাষণদানে আমি ৭ই মার্চ রেসকোর্সে অনুষ্ঠিতব্য জনসভায় বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করিবার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানে প্রতি আহবান জানাই এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলা জাতীয় লীগের পক্ষ হইতে সর্বশক্তি নিয়োগেরও প্রতিশ্র“তি ও আশ্বাস দান করি।

গভর্নর পদে টিক্কা খান
      ১০ই মার্চ আহূত গোল টেবিল বৈঠকের প্রতি বাংলার সেতার অনমনীয় মনোভাব লক্ষ্য করিয়অ ৬ই মার্চ এক বেতার ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেন। ৭ই মার্চ অপরাহ্ন তিন ঘটিকায় লক্ষ লক্ষ লোকের পদভারে প্রকম্পিত রেসকোর্স ময়দানে মুহুর্মুহু ধ্বনি ও করতালির মধ্যে স্বাধীন বাংলার পতাকা শোভিত মঞ্চ হইতে স্বাধীন বাংলার নায়ক শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।
      স্মর্তব্য যে, একই দিবসে অর্থাৎ ৭ই মার্চ লেঃ জেঃ সাহেবজাদা এয়াকুবের স্থলে কঠোরমনা লেঃ জেঃ টিক্কা খান পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক শাসনকর্তা বেসামরিক গভর্নর পদে নিযুক্ত হইয়া ঢাকায় আসেন। ঢাকায় আগমনের পরই লেঃ জেঃ টিক্কা খান বিমানে রেসকোর্স ময়দানের জনারণ্য পর্যবেক্ষণ করেন। বোধহয় ভীতি প্রদর্শনের প্রয়াসে রেসকোর্সের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিন-পশ্চিম কোণে সশস্ত্র বাহিনীকে মোতায়েন রাখা হয়।
     ইতিপূর্বে ১লা মার্চ সাজেন্ট জহুরুল হক হলে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সগ-সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন সমবায়ে চার সদস্যবিশিষ্ট “স্বাধীন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ” গঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের উক্ত একক পদক্ষেপের ফলে স্বাভাবিকভাবেই ১১ ;ফা দাবী আদায়ের উদ্দেশ্যে গঠিত ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের’ বিলুপ্তি ঘটে।

মুক্তিফ্রন্ট গঠন করে
গণহত্যার জবাবে
স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলা দেশ কায়েমের
দাবীতে-

বাংলা ন্যাশনাল লীগের উদ্দ্যেগে বিরাট জনসভা
স্থান- ঐতিহাসিক পল্টন ময়দান
তাং- ৬ই মার্চ, রোজ-শনিবার
সময়-বেলা ৩ ঘটিকায়

বক্তা:
১। স্বাধীন বায়লা আন্দোলনের অগ্রদূত বিপ্লবী নেতা বাংলা ন্যাশনাল লীগের সাধারন সম্পাদক: অলি আহাদ
২। প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা বাংলা ন্যাশনাল লীগের অন্যতম নেতা দেওয়ান সিরাজুল ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

আপনারা দলে দলে যোগদান করুন।

নিবেদক
বাংলা ন্যাশনাল লীগ
ঢাকা শহর শাখা।

বাংলা ন্যাশনাল লীগের প্রচার সম্পাদক জনাব কাজী জওয়াহেরুল ইসলাস কর্তৃক প্রচারিত।

ফরওয়ার্ড ষ্টুডেন্টস ব্লকের ডাক-

বাঙলা মুক্তিফ্রন্ট গঠন কর
স্বাধীন সমাজতন্ত্রিক বাঙলাদেশ কায়েম কর

সংগ্রামী সাথী ভাই বোনেরাঃ-

শোষকদের প্রতিভূ পশ্চিমা উপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী শত্র“দের করাল গ্রাস থেকে আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি বাঙলা দেশকে মুক্ত করে বিশ্বের মানচিত্রে একটা স্বাধীন সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

সাহসে বলীয়ান মুক্তিঃ ......-
    মাতৃভূমি আজ বিদেশী শত্রু সৈনিকদের পদভারে লাঞ্চিত-কলঙ্কিত। বাঙলা মায়ের দুলালদের বুকের তপ্ত রক্তের পিপাসায় আজ তারা উন্মত্ত। বাঙলার জনপদ কুক্তিকামী সেনাদের রক্তে আজ রঞ্জিত।

সংগ্রামী বন্ধুগণঃ-
    তাই আজ আমাদের প্রতিজ্ঞা রক্তের ঋণ রক্তে শোধিব। সুতরাং আজ আমাদের কর্তব্য বাঙলার হাটে-বাজারে, মাঠে-ঘাটে, গ্রামে-গঞ্জে, নগরে-বন্দরে ছড়িয়ে পড়ে মুক্তির অকৃত্তিম পণ-নিয়ে সংগ্রামী মুক্তি সেনাদের সুসংগঠিত করা এবং “বাঙলা মুক্তি ফ্রন্ট গঠন করা।

    এরই প্রেক্ষিতে আমরা দ্বিতীয় পর্য্যায়ের পদক্ষেপ হিসেবে পক্ষ কাল ব্যাপী নিচের কর্মসূচী সমূহ প্রণয়ন করেছি।

প্রকাশকাল ৭ই মার্চ ১৯৭১ ইং।

বাংলা ন্যাশনাল লীগের উদ্দ্যেগে
৬ই মার্চ ১৯৭১ ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত
জনসভার প্রস্তাব-

    বাংলা ন্যাশনাল লীগের উদ্দ্যেগে ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে বাংলার জাতীয় জীবনের এই চরম সংকট মূহুর্থে ও যুগসন্ধিক্ষনে অনুষ্ঠিত এই জনসভা বিশ্বাস করে, বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের কবল হতে মুক্ত হয়ে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী বাংলা দেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বিশ্বের স্বাধীন জাতীয় মানচিত্রে স্থান পায়নি। তারপর তেইশ বছরের উতিহাস প্রমান করেছে, বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ ঘৃণিত উপনিবেশিক শাসন শোষনের যাতাকলে আজো শৃঙ্খলিত। বায়ন্নের রক্তপাত থেকে শুরু করে স্বাধীনতাকামী বীর বাঙালীরা আজ পর্যন্ত বুকের রক্ত দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে গিয়েছে এদেশের ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক, জনতার বুকে। তৎসত্তেও কায়েমী স্বার্থবাদী স্বৈরাতান্ত্রিক গোষ্ঠী ১লা মার্চে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আহূত ৩রা মার্চের অধিবেশন স্থগিত করে ষড়যন্ত্রের নতুন জাল বিস্তার করে। তারই প্রতিবাদে বাংলার গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে মুক্তিকামী মানুষের উত্তাল তরঙ্গে বজ্রনির্ঘোষে ধ্বণিত হচ্ছে একই কথা- বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধরো, বাংলা দেশ স্বাধীন করো। এই ঐতিহাসিক জনসভা বিশ্বাস করে, সাম্রাজ্যবাদী, পুজিবাদী ও সামন্তবাদের প্রভূরা একদিনের ধনে-ধাণ্যে ভরা সোনার বাঙলাকে শোষন করে আজ পরিণত করেছে শ্মশানে। ক্ষুধা, অভাব আর মৃত্যুর হাহাকার আজ চারিদিকে। বাঙলার সম্পদে বাঙ্গালীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সুসম বন্ঠন ব্যাবস্থার মাধ্যমে সমাজত্রান্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই যুগে যুগে শোষনের ইতিহাসের একমাত্র জবাব।

    অতএব বাঙলা ন্যাশনাল লীগের এই ঐতিহাসিক জনসভা বাঙলার নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্যবৃন্দের প্রতি অবিলম্বে “স্বাধীন সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক” শাসনতন্ত্র ঘোষণা এবং প্রয়োজন বোধে উক্ত শাসনতন্ত্র বানচাল প্রতিরোধের জন্য স্বাধীনতাকামী সকল রাজনৈতিক দলের ঐক্যবদ্ধ “মুক্তিফ্রন্ট” গঠন করার আহবান জানাইতেছে।

বাংলা ন্যাশনাল লীগের প্রচার সম্পাদক জনাব কাজী জওয়াহেরুল ইসলাস কর্তৃক প্রচারিত।

শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণ
    “আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সকলে জানেন এবং বোঝেন আমরা আমাদের জীবন দিয়া চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপরি আমার ভায়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ অধিকার চায়। কি অন্যায় করেছিলাম? নির্বাচনের সময় বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে ও আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল এসেমব্লি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈরী করবো এবং এ দেশের ইতিহাসকে আমরা গড়ে তুলবো। এদেশের মানুষ অর্থনীতি, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলছি, বাংলাদেশের করুণ ইতিহাস, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস- এই রক্তের মুমুর্ষূ মানুষের করুণ আর্তনাদ, এদেশের করুণ ইতিহাস, এদেশের মানুষের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।
    ১৯৫২ সালে আমরা রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারিনি। ১৯৫৮ সালে আইউব খাঁ মার্শাল ল’ জারি করে ১০ বছর আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনের সময় আমাদের ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯ সালের আন্দোলনে আইউব খাঁর পতনের পরে ইয়াহিয়া এলেন। ইয়াহিয়া খান সাহেব বললেন, দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন- আমরা মেনে নিলাম। তারপর অনেক ইতিহাস হয়ে গেল নির্বাচন হোল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি, শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাকে অনুরোধ করেছিলাম, ১৫ই ফেব্রুয়ারী তারিখে আমাদের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি বললেন, মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে সভা হবে। আমি বললাম ঠিক আছে, আমরা এসমব্লিতে বসবো। আমি বললাম, এসেমব্লির মধ্যে আলোচনা করবো- এমনকি এ পর্যন্তও বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজনের মতেও যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা মেনে নেব।
    ভুট্টো সাহেব এখানে ঢাকা এসেছিলেন, আলোচনা করলেন। বলে গেলেন, আলোচনার দরজা বন্ধ নয়, আরো আলোচনা হবে। তারপর অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করলাম- আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈরী করবো- সবাই আসুন, বসুন। আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈরী করবো। তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বর যদি আসে তাহলে কসাইখানা হবে এসেমব্লি। তিনি বললেন যে, যে যাবে তাদের মেরে ফেলে দেওয়া হবে, যদি কেউ এসেমব্লিতে আসে পেশোয়ার থেকে করাচী পর্যস্ত সব জোর করে বন্ধ করা হবে। আমি বললাম, এসেমব্লি চলবে আর হঠাৎ মার্চের ১ তারিখ এসেমব্লি বন্ধ করে দেওয়া হলো।

    ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হিসাবে এসেমব্লি ডেকেছিলেন। আমি বললাম, আমি যাবো। ভুট্টো বললেন, যাবেন না। ৩৫ জন সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে এলেন। কারপর হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হোল, দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষের, দোষ দেওয়া হলো আমাকে। দেশের মানুষ প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠলো।
    আমি বললাম, আপনারা শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালন করুন। আমি বললাম, আপনারা কলকারখানা সবকিছু বন্ধ করে দেন। জনগণ সাড়া দিল। আপন ইচ্ছায় জনগণ রাস্তায় বেড়িয়ে পড়লো, সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য প্রকিজ্ঞাবদ্ধ হোল। আমি বললাম, আমরা জামা কেনার পয়সা দিয়ে অস্ত্র পেয়েছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করবার জন্য, আজ সেই অস্ত্র আমার দেশের গরীব দুঃখী মানুষের বিরুদ্ধে-তার বুকের উপর হচ্ছে গুলি। আমরা পাকিস্তানে সংখ্যাগুরু- আমরা বাঙ্গালীরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদের উপর ঝাপিয়ে পড়েছে। আমি বলেছিলাম, জেনারেল ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কিভাবে আমার গরীবের উপর, আমার বাংলার মানুষের বুকের উপর গুলি করা হয়েছে, কি করে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আপনি আসুন, আপনি দেখুন। তিনি বললেন, আমি ১০ তারিখে রাউন্প টেবিল কনফারেন্স ডাকবো। আমি বলেছি, কিসের এসেমব্লি বসবে, কার সঙ্গে কথা বলবে? আপনারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলবো? পাঁচ ঘন্টার গোপন বৈঠকে সমস্ত দোষ তারা আমাদের উপর, বাংলার মানুষের ওপর দিয়েছেন। দায়ী আমরা।
    ২৫ তারিখে এসেমব্লি ডেকেছেন। রক্তের দাগ শুকায় নাই। ১০ তারিখে বলেছি, রক্তে পাড়া দিয়ে, শহীদের উপর পাড়া দিয়ে, এসেমব্লি খোলা চলবে না। সামরিক আইন মার্শাল ল’ উইড্রো করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকের ভিতরে ঢুকাতে হবে। যে ভাইদের হত্যা করা হয়েছে তাদের তদন্ত করতে হবে। আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে, তারপর বিবেচনা করে দেখবো আমারা এসেমব্লিতে বসতে পারবো কি পারবো না। এর পূর্বে এসেমব্লিতে আমরা বসতে পারি না।
    আমি পরিস্কার অক্ষরে বলে দিতে চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারী, আদালত-ফৌজদারী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরীবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে সে জন্য যে সমস্ত অন্যান্য জিনিসগুলো আছে সেগুলো হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকসা, গরুর গাড়ী, রেল চলবে, শুধু সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্ট, সেমি-গভর্নমেন্ট দফতর, ওয়াপদা- কোনকিছু চলবে না। ২৮ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন। এরপর যদি বেতন দেওয়া না হয়, এরপর যদি ১টি গুলি চলে, এরপর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়- তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্র“র মোকাবেলা করতে হবে, এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট, যা যা আছে সবকিছু- আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে সারবো। সৈন্যরা, তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, তোমাদের কেহ কিছু বলবে না কিন্তু আর তোমরা গুলি করার চেষ্টা কর না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবে না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না। আর যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগ থেকে যদ্দুর পারি সাহায্য করতে চেষ্টা করবো। যারা পারেন আওয়ামী লীগ অফিসে সামান্য টাকা পয়সা পৌঁছে দেবেন। আর ৭ দিন হরতালে শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছে, প্রত্যেক শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছে দেবেন। সরকারী কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হচ্ছে ততদিন ওয়াপদা ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হোল- কেউ দেবেন না। শুনুন, মনে রাখুন, শত্র“ পিছনে ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু, মুসলমান যারা আছে তারা আমাদের ভাই, বাঙ্গালী, অবাঙ্গালী- তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের উপর, আমাদের যেন বদনাম না হয়। মনে রাখবেন কর্মচারীরা, রেডিও যদি আমাদের কথা না শোনে তাহলে কোন বাঙ্গালী রেডিও ষ্টেশনে যাবেন না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, তাহলে টেলিভিশনে যাবেন না। ২ ঘন্টা ব্যাংকগুলো খোলা থাকবে, যাতে মানুষ তাদের মাইনে পত্র নিতে পারে। পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন, টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ব বাংলায় চলবে এবং বাংলাদেশের নিউজ বাইরে পাঠানো চলবে। এই দেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা চলছে- বাঙ্গালীরা বুছে সুঝে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলুন। এবং আমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। যখন রক্ত দিয়েছি রক্ত আরো দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা। জয় পাকিস্তান।

    উল্লেখ্য যে, ৭ই মার্চের জনসভাতেই ২৫শে মার্চে আহূত জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগদান প্রসঙ্গে শেখ মুজিব নিম্নোক্ত শর্তাবলী আরোপ করেন:
    (ক) সামরিক আইন প্রত্যাহার করিতে হইবে।
    (খ) সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরাইয়া লইয়া যাইতে হইবে।
    (গ) হত্যার তদন্ত করিতে হইবে।
    (ঘ) জনপ্রতিনিধিগণের হস্তে ক্ষমতা হস্তান্তর করিতে হইবে।
    তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানান, উপরোক্ত শর্তাবী পূরণ না হইলে শহীদের কাঁচারক্ত মাড়াইয়া ২৫শে মার্চ আহূত জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যাইব না!”

    উল্লেখ্য যে, ৭ই মার্চ রবিবার এক বিবৃতিতে শেখ মুজিব ৮ই মার্চ হইতে পরবর্তী সপ্তাহের নিন্মলিখিত কর্মসূচী ঘোষণা করেন:
    ১। কর না দেওয়ার আন্দোলন চলিবে।
    ২। সেক্রেটারিয়েট, সরকারী ও আধা-সরকারী অফিস, হাইকোর্ট এবং বাংলাদেশের অন্যান্য আদালত হরতাল পালন করিবে। এই ব্যাপারে কি কি শিথিল করা হইবে, তাহা সময়ে সময়ে জানান হইবে।
    ৩। রেলওয়ে ও বন্দর সমূহ কাজ চালাইয়া যাইবে। তবে জনগণের উপর অত্যাচার চালাইতে সৈন্য সমাবেশকে রেলওয়ে ও বন্দর কর্মচারীরা সহযোগীতা করিবে না।
    ৪। বেতার, টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রকে আমাদের বক্তব্যের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করিতে হইবে এবং তাহারা জনতার আন্দোলনের সংবাদ চাপিয়া যাইতে পারিবে না।
    ৫। কেবলমাত্র স্থানীয় ও আন্তঃজেলা ট্রাংক টেলিফোন যোগাযোগ চলিবে।
    ৬। সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকিবে।
    ৭। ষ্টেট ব্যাংক বা অন্য কোন উপায়ে কোন ব্যাংক দেশের পশ্চিম অংশে টাকা পাঠাইতে পারিবে না।
    ৮। প্রতিদিন সমস্ত ভবনে কালো পতাকা উত্তোলন করা হইবে।
    ৯। অন্যান্য ক্ষেত্রে হরতাল প্রত্যাহার করা হইল। কবে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যে কোন মুহূর্তে পূর্ণ অথবা আংশিক হরতাল ঘোষণা করা যাইতে পারে।
    ১০। স্থানীয় আওয়ামী লীগ শাকার নেতৃত্বে প্রত্যেক ইউনিয়ন, মহল্লা, থানা, মহকুমা এবং জেলার সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হইবে।

সামরিক কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা
    এইভাবেই সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর আকাঙ্খার বলিষ্ঠ কণ্ঠ শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে অগহযোগ আন্দোলন ঘোষণা করেন এবং ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাত্রির অন্ধকারে পাক সেনাবাহিনীর হামলার পূর্বাহ্ন অবধি পূর্ব পাকস্তানে অবস্থিত কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক বেসামরিক অফিস-আদালতসমূহ আওয়ামী লীগ সদর দফতর হইতে জারিকৃত প্রশাসনিক আদেশ ও ফরমান নির্ববাদে প্রতিপালন করিয়া চলে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানরে বেসামরিক ব্যবস্থা পূর্ব পাকিস্তানে সম্পূর্ণ অচল ও বিকল হইয়া পড়ে।
    লক্ষণীয় যে, ২২শে মার্চ সংখ্যায় ঢাকার সকল দৈনিক সংবাদপত্র স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার ছবি সর্বসাধারণের জ্ঞাতার্থে প্রকাশ করে। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, পাকিস্তান দিবস ২৩শে মার্চে কেবলমাত্র ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ও প্রেসিডেন্ট হাউসে পাকিস্তানের রাষ্টীয় পতাকা উত্তোলিত হইতে দেখা যায়। পক্ষান্তরে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবানে সেই দিন ঢাকার ঘরে ঘরে স্বাধীন বাংলার পতাকা শোভা পাইতেছিল। সংক্ষেপে বলিতে গেলে, পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসনের সর্বময় কর্তৃত্ব শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে চলিয়া যায়। এইদিকে ঘটনার স্রোত দ্রুত প্রবাহিত হইতে লাগিল। পরিস্থিতির জটিলতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তাহার অঘোষিত উপদেষ্টা ও সামরিক জান্তার সদস্যবৃন্দ জেনারেল আবদুল হামিদ খান, লেঃ জেঃ এস.জি.এম.এম পীরজাদা, লেঃ জেঃ আকবর খানের পরামর্শে ১৯৬৯ সালের ৫ই আগষ্ট গঠিত বেসামরিক মন্ত্রীসভা ১৯৭১ সালে বিলুপ্ত করেন (১৭ই ফেব্রুয়ারী ১৯৭১)। ১লা মার্চ গভর্নর ভাইস এডমিরাল এস.এম আহসানের স্থলে সামরিক শাসনকর্তা লেঃ জেঃ ইয়াকুব খানকে বেসামরিক গভর্নরের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং ৭ই মার্চ ভদ্র ও নরম মেজাজী লেঃ জেঃ ইয়াকুব খান সাহেবজাদার স্থলে কঠোরমনা লেঃ জেঃ টিক্কা খানকে যুগপৎ সামরিক শাসনকর্তা ও বেসামরিক গভর্নর পদে নিয়োগ করেন। রাজনৈতিক দিকপাল রাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের মন্তব্য “politics is too serious a matter to be left with the Generals” অর্থাৎ “রাজনীতি এতই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, ইহা জেনারেলদের দায়িত্বে ছাড়িয়া দেওয়া যায় না”- এই স্থলে প্রণিধানযোগ্য। উক্ত মন্তব্যের যথার্থতা প্রমাণের জন্যই যেন পাকিস্তানী সামরিক জান্তা অচিরেই রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে সমর দ্বন্দ্বে পরিণত করে।
    উল্লেখ্য যে, এই সময়ে জনতার প্রতিরোধ-ঐক্য ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতিমন্ডলীকেও প্রভাবান্বিত করিয়াছিল। প্রধান বিচারপতি বি.এ সিদ্দিকী (বদিউদ্দিন আহমদ সিদ্দিকী) নবনিযুক্ত গভর্নর লেঃ জেঃ টিক্কা খানের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করিতে অস্বীকৃতি জানাইয়া আওয়ামী লীগ পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলনে শরীক হন।
    পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক শাসনকর্তা ১৩ই মার্চ এক আদেশ বলে সামরিক বিভাগে কর্মরত বেসামরিক কর্মচারীদের ১৫ই যথারীতি কাজে যোগ দিতে নির্দেশ দেন। নির্দেশে ইহাও বলা হয় যে, ইহার অন্যথা হইরে অর্থাৎ কাজে যোগ না দিলে কেবল চাকুরী হইতেই বরখাস্ত করা হইবে না, উপরন্ত সামরিক আদালতের বিচারে সর্বোচ্চ দশ বৎসর সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হইবে।
    ইহার পাল্টা জবাবে বেসামরিক প্রশাসন চালু রাখিবার স্বার্থে ১৪ই মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান ৩৫টি নূতন বিধি জারি করেন এবং তদানুযায়ী ১৫ই মার্চ হইতে পরবর্তী দিবসগুলি বেসামরিক প্রশাসনযন্ত্র তাঁহার বিধি মোতাবেক দেশের প্রশাসন কার্যপরিচালনা করিতে থাকে।
    এই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটে জীবনের নিরাপত্তা বিঘিœত হইবার আশংকায় জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেল উত্থান্ট জাতিসংঘ কর্মচারীদিগকে পূর্ব পাকিস্তান হইতে অপসারেণের অনুমতি প্রদান করেন। শেখ মুজিব ১৯শে মার্চ সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিবৃতিতে ইহার প্রতিবাদ করিয়া মন্তব্য করেন যে, কর্মচারী অপসারণের মাধ্যমেই জাতিসংঘের দায়িত্ব সমাপ্ত হয় না। বাংলাদেশে যে গণহত্যা চলিতেছে, তাহাতে জাতিসংঘের মানবাধিকার হুমকির সম্মুখীন বলিয়াও শেখ মুজিব এই বিবৃতিতে মন্তব্য করেন।

ইয়াহিয়া-ভুট্টোর ঢাকা আগমন
    রাজনৈতিক সংকট নিরসনকল্পে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৫ই মার্চ ঢাকা আগমন করেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত ১৬ই মার্চ আড়াই ঘন্টা, ১৭ই মার্চ এক ঘনাটা, ১৯শে মার্চ এক ঘন্টা তিরিশ মিনিট, ২০শে মার্চ দুই ঘন্টা দশ মিনিট, ২১শে মার্চ এক ঘন্টা তিরিশ মিনিটব্যাপী কয়েক দফা রাজনৈতিক বৈঠকে মিলিত হন। মুজিব-ইয়াহিয়ার আলোচনার আলোকে প্রেসিডেন্ট হাউস হইতে ঢাকা সফরের আমন্ত্রন পাইয়া পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৫ সদস্যবিশিষ্ট এক প্রতিনিধিদলসগ ২১শে মার্চ ঢাকা আগমন করেন। এবং ২১শে মার্চ হইতে ২৪শে মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টোর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ও ত্রিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২২শে মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টোর ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের ঐক্যমত্য অনুসারে প্রেসিডেন্ট ২৫শে মার্চে আহূত জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন।
    উল্লেখ্য যে, এই মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনায় তিন মাসের জন্য নিম্নলিখিত ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। যথা:
    ১। সামরিক আইন প্রত্যাহার, ২। বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিস্তান) ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হস্তে ক্ষমতা হস্তান্তর, ৩। জেনারেল ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকিবেন, ৪। দেশ রক্ষা, বৈদেশিক নীতি (বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যতীত মুদ্রা ও পুঁজি পাচার নিষিদ্ধকরণসহ) ছাড়া বাকি সর্বময় ক্ষমতা বাংলাদেশ সরকারের হাতে থাকিবে, ৫। তিন মাসের অতিক্রান্ত হইলে প্রত্যেক অঞ্চলের জাতীয় পরিষদ সদস্যবর্গ সংবিধান রচনাকল্পে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গী স্থিরীকরণের নিমিত্ত পৃথক পৃথক ভৈঠকে মিলিত হইবেন। তৎপর সংবিধান সমস্যাবলীর সর্বগ্রাহ্য সমাধান নির্ধারণকল্পে সদস্যবর্গ যুক্ত বৈঠকে মিলিত হইবেন।
    এই সিদ্ধাস্তের চূড়ান্ত রূপদানের উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের তরফ হইতে সর্বজনাব তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও ডঃ কামাল হোসেন এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার পক্ষ হইতে এম.এম আহমদ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, বিচারপতি এ.আর কর্নেলিয়াস, লেঃ জেঃ পীরজাদা ও লেঃ কঃ এম.এ হাসান ১৯শে মার্চ, ২৩শে মার্চ ও ২৪শে মার্চ বৈঠকে মিলিত হন। ২৫শে মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের এতদসংক্রান্ত চূড়ান্ত ঐক্যমত্যের বিষয় ঘোষণার কথা ছিল।

২৫শে মার্চের কালোরাত্রি
    কিন্তু সকলই গরল ভেল। খুব সম্ভব পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোই ইয়াহিয়া-মুজিব প্রণীত ঐকমত্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান এবং ফলে ২৫শে মার্চ কালো রাত্রিতে জাতিকে বিভক্ত করিবার পথে এক অশুভ চক্রের পদচারণা শুরু হয়, এবং রাচিত হয় এক নির্মম কালো ইতিহাস।
    এই কালো ইতিহাসের জঘন্যতম ও নির্মম ভূমিকা পালনের অসৎ উদ্দেশ্যে অতিসন্তর্পণে ও সংগোপনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ঢাকা অবস্থান ও আলোচনার ছদ্মাবরণে সর্বাত্মক সামরিক প্রস্তুতি ইুতমধ্যেই সম্পন্ন করা হয়। আলোচনার ফলাফল জানার জন্য দেশবাসী যখন উদ্বিগ্নচিত্তে ও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করিতেছিল, আশা-নিরাশার ঠিক সেই মুহূর্তেই ২৫শে মার্চ (১৯৭১) প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সহিত বৈঠকের পর ভুট্টো সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তরে বলেন যে, “অবস্থা অত্যন্ত সংকটপূর্ণ”।
    প্রকাশ, সন্ধার মর্ধেই নাতি শেখ মুজিব জানিতে পারেন যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করিয়াছেন। বস্তুতঃ জনতার নেতা ও স্বাধীন বাংলা সংগ্রামের অন্যতম অধিনায়ক হিসাবে পরিচিত শেখ মুজিব সেদিন কি নির্মমভাবেই না বিভ্রান্ত ও প্রতারিত হইয়াছিলেন প্রতারক ও চানক্যরূপী সমর নায়ক জেনারেল ইয়াহিয়ার কূট-কৌশলের মারপ্যাচে।
    সেদিন রাত ৯-৩০ মিনিটে বাংলা জাতীয় লীগের সদর দফতর হইতে আমি পূর্বদেশের প্রক্যাত কলামিষ্ট জনাব আবদুল গাফফার চৌধুরীর বাসায় যাই। তাহার সহিত অবস্থার আলোচনা-পর্যালোচনার পর স্বীয় বাসবভন মুখে রওয়ানা হই। যাত্রাপথে বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে ব্যারিকেড রচনা করিতে দেখিতে পাই ভয়ার্ত অথচ সংকল্পে অটল জনতাকে। উদ্বিগ্ন ও উদ্গ্রীব জনতা স্থানে স্থানে আমার গাড়ী থামাইয়া পরিস্থিতি জানিতে চায়। আমি তখনও অনাগত হামলা সম্পর্কে কিছুই ওয়াকিফহাল ছিলাম না। পথিমধ্যে সর্বত্র ব্যারিকেড, উদ্বিগ্ন জনতার ভিড়। আঁচ করিলাম, সংঘর্ষ অত্যাসন্ন এবং বোধহয় সর্বশেষ ফল সুখের নয়।
    বাসায় পৌঁছিয়াই জনাব আবদুল গাফফার চৌধুরীকে টেলিফোন করি এবং পথে পথে ব্যরিকেড ও উৎকণ্ঠিত জনতার সহিত আলোচনার বিষয়বস্তু তাহাকে জানাই। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মিরপুর রোডের উপর সাঁজোয়া বাহিনীর গাড়ীর আওয়াজ ও অহরহ গুলির শব্দ শুনিতে পাই এবং টেলিফোনে জনাব চৌধুরীকে সে খবরও জানাই। রাত ১২টার দিকে পুনরায় জনাব চৌধুরীর সহিত আলাপ করিবার নিমিত্ত টেলিফোনের রিসিভার উঠাইয়া বুঝিলাম টেলিফোন বিকল। চারিদিকে তখন মুহুর্মুহু রকেট, মর্টার, মেশিনগান ওকামানের আওয়াজ, চতুর্দিকে আগুনের লেলিহান শিখা ও গগনচুম্বি অন্ধকার ধোঁয়া। রাতভর কখনও বিছানায় কখনও বারান্দায়, কখনও ছাদে গভীর উৎকণ্ঠার সহিত পাঁয়চারি করিতে থাকি। রাত্রি তিন ঘটিকার দিকে মাইকে ঘোষণা শুনিতে পাই, সামরিক শাসনকর্তা ঢাকা নগরে অনির্দিষ্টকালর জন্য সান্ধ্য আইন জারি করিয়াছেন।
    ২৫শে মার্চ কালো রাত্রিতে পাক সেনাবাহিনীর নির্মম হামলায় প্রাণ হারান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার দ্বিতীয় প্রধান আসামী পাক নৌ-বাহিনীর তেজস্বী অফিসার লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন। আগেই বলিয়াছি, পূর্ব পাকিস্তান সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিকল্পনার পশ্চাতে মূল ব্যক্তি ছিলেন তিনি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের পর তিনি তাঁহার পরিকল্পিত ‘স্বাধীন বাংলা’ সংগ্রাম চালাইয়া যাইবার মানসে ‘লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠন করেন। আমি তাহার পথের পথিক ছিলাম। আমিই কমিটির উক্ত নামকরণ করি। পাক বাহিনী লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনকে তাহার এলিফেন্ট রোডস্থ বাসভবন হইতে বলপূর্বক বাহিরে আনিয়া প্রাণাধিক প্রিয় স্ত্রী ও সন্তানদের দৃষ্টিসীমার স্বল্প দূরেই গুলি করিয়া হত্যা করে। শুধু তাঁহাকেই নয়, সেই কালো রাত্রে হত্যা করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর ডঃ গোবিন্দ চন্দ্র দেব, প্রফেসর এম. মুনিরুজ্জামান, জগন্নাথ হলের প্রভোষ্ট ডঃ জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, সিনিয়র লেকচারার ডঃ ফজলুর রহমান খান, সিনিয়র লেকচারার এম.এ মোকতাদির, লেকচারার অনুর্দ্বেপায়ন ভট্টাচার্য, লেকচারার এম.আর খান খাদেম, লেকচারার শরাফত আলী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনষ্টিটিউটের সিনিয়র লেকচারার ডঃ মোহাম্মদ সাদত আলী ও সিনিয়র টিচার মোঃ সাদেককে। ইহা ছাড়াও এই কালো রাত্রিতে এসএম হল, জহুরুল হক হল ও জগন্নাথ হরে বহু সংখ্যক আবাসিক ছাত্রকে হত্যা করা হয়। ব্যারিকেড রচনাকারী জনতা, রেসকোর্স মন্দিরবাসী, নিঃস্ব বস্তিবাসী কেহই এই হত্যাযজ্ঞের হাত হইতে রেহাই পায় নাই। বস্তুতঃ সেই রাত্রিতে হত্যার তান্ডব নৃত্যই চালিয়েছে পাক বাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ ঢাকা নগরীতে। খেলা হইয়াছে রক্তের হোলি। সংহতি রক্ষার নামে কি অদ্ভুত পাশবিক নৃশংস কর্মকান্ড! কিন্তু শুধু কি মানুষ? পাক বাহিনীর হাতে সেই রাত্রিতে অগ্নিদাহ হইয়াছে জনতার কণ্ঠ দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ, সাপ্তাহিক গণবাংলা ও ইংরেজী দৈনিক পিপলস অফিস। অগ্নিদাহ হয় নয়াবাজার বস্তি, কাঠের আড়ত।
    উপরে বর্ণিত নারকীয় লোমহর্ষক ঘটনা পুনরায় ঘটে ১৪ই ডিসেম্বর (১৯৭১) তারিখ। এই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনির চৌধুরী, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক ডঃ আবুল খায়ের, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক রশিদুল হাসান, ডঃ সিরাজুল হক খান, অধ্যাপক ডঃ ফয়জুল মুহি, ডঃ মর্তুজা ঘাতকের হিংস্র ছোবলের শিকারে পরিণত হন এবং জাতিকে বঞ্চিত করিয়া পরপারের যাত্রায় পাড়ি জমান। ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপকবৃন্দ যধা- ডঃ আলীম চৌধুরী, ডঃ ফজলে রাব্বি, প্রখ্যাত সংবাদিকবৃন্দ যেম দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন, সংবাদের বার্তা সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সার, বিবিসি, ও পিপিআই-এর নিজামুদ্দীন আহমদ, পিপিআই-এর নাজসুল হক, দৈনিক পূর্বদেশের এ.এন.এম গোলাম মোস্তফা, দৈনিক মর্নিং নিউজের আবুল বশার চৌধুরী ও খন্দকার আবু তালেব একই প্রতিহিংসার বা জিঘাংসাবৃত্তের হুতাশনে প্রাণ দেন।

Witness to surrender নামক গ্রন্থে এই অপারেশনের পূর্ণ নীল নকশা বিবৃত হইয়াছে। উক্ত গ্রন্থের পরিশিষ্ট-২ এবং ১৩ নং অনুচ্ছেদে বলা হইয়াছে যে, নিম্নোক্ত ১৬ জন ও অন্যান্য রাজনীতিবিদ ও ছাত্রনেতাদের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করিবার জন্য আর্মি গেড কোয়ার্টার তাহাদের এজন্সিকে নির্দেক প্রদান করে:
    ১) শেখ মুজিবুর রহমান            ২) সৈয়দ নজরুল ইসলাম
    ৩) তাজউদ্দিন আহমদ            ৪) এম.এ.জি ওসমানী
    ৫) সিরাজুল আলম খান            ৬) আবদুল মান্নান
    ৭) আতাউর রহমান খান            ৮) প্রফেসর মোজাফফর আহমদ
    ৯) অলি আহাদ                ১০) মিসেস সতিয়া চৌধুরী
    ১১) ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ        ১২) ফয়জুল হক
    ১৩) তোফায়েল আহমদ            ১৪) নূরে আলম সিদ্দিকী
    ১৫) আবদুর রউফ            ১৬) আবদুল কুদ্দুস মাখন এবং অন্যান্য ছাত্র নেতৃবৃন্দ।

    হানাদার বাহিনীর হামলার খরব পূবাহ্নে জ্ঞাত হওয়া সত্ত্বেও শেখ মুজিবুর রহমান ২৫শে মার্চ কাল রাত্রিতে স্বীয় বাসভবনে অবস্থান করিবার মনস্থ করেন। পাক হানাদার বাহিনী তাঁহার ধানমন্ডির ৩২নং রোডস্থ বাড়ী ঘেরাও করিলে শেখ সাহেব বিনাবাক্য ব্যয়ে ধরা দিলেন। শেখ মুজিবের মুক্তিযুদ্ধের সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণই ছিল আপামর দেশবাসীর প্রত্যাশা ও আখাঙ্কা। বিস্ময়-বিমূঢ় দেশবাসী শেখ সাহেবের সংকট মুহূর্তে ভিন্ন আচরণে হইল বিভ্রান্ত ও হতবাক। জেনারেল মিঠার আদেশ ছিল শেখ সাহেবকে জীবিত বন্দী করিবার এবং তাহাই হইল। উপরে উল্লেখিত অন্য কাহাকেও গ্রেফতার করিতে পাক হানাদার বাহিনী সেই কৃষ্ণ রাত্রে ব্যর্থ হয়। তাই আজও আমরা জীবিত।
    গ্রেফতারের পর শেখ সাহেব আদমজী ক্যান্টমেন্ট স্কুলে রাত্রি যাপন করেন, ২৬শে মার্চ তাঁহাকে ফ্ল্যাগ ষ্টাফ হাউসে (Flag stafe House) স্থানান্তরিত করা হয় এবং ২৮শে মার্চ বিমানযোগে শেক সাহেবকে করাচী নিয়া যাওয়া হয়।
    চতুর্দিকে গুজব ছিল শেখ মুজিব মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিতেছে। ইহা মিথ্যা প্রমাণ করিবার জন্যই ২রা এপ্রিল (১৯৭১) করাচী বিমানবন্দরে তোলা ছবি বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় ছাপানো হয় এবং তাঁহাকে মীয়নওয়ালী কারাগারের বন্ধ প্রকোষ্ঠে বন্দী করিয়া রাখা হয়।
    এইভাবে সমঝোতার নামে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান বিশ্বাসঘাতকতা ও লজ্জাকর কাপুরুষোচিত ভূমিকায় অভিনয় করেন। পাছে এই গণহত্যা অভিযান, লোমহর্ষক ধর্ষণকাহিনী ও গৃহদাহের এবং ধ্বংসযজ্ঞের কাহিনী ফাঁস হইয়া যায়, তাই হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ৩৫ জন বিদেশী সাংবাদিককে প্রথমে আটক করা হয় এবং ২৬শে মার্চ (১৯৭১) পাঠাইয়া দেওয়া হয় বিমানযোগে ঢাকার বাহিরে।
    পশ্চিম পাকিস্তানের মীয়ানওয়ারী কারাগরে আটক থাকাকালে আগষ্ট মাসে সামরিক আদালতে শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের ব্যবস্থা করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েট রাশিয়া ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশের অবিরাম প্রচেষ্টা ও জাগ্রত বিশ্ববিবেকের চাপে পাক-সরকারের পক্সে শেষ পর্যন্ত শেখ মুজিবের প্রাণাশ কার সম্ভব হয় নাই। শেখ সাহেব নেতৃবৃন্দকে ঢাকা ত্যাগ করে গা-ঢাকা দেওয়ার পরামর্শ দিলেও আন্দোলনের খাদিরে নিজে আত্মগোপন করেন নাই কেন? ১৯৪৯ সালের অক্টোবর ব্যতীত অতীতেও গণ আন্দোলনের প্রয়োজনে শেখ সাহেব কখনও আত্মগোপন করেন নাই। দেখা গিয়াছে, সকল আন্দোলনের সূচনা মুহূর্তে স্বগৃহে অবস্থান করিয়াই তিনি গ্রেফতারবরণ করিতেন। রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের প্রয়োজনে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আলোচনায় বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবরের উপস্থিতির অপরিহার্যতা সন্দেহের অবকাশ রাখে না। প্রকাশ, মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিঃ ফারল্যান্ড শেখ সাহেবের সহিত তাঁহার বাসভবনে দেখা করিয়া জীবনের নিরাপত্তায় মার্কিন সাহায্যের নিশ্চয়তা দিয়াছিলেন। উল্লেখ্য যে, ২১শে জুন এস.এস. পদ্মা ও এস.এস সুন্দরবন অস্ত্র বোঝাই বিষয়ে ‘সিনেট সাব কমিটি অন রিফিউজি’র নিকট সাক্ষাৎদানকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি এসিসট্যান্ট সেক্রেটারী মিঃ ক্রিস পারভন যাহা বলিয়াছিলেন, তাহা রাজনৈতিক সমাধানকল্পে পাকিস্তানের সহিত আলোচনার ইঙ্গিত বহন করে। বোধহয় এই কারণেই বন্দী নেতা শেক মুজিবুর রহমানের ঢাকায় অবস্থানকারী পরিবারের ব্যয় বহনকল্পে পাক সরকার শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেসাকে প্রতি মাসে ১৫০০ (পনের শত টাকা) করিয়া মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। নিউজ উইকের সিনিয়র এডিটর আরন্ড ডি বোরচগ্রেভের (Aranand fe Brochgrave) সহিত এক সাক্ষাতকারে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এই মর্মেও আভাস দিয়াছিলেন যে, “জাতি দাবী করিলে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিবেন।

ফরওয়ার্ড ষ্টুডেন্টস ব্লক
    প্রসঙ্গত ফরওয়ার্ড ষ্টুডেন্টস ব্লক সম্পর্কে দু’একটি কথা না বলিলে ইতিহাসের প্রতি অবিচার করা হইবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই ছাত্র সংগঠনটির অবদান অনস্বীকার্য নয়, অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বলও বটে। সরকারী অর্থানুকুল্যে প্রকাশিত ১৪ খণ্ডের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলসহ মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা অনেক গ্রন্থেও স্বাধীনতা আন্দোলনে এই ছাত্র সংগঠনটির নানাবিধ নাহসী ভূমিকার কথা উল্লেখ রহিয়াছে।
    ফরওয়ার্ড ষ্টুডেন্টস ব্লক প্রতিষ্ঠা লাভ করে উনিশ’শ একাত্তুরের ১৭ই ফেব্রুয়ারী। বস্তুতঃ বাংলা ছাত্রলীগ ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রশক্তির একদল মেধাবী ও সম্ভাবনাময় তরুণের সমন্বয়ে গোড়াপত্তন ঘটে এ সংগঠনটির। তোপখানা রোডের দোতলায় (বর্তমান হোটেল সম্রাট) এক অনাড়ম্বর ছাত্র সমাবেশে এই সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়। সে সমাবেশে জনাব লুৎফর রহমানকে সভাপতি, জনাব সৈয়দ ওয়াজেদুল করিমকে সাধারণ সম্পাদক ও জনাব মোঃ এহ্সানুল হক সেলিমকে সাংগঠনিক সম্পাদক করিয়া ৩১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হয়। অন্যান্য নির্বাহী সদস্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সর্বজনাব সিরাজুল ইসলাম, চৌধুরী মোহাম্মদ ফারুক, ফোরকান আগমদ, সাহনেওয়াজ খান, আলতাফ হোসেন, চৌধুরী সাইদুর রেজা মানিক, মোশারফ হোসেন খান (মালেক) ও মীর্জা সফিকুল ইসলাম প্রমুখ। ৭১-এর ১লা মার্চ হইতে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত অসহযোগ আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলিতে তাহাদের উচ্চকিত “মুক্তিফৌজ গঠন কর বাংলাদেশ স্বাধীন কর” এ বুুন্দ আওয়াজ সারা বাংলায় এক অভূতপূর্ব শিহরণ জাগায়। স্বাধীনতা ও মক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি লগ্নে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত ফরওয়ার্ড ষ্টুডেন্টস ব্লক যে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করে তার সার্বিক নেতৃত্বে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জনাব মোঃ এহ্সানুল হক সেলিম।
    স্বাধীনতা যুদ্ধে এই সংগঠনের প্রত্যেকেই সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হইতেছে এই সংগঠনের সভাপতি লুৎফর রহমান ফরিদপুরে পাক বাহিনীর সহিত সম্মুখ যুদ্ধে ধৃত হইয়া নিগৃহিত হন এবং পরবর্তিতে শাহাদাত বরণ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কোন ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতির স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করিয়া শহীদ হওয়ার গৌরব একমাত্র ফরওয়ার্ড ষ্টুডেন্টস ব্লকেরই। উপরন্তুফরওয়ার্ড ষ্টুডেন্টস ব্লক-এর সবাই মুক্তিযুদ্ধে কোস সা কোনভাবে নিগৃহিত হইয়াছেন।
     স্বাধীনতা অর্জনের অব্যবহিত পর ’৭২ এর ১৪ই জানুয়ারীতে ফরওয়ার্ড ষ্টুডেন্টস ব্লক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে “স্বাধীনতা বরণ উৎসব” পালন করে। বর্ণাঢ্য সেই অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এক বিশাল ছাত্র জনসভাও অনুষ্ঠিত হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অংশ বিশেষ পরদিন বাংলাদেশ বেতারেও প্রচার করা হয়। সেই অনুষ্ঠানের আলোচনা সভায় বক্তাগণ স্বাধীন বাংলার তৎকালীন সরকারের উদ্দেশ্যে দেশ থেকে অনতিবিলম্বে ভারতীয় সৈন্য ভারতে ফেরৎ পাঠানোর ব্যবস্থা করা এবং ভারতের সাথে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের কোন গোপন চুক্তি হইয়াছে কিনা, হইয়া থাকিলে তা প্রকাশের দাবী জানান। সেই সভায় বক্তাগণ সরকারের প্রতিটি ভালো কাজে সহযোগীতা এবং জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি যে কোন কার্যক্রমের কঠোর বিরোধিতা করিবার ঘোষণা প্রদান করেন।
    স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হইয়াছিলেন জনাব চৌধুরী মোহাম্মদ ফারুক- পরবর্তীতে ১৯৭১ এর ডিসেম্বরে সংগঠনের কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি সভাপতি ও জনাব আ.গ.ম আবদুল বাতেন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। একতরফাভাবে ভারত কর্তৃক ফারাক্কার পানি প্রত্যাহার, ২৫ সালা ভারত-বাংলা দাসত্ব চুক্তি, ভারতের সহিত সম্পাদিত সকল গোপন ও অসমচুক্তি বাতিলের আন্দোলনসহ মুজিব বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনে ও ছাত্র সংগঠনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সাহসিকতাপূর্ণ।

নেতাদের আত্মগোপন
    ২৭শে মার্চ সকাল ৮টায় সান্ধ্য আইন কিছুক্ষণের জন্য শিথিল হইবার পর পরেই বাংলা মজদুর ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান সিরাজুল হক ইপিআর টিসি’র গাড়ী লইয়া আমার ৭নয় কলেজ ষ্ট্রীট ধানমন্ডি বাসভবনে আসেন। আমি তাঁহার সহৃদয়তায় বিমোহিত ও কৃতজ্ঞ। দেওয়ান সাহেবের গাড়ী লইয়া আমি সহোদরা বোন সুফিয়া ও তাহার সন্তানদিগকে রেলওয়ে অফিসার্স বাংলো হইতে ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে উর্দুভাষিনী মিসেস রাজিয়া বেগমের হেফাজতে পৌঁছাইয়া বিদায় গ্রহণ করি। রেলওয়ে অফিসারদের বায়লোগুলিতে বাঙ্গালী পরিবারের উপরে নামিয়অ আসিয়াছিল নারকীয় পরিস্থিতি। সতর্ক সাহসী ও সহৃদয়া মিসেস রাজিয়া বেগম ১৯৭১ সালের ভয়াবহ নয়টি মাস আমার বোনের পরিবারের যুবক-যুবতী ও শিশু সন্তানদের, বোনের স্বামী রেলওয়ে অফিসার কফিলউদ্দিন আহমদ ও বোনকে আশ্রয় দান করিয়অ উজ্জত ও প্রাণ রক্ষা করিয়াছেন। তাঁহার নিকট আমরা চিরকৃতজ্ঞ। ভারত হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া আমিও তাঁহার আবাসস্থলে আত্মগোপন অবস্থায় জীবন যাপন করিয়াছি।
    ২৭শে মার্চ ভোর ৮ ঘটিকা হইতে অপরাহ্ন ৪ ঘটিকা পর্যন্ত এবং ২৮শে মার্চ ভোর ৭টা হইতে দ্বি-প্রহর ১২টা পর্যন্ত সান্ধ্য আইন শিথিল করা হয়। পরে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার-বিবেচনা করিয়া সান্ধ্য আইন শিথিলের মেয়াদ অপরাহ্ন ৫টা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয় এবং পরবর্তী দিবসগুলিতে সান্ধ্য আইন আরো শিথিল করা হয়।
    ঢাকায় বাঙ্গালী পুলিশ বাহিনী ও গোয়েন্দা কর্মচারীরা তখন পলাতক। অতএব বাঙ্গালী গোয়েন্দা কর্মচারীর অবর্তমানে সাহসী রাজনৈতিক কর্মীর পক্ষে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার সহিত যোগাযোগ রক্ষা কঠিন ছিল না। তাই আমরা শাহজাহানপুরে দেওয়ান সিরাজুল হকের বাসভবনে এক বৈঠকে মিলিত হইয়া উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনা করিয়া প্রতিরোধ সংগ্রাম সংগঠিত করিবার এবং প্রতিরোধ শক্তি সংহত করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহন করি।
    বলাই বাহুল্য যে, সরকারী রোষ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের উপর ছিল প্রচন্ড। তাই আত্মগোপন ছাড়া তাহাদের উপায় ছিল না। সান্ধ্য-আইন শিথিল হইবার সঙ্গে সঙ্গে নগরবাসী প্রায় সকলেই পরিবার পরিজনসহ ঢাকা ত্যাগে উদ্যোগী হন। এইসব পলায়নপর কাফেলার অন্তর্ভূক্ত নারী ও শিশু সন্তানের চরম কষ্ট স্ববক্ষে না দেখিলে অনুধাবন করা যাবে না। যানবাহন নাই, সম্বল স্বীয় পদযুগল, নিজ নিজ শিরে বাক্স-পেটরা, কাঁখে দুধের শিশু। তবু চলিতে হয় জান-মাল-ইজ্জতের তাগিদে। কেত কেহ দেশ ছাড়ার ব্রতী হইয়াই ভিনদেশের অচেনা পরিবেশে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে যাত্র করে। এই কাহিনী লিখা সম্ভব নয়। কারণ, তখনকার দৃশ্য বর্ণনা করিবার জন্য ভাষার উপরে যে দখন থাকা দরকার, তাহা আমার নাই। এমনি কাফেলার সঙ্গী হইয়া পূর্ব পাক্তিান প্রাদেশিক পরিষদের আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারী পার্টি নেতা জনাব মনসুর আলীসহ পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের যুবক সদস্য ডঃ আবু হেনা নদী পাড়ি দেন এবং অপরতীরে জিঞ্জিরা পতে পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব কামরুজ্জামানের সহিত তাঁগাদের মোলাকাত হয়। তাঁহারা একই সঙ্গে কলাতিয়অর জনাব রতন সাহেবের বাড়ীতে আতিথ্য গ্রহণ করেন। পূবাহ্নে ঐ বাড়ীতে শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ, আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং রাত্রে নূরে আলম সিদ্দিকা ও আবদুল কুদ্দুস মাখনও আশ্রয় সন্ধানে ঐ বাড়ীতে আসেন।
    রাত্রির আলোচনা বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সর্বজনাব মনসুর আলী, কামরুজ্জামান, শেখ ফজলে হক মনি, তোফায়েল আহমদ ও ডঃ আবু হেনা ৪ঠা এপ্রিল ভারতের পতে সারিয়াকান্দি পৌঁছেন। পরিবার-পরিজনের জন্য বিচলিত মনসুর আলী স্পীডবোটযোগে সিরাজগঞ্জ যাত্রা করেন। সারিয়াকান্দি হইতে ৪ঠা এপ্রিল (১৯৭১) বগুড়া পৌঁছিয়া জীপযোগে সর্বজনাব কামরুজ্জামান, শেখ ফজলুল হক মনি, তোফায়েল আহমদ ও ডঃ আবু হেনা পাক-হিলি সীমান্ত অতিক্রম করিয়া ভারতীয় হিলিতে প্রবেশ করেন এবং তথা হইতেই ৬ই এপ্রিল (১৯৭১) কলিকাতা পৌঁছেন। প্রকাশ, তাঁহারা নাকি পূর্ব ব্যবস্থা মোতাবেক ভবানীপুর এলাকার ডঃ রাজেন্দ্র রোডের ২৬নং বাড়ীতে পৌঝান এবং তথায় তাঁহাদের অবস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। ঐ বাড়ীতে শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে “শ্রী ভূজঙ্গ ভূষণ রায়” এই ছদ্মনামে বরিশাল জেলা নিবাসী সাবেক পূর্ব পাকিস্তান ব্যবস্থা পরিষদের সদস্য শ্রী চিত্তরঞ্জন সুতার স্ত্রী-পুত্র ও কয়েকজন সহকর্মীসহ বাস করিতেন। প্রকাশ, তিনিই ভারত সরকার ও শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে যোগসূত্র হিসাবে কাজ করিতেন এবং ভারত সরকারই তাঁহাকে ঐ বাড়ীর ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছিলেন।
    এই সময় কলিকাতায় খরব আসে যে, জনাব তাজউদ্দিন আহমদ ও ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাম যথাক্রমে মোহাম্মদ আলী, রহমত আলী ছদ্মনামে দিল্লীতে অবস্থান করিতেছেন। তাঁহারা ২রা এপ্রিল ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সহিত আলোচনা বৈঠকে মিলিত হন। উল্লেখ্য যে, তাঁহারা উভয়েই ৩০শে মার্চ বনগাঁয় পৌঁছিয়াছিলেন। তাহাদের পরিচয় পাওয়া মাত্র বিএসএফ-এর একজন মেজর তাঁহাদিগকে স্যালুটদানের পর বিওপিতে (Border out post) লইয়া গিয়া যথারীতি আদর-আপ্যায়ন করেন। ইহা জনাব তাজউদ্দিন-এর ১৮ই মার্চ প্রেরিত ম্যাসেজ যথাস্থানে পৌঁছিবার পল। ওই রাত্রিতেই দিল্লী হইতে তাঁহাদের উদ্দেশ্যে হেলিকপ্টার পাঠান হয়। তাঁহারা দিল্লীর পতে যাত্রা শুরু করেন। উল্লেখ্য যে, ১৯৭২-এর মার্চ সাংবাদিক সম্মেলনের এক পর্যয়ে উপরোক্ত তথ্য সরবরাহ করা হয়।
    পরবর্তী তথ্য হইতে ইহাও জানা যায় যে, যশোহর হইতে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য মোশারফ আলী সর্বপ্রথম দিল্লী গমন করেন ও ভারতীয় সরকারের সহিত যোগাযোগ স্থাপন করেন।

অস্থায়ী সরকার
    যাহা হইক, কলিকাতায় দলীয় নেতৃবৃন্দের সহিত আলোচনার পর জনাব তাজউদ্দিন আহমদ ও ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাম পুনঃ দিল্লী গমন করেন এবং ৪ ও ৬ই এপ্রিল ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সহিত দুই দিবসব্যাপী আলোচনায় ভারত-বাংলাদেশ সহযোগীতার ভিত রচিত হয়। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে ভারতের সর্বপ্রকার সাহায্য-সহযোগীতার নিশ্চয়তা পাওয় যায়। উল্লেখ্য যে, জনাব তাজউদ্দিন আহমেদের এই দিল্লী অবস্থানকালেই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী পদে তাঁহার অধিষ্ঠিত হইবার ঘোষণা টেপ রেকর্ডিং করা হয়। ভারত সরকার সৈয়দ নজরুল ইসলামকে আনিবার জন্য ডঃ আবু হেনাকে ময়মনসিংহ প্রেরণ করে। ডঃ আবু হেনা গারো এলাকাভুক্ত গারোবোদা হইয়া ময়মনসিংক যান। ৮ই এপ্রিল জনাব তাজউদ্দিন আহমদ ও ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাম দিল্লী হইতে কলিকাতায় ফিরিয়া আসেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ময়মনসিংহের অন্তর্গত গারো হিলের ঢালু হইয়া ভারতে প্রবেশ করতঃ তুরাতে অবস্থান করিতেছেন- এই খবর পাইয়া জনাব তাজউদ্দিন আহমদ, ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাম ও শেখ ফজলুল হক মনি শিলিগুড়ি রওয়ানা হইয়অ যান এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামকে লইয়া কলিকাতা প্রত্যাবর্তন করেন। এইভাবে ক্রমে ক্রমে বিভিন্ন পতে যেসব নেতা কলিকাতা পে্যঁছেন, তাঁহাদের মধ্যে সর্বজনাব মনসুর আলী, কর্নেল আতাউল গনিওসমানী, মিজানুর রহমান চৌধুরী ও অধ্যাপক ইউসুফ আলী উল্লেখযোগ্য। ভারত সরকার সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ ও কর্নেল আতাউল গনি ওসমানীর বিএসএফ-এর কলিকাতা হেড অফিসে অবস্থানের ব্যবস্থা করেন। ভারত সরকারের এবম্বিত তৎপরতার অন্তর্নিহিত অর্থ ছিল সুস্পষ্ট অর্থাৎ যাহাতে ভারত সরকারের অভীষ্ট সিদ্ধি অর্থাৎ পাকিস্তানকে বিভক্ত করিবার মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া না হয়। অনেক বাক-বিতন্ডার পর শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রেসিডেন্ট, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট, তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমদকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মনসুর আলীকে অর্থমন্ত্রী, কামরুজ্জামানকে ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী হিসাবে ঘোষণা করিয়া গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়।
    ১নং ক্যামাক ষ্ট্রীটে এম.এল.এ হোষ্টেলে (ব্যবস্থাপক পরিষদ সদস্য ভবন) জনাব কামরুজ্জামানের সভাপতিত্বে পূর্ব পাকিস্তান হইতে আগত ৭৬ জন জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যের বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে সর্বজনসান্য নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রেসিডেন্ট এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম, খন্দকার মোশতাক আহমদ, তাজউদ্দিন আহমদ সভায় উপস্থিত ছিলেন না। অধ্যাপক ইউসুফ আলী সভার কার্যবিবরণী ও প্রস্তাব লিপিবদ্ধ করেন।
    ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সহিত দিল্লীতে আলোচনাকালে জনাব তাজউদ্দিন আহমদ কর্তৃক প্রধানমন্ত্রী হিসাবে স্বীয় নাম ঘোষণা এবং ১নং ক্যামাক ষ্ট্রীটে এম.এল.এ হোষ্টেলের এই বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাব পরস্পর বিরোধী ও সামঞ্জস্যহীন। এই বিরোধ নিরসনকল্পে সর্বজনাব তাজউদ্দিন আহমদ, কামরুজ্জামান, মনসুর আলী, আবদুল মান্নান (সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় শ্রমিক লীগ), শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক, আ স ম রব, আমিরুল ইসলাম বার-এট-ল’, মিজানুর রহমান চৌধুরী এক বৈঠকে মিলিত হইয়া ঐকমত্যে পে্যঁছান এবং জনাব তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী পদে বরণ করিয়া লন। বস্তুতঃ ব্যক্তি তাজউদ্দিন আহমদের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখান করিলে ভারত সরকারের নিকট হইতে মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য প্রাপ্তি ঘোরতরভাবে ব্যাহত হইবার আশংকা ছিল।