বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা

ফন্ট সাইজ:

     ১০ই এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় ও ১১ই এপ্রিল জনাব তাজউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বেতার ভাষণ দেন। ১২ই এপ্রিল স্বাধীন বাংলা বেতারে গণপ্রজাকন্ত্রী বাংলাদেশের ৬ সদস্যবিশিষ্ট অস্থায়ী সরকার গঠনের সংবাদ প্রচারিত হয়। ১৩ই এপ্রিল আগরতলা আশ্রয় গ্রহণকারী জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের সভায় উদ্ভূত পরিস্থিতির আলোকে সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। ১৭ই এপ্রিল অপরাহ্ন দেড় ঘটিকায় কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্গত মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথপুর গ্রামের আম্রকুঞ্জে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে। এইভাবেই ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার যে স্বাধীনতা সূর্য অস্ত যায়, ১৯৭১ সালে বৈদ্যনাথপুর আম্রকাননে সেই স্বাধীনতা সূর্যের পুনঃ উদয় হয়।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র
     “যেহেতু ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর হইতে ১৯৭১ সনের ১৭ই জানুয়ারী পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হইয়াছিল।”

                                                               এবং
    “যেহেতু এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় ১৬৭ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত করিয়াছিলেন।’

                                                              এবং
      “যেহেতু জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সনের ৩রা মার্চ তারিখে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহবান করেন।”
                                                             এবং
“যেহেতু আহূত এই পরিষদ স্বেচ্ছাচার এবং বেআইনীভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন।”

                                                           এবং
“যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিশ্র“তি পালন করিবার পরিবর্তে বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিদের সহিত পারস্পরিক আলোচনাকালে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ ন্যায়নীতি বহির্ভূত বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করেন।”

                                                          এবং
“যেহেতু উল্লিখিত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকায় যথাযতভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান।”

                                                         এবং
“যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বর্বর ও নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনা করিয়াছে এবং এখনও বাংলাদেশে বেসামরিক ও নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন গণহত্যা ও নির্যাতন চালাইতেছে।”

                                                       এবং
“যেহেতু পাকিস্তান সরকার অন্যায় যুদ্ধ, গণহত্যা ও নানাবিধ নৃশংস অত্যাচার পরিচালনা দ্বারা বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিদের একত্রিত হইয়া শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করিয়া জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা অসম্ভব করিয়া তুলিয়াছে।”

                                                     এবং
যেহেতু বাংলাদেশের জনগণ তাহাদের বীরত্ব, সাহসীকতা ও বিপ্লবী কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের উপর তাহাদের কর্যকরী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করিয়াছে এবং সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যে ম্যান্ডেট দিয়াছেন সেই ম্যান্ডেট মোতাবেক আমরা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আমাদের সমবায়ে গণপরিষদ গঠন করিয়া পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের পরিত্র কর্তব্য- সেইহেতু আমরা বাংলাদেশকে রূপায়িত করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করিতেছি এবং উহা দ্বারা পূর্বাহ্নে বঙ্গবন্ধু শেক মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা অনুমোদন করিতেছি।
      এতদ্বারা আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করিতেছি যে, শাসনতন্ত্র প্রণীত ওা হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকিবেন।

     রাষ্ট্রপ্রধান প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক পদেও অধিষ্ঠিত থাকিবেন। রাষ্ট্রপ্রধানই সর্বপ্রকার প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতার অধিকারী।

    রাষ্ট্রপ্রধানের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়োগের ক্ষমতা থাকিবে। তাঁহার করধার্য ও অর্থব্যয়ের ক্ষমতা থাকিবে। তাঁহার গণপরিষদের অধিবেশন আহবান ও উহা মুলতবী ঘোষণার ক্ষমতা থাকিবে। উহা দ্বারা বাংলাদেশের জনসাধারণের জন্য আইনানুগ ও নিয়মতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় সকল ক্ষমতার তিনি অধিকারী হইবেন।

     বাংলাদেশের জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করিতেছি যে, কোন কারণে যদি রাষ্ট্রপ্রধান না থাকেন অথবা যদি রাষ্ট্রপ্রধান কাজে যোগদান করিতে না পারেন অথবা তাঁহার কর্তব্য এবং প্রদত্ত সকল ক্ষমতা ও দায়িত্ব ইপ-রাষ্ট্রপ্রধান পালন করিবেন।

     আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করিতেছি যে, বিশ্বের একটি জাতি হিসেবে এবং জাতিসংঘের সনদ মোতাবেক আমাদের যে দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্তাইয়াছে উহা যথাযতভাবে আমরা পালন করিব।

     আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করিতেছি যে, আমাদের এই সিদ্ধান্ত কার্যকরী করিবার জন্য আমরা অধ্যাপক এম. ইউসুপ আলীকে যথাযতভাবে রাষ্ট্রপ্রধান ও উপ-রাষ্ট্রপ্রধানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য দায়িত্ব অর্পণ ও নিযুক্ত করিলাম।”

স্বাক্ষরঃ- এম. ইউসুফ আলী
(বাংলাদেশ গণপরিষদের পক্ষ থেকে)

রাজনৈতিক সমাধানের শর্তাবলী
     গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ ঘোষণার পর দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মহল কর্তৃক রাজনৈতিক সমাধানের প্রস্তাবের জওয়াবে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম ১৯৭১ সালের ৬ই জুন বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হইতে প্রচারিত ভাষণে নিম্নোক্ত শর্তাধীনে রাজনৈতিক সমাধানের প্রস্তাব দেন:

১। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বীকৃতি দান,
২। বাংলার মাচি হইতে পা-বাহিনী প্রত্যাহার,
৩। বঙ্গবন্ধু ও ধৃত জনপ্রতিনিধিদের অবিলম্বে মুক্তিদান,
৪। আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ নির্ণয় ও ক্ষতিপূরণ দান।

     প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৮শে জুন (১৯৭১) এক বেতার ভাষণে অনুপস্থিত, পলাতক সদস্যদের আসন শূন্য ঘোষণা করিয়া জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের শূন্য আসনগুলিতে উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা সাধারণ্যে প্রকাশ করেন। উদ্দেশ্য জনপ্রতিনিধিদের হস্তে ক্ষমতা হস্তান্তর।
      ৫ ও ৬ই জুলাই (১৯৭১) বাংলাদেশ হইতে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের এক যুক্ত অধিবেশনে ভাষণদানকালে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার দুইমুখী নীতির স্বরূপ উদ্ঘাটর করিয়া বলেন, “...বঙ্গবন্ধুর আদেশে ও নির্দেশে আমি এবং আপনাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন সাহেব আলোচনা শুরু করিলাম। জনাব ইয়াহিয়া খান সাহেবের পক্ষে ছিলেন লেঃ জেঃ পীরজাদা।... আলোচনা চলিতে থাকিল। ২৪শে মার্চ পর্যন্ত আলোচনা হইল। আমার বন্ধু তাজউদ্দিন উপস্থিত। আমি বারবার এই কথা বলিয়াছি, এই আলোচনা কোনকালেই ব্যর্থ হয় নাই। ২৪ তারিখ ডকুমেন্ট (উড়পঁসবহঃ) তৈরী হোল। অথচ ২৫শে মার্চ রাত্রে অতর্কিতে হামলা নিরস্ত্র অপ্রস্তুত বাংগালীর উপর। তাই বিশ্বাসঘাতক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ২৮শে জুন পরিকল্পনার দাঁতভাংগা জওয়াব লড়াই-এর মাঠে দেওয়ার সংকল্প বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু
      গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার কর্নেল আতাউল গনি ওসমানীকে জেনারেল পদে উন্নীত করিয়অ সর্বাধিনায়ক ও কর্নেল আবদুর রবকে চীফ অব ষ্টাফ নিযুক্ত করেন। বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ ১১ই এপ্রিল-এর বেতার ভাষণে মেজর শফিউল্লাহ, মেজর জিয়াউর রহমান ও মেজর খালেদ মোশাররফকে যথাক্রমে ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল অঞ্চল, চট্টগ্রাম-নোয়াখালী অঞ্চল ও শ্রীহট্ট-কুমিল্লা অঞ্চলের সেক্টর কমান্ডার হিসাবে ঘোষণা করেন।
      পরবর্তিতে রণাঙ্গন অর্থাৎ সমগ্র বাংলাদেশকে মোট ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। এই সেক্টরগুলির নেতৃত্ব বা কমান্ডে যাহারা বিভিন্ন সময়ে ছিলেন তাঁহাদের নাম নিম্নে দেওয়া হইল:

সেক্টর ১।     (ক) মেজর জিয়াউর রহমান (জুন পর্যন্ত)
        (খ) ক্যাপ্টেন মোঃ রফিক (জুন হইতে ডিসেম্বর)
সেক্টর ২।     (ক) মেজর খালেদ মোশাররফ (সেপ্টেম্বর পর্যন্ত)
        (খ) মেজর এ.টি.এম. হায়দার (সেপ্টেম্বর হইতে ডিসেম্বর পর্যন্ত)
সেক্টর ৩।     (ক) মেজর কে.এম. শফিউল্লাহ (সেপ্টেম্বর পর্যন্ত)
        (খ) মেজর এ.এন.এম. নূরুজ্জামান (সেপ্টেম্বর হইতে ডিসেম্বর পর্যন্ত)
সেক্টর ৪।     মেজর সি.আর. দত্ত
সেক্টর ৫।     মেজর মীর শওকত আলী
সেক্টর ৬।     উইং কমান্ডার এম.কে. বাশার
সেক্টর ৭।     মেজর কাজী নূরুজ্জামান
সেক্টর ৮।     (ক) মেজর আবু ওসমান চৌধুরী (আগষ্ট পর্যন্ত)
        (খ) মেজর এম.এ. মনজুর (আগষ্ট হইতে ডিসেম্বর)
সেক্টর ৯।     (ক) মেজর এম.এ. জলিল (ডিসেম্বরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত)
        (খ) মেজর জয়নাল আবেদীন (যুদ্ধের শেষ কিছুদিন)
সেক্টর ১০।     হেড কোয়ার্টার পরিচালিত কমান্ড বাহিনী
সেক্টর ১১।     (ক) মেজর আবু তাহের (আগষ্ট হইতে নভেম্বর)
        (খ) ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট এম. হামিদুল্লাহ (নভেম্বর হইতে ডিসেম্বর)

     ইহা ছাড়া নৌ-কমান্ডাররা নির্দিষ্ট মিশনে নিয়োজিত হইলে তাহারা সংশ্লিষ্ট কমান্ডারদের অধীনে কাজে নিয়োজিত থাকিতেন।
ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলসের প্রায় ১৪ হাজার বাঙ্গালী নওজোয়ান, ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রায় ৩ হাজার নওজোয়ান ও ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ, আনসার-মোজাহিদদের লইয়া পুনর্গঠিত সশস্ত্রবাহিনী কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়। সেক্টর কমান্ডারদের নামের ইংরেজী অধ্যাক্ষরে ‘এস’ (ঝ) ফোর্স, (ত) ‘জেড’ ফোর্স ও (ক) ‘কে’ ফোর্স নামে মুক্তিযোদ্ধারা বিভক্ত ও পরিচিতি লাভ করে। উল্লেখ্য যে, নিউজ উইকের সিনিয়র এডিটর আরনয়নড ডি. ব্রচগ্রেডের সহিত সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান প্রকাশ করেন যে, ৬ ব্যাটেলিয়ন সৈন্য, পুলিশ ও ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস হইতে সর্বমোট ৬০ জাহার সশস্ত্র বাহিনী ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর সাহায্যে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতেছে (পাকিস্তান টাইমস, ৭/১১/৭১)।

ঢাকা ত্যাগ
     ২৫শে মার্চের পর কারফিউ তুলিয়া নেওয়া হইলে আমি ঢাকা নগরে বেবী ট্যাক্সিতে সর্বত্র সকাল-সন্ধা ঘোরাফেরা করিতাম। স্বচক্ষে পাক-বাহিনীর অত্যাচার, জুলুম হত্যাযজ্ঞের চিহ্নসমূহ পরিদর্শন করিতাম। সুবিধা ছিল, বাংগালীরা মর্মাহত ও ঐক্যবদ্ধ, কেহ কাহারো বিরুদ্ধে কোন সংবাদ অত্যাচরী সামরিক শাসন কর্তৃপক্ষকে কর্ণগোচর করিত না। এমনি অবস্থায় সাপ্তাহিক ‘জনতা’ সম্পাদক আনিসুজ্জামানের সহিত তাঁহার শেখ সাহেব বাজারস্থ বাসভবনে সাক্ষাৎ করি। পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণের পর জনাব আনিসুজ্জামান আওয়ামী লীগ নেতৃবর্গের সহিত যোগাযোগ করিবার জন্য কলাতিয়া যাইতে সম্মতি জানান এবং তদানুযায়ী ৩২শে মার্চ তিনি কলাতিয়ার পথে ঢাকা ত্যাগ করেন। ১লা এপ্রিল কলাতিয়া হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া জনাব আনিসুজ্জামান আমাদিগকে জানান যে, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ তাঁহার কলাতিয়া পে্যঁছিবার পূর্বেই ভারতের পথে রওয়ানা হইয়া গিয়াছেন।
      আমি জনাব আবদুল গাফফার চৌধুরীর সহিত নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করিতাম এবং মাঝে মাঝে তাঁহার অভয়দাস লেনের বাসায় রাত্রিযাপন করিতাম। তাঁহার বাসায় রাত্রিযাপন করিতে গিয়া তাঁহারই রেডিও সেটে ২৭শে মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্ত্র হইতে বাংলা’র ঘোষণা শুনিতে পাই। চট্টগ্রাম বেতারের কালুরঘাট ট্রান্সমিশন কেন্দ্র হইতে মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠস্বরে ‘স্বাধীন বাংলার’ ডাক ধ্বনিত হইয়াছিল। এই ডাকের মধ্যে সেই দিমাহারা, হতভম্ব, সম্বিতহারা ও মুর্ছিতপ্রাণ বাংগালী জনতা শুনিতে পায় এক অভয়বাণী, আত্মমর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে ঝাঁপাইয়া পড়িবার আহবান, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের লড়াই-এর সংবাদ। ফলে সর্বত্র উচ্চারিত হয় মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পতনের সংকল্প, আওয়াজ উঠে- জালেমের নিকট আত্মসমর্পণ নয়, আহবান ধ্বনিত হইতে থাকে আত্মপ্রতিষ্ঠার, প্রতিরোধ শক্তিকে সুসংহতকরণের। এইভাবেই সেদিন জাতি আত্মসন্বিৎ ফিরিয়া পায় এবং মরণপণ সংগ্রামে ঝাঁপাইয়া পড়ে।

     যাহা হউক, জনাব আনিসুজ্জামনের রিপোর্ট শুনিবার পর আমি ঢাকায় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সহিত সাক্ষাতের আশায় ত্যাগ করিয়া আগরতলায় যাওয়অর মনস্থ করি। আমরা পূর্ব পাকিস্তানকে কয়েকটি এলাকায় বিভক্ত করি এবং বিভিন্ন গ্রুপে বাংলা জাতীয় লীগ কর্মীদিগকে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে ছড়াইয়অ পড়িবার নির্দেশ দান করি। স্থানীয় পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন করিয়অ স্থানীয়ভাবে নেতৃত্ব দিবার ও দলমত-নির্বিশেষে প্রতিরোধ শক্তিকে সুসংহত করিবার আহবান জানাই। ঢাকা নগরীকে যোগাযোগ রক্ষার কেন্দ্রস্থল ঘোষণা করি। আমরা মুক্তি সংগ্রামের একটি দলীয় কর্মসূচী প্রণয়ন করি এবং কর্মীদের উদ্দেশ্যে উহার মাধ্যমে যথাযত নির্দেশ দিয়া সবাইকে মুক্তি সংগ্রামের মূল প্রতিরোধ শক্তি আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সহিত যোগাযোগ করিবার নির্দেশ দেই। এইভাবে সবকিছু ঠিকঠাক করিয়া দিয়া আমি ৩রা এপ্রিল আগরতলার পথে ঢাকা ত্যাগ করি। জনাব গাফফার চৌধুরীর আমাদের সহিত যাইবার কথা ছিল কিন্তু ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণে তিনি নির্দিষ্ট সময়ে যাত্রা করিতে পারেন নাই।
    যাত্রা পথে দেওয়ান সিরাজুল হক ও আমি ডেমরা ও নরসিংদী অতিক্রম করিয়অ নবীনগর পৌঁছি এবং নবীনগরে আমার বড় ভাইয়ের শ্বশুর জনাব আমীর আলী খান সাহেবের বাড়ীতে রাত্রিযাপন করিয়া ৪ঠা এপ্রিল ভোরে লঞ্চে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুক্ত এলাকার প্রতিরক্ষা ব্যুহের সিপাহসালার।
      এরপর আমি ও দেওয়ান সিরাজুল হক আখাউড়া যাই এবং আখাউড়া ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এম.এ. তাহেরের আতিথ্য গ্রহণ করি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া হইতে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য আলী আজম ভূঁইয়অ আগরতলায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের পক্ষ হইতে ৮ই এপ্রিৈ আমাদের সহিত রাজনৈতিক আলোচনা করিবার জন্য আথাউড়া আসেন এবং আমরা এম.এ. তাহেরের বাসভবনে আলোচান বৈঠকে মিলিত হই। বৈঠকে নিম্নলিখিত ঐকমত্যে পৌঁছি:
১। ভারতীয় সৈন্যকে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশাধিকার দেওয়া হইবে না।
২। মুক্তিযুদ্ধে জয়ের পর ভারতীয় হিন্দু বাংগালীদের বাংলাদেশে প্রবেশাধিকার দেওয়া হইবে না।
৩। লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী সার্বভৌম ও স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান গঠন। পূর্ব পাকিস্তান ভারতভুক্ত অংশ হইবে না।
৪। মুক্তিযুদ্ধে জয়ের পর দেশে কোন ফৌজি শাসন কায়েম হইবে না।

জনাব আলী আযম ভূঁইয়ার সহিত আলোচনার পর আমি পুররায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রত্যাবর্তন করি। ১৪ই এপ্রিল অপরাহ্ন তিন ঘটিকার সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিমান হামলা হয়। ১৫ই এপ্রিল ভোরে পুনরায় বিমান বাহিনীর হামলা চলিল। বিমান হামলার পর আমি ও দেওয়ান সিরাজুল হক পুনরায় আখাউড়া পতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ত্যাগ করি। পরে আমরা আখাউড়া হইতে সীমান্ত গ্রাম চাঁদপুরে আশ্রয় গ্রহণ করি এবং এইভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করি যাহাতে প্রয়োজন দেখা দিলে আত্মরক্ষার কারণে যেন ত্বরিত ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করিতে পারি। পাক হাওয়াই হামলায় পর্যুদস্ত মুক্তিবাহিনী ও বেঙ্গল আর্মি বিনা ুদ্ধে ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গোপনাঘাট, উজানীসার ও আজমপুর হইতে পশ্চাদপসরণ করে এবয় অনায়ানেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাক বাহিনীর করায়ত্ত হয়।

     সীমান্তগ্রামগুলি পাক বাহিনীর বিষদৃষ্টিমৃক্ত নয় এই আশংকাং ও সীমান্তের অপর পাড়ে সরকারের নিকট হইতে বাস্তব সাহায্যের আশায় ও মুক্তিকামী সহযোগী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সহিত ঐক্যবদ্ধ কর্মপন্থা নির্ধারণকল্টে আমরা পরিশেষে সীমান্ত অতিক্রম করিয়া আগরতলায় পৌঁছি।

ভারতের অভিজ্ঞতা
     আগরতলায় লক্ষ্য করি, আওয়ামী লীগ নেতা, কর্মী ও সমর্থক ব্যতীত অন্য রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা ও কর্মীদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। তবে প্রকৃত জাতীয়তাবাদী দলগুলির সংকট চরম ও বর্ণনাতীত ছিল। আওয়ামী লীগ প্রকৃত জাতীয়তাবাদী দল ছিল না, ইহা ছিল বরং ক্ষমতা লিপ্সু, নীতি বিবর্জিত রাজনৈতিক কর্মীদের সমাবেশ মাত্র। তাই বলিয়া আওয়ামী লীগে যে কিছুসংখ্যক আদর্শবাদী সিঃস্বার্থ কর্মী ছিলেন না, তাহা নহে, তবে তাঁহারা ছিলেন ব্যতিক্রম।
       কমিউনিষ্ট পার্টি এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও তাহাদের গণ-সংগঠন কর্মীদের আহার ও বাস্থানের দায়িত্ব গ্রহণ করে ভারতীয় কমিউনিষ্ট পার্টি (মস্কো বা পিকিং)। আমরা জাতীয়তাবাদী দলগুলি তাহাদের সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা দল, সেই বোধটুকু তাহাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় নাই। তাহারা ছিল আত্মস্বার্থগত প্রাণ, আত্মবিলীনগত প্রাণ নহে। কটু শুনাইলেও নির্মম সত্য।
আগরতলায় আমি স্বল্পবেতনভুক্ত সরকারী কর্মচারী বাবু সুধীরচন্দ্র ঘোষের বাড়ীতে আতিথ্য গ্রহণ করি। মহৎপ্রাণ সুধীর বাবুর আতিথেয়তা ও অমায়িক ব্যবহার আমার স্মৃতিপটে চিরজাগরুক থাকিবে। তাঁহারই বাসভবনে জনাব সিরাজুল আলম খান ও জনাব আ স ম আবদুর রবের সহিত মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়। তাঁহারা আমার সহিত নীতিগতভাবে একমত হলেও বাস্তবে ১৬ই ডিসেম্বরের পূর্ব পর্যন্ত ভারতের মাটিতে মুক্তিযুদ্ধের মহড়া দিয়াছেন, কিন্তু বাংলার মাটিতে দাঁড়াইয়া মাতৃভূমির মুক্তির জন্য পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েন নাই। তাঁহারা উভয়েই পৃথক পৃথক আলোচনায় আমাকে কলিকাতার অস্থায়ী সরকার প্রধান তাজউদ্দিন আহমদের সহিত দেখা করিবার প্রস্তাব দিলে আমি তাহাদিগকে বলি, প্রথমতঃ আমার বুঝা দরকার, জনাব তাজউদ্দিন আহমদ ভারতের ক্রীড়নক শক্তি কি না, দ্বিতীয়তঃ ভারতীয় সেনাবাহিনী মুক্তিযুদ্ধে লিপ্ত হইবে, নাকি বঙ্গসন্তাইরাই বঙ্গের স্বাধীনতা পরিচালনা করিবে। যদি ভারতীয় সেন্য সশরীরে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়া বাংলাদেশের মাটিকে পাক বাহিনীমুক্ত করে, তাহা হইলে কার্যক্ষেত্রে আমরা ভারতের ক্রিড়নক রাষ্ট্রেই পরিণত হইব। তৃতীয়তঃ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলা জাতীয় লীগের মতো সহযোগী স্বাধীনতা কামী দলগুলির সহিত যুক্তভাবে স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা করিতে সম্মত আছে কি না? চতুর্থতঃ এখানকার অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে আপনাদের অবস্থা খুব একটা সুবিধাজনক নহে। চতুর্থ মন্তব্যের উত্তরে আ স ম আবদুর রব দৃঢ়তার সহিত বলিলেন, ভারত সরকার জানেন, আমাদের শক্তি আছে কি-না। তাই “ভারত সরকার আমাদিগকে পৃথকভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার বাস্তব সাহায্য দিবে, এই মর্মে আমরা (সিরাজুল আলম গ্রুপ) আশ্বাস পাইয়াছি।” কথা প্রসঙ্গে তিনি আমার সহিক এই বিষয়েও একমত হইলেন যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই গেরিলা যুদ্ধ সংগঠিত হইবে। সিরাজুল আলম খান তখন কলিকাতা রওয়ানা হওয়ার পথে। তিনি বলিলেন যে, কলিকাতায় অবস্থানরত অস্থায়ী সরকারের সহিত আমার বক্তব্য সম্পর্কে আলোচনা করিয়া আমাকে ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের মাধ্যমে ফলাফল জানাইবেন। সিরাজুল আলম খান কলিকাতা গেলেন বটে, তবে প্রতিশ্র“তি মোতাবেক কোন উত্তর আমাকে কখনও পাঠান নাই। সেইদিন আমি যে আশংকা প্রকাশ করিয়াছিলাম, পরবর্তীকালে হইয়াছেও তাহাই। ভারত নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গীতেই পাকিস্তানের অভ্যূদয় লগ্ন হইতে পাকিস্তান ধ্বংসের চেষ্টায় সর্বশক্তি নিয়োগ অব্যাহত রাখিয়াছে আর আমরা আমাদের নিজস্ব প্রয়োজনে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা চাহিয়াছি। ইহা শুধু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নয়, অনুধাবনের বিষয়।

    যাহা হউক, শেষ পর্যন্ত বাংলা জাতীয় লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এম.এম.আনোয়ারের উদ্যোগে আগরতলা এসম্বলি মেম্বার রেষ্ট হাউসে আমার ও আওয়ামী লীগ নেতা এবং জাতীয় পরিষদ সদস্য আবদুল মালেক উকিলের মধ্যে সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর এক দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানাইয়া দেন যে, শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের পূর্ব মুহূর্ত অবধি কোন নির্দেশ দান করেন নাই। এইদিকে মুজিব-ইয়াহিয়অর মার্চ-এর আলোচনার সূত্র ধরিয়া কনফেডারেশন প্রস্তাবের ভিত্তিতে সমঝোতার আলোচনা চলিতেছে। জনাব মালেক উকিল আমাকে ইহাও জানান যে, তিনি এই আলোজনার ফলাফল সম্পর্কে আশাবাদী। প্রসঙ্গত ইহাও উল্লেখ্য যে, ইতিমধ্যে আমি সর্বজনাব আবদুল মালেক উকিল, জহুর আহমদ চৌধুরী, আবদুল হান্নান চৌধুরী, আলী আজম, খালেদ মোহাম্মদ আলী, লুৎফুল হাই সাচ্চু প্রমুখ আওয়ামী লীগ নেতার সহিত বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে আলোচনাকালে নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ভবিষ্যৎ কর্মপন্থ বা লক্ষ সম্পর্কে কোন নির্দেশ দিয়াছিলেন কিনা, জানিতে চাহিয়াছিলাম। তাহারা সবাই স্পষ্ট ভাষায় ও নিঃসঙ্কোচে জবাব দিলেন যে, ২৫শে মার্চ পাক বাহিনীর আকস্মিক অতর্কিত হামলার ফলে কোন নির্দেশ দান কিংবা পরামর্শ দান নেতার পক্ষে সম্ভব হয় নাই। অথচ স্বাধীনতা উত্তরকালে বানোয়াটভাবে বলা হয় যে, তিনি পূর্বাহ্নেই নির্দেম প্রদান করিয়াছিলেন। শুধু তাহাই নয়, শেখ মুজিবুর রহমানও ১৯৭২ সালের ৭ই এপ্রিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল অধবেশনে ঘোষণা করেন যে, তিনি নির্দেশনামা জনাব জহুে আহমদ চৌধুরীকে পাঠাইয়াছিলেন। কথিত সেই নির্দেশনামাটি নিম্নরূপ:

DECLARATION OF WAR OF INDEPENDENCE

BY

BANGABANDHU SK. MUJIBUR RAHMAN

A historic message from Bangabandhu Sk. Mujibur Rahman conveyed to Mr. Zahur Ahmed Chowdhury on 25th March, 1971 at ll.30 hours immediately after crack-down of Pak Armay.

"Pak army suddenly attacked E.P.R. base at Pilkhana, Rajarbagh Police line and killing citizens, Streets battles are going on in every street of Dacca, Chittagong. I appeal to the nations of the World for help. Our freedom fighters are gallantly fighting with the enemies to free the motherland. I appeal and order you all in the name of Almighty Allah to fight to the last drop of blood to liberate the country. Ask Police, E.P.R; Bengal Regiment and Ansar to stand by you and to fight. No compromise, Victory is ours. Drive out the last enemy from the holy soil of motherland. Convey this message to all Awami League leaders, workers and other patriots and lovcrs of freedom. May Allah bless you.

     পাক বাহিনীর আক্রমণের অব্যবহিত পর রাত সাড়ে ১১টায় (২৫শে মার্চ, ১৯৭১) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক জনাব জহরি আহমদ চৌধুরীর নিকট প্রেরিত একটি ঐতিহাসিক বাণী: (অনুবাদ)

“পাক বাহিনী আকস্মিকভাবে পিলখানাস্থ ইপিআর ইেজ এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমন করিয়াছে এবং নাগরিকদেরকে হত্যা কিরতেছে। ঢাকা চট্টগ্রামে প্রতিটি রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলিতেছে। আমি সাহায্যের জন্য বিশ্বের জাতিসংঘের প্রতি আবেদন জানাইতেছি। মাতৃভূমিকে মুক্ত করিবার জন্য আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুর সহিত বীরের মতো যুদ্ধ করিতেছে। আমি সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালার নামে দেশকে মুক্ত করিবার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালাইয়া যাওয়ার জন্য আপনাদের প্রতি আবেদন জানাইতেছি এবং নির্দেশ প্রদান করিতেছি। পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং আনসারদের আমাদের পাশে দাঁড়াইয়া যুদ্ধ করিবার জন্য নির্দেশ প্রদান করুন। কোন আপোষ নাই, বিজয় আমাদের হইবে।
     মাতৃভূমির পবিত্র মৃক্তিকা হইতে শেষ শত্রুটিকেও বিতাড়িত করুন। সকল আওয়ামী লীগ নেতা, কর্মী ও অন্যান্য দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনতাপিয়াসী ব্যক্তিদের নিকট এই বাণী পৌঁছাইয়অ দিবেন। আল্লাহ আপনাদের সহায় হউন।

জয় বাংলা
শেখ মুজিবুর রহমান

উপরে আওয়ামী লীগ নেতাদের সাক্ষ্য অনুসারেই শেখ মুজিবুর রহমানের এই দাবী যে বিতর্কের উর্ধ্বে নয়, তার জ্বলস্ত প্রমাণ “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র” প্রন্থাবলীতে প্রকাশিত বার্তাটি হচ্ছে “এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহবান জানাচ্ছি, আপনারা যেখানেই আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তা দিয়ে দখলদার বাহিনীর শেষ সুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিরোধ করুন। পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি হইতে বহিস্কার এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।” উপরোক্ত বক্তব্যটিই হুবহু ভারতীয় বৈদেশিক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত “বাংলাদেশ ডকুমেন্টসেও” পূর্বাহ্নে ছাপা হয়। অবশ্য একথা সত্য যে, সেইদিন আমার মতো কোটি কোটি উৎকণ্ঠিত বাঙ্গাণীপ্রাণ উল্লিখিত অনুরূপ একটি নির্দেশের অপেক্ষায় ছিল।
     শেখ মুজিবুর রহমান যে স্বাধীনতার কোন ঘোষণা দেন নাই তার আরও প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৭১-এর ৬ই নভেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়অ বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ভাষণ দেন যে ভাষণে। সেই ভাষণে মিসেস ইন্দিরা গান্ধী বলেন,

     ...The cry for Independence (of Bangladesh) arose after Sheikh Mujib was arrested and not before. He (Mujib) himself, so far as I know has not ask for Independence even now. ...

“স্বাধীনতার প্রশ্ন উঠে (বাংলাদেশের) শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পর তার আগে নয়। আমি যতদূর জানি আজো পর্যন্ত শেক মুজিব স্বাধীনতা দাবী করেননি।”
        পক্ষান্তরে সেই অন্ধকার ও সংকটময় মুহূর্তে ২৭শে মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র হইতে ভাসিয়া আসিয়াছিল একটি নির্ভয় বীরদর্পী বিদ্রোহী কণ্ঠ। এই কণ্ঠই সেইদিন লক্ষ কোটি বাঙ্গালীকে দিয়াছিল অভয়বাণী, ডাক দিয়াছিল মাতৃভূমির মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে অংশগ্রহণ করিতে। কণ্ঠটি বেঙ্গল আর্মি মেজর জিয়াউর রহামনের। উক্ত ঘোষণার অংশ বিশেষ হইল:

"I major Ziaur Rahman head ofthe provisionery revoletionary Government of Bangladesh do hereby proclaim and declare the Independence of Bangladesh .... and also appeal to the all Democratic socialist and other countries of the world to immediate recognise our country Bangladesh. .... Insha Allah victory is ours."

“প্রিয় দেশবাসী,
   আমি মেজর জিয়া বলছি। এতদ্বারা আমি স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি...
    বিশ্বের সকল গণত্রান্ত্রিক, সমাজতানিত্রক ও অপরাপর রাষ্ট্রসমূহকে অনতিবিলম্বে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহবান জানাচ্ছি।... ইনশা আল্লাহ জয় আমাদের সুনিশ্চিত।”
    পরবর্তীতে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে জিয়াউর রহমান কর্তৃক সংশোধিত ঘোষনাটি নিম্নরপ:

     I major Ziaur Rahman on behalf of our great Leader Bangabandhu Sheikh Mujibar Rahman supreem commander and head of the provisionery Revoletionary Govt of Bangladesh do hereby proclaim and declare the Independence of Bangladesh. ... সময়োপযোগী নেতৃত্বদানের ব্যর্থতা ঢাকিবার জন্যই পরবর্তীকালে শেখ মুজিবুর রহমান অসত্যের আশ্রয় গ্রহণ করিয়া নির্দেশ প্রদানের একটি ঘোষণা পত্র ছাপাইয়া সারারণ্যে বিলি করিয়াছিলেন। ইহা না করিয়া তাহার উচিত ছিল সময়োপযোগী অবদানের জন্য মেজর জিয়াউর রহমানকে স্বীকৃতিদান, ইহা হইত নেতাসুলভ আচরণ। তাঁহার মানসিকতার কারণেই শেখ মুজিবুর রহমান স্বাভাবিকভাবেই তাহা করিতে ব্যর্থ হন। ইহা অতীব পরিতাপ এবং দুঃখের বিষয়। যাহা হউক, মেজর জিয়ার বলিষ্ঠকণ্ঠস্বর সেইদিন বাংগালী জাতিকে স্মরণ করাইয়া দিয়াছিল কবির সেই অভয় বাণী:

“উদয়ের পথে শুণি কার বাণী
ভয় নাই ওরে ভয় নাই;
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।”

এইভাবেই মেজর জিয়ার সেই ঘোষণা বাংগালী জাতির ধমনীতে সেইদিনের সেই সংকটময় মুহূর্তে জোগাইয়াছিল ঐশ্বরিক শক্তি; মনে-প্রালে সঞ্জীবিত করিয়া তুলিয়াছিল দৃঢ়প্রত্যয়, আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মানবোধ। ফলকথা, সেইদিন বাংগালীকে নিজস্ব সত্ত্বায় আত্মস্থ ও বলীয়ান করিবার জন্যই যে মেজর জিয়ার আবির্ভাব ঘটিয়াছিণ।
     শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা আন্দোলনকে নিয়মতান্ত্রিক অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে আপামর জনতার সার্বিক গণ-আন্দোলনে রূপান্তরিত করেন এবং এইভাবেই তিনি বাংগালী জনতার একচ্ছত্র ও অবিসংবাদিত নেতার আসনে আসীন হয়। ২৫শে মার্চ (১৯৭১) মধ্যরাত্রিতে পাক হানাদার বাহিনীর আক্রমণের খবর পূর্বাহ্নে জ্ঞাত হইয়াও তিনি তদমুহূর্তে জাতির মরণপল সংগ্রামের সর্বাধিনায়ক হওয়অ সত্ত্বেও স্বেচ্ছায় স্বীয় বাসভবনে অবস্থান করিয়া হানাদার বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করেন। ইতিহাস সচেতন মাত্রই জ্ঞাত যে, ১৯৮২ সালের আগষ্টের অহিংস আন্দোলনের ডাক দিলে কারারুদ্ধ গান্ধী পন্থী লোকনায়ক জয়প্রকাশ নারায়ণ ‘হাজারীবাগ’ কারাগার হইতে পলায়ণ করিয়া সশরীরে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তদ্রুপ শাসক ফরাসীদের বিরুদ্ধে আলজিরিয়ার মুক্তিযুদ্ধে সশরীরে নেতৃত্বদানের উদ্দীপনায় বিপ্লবী আহমদ বেনবেল্লাহ কারাগার হইতে পলায়ণ করেন। গ্রেফতারী পরোয়ানা জ্ঞাত হওয়ার পর দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যান্ডেলা ১৯৬২ সালে গোপনে দেশ ত্যাগ করে আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশে বর্ণবাদী রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ার জন্য সভা-সমিতি করেন। এমনকি লন্ডনে জনমত গড়ার জন্য আত্মগোপন অবস্থায় দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করেন। আমরা দেশবাসী পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশরীরে সেনাপতিত্ব চাহিয়াছিলাম- পাক হানাদার বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পন চাই নাই। তথাপি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বিশাল সাংগঠনিক শক্তির কারণেই দেশবাসী তাহার নামেই মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণে কুণ্ঠাবোধ করে নাই।

 

Joy Bangla
Sk. Mujibur Rahman

 

(This message was communicated from Teknaf to Dinajpur and to fricndly countries through somc vcsscis which wcrc anchored at Bay of Bengal near Chittagong by Mr. ZahurAhmcd Chowdhury)