স্বাধীনতার ঘোষণা ও মেজর জিয়া

ফন্ট সাইজ:

প্রসঙ্গত চট্টগ্রাম বেতার মারফত স্বাধীনতার ঘোষণা ও মেজর জিয়া
     স্বাধীনতা যুদ্ধ হঠাত করে ঘটে যাওয়অ কোন ঘটনা নয় কিংবা হঠাৎ করে রেডিওতে ভেসে আসা কোন এক ব্যক্তির ঘোষণায় সারাদেশের মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লো এমন নয়। একটি দেশের- একটি জাতির, স্বাধীনতা সংগ্রাম দীর্ঘদিনের প্রস্তুতিরই ফসল। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত-সংঘাত-আত্মত্যাগ আর আত্মাহুতির বিনিময়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপট গড়ে উঠে। মনে রাখতে হবে আমাদের দেশের স্বাধীনতা
      আন্দোলনের প্রেক্ষাপটও দীর্ঘদিনের লাঞ্ছনা-বঞ্ছনা, আন্দোলন-সংগ্রাম আর জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষের চরম পরিণতিরই ফলশ্র“তি। ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর হতেই পশ্চিম পাকিস্তানী অবাঙ্গালী শাসক-শোষকগোষ্ঠী নিজেদেরকে ক্ষমতায় স্থায়ীভাবে আসীন রাখার মানসে ছলে বলে কৌশলে আমাদেরকে তাদের পদানত রেখে কখনো ইসলামের নামে কখনো গণতন্ত্রের নামে বিভিন্নভাবে তাদের শাসন ও শোষণ অব্যাহত রাখে। আমাদের ভাষা সংস্কৃতি ও কৃষ্টির উপর চালায় আগ্রাসন। এরই সূচনা হয় ১৯৪৮ সালে আমাদের মাতৃভাষার উপর হস্তক্ষেপের মাধ্যমে। এরপর রক্তস্মাত ’৫২-এর ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর নির্বাচনে এ অঞ্চলে মুসলিম লীগের ভরাডুবির মাধ্যমে যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয়, ’৬২-এর আইউবী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ’৬৬-এ শেখ মুজিবের ৬ দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ’৬৯-এর ১১ দফা আন্দোলন তথা আইউব শাহীর বিরুদ্ধে গণঅভ্যূত্থান, ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে ৬ দফার পক্ষে এদেশের মানুষের ম্যান্ডেট। স্বায়ত্বশাসন, পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। ’৫৫ এব ’৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানীর পাকিস্তানকে আস্সালামু আলাইকুম, ’৭০-এ নির্ভাচন বর্জন করে স্বাধীন পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা, ’৭০-এর নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সত্বেও পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে নিয়মমাফিক ক্ষমতা হস্তান্তর না করে চক্রান্তের আশ্রয় গ্রহণ- সবকিছু মিলিয়ে ২৩ বছরের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ আর বেদনাই মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করে। ২৫শে মার্চের কালো রাত্রিতে নিরস্ত্র বাঙালীর উপর পাক বাহিনীর নগ্ন হামলার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সারাদেশে একই আওয়াজ- “মুক্তিফৌজ গঠন করো বাংলাদেশ স্বাধীন করো” ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে এদেশের সর্বস্তরের মানুষ তখন স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত।
      অবস্থা এমন দাঁড়ায় সমস্ত বেসামরিক প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে শেখ মুজিবের হাতে। সমস্ত দলমত ছাপিয়ে শেখ মুজিব হয়ে যান একচ্ছত্র নেতা। স্বাধীনতার প্রশ্নে দলমত নির্বিশেষে দেশবাসী বিজয়ী দলের নেতা হিসাবে শেখ মুজিবকে মেনে নেয় স্বাধীনতা সংগ্রামের একচ্ছত্র নেতা হিসাবে- জাতীয় স্বাধীনতার প্রতীক হিসাবে। ২৫শে মার্চ কালো রাত্রির পর চট্টগ্রামেও সঙ্গত কারণেই বেসামরিক প্রশাসন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ছিল। ২৬শে মার্চ বেলা ২টায় চট্টগ্রাম বেতার থেকে আওয়ামী লীগ নেতা এম.এ. হান্নান দেশবাসীকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহবান জানিয়ে একটি ঘোষণা দেয়। যে কোন কারণেই হোক সেটি অনেকের গোচরীভূত হয়নি। পরে নেতৃবৃন্দ দেশের সামরিক বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীকে সংঘবদ্ধ করা এবং দেশবাসীর মনে সাহস সঞ্চারের লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর একজন বাঙালী অফিসার দিয়ে বেতারে একটি ঘোষণা প্রদানের পরিকল্পনা করে। তৎকালীন ইপিআর-এর দায়িত্বে নিয়োজিত ক্যাপেটেল রফিক বাংগালীদের মধ্যে সিনিয়র অফিসার হিসেবে ৮ম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়ার কথা বলেন। মেজর জিয়া এতে সম্মত হবেন কিনা এ ব্যাপারে নেতৃবৃন্দের মনে সংশয় ছিল। কেননা চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪শে মার্চ বাংগালী শ্রমিকরা করাচী হতে আগত সোয়াত জাহাজ হতে অস্ত্র খালাশের কাজ বন্ধ করে দিলে বন্দরের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। এ পরিস্থিতিতে এম.এ. হান্নান, এস.এম ইউসুফ সহ কতিপয় আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ বন্দরে যায়। সেখানে তাদের সাথে মেজর জিয়ার সাক্ষাৎ হয় নেতৃবৃন্দ মেজর জিয়াকে বাংগালীর স্বাধীকারের আন্দোলনের সাথে একাত্ম হয়ে সহযোগীতা করার কথা বললে তিনি রাগান্বিত হয়ে তাদের বলেন-

"You know l am a deceipline Army. Icnn not take the risk of my job and life. You politiceans are created the problems and make the country unstable. What do you think you will libarate the country? It is not possible. Situation will bc under control within short time.Iam the last man to go with you."

     এই যার অবস্থান তাঁকে দিয়ে বেতারে ঘোষণা সম্ভব কিভাবে? তবুও তারা তাদের প্রচেষ্ঠা অব্যাহত রাখেন। ২৬শে মার্চ মেজর জিয়া যথারীতি সোয়াত জাহাজ হতে অস্ত্র খালাশের জন্য সেনানিবাস হতে চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশে বের হবার পর পরই পাকবাহিনী সেনানিবাসে অবস্থানরত মেজর জিয়ার ইউনিটসহ সকল বাংগালী সৈনিকদের নিরস্ত্র করে ফেলে। এমনি অবস্থায় যে কয়জন বাইরে আসতে পেরেছেন তার মধ্যে ল্যাঃ শমসের মুবিন চৌধুরী সেনানিবাসের পরিস্থিতি মেজর জিয়াকে অবহিত করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে তার সাথে যোগাযোগ করতে বন্দর অভিমুখে যান। টাইগার পাশ এলাকায় জিয়ার সাথে তার সাক্ষাৎ হলে গাড়ী থামিয়ে জিয়াকে সেনানিবাসের পরিস্থিতি জানান। জিয়া তার কথায় বিশ্বাস না করে তাকে ধমক দেন। শমসের মুবিন তাকে সেনানিবাসে টেলিফোন করে সত্যতা যাচাই করতে বলেন। টেলিফোনে তার ইউনিট কিংবা বাসভবনে যোগাযোগে ব্যর্থ হয়ে শমসের মুবিনের কথায় তার বিশ্বাস হয়। অতঃপর তারা সেনানিবাসে ফিরে গিয়ে অতর্কিতে তার কমান্ডার কর্নেল জানজুয়াকে হত্যা করে পরিবিার পরিজনকে সেনানিবাসে ফেলে রেখে তার ইউনিটের সৈনিকদের নিয়ে সেনানিবাস ত্যাগ করে। প্রথমে কক্সবাজার চলে যান পরে সেখান থেকে ফিরে এসে গোমদন্তীতে আশ্রয় নেন। এদিকে ২৭শে মার্চ প্রত্যুষে কালুরঘাটে অবস্থিত চট্টগ্রাম বেতারের বিপ্লবী কর্মীরাও অদূরে বাংগালী সেনাদের অবস্থানের খবর পেয়ে তাদের সাথে যোগাযোগ করে। সেখানে তারা মেজর জিয়াকে বেতারে একটি ঘোষণা দিতে এবং ট্রান্সমিশন কেন্দ্র পাহারা দিতে কয়েকজন সৈনিক দেবার অনুরোধ করে। মেজর জিয়া এতে রাগান্বিত হয়ে তাদের ফিরিয়ে দেন। অবশ্য কিছুক্ষণ পরে তিনি কালুরঘাট ট্রান্সমিশন কেন্দ্র পাহারার জন্য ৮ জন সৈনিক পাঠান। তারপর হঠাৎ করে নিজে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন এবং ট্রান্সমিশন কেন্দ্র থেকে নিজেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন। তার এই ধরনের ঘোষণায় নেতৃবৃন্দ হতভম্ব হয়ে পড়েন। পরে সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব প্রাক্তন কেন্দ্রীয় শিল্পমন্ত্রী জনাব এ.কে. খান সাহেব তার বাসভবনে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে নিজ হাতে মেজর জিয়ার মাধ্যমে শেখ মুজিবের পক্ষে ঘোষণার জন্য সংশোধিত ঘোষণাটি লিখে দেন।
    এই সংশোধিত ঘোষণাটি মেজর জিয়া সেদিনই ২৭শে মার্চ সন্ধ্যে ৭-৩০ মিঃ ইংরেজীতে পাঠ করেন এবং কিছুক্ষণ পর পর পুনঃ প্রচারিত হতে থাকে। অবশ্য এর মধ্যে এই ঘোষণার বাংলা অনুবাদও প্রচারিত হতে থাকে। ঘোষণাটি নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো:-

     "I Major Ziaur Rahman on behalf of our great leader, the supreeme commander of Bangladesh Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, do here by proclaim and declare the Independence of Bangladesh, and that the government headed by Bangabandhu Sheik Mujibur Rahman has already been formed. lt is further proclaimed that Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman is the sole leader of the elected representitives of Seventy five millions people of Bangladesh and The Government headed by him is the only legilimate government of the people of the independent sovereign state of Bangladesh which is legally and constitutionaly formed and is worthy of being recognised by all the government, of the world. I therefor reppeal on behalf of our great leader Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman to the governments of all the Democratic, Socialist and other countries of the world specially the big powers and the Nighbouring countries to recognise the legal government of Bangladeshand take effective steps to stop immediately the awful genocide that has been curried on by the army of occupation from Pakistan. To dub out the legally elected representitive of the majority of the peoples as secessionist is a crude joke and contradiction to truth wl1ich should be fool none. The guiding princeple of the new state will be lirst Neutrality. Second peace and third friendship to all and enimity to none. May Allah help us. Joy Bangla."

     এটাই হলো জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতা ঘোষণার ইতিহাস। বিভিন্ন স্থান থেকে এ ধরনের ঘোষণা এসেছে যেমন কুষ্টিয়া থেকে ইপিআর-এ দায়িত্বে নিয়োজিত ক্যাপটেন আবু ওসমান চৌধুরী, গাজীপুর থেকে তৎকালীন মেজর সফিউল্লাহ, ব্রাহ্মনবাড়িয়া থেকে তিতাস গ্যাসের মাইত্রোওয়েভ এর মাধ্যমে মেজর খালেদ মোশাররফ। তবে ওই সব ঘোষণাকে ছাপিয়ে জিয়ার ঘোষণাই বেশী সাড়া জাগিয়েছে এ কারণে যে, কালুরঘাট ট্রান্সমিশন কেন্দ্রটি ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল। এ কারণে এর ব্যপ্তি ছিল বেশ। জিয়াউর রহমানের ঘোষণাটি তৎকালীন পরিস্থিতিতে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত দেশবাসীকে নূতন করে সাহস আর আত্মবিশ্বাসের অভয়বাণী শুনিয়ে ছিল এবং নবউদ্যোমে স্বাধীনতা সংগ্রামকে এগিয়ে নেবার প্রেরণা যুগিয়ে ছিল। এতে কিন্তু জিয়ার কোন একক কৃতিত্ব্ নাই- এটা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা আর কার্যক্রমের মধ্যে একটি। পরে জিয়াউর রহমান একজন সেক্টর কমান্ডার হিসাবে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অধীনে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন এবং যুদ্ধোত্তর কালে বীরত্বের জন্য ‘বীরউত্তম’ খেতাবে ভূষিত হন এবং শেথ মুজিব শাসনামল ১৫ই আগষ্ট ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডিপুটি চীফ অব ষ্টাফ এর দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তার বাহিনীর নাম ছিল জেড ফোর্স’। ২৫ থেকে ২৭শে মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ও পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে তৎকালীন ক্যাঃ রফিক, ক্যাঃ মীর শওকত আলী, লেঃ অলি আহমদ, ল্যাঃ শমসের মুবিন চৌধুরী, ক্যাঃ সুবেদ আলী ভূঁইয়ার অবদান অনস্বীকার্য।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অবদান
    আজাদীর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অবদান ছিল বর্ণনাতীত। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনা করে সৈয়দ আব্দুস শাকের, মোস্তফা আনোয়ার, রেজাউল করিম চৌধুরী, রাশেদুল হাসান, আবুল কাসেম (সন্দ্বীপ, আমিনুর রহমান, বেলাল আহমদ, সরফুজ্জামান, আব্দুল্লাহ আল ফারুক ও কাজী হাবিবুদ্দিন বাংলা মায়ের এই দশজন দামাল ছেলেই ২৬শে মার্চ কালুরঘাট ট্রান্সমিশন ও রিসেপশন কেন্দ্র এবং আগ্রাবাদ ব্রপ বাষ্টিং ষ্টেশন দখল করেন। ৩০শে মার্চ কালুরঘাট বেতার ভবনে পাক বাহিনী বোমা বর্ষণ করিলে তাহারা ১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারসহ গভীর অরণ্যে প্রবেশ করেন। ৩রা এপ্রিল হইতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পূর্ণোদ্যমে চালু হয়।
    ২৯শে মার্চ উক্ত বেতার কেন্দ্র হইতে ঘোষণা করা হয় যে, শেখ মুজিব মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেই আছেন, নেতৃত্ব দিতেছেন এবং সংঘর্ষে জেনারেল টিক্কা খান নিহত হইয়াছেন। উক্ত ঘোষণা দেশবাসীর মনে বর্ণনাতীত সাহস সঞ্চার করে। ভারত গমনকালে হাটে-মাঠে, ঘাটে সংবাদটি প্রত্যেকের মুখে মুখে আমি স্বকর্ণে শুনিয়াছি এবং পাক বেতার কেন্দ্রের বিপরীত সত্য ঘোষণা কেহ সেই দিন বিশ্বাস করে নাই। স্বজাতি বেতার কেন্দ্রের ঘোষণার প্রতি যে কি অবিচল আস্থা স্বীয় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ব্যতীত উহা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। বাংগালী জাতির বদ্ধমূল ধারণাকে বিনষ্ট করিবার প্রয়াসেই পাকিস্তান সরকার করাচী বিমান বন্দরে বসা অবস্থায় বন্দী শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসহ গ্রেফতারের খবর ২রা এপ্রিল পাকিস্তান অবজারবার পত্রিকায় প্রকাশ করে। ইহাই পরে ১৫ই এপ্রিল দৈনিক পূর্বদেশে ছাপা হয়।

আগরতলা পুলিশী হয়রানি
    আগরতলা হইতে রওয়ানা হইয়অ সোনামোড়া শহরে টেকী হইতে অবতরণ করিলে আমাকে থানায় যাইতে অনুরোধ জানানো হয়। থানায় জিজ্ঞাসাবাদের পর থানার অফিসার-ইন-চার্জের বাসভবনে আমার রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করা হয় অর্থাৎ ভদ্রভাবে পরোক্ষ ক্রিয়ায় আমাকে পুলিশী হেফাজতে আটক রাখা হয়। পরদিন ভোর ৮ ঘটিকায় ভারতীয় দেশরক্ষা বিভাগীয় সিকিউরিটি অফিসার ক্যাপ্টেন ঘোষ প্রায় দুই ঘন্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর আমার নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করেন। মনে হইল, তাহাদের মনের রোগ কিছুটা প্রশমিত হইয়াছে। তবে, আমার দৃঢ় ধারণা জন্মিল যে, আমার মতো স্পষ্টভাষী স্বাধীনচেতা জাতীয়তাবাদীদের জন্য ভারত ভূমিতে কোন আশ্রয় নাই; আশ্রয় রহিয়াছে তাহাদের পোষা মেরুদন্ডহীন আওয়ামী লীগ মার্কা জাতীয়তাবাদীদের তাহাদের জন্যই সর্বত্র অবারিত দ্বার।
    আগরতলা বাংগালী হিন্দুদিগকে পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে বাংগালীর মরণপণ সংগ্রামে উৎফুল্ল মনে হইয়াছে। ইহা সর্ববাদী সত্য যে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে সীমান্তের ওপারের বংগভাষাভাষী হিন্দুদের নৈতিক, আর্থিক ও বাস্তব সমর্থন অর্থাৎ সর্বাত্মক সহায়তা ছিল অতুলনীয়। কিন্তু যখনই আমরা বাংলা ভাষাভাষী সকলে ঐক্যবদ্ধ হইয়অ বৃহত্তর বাংগালী জাতির জন্য বৃহত্তর স্বাধীন সার্বভৌম বঙ্গদেশ রাষ্ট্র গঠন মর্মে প্রস্তাবের অবতারণা করিয়াছি, তখন কেহ কেহ সরাসরি প্রস্তাবটি প্রত্যাখান করিয়াছেন, কেহ অন্য প্রসঙ্গ উত্থাপন করিয়া মূল আলোচনার মোড় ঘুরাইয়া দিয়াছেন। ঘনিষ্ঠ মেলামেশা, ভাবের গভীর আদান-প্রদান এবং সর্বোপরি বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণের ফলে নিঃসন্দেহে এবং স্থির নিশ্চিত হইলাম যে, সীমান্ত পরপারের বঙ্গ ভাষাভাষী হিন্দুদের নিকট বৃহৎ ভারতীয় রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব প্রকৃতই গর্বের বস্তু।
    তাহারা যতটাবা বাংগালী তাহার চাইতে অধিক ভারতীয়। ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণেই বোধহয় বঙ্গ ভাষাভাষী হিন্দুদের চিন্তা ভিন্নরূপ। অবাংগালীর শোষণ তাহারা স্বীকার করেন; কিন্তু বাংগালীর সত্ত্বা বিকাশের সংগ্রামে তাহারা আগ্রহী নহেন। পূর্ববংগ, পশ্চিমবংগ, আসাম, মেঘালয় ও পার্বত্য ত্রিপুরা এক সমৃদ্ধশালী বৃহত্তর এলাকা এবং উক্ত গোটা এলাকাই বংগ ভাষাভাষী অধ্যুষিত। ভাষা, সংস্কৃতি, রক্ত ও ভৌগোলিক অবস্থান যদি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তি হয়, তাহা হইলে স্বাধীন ও সার্বভৌম বৃহত্তর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দাবী একান্ত স্বাভাবিক। সুতরাং কালের যাত্রায় এই দাবী উত্থিত হইবার বিরুদ্ধে সীমান্ত পারের বাঙ্গালীদের বাস্তব ও মনস্তাত্বিক বাধা কোথায়?
    স্মর্তব্য, বাংগালী হিন্দু জনতাই সাম্প্রদায়িকতার মন্ত্রে উদ্ধুদ্ধ হইয়অ ১৯৪৭ সালে বোস-সোহরাওয়ার্দী’র উত্থাপিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ পরিকল্পনাকে আঁতুরড় ঘরেই হত্যা করে। যে মজ্জাগত ধ্যান-ধানণায় তাহারা সেইদিন আত্মবলির রাজপথ অবলম্বন করিয়াছিল, একদিন না একদিন ভারতে অবস্থানরত বংগ ভাষাভাষী হিন্দু জনতা নিজেদের সেই ভুল উপলব্ধি করিবে এবং বৃহত্তর স্বাধীন বংগদেশ প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হইবে, এই বিশ্বাস ও প্রীতি লইয়া সেইদিনের অপেক্ষায় রহিলাম।

ঢাকা প্রত্যাবর্তন
    ভারত ভূমিতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের দৌরাত্ম্যে মনে হইত যে, আমাদের জীবনের নিরাপত্তা নাই। আমরা সংগ্রামরে প্রেরণায় ভারত ভূমিতে গিয়াছিলাম, প্রাণ বাঁচাইতে যাই নাই, ব্যবসা করিতে যাই নাই, ব্যাংক লুটের টাকা সামলাইতে যাই নাই, অসৎ কর্মে লিপ্ত হইতে যাই নাই। লুটের ঠাকাং জীবনভোগ করিতে যাই নাই, হোটেল রোস্তোরাঁয় বিলাস জীবন-যাপন করিতে যাই নাই, দয়ার ভিক্ষা চাহিতে যাই নাই, সর্বোপরি কাহারো সহিত ঝগড়া করিতেও যাই নাই। আমাদের ঝগড়া-বিবাদ জালেম জেনারেল ইয়াহিয়া সরকারের বিরুদ্ধে, অত্যাচারী পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে। তাই পাক-বাহিনী কবলিত কোটি কোটি বাংগালীদের সহিত সমভাবে মানসিক ও প্রয়োজনবোধে দৈহিক নির্যাতন সহ্য করিবার দৃঢ় সংকল্প লইয়া আমি, সহকর্মী এহসানুল হক সেলিম ও কবিরসহ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তনকালে ইলিয়টগঞ্জ ব্রিজের সন্নিকটে আসিয়া দেখি যে, ব্রিজটি ভাংগা। কবিরই কিছুদিন পূর্বে ভারতীয় সৈন্য বাহিনীর এক ক্যাপ্টেন ও অন্যান্যের সহায়তায় ব্রিজটি বিস্ফোরক দ্রব্যের সাহায্যে উড়াইয়া দিয়াছিল। উল্লেখ্য যে, পরবর্তীকালে ঢাকার মালিবাগের মোড়ে সশস্ত্র মোকাবেলায় পাক-বাহিনীর গুলিতে কবির শাহাদাৎবরণ করে। বলিতে ভুলিয়াছি যে, ভারতে অবস্থানরত আশ্রয় গ্রহণকারী বাংলা জাতীয় লীগ নেতৃবৃন্দ সর্বজনাব দেওয়ান সিরাজুল হক, আশরাফ হোসেন, এম.এম. আনোয়ার ও পরিমল সাহা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন এবং ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম-সূচী গ্রহণের অনুরোধ জানাইয়াছিলেন, অবশ্য ফল বিশেষ কিছু হয় নাই।

দেশে অবস্থানকারী বাংগালীদের অবদান
    ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ হইতে ১৫ই ডিসেম্বর এই সময়টা ছিল পূর্ব পাকিস্তানবাসী বাংগালীদের জন্য সহাসংকটকাল, মহাদুর্ভোগকাল ও মহাত্যাগের কাল। এই সময়ে আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীদের বাড়ীঘর কোন কোন ক্ষেত্রে ভষ্মীভূত হইয়াছে, কোন কোন ক্ষেত্রে বাজেয়াপ্ত হইয়াছে। ২৬শে মার্চ সন্ধ্যা ৭ টায় বেতার ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া দেশে রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। দেশবাসীর জন-মাল ইজ্জতের কোন প্রকার নিরাপত্তা ছিল না। যখন তখন গ্রেফতার, পাশবিক ও দৈহিক অত্যাচার ও নির্যাতন ভোগ ছিল ভাগ্যলিপি। সীমান্ত পারে ভারত ভূখন্ডে আশ্রয়প্রার্থী কয়েক লক্ষ শরনার্থী ব্যতীত বাকী সাত কোটি নিরস্ত্র বাংগালী ছিল কার্যতঃ সশস্ত্র হিংস্র পাক বাহিনীর হাতে বন্দী। তাহারাই পাক বাহিনীর জুলুম সহ্য করিয়াছে; তাহারাই মুক্তিযোদ্ধাকে আহার, আশ্রয় ও ন্যান্য সাহায্য দিয়াছে। তাহারা আত্মবিসর্জন দিয়াছে; কিন্তু শত্র“ সেনার নিকট আত্মসমর্পণ করে নাই। ভাগ্যের কি পরিহাস, ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর মৃত্যুঞ্জয়ী এই জনতাই মুহূর্তের মধ্যে ভারতে আশ্রয়-প্রার্থী শরনার্থীদের দৃষ্টিতে পাক-বাহিনীর সহযোগীরূপে অভিযুক্ত হয় এবং এক পলকে পরিণত হয় এক অচ্ছুত শ্রেণীতে। আরো পরিতাপের বিষয়, ১৬ই ডিসেম্বরের পরে অনুষ্ঠিত অত্যাচার, অবিচার, লুটপাট, খুন, রাহাজানী ও মান-ইজ্জত এবং সতীত্ব হরণ ১৬ই ডিসেম্বরের আগেকার সময়ের মতই সমভাবে গ্রামজীবন ও বাংগালী জন-জীবনকে বিষাক্ত করিয়া তোলে। ভারত হইতে প্রত্যাগত মুষ্টিমেয় শরনার্থীই ছিল ইহার জন্য দায়ী। ইতিহাসের কি নির্মম শিক্ষা; ফরাসী বিপ্লবের কি মর্মন্তদ পুনরাবৃত্তি!

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া পাক-ভারত যুদ্ধ
    ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ নিরস্ত্র ভাষাভাষী পূর্ব পাকিস্তানীদের উপর উর্দুভাষী পাক-বাহিনীর হামলা ও ডিসেম্বরে পাক-ভারত যুদ্ধ ছিল একাধারে পাকিস্তানী উর্দুভাষী কায়েমী স্বার্থ চক্র, ভারতীয় সম্পসারণবাদী কুচক্রী মহল এবং পাক-চীন ও পাক-সোভিয়েত বন্ধুত্বের ক্ষিপ্ত মার্কিন সম্রাজ্যবাদী মহলের বহুমুখী সাঁড়াশি অভিযানের সহিংস ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও প্রতিফল।
    জুলাই মাস হইতে জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেল উত্থান্ট সহানুভূতিশীল মনোভাবপ্রসূত যে সব প্রস্তাব দিয়া আসিতেছিলেন, ক’টবুদ্ধি ইন্দিরা গান্ধীর বিরোধিতার ফলে সেইগুলি ব্যর্থ হয়। ফলে জাতিসংঘের ২৬তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের প্রস্তাবানুযায়ী অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে পাক-ভারত সীমান্ত এলাকায় জাতিসংঘ প্রহরী নিয়োগের প্রচেষ্টা বানচাল হইয়া পড়ে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পরিকল্পনা মোতাবেক ২৬শে অক্টেবর (১৯৭১) যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও পশ্চিম জার্মানীর সমর্থন কুড়াইরার মানসে ভ্রমণ করেন ও রাষ্ট্রনায়কদের সহিত সাক্ষাৎ করেন। পূর্বাহ্নে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে যে কোন অবস্থা মোকাবেলার চিন্তায় সোভিয়েট রাশিয়ার সহিত ৯ই আগষ্ট (১৯৭১) শান্তি মৈত্রী ও সহযোগীতা চুক্তি (TREATY OF PEACE, FRIENDSHIP & CO-OPERATION) নামে সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ২১শে নভেম্বর ‘বয়রা’ এলাকায় পাক-বাহিনী সম্মিলিত ভারতীয় ও মুক্তি বাহিনীর নিকট পরাজয়বরণ করেন। তাহাদের তেরটি ট্যায়ক ও চারটির মধ্যে তিনটি সেবর জেট ভারত ভূমিতে ধ্বংস হয়। ক্ষিপ্ত ইয়াহিয়া খান ২৩শে নভেম্বর দেশব্যাপী জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেন। ২৬শে নভেম্বর পশ্চিম পাকিস্তানে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ সংকটজনক পরিস্থিতি হইতে ত্রান লাভের আশায় পাক-ভারত সশস্ত্র সংঘর্ষের প্রস্তুতি নেন। তিনি হয়ত আশা করিয়াছিলেন যে, আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের ফলে ভারত কর্তৃক মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য সহায়তাদান বন্ধ হইবে। ১৯শে জুলাই লন্ডনের ফিনানসিয়াল টাইমস প্রতিনিধির সহিত এক সাক্ষাৎকারে জেনারেল ইয়াহিয়া খান হুমকি দেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের কোন অংশ বিদ্রোহীদের ঘাঁটি নির্মণকল্পে দখল করা হইলে পূর্ণ যুদ্ধ ঘোষণা করা হইবে। ৪ঠা আগষ্ট করাচী টেলিভিশন ঘোষণায়ও তিনি একই উক্তি করেন। উল্লেখ্য যে, পূর্ব পাকিস্তানকে দেখানোর ব্যাপারে ইয়াহিয়া খানের পদক্ষেপ সম্পর্কে লন্ডনের ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় মিঃ পিটার প্রেসটন ২৯শে মার্চ (১৯৭১) এক রিপোর্টে মন্তব্য করেছিলেন, ''It is an act of a mindless sergeant Major"  অর্থাৎ ইহা নির্বোধ বা ধীশক্তিহীন সার্জেন্ট মেজরের কাজ। বস্তুতঃ ঘটনাপ্রবাহ মিঃ প্রেসটনের মন্তব্যর যথার্থতা প্রমাণ করে।

ভারতীয় সামরিক হামলা
    ইন্দিরা গান্ধীর ভুল চাল অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর রাত্রে পাকিস্তান ভারতের উপর অতর্কিতে বিমান ইক্রমন করিলে পাক-ভারত যুদ্ধ বাধে- ইহা সত্য নহে। নিম্ন বর্ণিত বক্তব্যই সত্য-Henry Broaudon of the Sunday Times তাহার “The Retrest of American Power” (১৯৭৩) গ্রন্থে লিখেছেন- “The Indian Cabinet On April 28 (’71) had secretly decided to prepare for the possibility of war” বক্তব্যের অকাট্য প্রমাণিক সমর্থন পাওয়া যায় Mejor General Sukhwant Sing, তৎকালীন Deputi Director, Military Operations at Army Heaf-Quarters কর্তৃক লিখিত ও ১৯৮০ সালে প্রকাশিত  “The Liberation of Bangladesh” এর আংশ বিশেষ  “The Army was asked to take over the guidance of all aspects of guerilla warfare on April 30, 1971.” ভারেতের পক্ষে যুদ্ধ পরিচালনার সর্বাধিনায়ক Field Marshal Sam Manekshaw বোম্বেতে এক জনসভায় ১৯৭৭ সালের ১৬ই নভেম্বর প্রকাশ করেন যে, ১৯৭১ সালে ডিসেম্বর ইন্দো-পাক যুদ্ধের ৯ মাস পূর্বে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী CABINET MEETING -এ উপস্থিত হইতে তলব করেন। ক্যাবিনেট সভায় তাহাকে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে আঘাত হানার জন্য নির্দেশ দেন- কিন্তু Field Marshal আঘাত হানার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণে সময় প্রার্থনা করে। International Commission of Jurists
তদন্তের সিদ্ধান্ত যে, ১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর ভারতীয় সাঁজোয়া বাহিনী পূর্ব পাকিস্তান ভূমিখন্ডে ঢুকিয়া পড়ে- সেইদিন হইতেই ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ আরম্ভ হয়- ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর নয়। তখনি পাকিস্তান অবস্থার বিপাকে মরিয়া হইয়া ভারতের উপর বিমান হামলা করিতে বাধ্য হয়।
    মাত্র কিছুদিনের মধ্যে অর্থাৎ ১৬ই ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানে পাক বাহিনী ভারতীয় বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং ইহারই ফলে পূর্ব পাকিস্তান পাক বাহিনীর অত্যাচার হইতে মুক্ত হয়। বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যূদয় ঘটে বাংলাদেশের।
    ইতিপূর্বে ৬ই ডিসেম্বর ভারতীয় পার্লামেন্টের বিশেষ অধিবেশনে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেন। উল্লেখ্য যে, ১লা জুন মিঃ ফনীভূষণ মজুমদারের নেতৃত্বে মিসেস নূরজাহান মুর্শেদ ও শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন সমবায়ে গঠিত তিন সদস্যবিশিষ্ট পার্লামেন্টারী প্রতিনিধিদল ভারতীয় পার্লামেন্ট সেন্ট্রাল হলে অনুষ্ঠিত ভারতীয় পার্লামেন্টের উভয় পরিষদের যুক্ত অধিবেশনে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দানের জন্য আকুল আবেদন জানাইয়াছিলেন। কিন্তু তখন ভারত সরকার অপেক্ষা করিবার নীতি গ্রহণ করিয়অ বিষয়টি এড়াইয়া গিয়াছিল। অবশ্য ইতিপূর্বে ৩১শে মার্চ ভারতীয় পার্লামেন্ট পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সহিত একাত্মতা ঘোষণা করিয়া সর্বপ্রকার সাহায্য দানের সংকল্প প্রকাশ করে এবং ১লা ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী মিসেস গান্ধী পূর্ব পাকিস্তান হইতে পাক সৈন্য প্রত্যাহারের দাবী জানান। প্রকাশ, মুক্তির নয় মাস সংগ্রামে ১০৪৭ জন ভারতীয় সৈন্য প্রাণ হারায়, ৩ হাজার ৪৭ জন আহত হয় ও ৮৯ জন নিখোঁজ হয়।
    বলা আবশ্যক যে, ভারতীয় বাহিনীর এই ত্যাগ আমরা কৃতজ্ঞতার সহিত স্মরণ করি। এবং বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতীয় বাহিনী সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ না হইলে বাংলাদেশ অচিরেই ভিয়েতনামে পরিণত হইত আর মুক্তিবাহিনী কয়েক যুগ অবিরাম সংগ্রাম করিয়াও দেশকে পাক বাহিনী-মুক্ত করিতে পারিত কিনা সন্দেহ। সুতরাং ইহাও মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিতে হইবে যে, ১৯৭১ সালের সেই ভয়াল কালো দিনগুলিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী ও ভারতীয় জনগণ সম্ভাব্য ঝুঁকি সত্ত্বেও যুদ্ধে অবতীর্ণ হইয়অ বাংলাদেশেকে পাক হানাদার বাহিনী মুক্ত করিবার চেষ্ট না করিলে অত্র এলাকার বংগভাষী মাত্রই হয়তো নগণ্য সংখ্যক উর্দু ভাষাভাষী ও তাহাদের নগণ্য সংখ্যাক স্থানীয় সমর্থকদের সেবাদাসে পরিণত হইত। সুতরাং কৃতজ্ঞ বংগ ভাষাভাষী আপামর জনগণ গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে রাজধানীর রাজপথে ১৬ই ডিসেম্বর ও ইহার পরবর্তী কয়েকদিন ভারতীয় নাগরিক ও ভারতীয় সেনাবাহিনীকে যে যততত্র স্বতঃস্ফূর্ত আস্তরিক ও প্রাণঢালা সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করিয়াছে তাহা বিস্ময়কর কিছু ছিল না। বাংগালী মজলুম জনগণ ১৯৭১-এর মার্চ হইতে ডিসেম্বর নয় মাসে যখন প্রায় ন্যূব্জদেহ, কুব্জপৃষ্ঠ, অতিমাত্রায় শ্রান্ত-ক্লান্ত ও অসহায়, বাংগালীর ফরিয়অদে যখন সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালার আরশ পর্যন্ত কাঁপিতেছিল, তখনই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বাংগালী জাতির মুক্তিদাতার ভূমিকাই গ্রহণ করেন।
    অবশ্য ইহা বলাও সত্যের অপলাপ হইবে যে, একমত্র মহান পরার্থপরতা বা মানবাধিকার নীতিতে উদ্বুদ্ধ হইয়াই ভারত পাক হানাদার বাহিনী বিতাড়নে সর্বশক্তি নিয়োগ করিয়াছিল। বরং আন্তর্জাতিক শক্তিতে পরিণত হইবার প্রবল আকাংখা এবং জাতীয় স্বার্থ চরিতার্থ করিবার মানসেই ভারত সেইদিন অস্ত্র ধরিয়অছিল। সুতরাং ইহার পরিণতি কি দাঁড়াইতে পারে, সেই চিন্তাও সেইদিন অনেকের মাথায় ছিল। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর বাংলাদেশ সরকারের মেরুদন্ড, শক্তি, দক্ষতা ও দেশপ্রেমের গভীরতার উপরই নির্ভর করিবে যে, ভারতীয় বিভন্ন স্বার্থান্বেষী শ্রেণী এই দেশকে একচেটিয়া লুট-পাট ও শোষণের যাঁতাকলে পরিণত করিতে সক্ষম হইবে কি হইবে না।
    ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাক বাহিনীর অধিনায়ক লেঃ জেঃ নিয়াজী ঢাকার রেসকোর্স দেশরক্ষা বাহিনীর যৌথ কম্যান্ড প্রতিনিধিদ্বয় ভারতীয় সেনা বিভাগের লেঃ জেঃ জগজিৎ সিং অরোরা ও বাংলাদেশ দেশরক্ষা বাহিনীর এ.কে খন্দকারের নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করিলে পাক দেশরক্ষা বাহিনীর ৭৫ হাজার ও বেসামরিক ১৮ হাজার যুদ্ধবন্দীকে ভারত ভূমিতে স্থানান্তরিত করিয়অ তথায় আটক রাখা হয়।
    যে দলিলের মাধ্যমে এই আত্মসমর্পণ সংঘটিত হইয়াছিল তাহা নিম্নে দেওয়া হইল:

TEXT OF INSTRUMENT OF SURRENDER

The PAKISTAN Eastern Command agree to surrender all PAKISTAN Armed Forces in BANGLADESH to Lieutenant General JAGJIT SINGH AURORA, General Officer Commanding-in-Chief of the Indian and Bangladesh force in the Eastern Theatre. This surrender includes all PAKISTAN Land, Air and Naval forces as also all paramilitary forces and civil amied forces. These forces will lay down their arms and surrender at the places where they are currently located to the nearest regular troops under the command of Lieutenant General JAGJIT SINGH AURORA.

The PAKISTAN Eastern Command shall come under the orders of Lieutenant General JAGJIT SINGH AURORA as soon as this instrument is signed. Disobedience of orders will be regarded as a breach of the surrender terms and will be dealt with in accordance with the accepted laws and usages of war. The decision of Lieutenant General IAGJIT SINGH AURORA will be final, should any doubt arise as to the meaning or interpretation of the surrender terms. Lieutenant General Jagjit Singh Aurora gives a solemn assurance that personnel who surrender shall be treated with the dignity and respect that soldiers are entitled to in accordance with the provisions of the GENEVA convention and guarantees the safety and well- being of all Pak Military and Paramilitary forces who surrender. Protection will be provided to foreign nationals, ethnic minorities and personnel of - West Pakistan origin by the forces under the command of Lieutenant General Jagjit Singh Aurora.

JAGJIT SINGH AURORA

Lieutenant General

General Officer Commanding in Chief

Indian and Bangladesh Forces

in the Eastern Theatre

16, December, 1971

AMIR ABDULLAH KHAN NIAZI

Lieutenant General

Martial Law Administrator

Zone B and Commander

Eastern Command (Pakistan)

16, December, l971

     আন্দোলনের প্রেক্ষাপটও দীর্ঘদিনের লাঞ্ছনা-বঞ্ছনা, আন্দোলন-সংগ্রাম আর জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষের চরম পরিণতিরই ফলশ্র“তি। ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর হতেই পশ্চিম পাকিস্তানী অবাঙ্গালী শাসক-শোষকগোষ্ঠী নিজেদেরকে ক্ষমতায় স্থায়ীভাবে আসীন রাখার মানসে ছলে বলে কৌশলে আমাদেরকে তাদের পদানত রেখে কখনো ইসলামের নামে কখনো গণতন্ত্রের নামে বিভিন্নভাবে তাদের শাসন ও শোষণ অব্যাহত রাখে। আমাদের ভাষা সংস্কৃতি ও কৃষ্টির উপর চালায় আগ্রাসন। এরই সূচনা হয় ১৯৪৮ সালে আমাদের মাতৃভাষার উপর হস্তক্ষেপের মাধ্যমে। এরপর রক্তস্মাত ’৫২-এর ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর নির্বাচনে এ অঞ্চলে মুসলিম লীগের ভরাডুবির মাধ্যমে যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয়, ’৬২-এর আইউবী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ’৬৬-এ শেখ মুজিবের ৬ দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ’৬৯-এর ১১ দফা আন্দোলন তথা আইউব শাহীর বিরুদ্ধে গণঅভ্যূত্থান, ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে ৬ দফার পক্ষে এদেশের মানুষের ম্যান্ডেট। স্বায়ত্বশাসন, পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। ’৫৫ এব ’৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানীর পাকিস্তানকে আস্সালামু আলাইকুম, ’৭০-এ নির্ভাচন বর্জন করে স্বাধীন পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা, ’৭০-এর নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সত্বেও পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে নিয়মমাফিক ক্ষমতা হস্তান্তর না করে চক্রান্তের আশ্রয় গ্রহণ- সবকিছু মিলিয়ে ২৩ বছরের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ আর বেদনাই মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করে। ২৫শে মার্চের কালো রাত্রিতে নিরস্ত্র বাঙালীর উপর পাক বাহিনীর নগ্ন হামলার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সারাদেশে একই আওয়াজ- “মুক্তিফৌজ গঠন করো বাংলাদেশ স্বাধীন করো” ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে এদেশের সর্বস্তরের মানুষ তখন স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত।
       অবস্থা এমন দাঁড়ায় সমস্ত বেসামরিক প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে শেখ মুজিবের হাতে। সমস্ত দলমত ছাপিয়ে শেখ মুজিব হয়ে যান একচ্ছত্র নেতা। স্বাধীনতার প্রশ্নে দলমত নির্বিশেষে দেশবাসী বিজয়ী দলের নেতা হিসাবে শেখ মুজিবকে মেনে নেয় স্বাধীনতা সংগ্রামের একচ্ছত্র নেতা হিসাবে- জাতীয় স্বাধীনতার প্রতীক হিসাবে। ২৫শে মার্চ কালো রাত্রির পর চট্টগ্রামেও সঙ্গত কারণেই বেসামরিক প্রশাসন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ছিল। ২৬শে মার্চ বেলা ২টায় চট্টগ্রাম বেতার থেকে আওয়ামী লীগ নেতা এম.এ. হান্নান দেশবাসীকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহবান জানিয়ে একটি ঘোষণা দেয়। যে কোন কারণেই হোক সেটি অনেকের গোচরীভূত হয়নি। পরে নেতৃবৃন্দ দেশের সামরিক বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীকে সংঘবদ্ধ করা এবং দেশবাসীর মনে সাহস সঞ্চারের লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর একজন বাঙালী অফিসার দিয়ে বেতারে একটি ঘোষণা প্রদানের পরিকল্পনা করে। তৎকালীন ইপিআর-এর দায়িত্বে নিয়োজিত ক্যাপেটেল রফিক বাংগালীদের মধ্যে সিনিয়র অফিসার হিসেবে ৮ম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়অর কথা বলেন। মেজর জিয়া এতে সম্মত হবেন কিনা এ ব্যাপারে নেতৃবৃন্দের মনে সংশয় ছিল। কেননা চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪শে মার্চ বাংগালী শ্রমিকরা করাচী হতে আগত সোয়াত জাহাজ হতে অস্ত্র খালাশের কাজ বন্ধ করে দিলে বন্দরের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। এ পরিস্থিতিতে এম.এ. হান্নান, এস.এম ইউসুফ সহ কতিপয় আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ বন্দরে যায়। সেখানে তাদের সাথে মেজর জিয়ার সাক্ষাৎ হয় নেতৃবৃন্দ মেজর জিয়াকে বাংগালীর স্বাধীকারের আন্দোলনের সাথে একাত্ম হয়ে সহযোগীতা করার কথা বললে তিনি রাগান্বিত হয়ে তাদের বলেন-

"You know l am a deceipline Army. Icnn not take the risk of my job and life. You politiceans are created the problems and make the country unstable. What do you think you will libarate the country? It is not possible. Situation will bc under control within short time.Iam the last man to go with you."

এই যার অবস্থান তাঁকে দিয়ে বেতারে ঘোষণা সম্ভব কিভাবে? তবুও তারা তাদের প্রচেষ্ঠা অব্যাহত রাখেন। ২৬শে মার্চ মেজর জিয়া যথারীতি সোয়াত জাহাজ হতে অস্ত্র খালাশের জন্য সেনানিবাস হতে চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশে বের হবার পর পরই পাকবাহিনী সেনানিবাসে অবস্থানরত মেজর জিয়ার ইউনিটসহ সকল বাংগালী সৈনিকদের নিরস্ত্র করে ফেলে। এমনি অবস্থায় যে কয়জন বাইরে আসতে পেরেছেন তার মধ্যে ল্যাঃ শমসের মুবিন চৌধুরী সেনানিবাসের পরিস্থিতি মেজর জিয়াকে অবহিত করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে তার সাথে যোগাযোগ করতে বন্দর অভিমুখে যান। টাইগার পাশ এলাকায় জিয়ার সাথে তার সাক্ষাৎ হলে গাড়ী থামিয়ে জিয়াকে সেনানিবাসের পরিস্থিতি জানান। জিয়া তার কথায় বিশ্বাস না করে তাকে ধমক দেন। শমসের মুবিন তাকে সেনানিবাসে টেলিফোন করে সত্যতা যাচাই করতে বলেন। টেলিফোনে তার ইউনিট কিংবা বাসভবনে যোগাযোগে ব্যর্থ হয়ে শমসের মুবিনের কথায় তার বিশ্বাস হয়। অতঃপর তারা সেনানিবাসে ফিরে গিয়ে অতর্কিতে তার কমান্ডার কর্নেল জানজুয়াকে হত্যা করে পরিবিার পরিজনকে সেনানিবাসে ফেলে রেখে তার ইউনিটের সৈনিকদের নিয়ে সেনানিবাস ত্যাগ করে। প্রথমে কক্সবাজার চলে যান পরে সেখান থেকে ফিরে এসে গোমদন্তীতে আশ্রয় নেন। এদিকে ২৭শে মার্চ প্রত্যুষে কালুরঘাটে অবস্থিত চট্টগ্রাম বেতারের বিপ্লবী কর্মীরাও অদূরে বাংগালী সেনাদের অবস্থানের খবর পেয়ে তাদের সাথে যোগাযোগ করে। সেখানে তারা মেজর জিয়াকে বেতারে একটি ঘোষণা দিতে এবং ট্রান্সমিশন কেন্দ্র পাহারা দিতে কয়েকজন সৈনিক দেবার অনুরোধ করে। মেজর জিয়া এতে রাগান্বিত হয়ে তাদের ফিরিয়ে দেন। অবশ্য কিছুক্ষণ পরে তিনি কালুরঘাট ট্রান্সমিশন কেন্দ্র পাহারার জন্য ৮ জন সৈনিক পাঠান। তারপর হঠাৎ করে নিজে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন এবং ট্রান্সমিশন কেন্দ্র থেকে নিজেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন। তার এই ধরনের ঘোষণায় নেতৃবৃন্দ হতভম্ব হয়ে পড়েন। পরে সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব প্রাক্তন কেন্দ্রীয় শিল্পমন্ত্রী জনাব এ.কে. খান সাহেব তার বাসভবনে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে নিজ হাতে মেজর জিয়ার মাধ্যমে শেখ মুজিবের পক্ষে ঘোষণার জন্য সংশোধিত ঘোষণাটি লিখে দেন।
    এই সংশোধিত ঘোষণাটি মেজর জিয়া সেদিনই ২৭শে মার্চ সন্ধ্যে ৭-৩০ মিঃ ইংরেজীতে পাঠ করেন এবং কিছুক্ষণ পর পর পুনঃ প্রচারিত হতে থাকে। অবশ্য এর মধ্যে এই ঘোষণার বাংলা অনুবাদও প্রচারিত হতে থাকে। ঘোষণাটি নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো:-

    "I Major Ziaur Rahman on behalf of our great leader, the supreeme commander of Bangladesh Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, do here by proclaim and declare the Independence of Bangladesh, and that the government headed by Bangabandhu Sheik Mujibur Rahman has already been formed. lt is further proclaimed that Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman is the sole leader of the elected representitives of Seventy five millions people of Bangladesh and

the Government headed by him is the only legilimate government of the people of the independent sovereign state of Bangladesh which is legally and constitutionaly formed and is worthy of being recognised by all the government, of the world. I therefor reppeal on behalf of our great leader Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman to the governments of all the Democratic, Socialist and other countries of the world specially the big powers and the Nighbouring countries to recognise the legal government of Bangladeshand take effective steps to stop immediately the awful genocide that has been curried on by the army of occupation from Pakistan. To dub out the legally elected representitive of the majority of the peoples as secessionist is a crude joke and contradiction to truth wl1ich should be fool none. The guiding princeple of the new state will be lirst Neutrality. Second peace and third friendship to all and enimity to none. May Allah help us. Joy Bangla."

এটাই হলো জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতা ঘোষণার ইতিহাস। বিভিন্ন স্থান থেকে এ ধরনের ঘোষণা এসেছে যেমন কুষ্টিয়া থেকে ইপিআর-এ দায়িত্বে নিয়োজিত ক্যাপটেন আবু ওসমান চৌধুরী, গাজীপুর থেকে তৎকালীন মেজর সফিউল্লাহ, ব্রাহ্মনবাড়িয়া থেকে তিতাস গ্যাসের মাইত্রোওয়েভ এর মাধ্যমে মেজর খালেদ মোশাররফ। তবে ওই সব ঘোষণাকে ছাপিয়ে জিয়ার ঘোষণাই বেশী সাড়া জাগিয়েছে এ কারণে যে, কালুরঘাট ট্রান্সমিশন কেন্দ্রটি ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল। এ কারণে এর ব্যপ্তি ছিল বেশ। জিয়াউর রহমানের ঘোষণাটি তৎকালীন পরিস্থিতিতে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত দেশবাসীকে নূতন করে সাহস আর আত্মবিশ্বাসের অভয়বাণী শুনিয়ে ছিল এবং নবউদ্যোমে স্বাধীনতা সংগ্রামকে এগিয়ে নেবার প্রেরণা যুগিয়ে ছিল। এতে কিন্তু জিয়ার কোন একক কৃতিত্ব্ নাই- এটা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা আর কার্যক্রমের মধ্যে একটি। পরে জিয়াউর রহমান একজন সেক্টর কমান্ডার হিসাবে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অধীনে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন এবং যুদ্ধোত্তর কালে বীরত্বের জন্য ‘বীরউত্তম’ খেতাবে ভূষিত হন এবং শেথ মুজিব শাসনামল ১৫ই আগষ্ট ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডিপুটি চীফ অব ষ্টাফ এর দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তার বাহিনীর নাম ছিল জেড ফোর্স’। ২৫ থেকে ২৭শে মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ও পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে তৎকালীন ক্যাঃ রফিক, ক্যাঃ মীর শওকত আলী, লেঃ অলি আহমদ, ল্যাঃ শমসের মুবিন চৌধুরী, ক্যাঃ সুবেদ আলী ভূঁইয়ার অবদান অনস্বীকার্য।